আশাপূর্ণা দেবী
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
এক নজরে
| নাম | আশাপূর্ণা দেবী |
|---|---|
| জন্ম | ৮ জানুয়ারি ১৯০৯, পোটলডাঙা, উত্তর কলকাতা |
| মৃত্যু | ১২ জুলাই ১৯৯৫, কলকাতা |
| জাতীয়তা | ভারতীয় |
| পেশা | ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, কবি |
| ভাষা | বাংলা |
| প্রধান কৃতি | প্রথম প্রতিশ্রুতি, সুবর্ণলতা, বকুলকথা |
| উল্লেখযোগ্য পুরস্কার | জ্ঞানপীঠ (১৯৭৬), পদ্মশ্রী (১৯৭৬), সাহিত্য অকাদেমি ফেলোশিপ (১৯৯৪) |
পরিচিতি
আশাপূর্ণা দেবী (১৯০৯–১৯৯৫) বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্পকার। নারীর জীবন, পরিবারের ভেতরের ক্ষমতার সমীকরণ এবং সমাজের রক্ষণশীল বেড়াজালের মধ্যে নারীর মর্যাদার সংগ্রামই তাঁর রচনার কেন্দ্রীয় বিষয়। তিনি প্রথম নারী যিনি জ্ঞানপীঠ পুরস্কার লাভ করেন (১৯৭৬, প্রথম প্রতিশ্রুতি উপন্যাসের জন্য)। তাঁর সাহিত্যজীবন প্রায় সাত দশক বিস্তৃত; দুই শতাধিক উপন্যাস, দুই হাজারেরও বেশি ছোটগল্প এবং শিশুসাহিত্যসহ বিপুল রচনাভাণ্ডার তাঁর নামে যুক্ত।
জন্ম ও শৈশব
আশাপূর্ণা দেবীর জন্ম ১৯০৯ সালের ৮ জানুয়ারি, উত্তর কলকাতার পোটলডাঙায় মামাবাড়িতে। জন্মনাম আশাপূর্ণা দেবী (গুপ্ত)। বৈদ্য পরিবারে জন্ম; পৈতৃক বাড়ি হুগলি জেলার বেগমপুরের গুপ্ত বাড়ি। বাবা হরেন্দ্রনাথ গুপ্ত ছিলেন সেকালের নামকরা শিল্পী, যিনি কলকাতার সি. লাজারাস অ্যান্ড কোং নামের আসবাবপত্র প্রতিষ্ঠানে নকশাকার হিসেবে কাজ করতেন। মা সরলাসুন্দরী ছিলেন বইয়ের প্রবল অনুরাগী, আর সেই পাঠতৃষ্ণাই তিনি সন্তানদের মধ্যে সঞ্চারিত করেছিলেন।
অত্যন্ত রক্ষণশীল যৌথ পরিবারে বড় হওয়া আশাপূর্ণার বাল্যজীবনে মেয়েদের স্কুলে যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল; প্রাইভেট শিক্ষক আসতেন কেবল ছেলেদের পড়াতে। কথিত আছে, ছোট্ট আশাপূর্ণা ভাইদের উল্টোদিকে বসে তাদের পড়া শুনে শুনেই অক্ষরজ্ঞান অর্জন করেছিলেন। অর্থাৎ প্রথাগত শিক্ষা ছাড়াই তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত। জায়গার অভাবে হরেন্দ্রনাথ পরে পরিবার নিয়ে ১৫৭/১বি আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোডের নতুন বাড়িতে ওঠেন, যেখানে মা ও মেয়েরা প্রাণখুলে বইপত্র পড়ার স্বাধীনতা পান। সেই যুগ ছিল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অস্থির সময়, যার সংবেদনশীলতা তাঁর শৈশবকেই গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
সাহিত্যজীবনের সূচনা
বোনেদের সঙ্গে কবিতা রচনার প্রতিযোগিতা থেকেই তাঁর লেখালেখির শুরু। ১৯২২ সালে মাত্র তেরো বছর বয়সে তিনি গোপনে শিশুসাথী পত্রিকায় “বাইরের ডাক” নামে একটি কবিতা পাঠান, যা ছাপা হয়। সম্পাদক রাজকুমার চক্রবর্তী আরও লেখা পাঠাতে অনুরোধ করেন—এখান থেকেই শুরু তাঁর অফুরন্ত সাহিত্যযাত্রা।
প্রথমদিকে তিনি কেবল শিশুসাহিত্য লিখতেন; ১৯৩৮ সালে ছোট ঠাকুরদার কাশীযাত্রা তাঁর প্রথম মুদ্রিত বই। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রথম গল্প “পত্নী ও প্রেয়সী” ১৯৩৬ সালে আনন্দবাজার পত্রিকার পূজাসংখ্যায় প্রকাশিত হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রথম উপন্যাস প্রেম ও প্রয়োজন প্রকাশিত হয় ১৯৪৪ সালে।
