ইউভাল নোয়া হারারি
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
এক নজরে
| পূর্ণ নাম | ইউভাল নোয়া হারারি (Yuval Noah Harari) |
|---|---|
| জন্ম | ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬ |
| জন্মস্থান | কিরইয়াত আতা, ইসরায়েল |
| অবস্থা | জীবিত |
| জাতীয়তা | ইসরায়েলি |
| পেশা | ইতিহাসবিদ, অধ্যাপক, জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখক |
| শিক্ষা | বিএ, হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়, জেরুজালেম (১৯৯৮); ডি.ফিল (ইতিহাস), অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় (২০০২) |
| উল্লেখযোগ্য কর্ম | স্যাপিয়েন্স: আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব হিউম্যানকাইন্ড; হোমো দেউস; ২১ লেসনস ফর দ্য ২১স্ট সেঞ্চুরি; নেক্সাস |
| পুরস্কার | পোলনস্কি পুরস্কার (২০০৯, ২০১২); মোনকাডো পুরস্কার (২০১১); জার্মান ইকোনমিক বুক অ্যাওয়ার্ড (২০১৭) |
পরিচিতি
ইউভাল নোয়া হারারি (জন্ম ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬) একজন ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ, দার্শনিক ও বিশ্বব্যাপী বেস্টসেলার লেখক। তিনি জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের অধ্যাপক। মানব সভ্যতার সুদীর্ঘ ইতিহাস, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে মানবতার ভবিষ্যৎ নিয়ে লেখা তাঁর বইগুলো বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি পাঠকের কাছে পৌঁছেছে এবং তিনি আমাদের সময়ের অন্যতম প্রভাবশালী পাবলিক বুদ্ধিজীবী হিসেবে বিবেচিত হন।
জন্ম ও শৈশব
হারারির জন্ম ইসরায়েলের কিরইয়াত আতায়; তিনি বেড়ে ওঠেন হাইফায়। তাঁর বাবা শ্লোমো হারারি ছিলেন রাষ্ট্রীয় অস্ত্র প্রকৌশলী এবং মা পিনা হারারি ছিলেন অফিস প্রশাসক। মাত্র তিন বছর বয়সে তিনি নিজে নিজে পড়তে শিখেছিলেন। আট বছর বয়স থেকে তিনি হাইফার লিও বেক এডুকেশন সেন্টারে বুদ্ধিমান শিশুদের বিশেষ শ্রেণিতে পড়াশোনা করেন।
শিক্ষাজীবন
মাত্র সতেরো বছর বয়সে হারারি জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পড়তে ভর্তি হন (১৯৯৩–১৯৯৮) এবং মধ্যযুগীয় ও সামরিক ইতিহাসে বিশেষায়ন নিয়ে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। ‘আতুদা’ কর্মসূচির আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য তিনি ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগদান স্থগিত রাখেন; পরে স্বাস্থ্যগত কারণে তাঁকে সেনাসেবা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ২০০২ সালে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জেসাস কলেজ থেকে ইতিহাসে ডি.ফিল ডিগ্রি অর্জন করেন; তাঁর তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন স্টিভেন গান এবং গবেষণার বিষয় ছিল রেনেসাঁ যুগের সামরিক স্মৃতিকথা। ২০০৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত তিনি ইয়াদ হানাদিভ ফেলো হিসেবে পোস্টডক্টরাল গবেষণা করেন। অক্সফোর্ডে থাকাকালীন জ্যারেড ডায়মন্ডের ‘গানস, জার্মস অ্যান্ড স্টিল’ বইটি তাঁকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে — তাঁর ভাষায়, এই বই পড়ে তিনি বুঝতে পারেন যে তিনিও এমন ব্যাপক পরিসরের ইতিহাস-গ্রন্থ লিখতে পারেন।
কর্মজীবন
হারারি জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। তাঁর একাডেমিক ক্যারিয়ারের প্রথম দিকে তিনি মধ্যযুগীয় ও সামরিক ইতিহাসে বিশেষজ্ঞ ছিলেন; এই বিষয়ে তিনি ‘স্পেশাল অপারেশনস ইন দ্য এজ অব শিভালরি, ১১০০–১৫৫০’ ও ‘দ্য আল্টিমেট এক্সপেরিয়েন্স: ব্যাটলফিল্ড রেভেলেশনস অ্যান্ড দ্য মেকিং অব মডার্ন ওয়ার কালচার’-এর মতো গ্রন্থ ও প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। ২০১৯ সালে তিনি তাঁর স্বামী ইতজিক ইয়াহাভের সঙ্গে ‘স্যাপিয়েনশিপ’ নামে একটি সামাজিক প্রভাবমূলক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন, যার লক্ষ্য বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে জনসাধারণের আলোচনাকে কেন্দ্রীভূত করা। তিনি দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে (২০১৮) ভবিষ্যৎ মানবতা নিয়ে মূল বক্তব্য রাখেন।
