অধ্যাপক মাযহারুল ইসলাম
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
এক নজরে
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| পূর্ণ নাম | মযহারুল ইসলাম (বানানভেদে মাযহারুল ইসলাম) |
| জন্ম | ১ জুলাই ১৯২৯ (একটি সূত্রে ১০ সেপ্টেম্বর ১৯২৮) |
| জন্মস্থান | চরনবীপুর, শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জ (তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত) |
| মৃত্যু | ১৪ নভেম্বর ২০০৩, ব্যাংকক, থাইল্যান্ড |
| জাতীয়তা | বাংলাদেশি |
| পেশা | লোকাচারবিদ (ফোকলোরিস্ট), গবেষক, কবি, শিক্ষাবিদ |
| শিক্ষা | তালগাছী আবু ইসহাক উচ্চ বিদ্যালয় (মেট্রিক, ১৯৪৫); সিরাজগঞ্জ কলেজ (ইন্টারমিডিয়েট, ১৯৪৭); রাজশাহী সরকারি কলেজ (বাংলায় অনার্স, ১৯৪৯ — প্রথম শ্রেণীতে প্রথম); ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (বাংলায় এমএ, ১৯৫১ — প্রথম শ্রেণীতে প্রথম; স্বর্ণপদক ও কালীনারায়ণ বৃত্তি); পিএইচডি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৫৮ — তত্ত্বাবধায়ক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ); পিএইচডি, লোকাচারবিদ্যা, ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র (১৯৬৩) |
| উল্লেখযোগ্য কর্ম | কবি হেয়াত মামুদ; কবি পাগলা কানাই; লোককাহিনী সংগ্রহের ইতিহাস; ফোকলোর পরিচিতি ও লোকসাহিত্যের পঠন-পাঠন; A History of Folktale Collections in India and Pakistan; The Theoretical Study of Folklore; বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব; মাটির ফসল (কাব্য); তালতমাল (গল্প); এতটুকু ছোঁয়া লাগে (উপন্যাস) |
| পুরস্কার | বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৮); দাউদ পুরস্কার (১৯৭০); একুশে পদক (২০২৩, মরণোত্তর) |
পরিচিতি
অধ্যাপক ড. মযহারুল ইসলাম (১ জুলাই ১৯২৯ – ১৪ নভেম্বর ২০০৩) ছিলেন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লোকাচারবিদ, লেখক, গবেষক ও শিক্ষাবিদ। বাংলা লোকসাহিত্য ও লোকাচারবিদ্যাকে তিনি আধুনিক গবেষণার বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বাংলা একাডেমির প্রথম মহাপরিচালক (১৯৭২–১৯৭৪) এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (১৯৭৪–১৯৭৫) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দুবার পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনকারী এই পণ্ডিতের গবেষণা-গ্রন্থ “A History of Folktale Collections in India and Pakistan” আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সমাদৃত হয়।
জন্ম ও শিক্ষা
মযহারুল ইসলামের জন্ম সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার চরনবীপুর গ্রামে; তাঁর পিতা ডা. মোহাম্মদ আলী এবং মাতা সালেহা বেগম। জন্মতারিখ নিয়ে সূত্রভেদ আছে — বাংলা উইকিপিডিয়া অনুযায়ী ১ জুলাই ১৯২৯, আর একটি গ্রন্থ-বিবরণীতে ১০ সেপ্টেম্বর ১৯২৮ উল্লেখ আছে। তিনি তালগাছী আবু ইসহাক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৪৫ সালে মেট্রিক এবং সিরাজগঞ্জ কলেজ থেকে ১৯৪৭ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। এরপর রাজশাহী সরকারি কলেজে বাংলা বিষয়ে অনার্স পড়ে ১৯৪৯ সালে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা এমএ প্রিভিয়াস ও ১৯৫১ সালে এমএ ফাইনাল পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান লাভ করেন; একই সঙ্গে স্বর্ণপদক ও কালীনারায়ণ বৃত্তি পান। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর তত্ত্বাবধানে ১৯৫৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে “মধ্যযুগের বাংলা কাব্যে হেয়াত মামুদ” বিষয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। পরে ১৯৬৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লোকাচারবিদ্যায় দ্বিতীয় পিএইচডি অর্জন করেন।
কর্মজীবন
