ইবনে খালদুন
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
এক নজরে
| পূর্ণ নাম | আবু জায়েদ আবদুর রহমান বিন মুহাম্মদ বিন খালদুন আল হাদরামি |
|---|---|
| জন্ম | ২৭ মে ১৩৩২, তিউনিস (তৎকালীন হাফসিদ সালতানাত) |
| মৃত্যু | ১৯ মার্চ ১৪০৬, কায়রো (মামলুক সালতানাত) |
| জাতীয়তা | আরব (তিউনিসীয়) |
| পেশা | ইতিহাসবিদ, সমাজতাত্ত্বিক, দার্শনিক, বিচারক |
| শিক্ষা | ধ্রুপদী ইসলামি শিক্ষা — কুরআন, হাদিস, ফিকহ, আরবি ভাষাতত্ত্ব; আল-আবিলির কাছে গণিত, যুক্তিবিদ্যা ও দর্শন |
| উল্লেখযোগ্য কর্ম | আল-মুকাদ্দিমা, কিতাব আল-ইবার, আত-তারীফ (আত্মজীবনী) |
| উল্লেখযোগ্য ধারণা | আসাবিয়া (গোষ্ঠী-সংহতি) |
পরিচিতি
আবু জায়েদ আবদুর রহমান বিন মুহাম্মদ বিন খালদুন আল হাদরামি — সংক্ষেপে ইবনে খালদুন (২৭ মে ১৩৩২ – ১৯ মার্চ ১৪০৬) — মধ্যযুগের আরব মুসলিম পণ্ডিত, ইতিহাসবিদ, দার্শনিক ও সমাজতাত্ত্বিক। তাকে আধুনিক সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাসতত্ত্ব ও অর্থনীতির অন্যতম জনক হিসেবে গণ্য করা হয়। তার বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ আল-মুকাদ্দিমা (মুকাদ্দিমা) — মূলত তার বৃহৎ ইতিহাসগ্রন্থ কিতাব আল-ইবার-এর ভূমিকা — মানবসমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি ও সভ্যতার উত্থান-পতনের তত্ত্ব নিয়ে রচিত ইতিহাসদর্শনের শ্রেষ্ঠতম রচনাগুলোর একটি।
জন্ম ও পরিবার
১৩৩২ সালের ২৭ মে (৭৩২ হিজরি) তিউনিসে তার জন্ম — তখন শহরটি হাফসিদ সালতানাতের অধীনে ছিল। তার পরিবার ছিল আন্দালুসিয়ার (মুসলিম স্পেন) উচ্চবংশীয় আরব পরিবার; ১২৪৮ সালে সেভিলের পতনের পর তারা তিউনিসে চলে আসে। বংশপরম্পরায় তারা ইয়েমেনের হাদরামাউত অঞ্চলের আরব বংশোদ্ভূত বলে দাবি করতেন। তার পিতা ও পিতামহ রাজনীতি থেকে সরে আধ্যাত্মিক জীবন বেছে নিয়েছিলেন; ভাই ইয়াহিয়া খালদুনও ছিলেন একজন ইতিহাসবিদ। ১৩৪৮-৪৯ সালের ব্ল্যাক ডেথ মহামারিতে মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি পিতামাতা উভয়কেই হারান।
শিক্ষাজীবন
পরিবারের মর্যাদার সুবাদে তিনি মাগরেবের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের কাছে ধ্রুপদী ইসলামি শিক্ষা লাভ করেন — কুরআন (যা তিনি কণ্ঠস্থ করেন), আরবি ভাষাতত্ত্ব, হাদিস, শরিয়া ও ফিকহ; প্রতিটি বিষয়ে তিনি সনদ (ইজাযা) অর্জন করেন। তিলিমসানের গণিতবিদ ও দার্শনিক আল-আবিলির কাছে তিনি গণিত, যুক্তিবিদ্যা ও দর্শন শেখেন এবং ইবনে সিনা, ইবনে রুশদ, রাজি ও তুসির রচনা গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন।
কর্মজীবন
