আবু সলীম মুহাম্মাদ আব্দুল হাই
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
এক নজরে
| পূর্ণ নাম | মাওলানা আবু সলীম মুহাম্মাদ আব্দুল হাই (Abu Salim Muhammad Abdul Hai) |
| জন্ম | ১ ডিসেম্বর ১৯১০, রামপুর, উত্তর প্রদেশ, ভারত |
| মৃত্যু | ১৬ জুলাই ১৯৮৭ |
| জাতীয়তা | ভারতীয় |
| পেশা | ইসলামি চিন্তাবিদ, দাঈ, লেখক, অনুবাদক |
| লেখার ধরন | সীরাত, ইসলামি চিন্তা, দাওয়াহ ও শিশু-নারী সাহিত্য |
| উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ | রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর বিপ্লবী জীবন; হায়াতে তাইয়িবা; কুরআনের হিন্দি তরজমা (১৯৬৬); আদর্শ কিভাবে প্রচার করতে হবে; মানুষের কাহিনী |
| সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান | কুরআনের হিন্দি অনুবাদ; জামেয়া সালেহাত, রামপুর প্রতিষ্ঠা (১৯৭৯) |
পরিচিতি
মাওলানা আবু সলীম মুহাম্মাদ আব্দুল হাই ভারতবর্ষের একজন প্রভাবশালী ইসলামি চিন্তাবিদ, দাঈ ও লেখক ছিলেন। তার জীবনকাহিনী একটি অসাধারণ রূপান্তরের গল্প: বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনে দর্শন ও আধুনিক চিন্তার প্রভাবে দ্বীনের প্রতি সংশয়ে পড়ে যাওয়া এক তরুণ, মাওলানা মওদূদীর বই পড়ে চিন্তার আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে ইসলামের একনিষ্ঠ দাঈ ও লেখকে পরিণত হন। পাঁচ বছরের পরিশ্রমে তিনি পবিত্র কুরআনের হিন্দি তরজমা সম্পন্ন করেন, যা ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত হয় — এটি তার সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান হিসেবে স্মরণীয়। সিরাত-সাহিত্য, শিশু-নারী সাহিত্য, পত্রিকা-প্রকাশনা ও শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় তার অবদান গভীরভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে। ১৯৮৭ সালের ১৬ জুলাই তিনি ইন্তেকাল করেন।
জন্ম ও শিক্ষা
১৯১০ সালের ১ ডিসেম্বর ভারতের উত্তর প্রদেশের রামপুরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার ছিল জ্ঞানচর্চার পরিবার: দাদা আব্দুল মুসতাকিম ছিলেন পরহেজগার আলেমে দ্বীন, আর পিতা আব্দুল মালেক ছিলেন আরবি, উর্দু ও ফারসি ভাষায় দক্ষ একজন শিক্ষিত ব্যক্তি। শৈশব থেকেই তিনি পড়াশোনা ও জ্ঞানচর্চার প্রতি অগাধ অনুরাগ দেখিয়েছিলেন।
স্থানীয় মাদরাসায় প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের পর মৌলভি আব্দুর রহমানের তত্ত্বাবধানে তিনি গুলিস্তান ও বোস্তান অধ্যয়ন করেন। ১৯২৩ সালে প্রাথমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তী সময়ে রামপুর স্টেট হাই স্কুলে নবম শ্রেণির সেরা শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি নবাব হামিদ আলী খানের শিক্ষাবৃত্তি লাভ করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি এলাহাবাদের এভিং ক্রিশ্চিয়ান কলেজে ভর্তি হয়ে বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করেন — ১৯৩২ সালে ইন্টারমিডিয়েট এবং ১৯৩৪ সালে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি সম্পন্ন করেন। ডাক্তারি পড়ার ইচ্ছা থাকলেও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে তা পূর্ণ হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনেই তার জীবনের মোড় ঘোরে: দর্শন ও আধুনিক চিন্তার প্রভাবে তিনি দ্বীনের প্রতি সংশয়ে পড়ে যান। নামাজ-রোজা থেকে দূরে সরে গিয়ে সাহিত্য, কবিতা ও শায়েরিতে তিনি গভীর মনোযোগী হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে তিনি নিজেই স্বীকার করেন যে, শৈশব দ্বীনি পরিবেশে কাটলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তিনি অস্বীকারবাদী ধ্যানধারণার দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন।
কর্মজীবন
শিক্ষা সম্পন্ন করে রামপুরে ফিরে প্রথমে তিনি টিউশনি করতেন। পরে রামপুর আলিয়া মাদরাসায় ইংরেজির শিক্ষক এবং রেজা লাইব্রেরিতে ক্যাটালগিং সহকারী হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তীতে তিনি কৃষি বিভাগে ডেপুটি ডিরেক্টর পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু ১৯৪৩ সালে তার জীবনে আসে চিন্তার বিপ্লব: আমজাদ আলী খানের মাধ্যমে তিনি মাওলানা আবুল আ’লা মওদূদীর বই পড়েন — বিশেষ করে নতুন শিক্ষা-ব্যবস্থা ও ইসলাম-পরিচিতি বিষয়ক গ্রন্থ তার চিন্তাজগতে আমূল পরিবর্তন ঘটায়। এরপর তিনি ইসলামের প্রতি গভীরভাবে অনুরাগী হয়ে দাওয়াহ ও লেখালেখিতে সক্রিয় হন।