সাহিত্যজীবন
তাঁর প্রথম বেস্টসেলার ‘স্যাপিয়েন্স: আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব হিউম্যানকাইন্ড’ প্রথমে ২০১১ সালে হিব্রু ভাষায় প্রকাশিত হয় — এটি ছিল তাঁর বিশ্ব ইতিহাসের স্নাতক শ্রেণির বিশটি লেকচারের ওপর ভিত্তি করে লেখা। ২০১৪ সালে ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশের পর বইটি আন্তর্জাতিক সাড়া জাগায়; প্রায় ৪৫টি ভাষায় অনূদিত এই বইটি ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’ বেস্টসেলার তালিকার শীর্ষ ৩-এ টানা ৯৬ সপ্তাহ অবস্থান করে এবং বারাক ওবামা, বিল গেটস ও মার্ক জাকারবার্গের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুপারিশ পায়। এরপর প্রকাশিত হয় ‘হোমো দেউস: আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টুমরো’ (২০১৫) — যেখানে তিনি ভবিষ্যতে মানবতার সুখ, অমরত্ব ও দেবতুল্য ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা এবং ‘ডেটাবাদ’ ধারণার কথা বলেন; ‘২১ লেসনস ফর দ্য ২১স্ট সেঞ্চুরি’ (২০১৮) — কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিশ্বায়ন ও কাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সমকালীন প্রশ্নের বিশ্লেষণ; ‘স্যাপিয়েন্স: আ গ্রাফিক হিস্ট্রি’ (২০২০); শিশুদের জন্য লেখা ‘আনস্টপেবল আস’ (২০২২) এবং ‘নেক্সাস: আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব ইনফরমেশন নেটওয়ার্কস ফ্রম দ্য স্টোন এজ টু এআই’ (২০২৪)। তাঁর বইগুলো ৬৫টি ভাষায় চার কোটিরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে। উল্লেখ্য, বাণিজ্যিক সাফল্য সত্ত্বেও একাডেমিক মহলে তাঁর রচনার কঠোর সমালোচনা হয়েছে; অনেকে তাঁর বইকে গুরুতর জ্ঞানচর্চার চেয়ে জনপ্রিয় ‘ইনফোটেইনমেন্ট’ হিসেবে দেখেন।
ব্যক্তিগত জীবন
২০০২ সালে হারারির সঙ্গে তাঁর ভবিষ্যৎ স্বামী ইতজিক ইয়াহাভের পরিচয় হয়; ইয়াহাভ তাঁর ব্যক্তিগত ম্যানেজার হিসেবেও কাজ করেন। তাঁদের বিয়ে হয় কানাডার টরন্টোতে একটি সিভিল অনুষ্ঠানে, কারণ ইসরায়েলে কোনো স্বীকৃত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সমলিঙ্গ বিয়ে সম্পন্ন করে না। তিনি তেল আভিভের একটি মধ্যবিত্ত উপকণ্ঠে বসবাস করেন। হারারি একজন নাস্তিক এবং ২০০০ সাল থেকে বিপশ্যনা ধ্যান চর্চা করেন — তিনি একজন সহকারী ধ্যান শিক্ষকও; ‘হোমো দেউস’ বইটি তিনি তাঁর শিক্ষক এস. এন. গোয়েঙ্কাকে উৎসর্গ করেছেন। তিনি নিরামিষভোজী এবং বলেন, তাঁর গবেষণাই তাঁকে এই পথে এনেছে।
পুরস্কার
তাঁর উল্লেখযোগ্য সম্মাননার মধ্যে রয়েছে: পোলনস্কি পুরস্কার (সৃজনশীলতা ও মৌলিকতার জন্য, ২০০৯ ও ২০১২); সোসাইটি ফর মিলিটারি হিস্ট্রির মোনকাডো পুরস্কার (২০১১); ইয়ং ইজরায়েলি অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসে নির্বাচন (২০১২); ‘হোমো দেউস’-এর জন্য হ্যান্ডেলসব্লাট জার্মান ইকোনমিক বুক অ্যাওয়ার্ড (২০১৭); ‘স্যাপিয়েন্স’-এর জন্য চীনের ওয়েনজিন বুক অ্যাওয়ার্ড (২০১৫) ও যুক্তরাজ্যের অ্যাকাডেমিক বুক অব দ্য ইয়ার (২০১৯); ভিইউবি (ব্রাসেলস) থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট (২০২০) এবং ইউএস অ্যাসোসিয়েশন অব ফরেন প্রেস করেসপন্ডেন্টসের সম্মানসূচক পুরস্কার (২০২১)।
বর্তমান অবস্থা ও উত্তরাধিকার
হারারি বর্তমানে জীবিত এবং হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পাশাপাশি লেখালেখি, বক্তৃতা ও স্যাপিয়েনশিপের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব এক্সিস্টেনশিয়াল রিস্কের সঙ্গেও যুক্ত। ‘বিগ হিস্ট্রি’ ধারার জনপ্রিয় লেখক হিসেবে তিনি জটিল বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক ধারণাকে সাধারণ পাঠকের কাছে সহজবোধ্য করে তোলার জন্য প্রশংসিত; একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি, এআই ও মানবতার নৈতিক প্রশ্ন নিয়ে তাঁর সতর্কবার্তাগুলো বিশ্বজনীন বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে।