মূল কন্টেন্টে যান
আহমদ ছফা

আহমদ ছফা

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

বিষয় তথ্য
পূর্ণ নাম আহমদ ছফা
জন্ম ৩০ জুন ১৯৪৩
জন্মস্থান গাছবাড়িয়া, চন্দনাইশ, চট্টগ্রাম
মৃত্যু ২৮ জুলাই ২০০১, ঢাকা
জাতীয়তা বাংলাদেশি
পেশা লেখক, ঔপন্যাসিক, কবি, প্রাবন্ধিক, চিন্তাবিদ
শিক্ষা ম্যাট্রিকুলেশন (১৯৫৭), উচ্চ মাধ্যমিক (১৯৬২); স্নাতক (১৯৬৭, ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ); রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ (১৯৭১, প্রাইভেট); গ্যেটে ইনস্টিটিউট, জার্মান ভাষায় ডিপ্লোমা (১৯৮৬)
উল্লেখযোগ্য কর্ম বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস (১৯৭২), বাঙালি মুসলমানের মন (১৯৮১), ওঙ্কার (১৯৭৫), একজন আলী কেনানের উত্থান-পতন (১৯৮৮), অলাতচক্র (১৯৯৩), গাভী বিত্তান্ত (১৯৯৫), পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ (১৯৯৬), যদ্যপি আমার গুরু (১৯৯৮); গ্যেটের ফাউস্ট-এর অনুবাদ (১৯৮৬)
পুরস্কার একুশে পদক (২০০২, মরণোত্তর); জীবদ্দশায় লেখক শিবির পুরস্কার (১৯৭৫) ও সাদত আলী আখন্দ পুরস্কার (১৯৯৩) প্রত্যাখ্যান করেন

পরিচিতি

আহমদ ছফা (৩০ জুন ১৯৪৩ – ২৮ জুলাই ২০০১) ছিলেন একজন বাংলাদেশি লেখক, ঔপন্যাসিক, কবি, প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ। জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক ও সলিমুল্লাহ খানসহ অনেকের মতে, মীর মশাররফ হোসেন ও কাজী নজরুল ইসলামের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঙালি মুসলমান লেখক তিনি। তার রচনায় বাংলাদেশি জাতিসত্তার পরিচয় নির্ধারণের প্রশ্নটি প্রাধান্য পেয়েছে। জীবিতকালে তিনি ছিলেন প্রথাবিরোধী, স্পষ্টবাদী ও প্রতিষ্ঠানবিরোধী — জীবদ্দশায় তাকে বিদ্রোহী, বোহেমিয়ান ও বিতর্কপ্রবণ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় — গল্প, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ, ইতিহাস ও ভ্রমণকাহিনি মিলিয়ে — তিনি তিরিশটিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন; তার রচনাবলি ৯ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে।

জন্ম ও শিক্ষা

১৯৪৩ সালের ৩০ জুন চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার হাশিমপুর ইউনিয়নের গাছবাড়িয়া গ্রামে আহমদ ছফার জন্ম। পিতা হেদায়েত আলী, মাতা আসিয়া খাতুন। দুই ভাই ও চার বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন বাবা-মায়ের দ্বিতীয় সন্তান।

পিতার প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণ গাছবাড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার পড়াশোনা শুরু হয়। ১৯৫৭ সালে গাছবাড়িয়া নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৬২ সালে নাজিরহাট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। একই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হলেও সেখানে ক্লাস চালিয়ে যাননি। ১৯৬৭ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ থেকে প্রাইভেটে দ্বিতীয় শ্রেণিতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমির পিএইচডি গবেষণা ফেলোশিপের জন্য মনোনীত হন — গবেষণার বিষয় ছিল ১৮০০ থেকে ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব ও বিকাশ এবং বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে তার প্রভাব। এ সময় জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের সান্নিধ্যে আসেন এবং দীর্ঘকাল তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় থাকে। ১৯৭১ সালে প্রাইভেটে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ পরীক্ষা দেন, তবে পিএইচডি আর সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। ১৯৮৬ সালে গ্যেটে ইনস্টিটিউট থেকে জার্মান ভাষায় ডিপ্লোমা ডিগ্রি লাভ করেন, যা পরে গ্যেটের ফাউস্ট অনুবাদে সহায়ক হয়।

কর্মজীবন ও রাজনৈতিক তৎপরতা

ছাত্রাবস্থায় সুধাংশু বিমল দত্তের মাধ্যমে তিনি কৃষক সমিতি-ন্যাপ বা তৎকালীন গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন। মাস্টারদা সূর্যসেনের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে অনুপ্রাণিত হয়ে বন্ধুদের নিয়ে চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেললাইন উপড়ে ফেলেন; গ্রেপ্তার এড়াতে কিছুকাল পার্বত্য চট্টগ্রামে আত্মগোপন করেন। ১৯৭১ সালে ‘লেখক সংগ্রাম শিবির’ গঠনে সক্রিয় অংশ নেন এবং ৭ মার্চ ‘স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পত্রিকা’ হিসেবে প্রতিরোধ প্রকাশ করেন। এপ্রিল মাসে কলকাতা চলে যান এবং মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে সেখান থেকে দাবানল পত্রিকা সম্পাদনা করেন। দেশ স্বাধীনের পর ফিরে এসে লেখালেখিতে মনোনিবেশ করেন। ১৯৮০ সালে দৈনিক ইত্তেফাকের সাংবাদিক নাজিমুদ্দিন মোস্তানের সহায়তায় ঢাকার কাঁটাবন বস্তিতে ‘শিল্পী সুলতান কর্ম ও শিক্ষাকেন্দ্র’ চালু করেন।