সাহিত্যজীবন ও প্রধান রচনা
আশাপূর্ণা দেবীর শ্রেষ্ঠ কীর্তি সত্যবতী-ত্রয়ী নামে পরিচিত তিনটি উপন্যাস: প্রথম প্রতিশ্রুতি (১৯৬৪), সুবর্ণলতা (১৯৬৭) এবং বকুলকথা (১৯৭৪)। তিন প্রজন্মের নারীর জীবনের মধ্য দিয়ে নারীর সমানাধিকারের অন্তহীন সংগ্রামই এই ত্রয়ীর মূল সুর। তাঁর রচনায় নারী-পুরুষের জীবন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক বাধ্যবাধকতায় কীভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ে, তার তীক্ষ্ণ চিত্রায়ন মেলে।
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের তথ্য অনুযায়ী তিনি ২৪০-এর বেশি উপন্যাস, দুই হাজারের বেশি গল্প এবং ৬২টি শিশুতোষ বই রচনা করেছেন। উল্লেখযোগ্য অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে আছে অগ্নিপরীক্ষা, যোগবিয়োগ, নিরজন পৃথিবী, চারপত্র, উত্তরলিপি, মুখররাত্রি, নবজন্ম, বলয়গ্রাস, সমুদ্র নীল আকাশ নীল প্রমুখ। মিত্র ও ঘোষ প্রকাশনী থেকে তাঁর রচনাবলী দশ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবন
১৯২৪ সালে পনেরো বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয় কালীদাস গুপ্তের সঙ্গে; বিয়ের পর তিনি কলকাতা ছেড়ে কৃষ্ণনগরে শ্বশুরবাড়িতে যান। ১৯২৭ সালে তাঁরা কলকাতায় স্থায়ী হন। তাঁদের একমাত্র পুত্র সুশান্ত; পরে পুত্রবধূ নূপুর এবং দুই নাতনি শতরূপা ও শতদীপা পরিবারে যুক্ত হন। ১৯৭০ সালে আশাপূর্ণা ও কালীদাস গড়িয়ার কানুনগো পার্কে নিজেদের বাড়ি তৈরি করেন; মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি সেখানেই বসবাস করেন।
পুরস্কার ও সম্মাননা
- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের লীলা পুরস্কার (১৯৫৪)
- ভুবনমোহিনী দাসী স্বর্ণপদক (১৯৬৬)
- পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রবীন্দ্র পুরস্কার (১৯৬৬)
- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার (১৯৭৬) — প্রথম নারী প্রাপক, প্রথম প্রতিশ্রুতি উপন্যাসের জন্য
- পদ্মশ্রী (১৯৭৬)
- বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের হরনাথ ঘোষ পদক (১৯৮৮)
- বিশ্বভারতীর দেশিকোত্তম (১৯৮৯)
- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগত্তারিণী স্বর্ণপদক (১৯৯৩)
- সাহিত্য অকাদেমির সর্বোচ্চ সম্মান ফেলোশিপ (১৯৯৪)
এছাড়া জবলপুর, রবীন্দ্রভারতী, বর্ধমান ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ডি.লিট. উপাধি লাভ করেন।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
আশাপূর্ণা দেবী ১৯৯৫ সালের ১২ জুলাই কলকাতায় মারা যান (কিছু সূত্রে ১৩ জুলাই উল্লেখ আছে)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৮৬ বছর। তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর রচনা বাংলা সাহিত্যে নারীচেতনার অন্যতম প্রধান দলিল হিসেবে পঠিত ও আলোচিত হচ্ছে। ২০০৯ সালে তাঁর জন্মশতবার্ষিকীতে দূরদর্শনে তথ্যচিত্র প্রচারিত হয় এবং কলকাতায় দুই দিনব্যাপী উৎসবের আয়োজন করা হয়। তাঁর জন্মশতবর্ষের স্মৃতিতে নির্মিত “আশাপূর্ণা দেবী ভবন” স্মৃতিহল তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকারের সাক্ষ্য বহন করে।