আল্লামা নাসিরুদ্দিন আলবানী
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| পূর্ণ নাম | মুহাম্মদ নাসিরুদ্দিন আলবানী (জন্মনাম: মুহাম্মদ নাসিরুদ্দিন নাঝাতী) |
| জন্ম | ১৬ আগস্ট ১৯১৪ |
| জন্মস্থান | শকোদার, আলবানিয়া |
| মৃত্যু | ২ অক্টোবর ১৯৯৯, আম্মান, জর্ডান (কিছু সূত্রে ৩ অক্টোবরের উল্লেখ) |
| সমাধিস্থল | আম্মান, জর্ডান |
| জাতীয়তা | আলবানীয় |
| পেশা | মুহাদ্দিস (হাদিস গবেষক), ফকিহ, লেখক, শিক্ষক, ঘড়ি মেরামতকারী |
| শিক্ষা | আনুষ্ঠানিক ডিগ্রি নেই; পিতা ও স্থানীয় আলেমদের কাছে কুরআন, হানাফি ফিকহ ও আরবি ভাষা শিক্ষা; বিশের দশকে স্ব-অধ্যয়নে হাদিসশাস্ত্রে বিশেষজ্ঞতা |
| উল্লেখযোগ্য রচনা | ‘সিলসিলাতুল হাদীস আস-সহীহা’ (১১ খণ্ড), ‘সিলসিলাতুল আহাদীস আজ-দাঈফাহ ওয়াল মাওদূআ’ (১৪ খণ্ড), ‘সিফাতু সালাতিন নাবি’, ‘ইরওয়াউল গালীল’ (৯ খণ্ড), ‘সহীহ ওয়া দাঈফ সুনান আবি দাউদ/তিরমিযী/ইবনি মাজাহ’ |
| পুরস্কার | বাদশাহ ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার (ইসলামি গবেষণা, ১৯৯৯) |
পরিচিতি
আল্লামা মুহাম্মদ নাসিরুদ্দিন আলবানী (১৯১৪–১৯৯৯) বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী হাদিস গবেষক (মুহাদ্দিস), ফকিহ ও বহুগ্রন্থপ্রণেতা লেখক। আলবানিয়ায় জন্ম নিয়ে শৈশবে সিরিয়ায় চলে আসা এই স্বশিক্ষিত আলেম হাদিস সাহিত্যের কঠোর পুনর্মূল্যায়নের জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পান; তাঁর দুই শতাধিক রচনা হাদিস, আকীদা ও ফিকহের ক্ষেত্রে বিশাল প্রভাব ফেলেছে। আধুনিক সালাফি ধারার অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি যেমন প্রশংসিত হয়েছেন, তেমনি তাঁর মতামত ব্যাপক বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে।
জন্ম ও শৈশব
১৯১৪ সালের ১৬ আগস্ট আলবানিয়ার শকোদার শহরে এক দরিদ্র হানাফি পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা নূহ নাঝাতী ছিলেন ইস্তাম্বুলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হানাফি ফকিহ। আলবানিয়ার ধর্মনিরপেক্ষ শাসক আহমাদ যোغুর শাসনামলে পাশ্চাত্যপন্থী নীতির আশঙ্কায় পিতা ১৯২৩ সালে — আলবানীর নয় বছর বয়সে — পরিবার নিয়ে ফরাসি-অধিকৃত সিরিয়ার দামেস্কে চলে আসেন।
শিক্ষাজীবন
দামেস্কে তিনি পিতা ও স্থানীয় আলেমদের কাছে ধর্মীয় শিক্ষা শুরু করেন: কুরআন, তাজবীদ, আরবি ভাষাবিজ্ঞান, হানাফি ফিকহসহ ইসলামি জ্ঞানের নানা শাখা অধ্যয়ন করেন। ‘আল-ইসআফ’ নামের একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ে আরবি শেখেন; আনুষ্ঠানিক পড়ালেখা ছেড়ে লেখালেখিতে মনোনিবেশের পর তিনি ‘আলবানী’ (আলবানীয়) নামে পরিচিতি পান। বিখ্যাত হানাফি গ্রন্থ ‘মারাকিল ফালাহ’ তিনি সাঈদ আল-বুরহানীর কাছে এবং ‘মুখতাসারুল কুদূরী’ সিরীয় শিক্ষকদের কাছে পড়েন। এরই মধ্যে তিনি প্রথমে ছুতারমিস্ত্রি হিসেবে এবং পরে পিতার সঙ্গে ঘড়ি মেরামতকারী হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করতেন — যে পেশায় তিনি দক্ষতা অর্জন করেন।
