আব্বাস আলী খান
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| পূর্ণ নাম | আব্বাস আলী খান |
| জন্ম | ৮ মার্চ ১৯১৫ (কিছু সূত্রে ১৯১৩ বা ১৯১৪ উল্লিখিত) |
| জন্মস্থান | জয়পুরহাট থানা, বগুড়া জেলা, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত (বর্তমান বাংলাদেশ) |
| মৃত্যু | ৩ অক্টোবর ১৯৯৯, ঢাকা |
| জাতীয়তা | বাংলাদেশি |
| পেশা | শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ, লেখক-গবেষক, অনুবাদক |
| শিক্ষা | হুগলী মাদ্রাসা (ম্যাট্রিক, ১৯৩১); রাজশাহী সরকারি কলেজ ও রংপুর কারমাইকেল কলেজে অধ্যয়ন; কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিএ (ডিস্টিংশনসহ) |
| উল্লেখযোগ্য কর্ম | জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস, বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস, মাওলানা মওদূদী: একটি জীবন, একটি ইতিহাস, মৃত্যু যবনিকার ওপারে, স্মৃতি সাগরের ঢেউ, বিকালের আসর, বিদেশে পঞ্চাশ দিন, ঈমানের দাবী; অনুবাদ: সীরাতে সরওয়ারে আলম (২–৫ খণ্ড), পর্দা ও ইসলাম, ইসলামী অর্থনীতি (সহ-অনুবাদ) |
| রাজনৈতিক পরিচয় | বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমীর (১৯৭৯–১৯৯৪); পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ সদস্য (১৯৬২–১৯৬৫); পূর্ব পাকিস্তান সরকারের শিক্ষামন্ত্রী (সেপ্টেম্বর–ডিসেম্বর ১৯৭১) |
পরিচিতি
আব্বাস আলী খান (৮ মার্চ ১৯১৫ – ৩ অক্টোবর ১৯৯৯) ছিলেন বাংলাদেশের একজন শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ, ইতিহাস-গবেষক ও ইসলামি লেখক। ব্রিটিশ আমল থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ — প্রায় ছয় দশকের কর্মময় জীবনে তিনি সরকারি চাকরি, শিক্ষকতা, জাতীয় রাজনীতি ও সংগঠন-নেতৃত্বের পাশাপাশি গ্রন্থ রচনায় অবদান রেখে গেছেন। দীর্ঘ পনেরো বছর (১৯৭৯–১৯৯৪) তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমীরের দায়িত্ব পালন করেন এবং ইসলামি আন্দোলনের ইতিহাস, মাওলানা আবুল আলা মওদূদীর জীবনী ও বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস নিয়ে বিশটি মৌলিক গ্রন্থ ও পনেরোটি অনুবাদগ্রন্থ রচনা করেন।
জন্ম ও বংশপরিচয়
১৯১৫ সালের ৮ মার্চ ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির বগুড়া জেলার জয়পুরহাট থানায় আব্বাস আলী খানের জন্ম। তবে কোনো কোনো সূত্রে তার জন্মসাল ১৯১৩ বা ১৯১৪ হিসেবেও উল্লেখ পাওয়া যায়। পারিবারিক সূত্র অনুযায়ী, তাদের পূর্বপুরুষ ছিলেন পাঠান বংশোদ্ভূত এবং আফগানিস্তান থেকে এসে এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিলেন। শৈশবে তিনি দাদা সুবিদ আলী খানের স্নেহ-যত্নে একটি ধর্মীয় পারিবারিক পরিবেশে বড় হন।
শিক্ষাজীবন
ঘরেই তার প্রাথমিক পড়াশোনার সূচনা; পরে স্থানীয় মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সেখান থেকে তিনি হুগলী মাদ্রাসায় পড়তে যান এবং ১৯৩১ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর রাজশাহী সরকারি কলেজ ও রংপুর কারমাইকেল কলেজে অধ্যয়ন করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তিনি ডিস্টিংশনসহ বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
কর্মজীবন
স্নাতক সম্পন্ন করে ১৯৩৬ সালে তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন এবং ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারত সরকারের বিভিন্ন পদে কর্মরত ছিলেন। এ সময় বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী এ কে ফজলুল হকের ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি শিক্ষকতার পেশায় যুক্ত হন এবং দীর্ঘদিন শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন।
রাজনৈতিক জীবন
