আবু রূশদ
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
এক নজরে
| পূর্ণ নাম | আবু রূশদ (Abu Rushd / Abu Rushed) |
| জন্ম | ২০ অক্টোবর ১৯৬৫, কিশোরগঞ্জ |
| জাতীয়তা | বাংলাদেশি |
| পেশা | সাংবাদিক, প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক; সম্পাদক, বাংলাদেশ ডিফেন্স জার্নাল |
| লেখার ধরন | প্রতিরক্ষা-বিশ্লেষণ, গোয়েন্দা-ইতিহাস, অনুবাদ |
| উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ | বাংলাদেশে ‘র’: আগ্রাসী গুপ্তচরবৃত্তির স্বরূপ সন্ধান, ইনসাইড ‘র’, পিলখানা ট্র্যাজেডি: আওয়ার ফলেন কমরেডস, প্রেসিডেন্ট জেনারেল ও আমি, পার্বত্য চট্টগ্রাম: শান্তিবাহিনী ও মানবাধিকার |
| পুরস্কার | টেলিভিশন রিপোর্টিং কোর্সে প্রথম স্থান; অন্যান্য যাচাইকৃত পুরস্কার-তথ্য পাওয়া যায়নি |
পরিচিতি
আবু রূশদ বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় একটি ব্যতিক্রমী নাম — সামরিক কর্মকর্তা থেকে সাংবাদিকতায় আসা, এমন দৃষ্টান্ত সচরাচর দেখা যায় না। পিবিএস (pbs.com.bd)-এর লেখক-পরিচিতিতে তার জীবনের এই বাঁকের বর্ণনা আছে সংক্ষেপে: “আবু রূশ্দ একসময় ক্যারিয়ার হিসেবে সৈনিক জীবনকে বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা তাকে সেই পেশা থেকে নিয়ে এসেছেন সাংবাদিকতায়।” সামরিক শৃঙ্খলার অভিজ্ঞতা আর গণমাধ্যমের বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ে তিনি জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়গুলোকে বাংলাদেশের পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন এক ভিন্ন মাত্রায়। তাকে বাংলাদেশে “ডিফেন্স জার্নালিজম” বা প্রতিরক্ষা-সাংবাদিকতার পথিকৃৎ হিসেবে অভিহিত করা হয়।
২০০৮ সাল থেকে তিনি নিজের সম্পাদনায় প্রকাশ করে আসছেন বাংলাদেশ ডিফেন্স জার্নাল — বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিরক্ষা-বিষয়ক জার্নাল। পাশাপাশি নিরাপত্তা বিশ্লেষক হিসেবে বিদেশের প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত পত্রিকা ও জার্নালে তার লেখা প্রকাশিত হয়েছে, আর দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর টক-শোতে তিনি নিয়মিত অংশ নেন।
জন্ম ও শিক্ষা
আবু রূশদের জন্ম ১৯৬৫ সালের ২০ অক্টোবর, কিশোরগঞ্জ জেলায়। তার পিতা ছিলেন রংপুর কারমাইকেল কলেজের অধ্যাপক — অর্থাৎ শিক্ষক-পরিবারের সন্তান তিনি। রংপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন; ক্যাডেট কলেজে তিনি সাংস্কৃতিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন এবং বাংলা ও ইংরেজি বিতর্কে ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী — বক্তৃতা ও যুক্তিনির্ভর চিন্তার এই প্রাথমিক চর্চা পরবর্তী সাংবাদিক-জীবনের ভিত্তি তৈরি করে দেয়।