পিতার নিরুৎসাহ সত্ত্বেও কুড়ি বছর বয়সের দিকে লেবাননী সংস্কারবাদী আলেম মুহাম্মদ রশীদ রিদার প্রভাবে তিনি হাদিসশাস্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট হন। তিনি মুহাম্মদ বাহজাত আল-বাইতার, ইয্যুদ্দীন আত-তানূখী, সাঈদ আল-বুরহানী ও মুহাম্মদ রাগিব আত-তাব্বাখসহ একাধিক আলেমের কাছে অধ্যয়ন করেন। তাঁর প্রাথমিক গবেষণার মধ্যে ছিল আবদুর রহীম ইবনুল হুসাইন আল-ইরাকীর ‘আল-মুগনী আন হামলিল আসফার’ গ্রন্থের অনুলিখন ও টীকা — যা দামেস্কের ধর্মীয় মহলে তাঁকে স্বীকৃতি এনে দেয়।
কর্মজীবন
১৯৫৪ সাল থেকে তিনি আকীদা, ফিকহ ও হাদিসের ওপর সাপ্তাহিক দুটি পাঠদান শুরু করেন, যাতে ছাত্র ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরাও যোগ দিতেন। সিরিয়া ও জর্ডানের বিভিন্ন শহরে তিনি দাওয়াতি সফরও পরিচালনা করেন। ১৯৬১ সালে সৌদি আরব তাঁকে নবপ্রতিষ্ঠিত মদীনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে হাদিস পড়ানোর আমন্ত্রণ জানায় — তৎকালীন উপাচার্য আবদুল আজিজ ইবনু বাজের আমন্ত্রণে। তবে প্রচলিত ফিকহি ধারার প্রতি তাঁর সমালোচনামূলক অবস্থানের কারণে ১৯৬৩ সালে তিনি সৌদি আরব ছেড়ে দামেস্কে ফিরে আসেন এবং জাহিরিয়্যাহ লাইব্রেরিতে গবেষণায় মনোনিবেশ করেন; ঘড়ির দোকানটি ভাইয়ের হাতে তুলে দেন।
পরবর্তীতে তিনি কাতার, মিশর, কুয়েত, স্পেন ও যুক্তরাজ্যসহ নানা দেশে বক্তৃতা দেন। গ্র্যান্ড মুফতি ইবনু বাজের হস্তক্ষেপে তিনি আবার সৌদি আরবে আমন্ত্রিত হন মক্কায় ইসলামি আইনে উচ্চশিক্ষার প্রধান হিসেবে। পরে সিরিয়ায় ফিরে আসেন এবং শেষ পর্যন্ত জর্ডানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন, যেখানে তিনি জীবনের বাকি সময় কাটান। সিরিয়ায় তাঁর শিক্ষাদানের জন্য তাঁকে দুবার কারাবরণও করতে হয়।
সাহিত্যজীবন ও রচনাবলি
তাঁকে একজন প্রচুর লেখক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে — হাদিস, ফিকহ ও আকীদার ওপর দুই শতাধিক রচনা তাঁর। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো:
- ‘সিলসিলাতুল হাদীস আস-সহীহা’ (১১ খণ্ড) — ফিকহি অধ্যায়ে সাজানো সহীহ হাদিসের সংকলন; প্রায় ৯০০ হাদিস আলোচিত।
- ‘সিলসিলাতুল আহাদীস আজ-দাঈফাহ ওয়াল মাওদূআ’ (১৪ খণ্ড) — দুর্বল ও জাল হাদিসের বিশ্লেষণমূলক সংকলন; অনেকের মতে তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা।