১৯৫৫ সালে আব্বাস আলী খান জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানে যোগ দেন এবং রাজশাহী বিভাগের আমির নিযুক্ত হন। ১৯৬২ সালে তিনি পাকিস্তানের তৃতীয় জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং দিনাজপুর-কাম-বগুড়া এলাকার প্রতিনিধিত্ব করেন (১৯৬২–১৯৬৫)। ১৯৭১ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামীর পূর্ব পাকিস্তান শাখার ডেপুটি আমির নিযুক্ত হন এবং ওই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান সরকারের (মালেক মন্ত্রিসভা) শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালের ২৪ ডিসেম্বর তাকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর সরকারের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর তিনি মুক্তি পান। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী গঠিত হলে তিনি দলের সিনিয়র নায়েবে আমির হন এবং একই সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত আমীরের দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। ১৯৯১ সালে গোলাম আযম আমির নির্বাচিত হলে ভারপ্রাপ্ত আমীর হিসেবে তার দায়িত্ব সাময়িকভাবে শেষ হয়; কিন্তু ১৯৯২ সালে গোলাম আযম গ্রেফতার হলে তিনি পরবর্তী ষোলো মাস আবার ভারপ্রাপ্ত আমীরের দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়কাল মিলিয়ে ১৯৭৯ থেকে ১৯৯৪ পর্যন্ত দলের নেতৃত্বে তার দীর্ঘ ভূমিকা ছিল।
সাহিত্যজীবন
রাজনীতি ও সংগঠনের ব্যস্ততার মধ্যেও আব্বাস আলী খান ছিলেন নিয়মিত লেখক। তার রচিত বিশটি গ্রন্থের মধ্যে ইতিহাস ও জীবনীভিত্তিক রচনাই প্রধান। জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস ও জামায়াতে ইসলামীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস — এই দুই গ্রন্থে তিনি দলের প্রতিষ্ঠা ও বিকাশের ধারাবাহিক বর্ণনা দিয়েছেন। বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস গ্রন্থে বাংলার মুসলিম জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক যাত্রা তুলে ধরেছেন। মাওলানা আবুল আলা মওদূদীকে কেন্দ্র করে তিনি লিখেছেন একাধিক গ্রন্থ — আলেমে দ্বীন সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদূদী, মাওলানা মওদূদী: একটি জীবন, একটি ইতিহাস এবং মাওলানা মওদূদীর বহুমুখী অবদান। এছাড়া ঈমানের দাবী, ইসলাম ও জাহেলিয়াতের চিরন্তন দ্বন্দ্ব, ইসলামী বিপ্লব একটি পরিপূর্ণ নৈতিক বিপ্লব, একটি আদর্শবাদী দলের পতনের কারণ: তার থেকে বাঁচার উপায় ও মৃত্যু যবনিকার ওপারে তার উল্লেখযোগ্য ইসলামি চিন্তামূলক গ্রন্থ। স্মৃতিচারণ ও ভ্রমণকাহিনী হিসেবে লিখেছেন স্মৃতি সাগরের ঢেউ, বিদেশে পঞ্চাশ দিন, যুক্তরাজ্যে একুশ দিন ও দেশের বাইরে কিছুদিন।
অনুবাদক হিসেবেও তার অবদান ছিল ব্যাপক। মাওলানা মওদূদীর সীরাত-গ্রন্থ সীরাতে সরওয়ারে আলম-এর ২য় থেকে ৫ম খণ্ড তিনি বাংলায় অনুবাদ করেন। এছাড়া পর্দা ও ইসলাম, আদর্শ মানব, ইসলাম ও সামাজিক সুবিচার, আসান ফিকাহ (১–২ খণ্ড) ও বিকালের আসরসহ মোট পনেরোটি অনুবাদগ্রন্থ তার নামে প্রকাশিত হয়।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে ১৯৯৯ সালের ৩ অক্টোবর ঢাকায় আব্বাস আলী খান মৃত্যুবরণ করেন। তার ইন্তেকালের সংবাদ তৎকালীন জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়। শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, জাতীয় পরিষদ সদস্য, শিক্ষামন্ত্রী ও দীর্ঘদিনের ভারপ্রাপ্ত আমীর — এক জীবনে এমন বৈচিত্র্যময় ভূমিকা পালন করা ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল। তার রচিত ইতিহাস ও জীবনীগ্রন্থগুলো ইসলামি আন্দোলনের ইতিহাস-অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের কাছে আজও তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।