মাত্র ২০ বছর বয়সে তিউনিসের শাসকের দরবারে কাতিব আল-আলামাহ (রাজকীয় সিলমোহর-বাহক ও লেখক) হিসেবে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। এরপর তিনি মরক্কোর মেরিনিদ সুলতানদের দরবারে, গ্রানাডার নাসরিদ সুলতান মুহাম্মদ পঞ্চমের দরবারে এবং উত্তর আফ্রিকার নানা রাজ্যের মন্ত্রী ও উপদেষ্টা পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৩৬৪ সালে গ্রানাডার সুলতানের পক্ষে তিনি কাস্টিলের রাজা পেড্রোর কাছে একটি কূটনৈতিক মিশন সফলভাবে সম্পন্ন করেন। রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও পক্ষ-বদলের এই জীবনে তিনি ১৩৫৭ সালে ২২ মাসের কারাদণ্ডও ভোগ করেন।
রাজনীতিতে ক্লান্ত হয়ে ১৩৭৫ সালে তিনি পশ্চিম আলজেরিয়ার কালাত ইবনে সালামায় এক বারবার গোষ্ঠীর আশ্রয়ে নির্জনবাসে যান — সেখানেই তিনি মুকাদ্দিমা রচনা শুরু করেন। ১৩৮২ সালের দিকে তিনি মিসরের কায়রো যান; সেখানে তিনি মাদ্রাসায় অধ্যাপনা করেন এবং মালিকি মাজহাবের প্রধান বিচারপতি (গ্র্যান্ড কাদি) পদে নিযুক্ত হন — এই সর্বোচ্চ বিচারিক পদে তিনি মোট ছয়বার আসীন হন। ১৪০১ সালে দামেস্ক অবরোধের সময় তিনি মঙ্গোল বিজয়ী তৈমুরের সঙ্গে ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ ও আলোচনায় অংশ নেন।
সাহিত্যজীবন ও রচনাবলি
তার প্রধান কীর্তি দুটি গ্রন্থকেন্দ্রিক: (১) কিতাব আল-ইবার — আরব ও বারবার জাতিসমূহের ইতিহাস নিয়ে রচিত বিশাল ইতিহাসগ্রন্থ; (২) এর ভূমিকা আল-মুকাদ্দিমা — ছয় অধ্যায়ে বিন্যস্ত এই তাত্ত্বিক প্রস্তাবনায় তিনি ইতিহাসের দর্শন, সমাজতত্ত্ব, অর্থনীতি, রাষ্ট্রতত্ত্ব এবং যাযাবর ও নগরভিত্তিক সমাজের বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন। তার সবচেয়ে বিখ্যাত ধারণা আসাবিয়া (গোষ্ঠী-সংহতি) — যার মাধ্যমে তিনি ব্যাখ্যা করেন, কীভাবে গোষ্ঠীগত ঐক্য ও সংহতি রাষ্ট্র ও সভ্যতার উত্থান ঘটায়, আর বিলাসিতা ও নৈতিক অবক্ষয় কীভাবে পতন ডেকে আনে। এছাড়া তিনি আত্মজীবনী আত-তারীফ রচনা করেন, যার মাধ্যমে তার জীবনী বিস্তারিতভাবে জানা যায়।
মুকাদ্দিমা ১৭ শতকের উসমানীয় ঐতিহাসিক কাতিব চেলেবিদের এবং ১৯ শতকের ইউরোপীয় পণ্ডিতদের গভীরভাবে প্রভাবিত করে; ইতিহাসবিদ আর্নল্ড টয়েনবি একে ইতিহাসদর্শনের শ্রেষ্ঠতম রচনা আখ্যা দিয়েছেন। বাংলায় গোলাম সামদানী কোরায়শীর অনুবাদে মুকদ্দিমা — ইবনে খালদুন প্রকাশিত হয়েছে।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
১৪০৬ সালের ১৯ মার্চ কায়রোতে তার মৃত্যু হয় — মালিকি প্রধান বিচারপতি পদে ষষ্ঠবার নিযুক্তির প্রায় এক মাস পর। আজ তিনি বিশ্বব্যাপী "সমাজবিজ্ঞানের জনক" হিসেবে স্বীকৃত; তিউনিস, কায়রোসহ বহু শহরে তার নামে সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পুরস্কার রয়েছে, এবং সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠ্যসূচিতে তার তত্ত্ব আজও পড়ানো হয়।