- ‘সিফাতু সালাতিন নাবি মিনাত তাকবীর ইলাত তাসলীম কা-আন্নাকা তারাহু’ — নবীজির নামাজের পদ্ধতির বর্ণনা; প্রচলিত মাজহাবগুলোর বিধান থেকে ভিন্ন সিদ্ধান্তের কারণে এটি ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।
- ‘ইরওয়াউল গালীল’ (৯ খণ্ড) — হাম্বলি ফিকহের ‘মানারুস সাবীল’ গ্রন্থের যাচাই ও টীকা।
- ‘সহীহ ওয়া দাঈফ সুনান আবি দাউদ’, ‘সহীহ ওয়া দাঈফ সুনান আত-তিরমিযী’, ‘সহীহ ওয়া দাঈফ সুনান ইবনি মাজাহ’ (প্রতিটি ৪ খণ্ড) — প্রধান হাদিস-সংকলনগুলোর পুনর্মূল্যায়ন।
- ‘আল-আকীদাতুত তাহাবিয়্যাহ: শরহ ওয়া তা’লীক’ — ইমাম তাহাবীর আকীদা-গ্রন্থের ব্যাখ্যা।
- ‘হিজাবুল মার’আতিল মুসলিমাহ’ (১৯৫২); ‘আত-তাওয়াস্সুল: আনওয়াআহু ওয়া আহকামুহ’; ‘সালাতুত তারাবীহ’; ‘তালখীস আহকামিল জানাইজ’।
তাঁর বহু প্রবন্ধ ‘আল-মানার’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মতো প্রামাণ্য সংকলনগুলোর পুনর্মূল্যায়ন তাঁকে প্রশংসা ও সমালোচনা — দুটোই এনে দেয়; সালাফি মহলে তিনি ‘সমকালীন যুগের বুখারী’ উপাধি পান।
ব্যক্তিগত জীবন
তাঁর স্ত্রী ছিলেন উম্মুল ফাদল। পারিবারিক জীবন সম্পর্কে প্রকাশ্য সূত্রে এর বেশি বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
মতাদর্শ ও সমালোচনা
আলবানী সালাফি ধারার অন্যতম প্রধান প্রবক্তা হিসেবে গণ্য হন। তিনি হানাফি, মালিকি, শাফিঈ, হাম্বলি — সব প্রচলিত ফিকহি মাজহাবের তাকলীদ (অন্ধ অনুসরণ) প্রত্যাখ্যান করেন এবং যুক্তি দেন যে বহু ব্যাপকভাবে গৃহীত হাদিস আসলে অপ্রমাণিত। তাঁর স্বতন্ত্র ফতোয়া প্রায়ই মূলধারার সুন্নি ঐকমত্য থেকে ভিন্ন হতো। তাঁর রচনার সমালোচনা করেছেন সিরীয় হাদিস-গবেষক আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ, মিশরীয় হাদিস-গবেষক মাহমূদ সাঈদ মামদূহ এবং সিরীয় আলেম মুহাম্মদ সাঈদ রামাদান আল-বূতীসহ অনেকে — যাঁরা তাঁর পদ্ধতি ও মাজহাব-বিরোধী অবস্থানের বিরুদ্ধে গ্রন্থ রচনা করেন।
পুরস্কার ও সম্মাননা
১৯৯৯ সালে তিনি ইসলামি গবেষণায় বাদশাহ ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
দীর্ঘ দশকের শিক্ষাদান ও লেখালেখির পর আলবানী জর্ডানে স্থায়ী হন, যেখানে তিনি বক্তৃতা চালিয়ে যান ও দর্শনার্থীদের গ্রহণ করতেন। ১৯৯৯ সালের ২ অক্টোবর আম্মানে ৮৫ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়; সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়। তাঁর শিক্ষা সিরিয়া, জর্ডান ও সৌদি আরবের এক প্রজন্মের ছাত্রকে প্রভাবিত করেছে এবং তাঁর হাদিস-পুনর্মূল্যায়ন আজও ইসলামি গবেষণায় আলোচিত বিষয়।