আলী আহমদ বা-কাসীর
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
এক নজরে
| পূর্ণ নাম | আলী আহমদ বা-কাসীর (Ali Ahmad Bakathir) |
| জন্ম | ২১ ডিসেম্বর ১৯১০ |
| জন্মস্থান | সুরাবায়া, ইন্দোনেশিয়া (হাযরামাউতি বংশোদ্ভূত) |
| মৃত্যু | ১০ নভেম্বর ১৯৬৯, কায়রো, মিশর |
| জাতীয়তা | ইয়েমেনি-মিশরীয় |
| পেশা | কবি, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, অনুবাদক |
| লেখার ধরন | ঐতিহাসিক কাব্যনাটক, উপন্যাস, অনুবাদ |
| উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ | ওয়া ইসলামাহ (উপন্যাস); আস-সিলসিলাতু ওয়াল গুফরান (নাটক); মালহামাতু উমর (মহাকাব্য-নাটক); সিররুল হাকিম বি-আমরিল্লাহ; আখনাতুন ওয়া নেফারতিতি |
| পুরস্কার | মিশর শিক্ষা মন্ত্রণালয় পুরস্কার (১৯৪৯); অর্ডার অব সায়েন্সেস অ্যান্ড আর্টস (১৯৬১); রাষ্ট্রীয় উৎসাহ পুরস্কার (১৯৬২) প্রভৃতি |
পরিচিতি
আলী আহমদ বা-কাসীর (২১ ডিসেম্বর ১৯১০ – ১০ নভেম্বর ১৯৬৯) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর আরবি সাহিত্যের অন্যতম প্রধান নাট্যকার, ঔপন্যাসিক ও কবি — ইয়েমেনি-মিশরীয় এই সাহিত্যিক হাযরামাউতি বংশোদ্ভূত হলেও জন্মেছিলেন ইন্দোনেশিয়ায়। ১৯৪০ ও ৫০-এর দশকে তিনি ছিলেন মিশরের সবচেয়ে খ্যাতিমান নাট্যকারদের একজন; তাঁর সর্বাধিক পরিচিত নাটক মালহামাতু উমর (উমরের মহাকাব্য) এবং সর্বাধিক পরিচিত উপন্যাস ওয়া ইসলামাহ (হায় ইসলাম!)। আরবি সাহিত্যে কাব্যনাটকের (poetic drama) অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে তিনি স্বীকৃত।
বাংলা পাঠকের কাছে তাঁর নাম বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ তাঁর পুরস্কার-বিজয়ী নাটক “আস-সিলসিলাতু ওয়াল গুফরান” (শৃঙ্খল ও ক্ষমা) বাংলায় অনূদিত হয়েছে — যা ১৯৪৯ সালে মিশরের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পুরস্কার জিতেছিল। মোট পঞ্চাশেরও বেশি গ্রন্থের রচয়িতা বা-কাসীর কবিতা, উপন্যাস ও নাটক — তিন মাধ্যমেই সমান দক্ষ ছিলেন; পাশাপাশি তিনি শেকসপিয়রের রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট-এর আরবি অনুবাদক হিসেবেও পরিচিত।
জন্ম ও শিক্ষা
বা-কাসীর ১৯১০ সালের ২১ ডিসেম্বর ইন্দোনেশিয়ার সুরাবায়া শহরে জন্মগ্রহণ করেন — তাঁর পিতা-মাতা ছিলেন হাযরামাউতের (বর্তমান ইয়েমেন) আরব; বংশগতভাবে তিনি ইয়েমেনের প্রসিদ্ধ কিন্দা গোত্রের। আট-দশ বছর বয়সে পিতা তাঁকে হাযরামাউতে নিয়ে যান, যাতে তিনি ইসলামি-আরবি পরিবেশে বড় হন। তিনি হাযরামাউতের সাইউন শহরে বেড়ে ওঠেন এবং সেখানেই আরবি ও ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেন। মাত্র তেরো বছর বয়সে তিনি কবিতা রচনা শুরু করেন; বিশ বছর বয়সের আগেই তিনি আল-নাহদা বৈজ্ঞানিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন এবং পরে এর প্রশাসনিক দায়িত্বও গ্রহণ করেন।
১৯২৭ সালে অল্প বয়সে তাঁর বিয়ে হয়, কিন্তু স্ত্রীর অকালমৃত্যুতে তিনি ভেঙে পড়েন। ১৯৩১ সালের দিকে তিনি হাযরামাউত ত্যাগ করে এডেন, সোমালিয়া ও ইথিওপিয়া হয়ে কিছুকাল হেজাজে বসবাস করেন; সৌদি আরবের তায়েফে থাকাকালীন তিনি তাঁর প্রথম কাব্যনাটক “হুমাম ফি বিলাদিল আহকাফ” রচনা করেন এবং “আত-তাহযীব” নামে একটি পত্রিকাও প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৩৪ সালে তিনি মিশরে আসেন এবং কিং ফুয়াদ ১ম বিশ্ববিদ্যালয়ে (বর্তমান কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়) ভর্তি হন — ১৯৩৯ সালে ইংরেজি বিভাগ থেকে বি.এ. এবং ১৯৪০ সালে শিক্ষক-প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা অর্জন করেন।
কর্মজীবন
বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনেই শেকসপিয়রের সঙ্গে পরিচয় তাঁর সাহিত্যপথ বদলে দেয় — কবিতা থেকে তিনি উপন্যাস ও নাটকের দিকে, ছন্দোবদ্ধ নাটক থেকে গদ্য-নাটকের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ১৯৩৬ সালে, তখনও ছাত্রাবস্থায়, তিনি শেকসপিয়রের রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট মুক্ত ছন্দে অনুবাদ করেন; দুই বছর পর ১৯৩৮ সালে রচনা করেন তাঁর প্রথম মিশরীয় নাটক “আখনাতুন ওয়া নেফারতিতি” — যা ১৯৪০ সালে প্রকাশিত হয় এবং আরবি সাহিত্যে মুক্ত-ছন্দের নাটকের পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচিত হয়।
স্নাতক হওয়ার পর তিনি প্রায় পনেরো বছর মিশরের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন; এই সময়ে ১৯৪২ সালে তিনি এক মিশরীয় নারীকে বিয়ে করেন — মৃত্যু পর্যন্ত তিনি তাঁর সঙ্গেই ছিলেন — এবং ১৯৫৩ সালে মিশরীয় নাগরিকত্ব লাভ করেন। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত মিশরের জাতীয় নাট্যমঞ্চ (ন্যাশনাল থিয়েটার) প্রতি মৌসুমে তাঁর নাটক দিয়েই উদ্বোধন হতো — যেমন সিররুল হাকিম বি-আমরিল্লাহ, মিসমারু জুহা, সিররু শাহরাযাদ ও আবু দুলামা মুদহিকুল খালিফা। ১৯৫৫ সালে তিনি সংস্কৃতি ও জাতীয় নির্দেশনা মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত সেখানেই কর্মরত ছিলেন।
১৯৬১–১৯৬৩ সালে তিনি দুই বছরের একটি বিশেষ বৃত্তি (তাফাররুগ) পান — মিশরে এই বৃত্তি পাওয়া প্রথম সাহিত্যিক ছিলেন তিনি। এই সময়ে তিনি রচনা করেন খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-কে নিয়ে ১৯ খণ্ডের বৃহৎ ইসলামি মহাকাব্য-নাটক মালহামাতু উমর, যা বিশ্বসাহিত্যের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নাট্যকর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়। পরের একটি বৃত্তিতে তিনি নেপোলিয়নের মিশর-আক্রমণ নিয়ে তিনটি নাটকের ট্রিলজি রচনা করেন (আদ-দুদা ওয়াস-সু’বান, আহলামু নাপোলিয়ন, মা’সাতু যাইনাব) — প্রথমটি তাঁর জীবদ্দশায়, বাকি দুটি মৃত্যুর পর মুদ্রিত হয়। ১৯৬৮ সালের এপ্রিলে, দক্ষিণ ইয়েমেনের স্বাধীনতার পর, তিনি জন্মভূমি হাযরামাউত সফর করেন; কিন্তু কায়রোর সাহিত্যজীবন নিয়ে হতাশা আর স্বদেশে ফিরে আরও গভীর হতাশা তাঁকে গ্রাস করে। এই হতাশার মধ্যেই ১৯৬৭-এর পরাজয়ের পর তিনি তাঁর শেষ নাটক আত-তাওরাতুদ দাইয়া (হারানো তাওরাত) রচনা করেন — যা তাঁর মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ পর প্রকাশিত হয়। ১৯৬৯ সালের ১০ নভেম্বর কায়রোতে তীব্র হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন; তাঁকে ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর কবরস্থানে দাফন করা হয়।
সাহিত্যকর্ম
বা-কাসীরের সাহিত্যকর্মের পরিধি বিশাল — পঞ্চাশেরও বেশি গ্রন্থ, যার বেশিরভাগই নাটক। তাঁর প্রধান রচনাগুলো:
- উপন্যাস: ওয়া ইসলামাহ — তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস (আইন জালুতের যুদ্ধ ও সুলতান কুতুজের কাহিনি); আথ-থা’ইরুল আহমার (লাল বিপ্লবী); সালামাতুল কাস; সিরাতু শুজা; আল-ফারিসুল জামিল; আওদাতুল মুশতাক; লাইলাতুন নাহর। প্রায় সবগুলোই ঐতিহাসিক পটভূমিতে রচিত।
- নাটক: আস-সিলসিলাতু ওয়াল গুফরান (শৃঙ্খল ও ক্ষমা) — ১৯৪৯ সালে রচিত; একই বছর মিশরের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের (ওযারাতুল মা’আরিফ) পুরস্কার জেতে; আরব সমালোচকদের মতে এটি আরবি সাহিত্যের প্রথম রূপক-নাটক (allegorical play) — মধ্যযুগীয় মিশরের পটভূমিতে ক্ষমার মাধ্যমে মন্দের শৃঙ্খল ভাঙার কাহিনি; মালহামাতু উমর — ১৯ খণ্ডের মহাকাব্য-নাটক; সিররুল হাকিম বি-আমরিল্লাহ; সিররু শাহরাযাদ (ফরাসি ভাষায় অনূদিত); মা’সাতু উদিব (ইংরেজিতে অনূদিত); আখনাতুন ওয়া নেফারতিতি (১৯৩৮); মিসমারু জুহা (১৯৫৪ সালে কায়রোর রয়্যাল অপেরা হাউসে মঞ্চস্থ); আবু দুলামা মুদহিকুল খালিফা; হারুত ওয়া মারুত; আত-তাওরাতুদ দাইয়া (সর্বশেষ নাটক)।
- অনুবাদ: শেকসপিয়রের রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট-এর মুক্ত-ছন্দে আরবি অনুবাদ (১৯৩৬)।
তাঁর এগারোটি নাটক অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি হিসেবে রয়ে গেছে। উল্লেখ্য, কিছু তালিকায় “সিরর বাতাল” শিরোনামে তাঁর একটি রচনার উল্লেখ থাকলেও প্রধান সূত্রগুলোর (ইংরেজি ও আরবি উইকিপিডিয়া, আরব বিশ্বকোষ) গ্রন্থতালিকায় এই শিরোনাম শনাক্ত করা যায়নি — তাই যাচাইকৃত তালিকায় এটি রাখা হয়নি।
পুরস্কার ও সম্মাননা
বা-কাসীর বহু পদক ও পুরস্কার পেয়েছেন:
- মিশর শিক্ষা মন্ত্রণালয় (ওযারাতুল মা’আরিফ) পুরস্কার, ১৯৪৯ — আস-সিলসিলাতু ওয়াল গুফরান নাটকের জন্য
- অর্ডার অব সায়েন্সেস অ্যান্ড আর্টস (বিজ্ঞান ও শিল্পপদক), ১৯৬১
- রাষ্ট্রীয় উৎসাহ পুরস্কার, ১৯৬২ — হারুত ওয়া মারুত নাটকের জন্য
- বিজ্ঞান দিবস পদক, ১৯৬৩
- রাষ্ট্রপতি জামাল আবদেল নাসের প্রদত্ত বিজ্ঞান ও শিল্পের সম্মাননা-ব্যাজ
- রাষ্ট্রীয় প্রশংসা পুরস্কার — নাগিব মাহফুজের সঙ্গে যৌথভাবে
রচনাশৈলী ও মূল্যায়ন
বা-কাসীরের সাহিত্যের প্রাণ হলো ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সমকালীন জীবন থেকে নেওয়া অনুপ্রেরণা। তাঁর প্রায় সব নাটকই ঐতিহাসিক পটভূমিতে — ফেরাউন-যুগের মিশর থেকে উমাইয়া-আব্বাসীয় খেলাফত, ক্রুসেড-যুগ থেকে নেপোলিয়নের আক্রমণ — কিন্তু প্রতিটি কাহিনির ভেতর দিয়ে তিনি সমকালের প্রশ্ন তোলেন: ক্ষমতা, ন্যায়, ঔপনিবেশিকতা ও মানবিক মর্যাদা। এই কারণেই তাঁর নাটকগুলো মঞ্চায়নে সমসাময়িক তাওফিক আল-হাকিমের চেয়েও বেশি জনপ্রিয় হয়েছিল।
তাঁর দার্শনিক অবস্থানকে বর্ণনা করা হয়েছে “খাঁটি ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি ও আধুনিক মানবতাবাদের সমন্বয়” হিসেবে। আস-সিলসিলাতু ওয়াল গুফরান-এ এই সমন্বয় সবচেয়ে স্পষ্ট: একটি রূপক-কাহিনির মাধ্যমে তিনি দেখান, কীভাবে ক্ষমার একটি কাজ মন্দের শৃঙ্খল ভেঙে দেয় — এটি একই সঙ্গে ধর্মীয় বার্তা ও সার্বজনীন মানবিক সত্য। আরবি সাহিত্যে কাব্যনাটকের বিকাশে — বিশেষ করে মহাকাব্যিক ও রূপক-নাটকের ধারায় — তাঁর অবদানকে পথিকৃৎ-মর্যাদা দেওয়া হয়: তিনিই প্রথম আরবি সাহিত্যে মহাকাব্য-নাটক (মালহামাতু উমর) ও রূপক-নাটক রচনা করেন।
শেকসপিয়রের প্রভাব তাঁর নাট্যশৈলীতে স্পষ্ট — বিশ্ববিদ্যালয়ে শেকসপিয়র পড়েই তিনি কবি থেকে নাট্যকারে রূপান্তরিত হন। কিন্তু তিনি শেকসপিয়রের অনুকরণ করেননি; বরং আরবি কাব্য-ঐতিহ্য ও ইসলামি ইতিহাস-চেতনাকে পাশ্চাত্য নাট্য-কাঠামোর সঙ্গে মিলিয়ে একটি স্বতন্ত্র ধারা গড়ে তোলেন। ইয়েমেনি বংশোদ্ভূত হয়েও মিশরীয় নাগরিক হিসেবে, ইন্দোনেশিয়ায় জন্মেও আরবি ভাষার সেবক হিসেবে — বা-কাসীরের জীবনই ছিল সাংস্কৃতিক সীমানা পেরিয়ে যাওয়ার গল্প; আর তাঁর সাহিত্য সেই গল্পেরই শিল্পরূপ। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান আরব লেখক হিসেবে আরবি নাটকের ইতিহাসে তাঁর অবস্থান আজও অটুট।