১৯৫২ সালে প্রভাষক হিসেবে ঢাকা কলেজে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়; ১৯৫৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে সিনিয়র প্রভাষক হন। ১৯৫৭ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ইচ্ছানুসারে ঢাবি ছেড়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে সিনিয়র প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেন; ১৯৬৪ সালে দেশে ফিরে রাবির বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় সভাপতির দায়িত্ব নেন এবং ১৯৬৫ সালে কলা অনুষদের ডীন নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথি অধ্যাপক হন এবং পরে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বার্কলে)-তেও অতিথি অধ্যাপকের দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নিয়মিত বক্তব্য উপস্থাপন করতেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তিনি বাংলা একাডেমির প্রথম মহাপরিচালক নিযুক্ত হন (২ জুন ১৯৭২ – ১২ আগস্ট ১৯৭৪) এবং ১৯৭৪ সালের ১৯ আগস্ট রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে যোগ দেন (৪ আগস্ট ১৯৭৪ – ১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭৫)। ১৯৭৯–১৯৮৪ সালে কলকাতা, বিশ্বভারতী, রাঁচি, দিল্লীর জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়সহ ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি অধ্যাপক ছিলেন। ১৯৮৭ সালে তিনি স্প্যারো অ্যাপারেলস লিমিটেড নামে পোশাক কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন এবং আজীবন এর নির্বাহী পরিচালক ছিলেন।
সাহিত্যজীবন
মযহারুল ইসলামের সাহিত্যকীর্তির কেন্দ্রে ছিল লোকসাহিত্য-গবেষণা। তাঁর গবেষণা-গ্রন্থ “কবি হেয়াত মামুদ” ও “কবি পাগলা কানাই” মধ্যযুগের বাংলার লোককবিদের নিয়ে মৌলিক গবেষণা; “লোককাহিনী সংগ্রহের ইতিহাস” (১৯৬৯) এবং “ফোকলোর পরিচিতি ও লোকসাহিত্যের পঠন-পাঠন” এই শাস্ত্রের পাঠ্যগ্রন্থ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ইংরেজিতে রচিত “A History of Folktale Collections in India and Pakistan” (১৯৭০) ও “The Theoretical Study of Folklore” (১৯৯৮) তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিয়ে “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব” (১৯৭৪) গ্রন্থসহ একাধিক বই লেখেন। কবি হিসেবেও তিনি সক্রিয় ছিলেন — “মাটির ফসল” (১৯৫৫), “যেখানে বাঘের থাবা” (১৯৭৯), “দুঃসময়ের ছড়া” (১৯৮৬) তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। এছাড়া “তালতমাল” (১৯৫৯) নামে একটি গল্পগ্রন্থ এবং “এতটুকু ছোঁয়া লাগে” (২০০২) নামে একটি উপন্যাসও রচনা করেন তিনি।
পুরস্কার ও সম্মাননা
সাহিত্য ও শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের জন্য তিনি ১৯৬৮ সালে কবিতায় বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ১৯৭০ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের উচ্চতম সাহিত্য পুরস্কার দাউদ পুরস্কার লাভ করেন। শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ২০২৩ সালে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করে।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
২০০৩ সালের ১৪ নভেম্বর থাইল্যান্ডের ব্যাংককে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন; বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। বাংলাদেশে লোকাচারবিদ্যাকে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার মর্যাদা দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অগ্রগণ্য; বাংলা একাডেমির প্রথম মহাপরিচালক হিসেবেও তিনি প্রতিষ্ঠানটির গোড়াপত্তনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাঁর নামে “মযহারুল ইসলাম কবিতা পুরস্কার” প্রবর্তিত হয়েছে, যা তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকারকে স্মরণীয় করে রেখেছে।