তিনি দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও সমাজ-সংস্কারে অত্যন্ত মনোযোগী ছিলেন। ১৯৭২ সালে একটি আন্তঃধর্মীয় সংগঠন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। শিক্ষাক্ষেত্রে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত জামেয়া সালেহাত, রামপুর — যা আজও মুসলিম নারীদের শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। জীবনে তিনি একাধিকবার কারাবন্দি হন — ১৯৫৪, ১৯৬৫, ১৯৭১ এবং ১৯৭৫ সালে। কারাগারে অবস্থানকালেই তিনি হায়াতে তাইয়িবা গ্রন্থ রচনা করেন, যা সিরাত-সাহিত্য জগতে এক অনন্য সংযোজন হিসেবে বিবেচিত। জীবনের শেষ প্রান্তে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন; দৃষ্টি ও স্মৃতিশক্তি দুর্বল হতে থাকে — তবু শেষ পর্যন্ত জামাতে নামাজ আদায়ের চেষ্টা করতেন।
সাহিত্যকর্ম
আবু সলীম মুহাম্মাদ আব্দুল হাই ছিলেন সুদূরদৃষ্টিসম্পন্ন লেখক ও অনুবাদক। তার রচনাবলি:
- রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর বিপ্লবী জীবন — তার সবচেয়ে পরিচিত বাংলা গ্রন্থ। বইটির মূল কাঠামো তিনিই তৈরি করেন; বাংলা সংস্করণে ড. খ ম আব্দুর রাজ্জাক ও এ কে এম আঃ খালেক ফারূকীর সম্পাদনায় অনেক প্রয়োজনীয় তথ্য ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংযোজন করা হয়েছে, ফলে বাংলা সংস্করণের কলেবর মূলের তুলনায় সম্প্রসারিত। বইটির বিষয়বস্তু প্রধানত রাসূল (সা.)-এর বৈপ্লবিক আদর্শ ও কর্মনীতি — “কীভাবে তিনি জাহেলি সমাজকে একটি আদর্শ ইসলামি সমাজে রূপান্তরিত করেছিলেন, তার পদ্ধতিগত দিক” তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশে দারুস সালাম বাংলাদেশ, আহসান পাবলিকেশন, ইউনিভার্সাল ইসলামিক থ্যটসহ একাধিক প্রকাশনী থেকে বইটি প্রকাশিত হয়েছে।
- হায়াতে তাইয়িবা — রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনভিত্তিক জনপ্রিয় গ্রন্থ; কারাগারে রচিত।
- কুরআনের হিন্দি তরজমা (১৯৬৬) — পাঁচ বছরের পরিশ্রমের ফসল; তার সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান।
- আদর্শ কিভাবে প্রচার করতে হবে — দাওয়াহ-পদ্ধতি নিয়ে রচনা।
- মানুষের কাহিনী — সাধারণ পাঠকের জন্য রচনা।
- পত্রিকা: হাদি (হিন্দি মাসিক, ১৯৬২), হেলাল (উর্দু শিশুসাহিত্য, ১৯৬৩), বাতোল (মহিলা-বিষয়ক মাসিক, ১৯৬৪) — শিশু, নারী ও সাধারণ পাঠকের জন্য তিনি বিভিন্ন গ্রন্থ ও পত্রিকা প্রকাশ করেন।
রচনাশৈলী ও মূল্যায়ন
আবু সলীম মুহাম্মাদ আব্দুল হাইয়ের রচনাশৈলীর মূল বৈশিষ্ট্য হলো “বিপ্লবী” দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামি ইতিহাসের পাঠ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর বিপ্লবী জীবন-এ তিনি সিরাতকে শুধু জীবনী হিসেবে নয়, একটি সমাজ-রূপান্তরের কর্মসূচি হিসেবে উপস্থাপন করেন — রাসূল (সা.)-এর “বৈপ্লবিক আদর্শ ও কর্মনীতি”ই বইয়ের উপজীব্য, জীবনের খুঁটিনাটি শুধু প্রাসঙ্গিক বিষয় হিসেবে এসেছে। এই পদ্ধতিগত দৃষ্টিভঙ্গি বইটিকে প্রচলিত সিরাত-গ্রন্থ থেকে আলাদা করেছে।
তার ভাষা সরল ও প্রাঞ্জল; দাওয়াহর উদ্দেশ্য তার প্রতিটি রচনায় স্পষ্ট। হিন্দিতে কুরআন অনুবাদের মতো শ্রমসাধ্য কাজ প্রমাণ করে, তিনি শুধু চিন্তাবিদ ছিলেন না — ছিলেন কর্মীও। শিশু ও নারীদের জন্য পত্রিকা প্রকাশ এবং নারী-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ থেকে বোঝা যায়, সমাজের প্রতিটি স্তরে ইসলামি জ্ঞান পৌঁছে দেওয়াই ছিল তার লক্ষ্য।
সামগ্রিক মূল্যায়নে বলা যায়, মাওলানা আবু সলীম মুহাম্মাদ আব্দুল হাই ছিলেন সংশয় থেকে ঈমানে ফেরা এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব — যার জীবন শেখায়, সত্যের অনুসন্ধান ও আল্লাহর পথে অবিচল থাকাই প্রকৃত সফলতা। তার রচিত গ্রন্থ, কুরআনের হিন্দি অনুবাদ, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান ও দাওয়াহ-কার্যক্রম আজও মুসলিম সমাজকে পথ দেখাচ্ছে।