সাহিত্যজীবন

তার প্রথম গ্রন্থ ও প্রথম উপন্যাস সূর্য তুমি সাথী (১৯৬৭)। প্রবন্ধসাহিত্যে তার সবচেয়ে আলোচিত গ্রন্থ বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস (১৯৭২) — স্বাধীন বাংলাদেশে রচিত এই গ্রন্থে তিনি বাংলাদেশি বুদ্ধিজীবীদের সুবিধাবাদিতার সমালোচনা ও তাদের দায়িত্বের স্বরূপ তুলে ধরেন; দৈনিক গণকণ্ঠে ধারাবাহিক প্রকাশকালে এটি ব্যাপক আলোড়ন তোলে এবং তৎকালীন সরকারের রোষের শিকার হন তিনি। বাঙালি মুসলমানের মন (প্রবন্ধ ১৯৭৬, গ্রন্থ ১৯৮১) প্রবন্ধসংকলনটিকে আনিসুজ্জামান ও সলিমুল্লাহ খানসহ অনেকে বাংলা ভাষায় রচিত গত শতাব্দীর ‘সেরা দশ চিন্তার বইয়ের’ একটি মনে করেন। অন্যান্য প্রবন্ধগ্রন্থের মধ্যে আছে জাগ্রত বাংলাদেশ (১৯৭১) ও সিপাহী বিদ্রোহের ইতিহাস (১৯৭৯)।

কথাসাহিত্যে ওঙ্কার (১৯৭৫) — ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে রচিত এই উপন্যাসকে আবুল ফজলসহ অনেকে স্বাধীনতা আন্দোলনের সর্বোত্তম সাহিত্যিক বহিঃপ্রকাশ বলেছেন। একজন আলী কেনানের উত্থান-পতন (১৯৮৮)-এ মাজার সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক উত্থান-পতনের চিত্র আঁকেন; মরণবিলাস (১৯৮৯)-এ মৃত্যুশয্যায় এক মন্ত্রীর স্বীকারোক্তি; অলাতচক্র (১৯৯৩) প্রেম ও মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে রচিত; গাভী বিত্তান্ত (১৯৯৫) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ব্যঙ্গাত্মক উপন্যাসগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত; পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ (১৯৯৬) আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস, যার জাপানি অনুবাদ ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত হয়; অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী (১৯৯৬) তার ব্যক্তিগত প্রেমকে উপজীব্য করে রচিত। ১৯৭০ সালে তিনি গ্যেটের ফাউস্ট অনুবাদ শুরু করেন, যা মুক্তধারা থেকে ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয়। অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাককে নিয়ে তার স্মৃতিচারণ গ্রন্থ যদ্যপি আমার গুরু প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সালে। তিনি চারটি কাব্যগ্রন্থও প্রকাশ করেন এবং জীবিত থাকাকালীন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় কলাম লিখতেন।

ব্যক্তিগত জীবন

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অবিবাহিত ছিলেন বলে জানা যায়। তার জীবনযাপন ছিল সরল ও অনাড়ম্বর; জীবদ্দশায় তিনি কোনো সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক পদপদবি গ্রহণ করেননি।

পুরস্কার ও সম্মাননা

  • একুশে পদক (২০০২, মরণোত্তর)
  • লেখক শিবির পুরস্কার (১৯৭৫) ও বাংলা একাডেমির সাদত আলী আখন্দ পুরস্কার (১৯৯৩) — প্রতিষ্ঠানবিরোধী অবস্থান থেকে দুটোই প্রত্যাখ্যান করেন

মৃত্যু ও উত্তরাধিকার

২০০১ সালের ২৮ জুলাই অসুস্থ অবস্থায় ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান; বয়স হয়েছিল ৫৮ বছর। তাকে মিরপুর বুদ্ধিজীবী গোরস্তানে সমাহিত করা হয়।

আহমদ ছফা ও তার রচনাকর্ম অনেক লেখক, শিল্পী, চলচ্চিত্রকার ও বুদ্ধিজীবীকে অনুপ্রাণিত করেছে — তাদের মধ্যে আছেন হুমায়ূন আহমেদ, ফরহাদ মজহার, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, তারেক মাসুদ ও সলিমুল্লাহ খান। বর্তমানে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবী ও প্রাবন্ধিক হিসেবে বিবেচিত। জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক তার রচনাবলিকে ‘গুপ্তধনের খনি’ বলেছেন।

প্রোফাইল ছবি: Wikimedia Commons (CC BY-SA 3.0)

জনপ্রিয় বই

সব বই দেখুন →

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।