ক্যাডেট কলেজের পর অফিসার ক্যাডেট হিসেবে তিনি যোগ দেন ১৩তম দীর্ঘমেয়াদি কোর্সে। বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে দুই বছরের প্রশিক্ষণকালে ৩য় ও ৪র্থ টার্মে যথাক্রমে কর্পোরাল ও আন্ডার অফিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লাভ করেন — প্রশিক্ষণে কৃতিত্বের স্বীকৃতি। ১৯৮৫ সালের ২০ ডিসেম্বর কোর্সের প্রথম দশজনের একজন হিসেবে তিনি কমিশন পান; সিগন্যাল কোরের অফিসার হিসেবে বেসিক কোর্স এবং স্কুল অব ইনফ্যান্ট্রি অ্যান্ড ট্যাকটিকসের কোর্স কৃতিত্বের সঙ্গে সম্পন্ন করেন। কিন্তু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় ১৯৮৯ সালে স্বাস্থ্যগত কারণে তাকে অবসর দেওয়া হয়। এলপিআর শেষে তৎকালীন সরকার বেসামরিক পর্যায়ে সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করলেও তিনি তাতে যোগ দেননি — বেছে নেন সাংবাদিকতাকে। পরবর্তীতে টেলিভিশন রিপোর্টিংয়ের ওপর কোর্স করে তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন।
কর্মজীবন
সাংবাদিকতায় এসে আবু রূশদ বেশ কয়েকটি প্রথম শ্রেণির দৈনিক পত্রিকায় সিনিয়র রিপোর্টার, বিশেষ সংবাদদাতা ও সহকারী সম্পাদক পদে কাজ করেছেন। তার সাংবাদিক-জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক — প্রতিরক্ষা-বিষয়ক রিপোর্টিংকে তিনি বাংলাদেশে একটি স্বতন্ত্র সাংবাদিক-ধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে জাতিসংঘ-পরিচালিত শান্তিরক্ষা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আমন্ত্রণে তিনি গেছেন সিয়েরালিওন ও দক্ষিণ সুদানে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশ নিয়ে এবং মিডিয়া টিমের সদস্য হিসেবে ভ্রমণ করেছেন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, চীন ও পাকিস্তানে; এছাড়া ঘুরে বেড়িয়েছেন তুরস্ক, মিশর, মালয়েশিয়া, ভারত, থাইল্যান্ড ও হংকং।
২০০৮ সাল থেকে নিজের সম্পাদনায় বাংলাদেশ ডিফেন্স জার্নাল প্রকাশ করে তিনি প্রতিরক্ষা-বিশ্লেষণকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। নিরাপত্তা বিশ্লেষক হিসেবে বিদেশি প্রতিরক্ষা-জার্নালেও তার লেখা ছাপা হয়েছে। টেলিভিশন টক-শোতে জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা-বিষয়ে তার মতামত নিয়মিত শোনা যায়।
সাহিত্যকর্ম
আবু রূশদের গ্রন্থতালিকায় প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দাবৃত্তি ও সাম্প্রতিক ইতিহাস-কেন্দ্রিক রচনাই প্রধান:
- বাংলাদেশে ‘র’: আগ্রাসী গুপ্তচরবৃত্তির স্বরূপ সন্ধান — তার সবচেয়ে আলোচিত গ্রন্থ। ভারতের বহির্বিশ্ব গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (র)-এর কার্যক্রম, কৌশল ও বাংলাদেশে এর প্রভাব নিয়ে রচিত। প্রথম প্রকাশ ২০০১ সালে (২৬৪ পৃষ্ঠা; আইআইইউসি গ্রন্থাগার-তালিকা অনুযায়ী); পরবর্তীতে ২০২৬ সালে রেডিয়েন্ট পাবলিশিং থেকে হার্ডকভার সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে (২৯৬ পৃষ্ঠা, ISBN 9789473114389)। লক্ষণীয়: প্রথমা প্রকাশনীর তালিকায় গ্রন্থটির মূল লেখক হিসেবে অশোকা রায়নার নাম এবং আবু রূশদকে অনুবাদক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে — অর্থাৎ গ্রন্থটি মূলত অশোকা রায়নার রচনার বাংলা রূপায়ণ/অনুবাদ।
- ইনসাইড ‘র’ — ‘র’ বিষয়ক ধারাবাহিক গ্রন্থ।
- পিলখানা ট্র্যাজেডি: আওয়ার ফলেন কমরেডস (Pilkhana Tragedy: Our Fallen Comrades) — ২০০৯-এর পিলখানা হত্যাকাণ্ড নিয়ে ইংরেজিতে রচিত গ্রন্থ।
- প্রেসিডেন্ট জেনারেল ও আমি — স্মৃতি-আলেখ্য ধাঁচের গ্রন্থ।
- পার্বত্য চট্টগ্রাম: শান্তিবাহিনী ও মানবাধিকার — পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিষয়ক বিশ্লেষণধর্মী গ্রন্থ।
তার রচনার সাধারণ বৈশিষ্ট্য — গোপনীয় ও স্পর্শকাতর বিষয়কে দলিল-নির্ভর বিশ্লেষণের মাধ্যমে পাঠকের সামনে আনা; সামরিক-অভিজ্ঞতা ও সাংবাদিক-অনুসন্ধানের মিশ্রণ।
পুরস্কার ও সম্মাননা
টেলিভিশন রিপোর্টিং-বিষয়ক কোর্সে প্রথম স্থান অধিকারের কথা তার জীবনীতে উল্লেখ আছে। এছাড়া কোনো জাতীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার-প্রাপ্তির যাচাইকৃত তথ্য প্রকাশ্য সূত্রে পাওয়া যায়নি।
রচনাশৈলী ও মূল্যায়ন
আবু রূশদের লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি তার দ্বৈত অভিজ্ঞতা — একদিকে সেনাবাহিনীর ভেতর থেকে দেখা প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা, অন্যদিকে সাংবাদিকের অনুসন্ধানী দৃষ্টি। বাংলাদেশে ‘র’-এর মতো গ্রন্থে তিনি এমন একটি বিষয় তুলে ধরেছেন, যা নিয়ে বাংলাভাষায় প্রকাশ্য আলোচনা ছিল প্রায় অনুপস্থিত — ফলে বইটি প্রকাশের সময় পাঠকমহলে ব্যাপক কৌতূহল ও আলোচনার জন্ম দেয়। গোয়েন্দা-ইতিহাসের মতো ধোঁয়াশাপূর্ণ ক্ষেত্রে লেখার ঝুঁকি তিনি নিয়েছেন সচেতনভাবেই; সমালোচকদের কেউ কেউ তার কিছু দাবির যাচাইযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও, বিষয়টির ওপর জন-আলোচনা সৃষ্টিতে তার ভূমিকা অনস্বীকার্য।
তার রচনাশৈলী প্রতিবেদনধর্মী ও তথ্যবহুল — সামরিক পরিভাষা ও কৌশলগত বিশ্লেষণের সঙ্গে সাংবাদিক-সুলভ বর্ণনার মিশ্রণ। বাংলাদেশ ডিফেন্স জার্নাল-এর সম্পাদক হিসেবে তিনি প্রতিরক্ষা-সাংবাদিকতাকে বাংলাদেশে একটি পেশাদার শাখা হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন — যা তার সাহিত্যিক পরিচয়ের চেয়েও বড় প্রাতিষ্ঠানিক অবদান বলে মূল্যায়ন করা যায়। সামগ্রিকভাবে, আবু রূশদ বাংলাদেশের সেই বিরল লেখকদের একজন, যিনি ব্যারাক ও নিউজরুম — দুই জগতের অভিজ্ঞতাকেই কলমে ধারণ করেছেন। তার লেখায় একটি সতর্কতাও প্রযোজ্য, যা পাঠকের জানা দরকার: গোয়েন্দা-ইতিহাসের মতো ক্ষেত্রে সব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন, এবং বাংলাদেশে ‘র’-এর মূল-লেখকত্ব নিয়ে প্রকাশনী-সূত্রগুলোর মধ্যে ভিন্নতা (কোথাও আবু রূশদ, কোথাও অশোকা রায়না মূল লেখক ও তিনি অনুবাদক) পাঠককে সচেতন থাকতে শেখায়। তবু জাতীয় নিরাপত্তা-বিষয়ক জন-আলোচনায় তার অবদান — বিশেষ করে প্রতিরক্ষা-সাংবাদিকতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া — বাংলাদেশের গণমাধ্যম-ইতিহাসে স্থায়ী ছাপ রেখেছে।