মূল কন্টেন্টে যান
অধ্যাপক গোলাম আযম

অধ্যাপক গোলাম আযম

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

বিষয় তথ্য
পূর্ণ নাম গোলাম আযম
জন্ম ৭ নভেম্বর ১৯২২
জন্মস্থান লক্ষ্মীবাজার, ঢাকা (মাতুলালয়); পৈতৃক নিবাস — বীরগাঁও, নবীনগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
মৃত্যু ২৩ অক্টোবর ২০১৪, বিএসএমএমইউ, ঢাকা
জাতীয়তা বাংলাদেশি
পেশা রাজনীতিবিদ, লেখক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক
শিক্ষা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় — রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বিএ ও এমএ (১৯৫০)
দায়িত্বকাল ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক; রংপুর কারমাইকেল কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক (১৯৫০–); পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমির (১৯৬৯–১৯৭১); বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির (২০০০ সাল পর্যন্ত)
উল্লেখযোগ্য কর্ম জীবনে যা দেখলাম (৯ খণ্ডের আত্মজীবনী); কেয়ারটেকার সরকার পদ্ধতি: উদ্ভাবনা, প্রস্তাবনা ও আন্দোলন; পলাশী থেকে বাংলাদেশ; ইসলাম ও গণতন্ত্র; সহজ বাংলায় আল কুরআনের অনুবাদ (৩ খণ্ড)
পুরস্কার প্রকাশ্য সূত্রে কোনো পুরস্কারের তথ্য পাওয়া যায়নি

পরিচিতি

গোলাম আযম (৭ নভেম্বর ১৯২২ – ২৩ অক্টোবর ২০১৪) ছিলেন একজন বাংলাদেশি রাজনীতিবিদ ও লেখক। তিনি ১৯৬৯ সাল থেকে পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমির ছিলেন এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির হিসেবে ২০০০ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তার রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে; ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেয়। রাজনীতির পাশাপাশি তিনি ইসলামি চিন্তা, রাজনীতি ও ইতিহাস নিয়ে প্রায় নব্বইটি গ্রন্থ রচনা করেন।

জন্ম ও শিক্ষা

১৯২২ সালের ৭ নভেম্বর (বাংলা ১৩২৯ সালের ৫ অগ্রহায়ণ) ঢাকার লক্ষ্মীবাজারস্থ শাহ সাহেব বাড়িতে — তার নানাবাড়িতে — গোলাম আযমের জন্ম। তিনি ছিলেন মাওলানা গোলাম কবীর ও সৈয়দা আশরফুন্নেসার জ্যেষ্ঠ সন্তান। তার পৈতৃক বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বীরগাঁও গ্রামে।

তিনি বীরগাঁওয়ের মাদ্রাসা থেকে প্রাথমিক শিক্ষা নেন এবং ঢাকা বোর্ড থেকে এসএসসি পরীক্ষায় মেধাতালিকায় ত্রয়োদশ স্থান লাভ করেন। ১৯৪৪ সালে তৎকালীন ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে আইএ পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে ঢাকা বোর্ডে দশম স্থান অধিকার করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বিএ ও ১৯৫০ সালে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। সূত্রানুযায়ী ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলা ভাষা আন্দোলনে তার ভূমিকার মধ্যে উল্লেখ আছে ১৯৪৮ সালের ২৭ নভেম্বর ডাকসুর পক্ষ থেকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের কাছে স্মারকলিপি প্রদান, যাতে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করা হয়। ভাষা আন্দোলনে যুক্ত থাকার কারণে তিনি তিনবার গ্রেফতার হন এবং রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয় বলে উল্লেখ আছে।

কর্মজীবন

ছাত্রজীবন শেষে ১৯৫০ সালের ৩ ডিসেম্বর তিনি রংপুর কারমাইকেল কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫০ সালে তবলিগ জামায়াতের তৎপরতায় যুক্ত হন এবং ১৯৫২–১৯৫৪ সালে রংপুরের আমির ছিলেন। ১৯৫২ সালে তিনি তমদ্দুন মজলিসের কাজে জড়িয়ে পড়েন এবং ১৯৫৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত রংপুর জেলার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৫৪ সালের ২২ এপ্রিল তিনি জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। ১৯৫৫ সালে গ্রেফতার হয়ে রংপুর কারাগারে অবস্থানকালেই তিনি জামায়াতের রুকন হন; একই বছর জুন মাসে রাজশাহী বিভাগীয় জামায়াতের সেক্রেটারি, পরে পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি ও রাজশাহী বিভাগীয় আমিরের দায়িত্ব পান। ১৯৫৭ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর সাধারণ সম্পাদক হন। ১৯৬৪ সালে আইয়ুব খান সরকার জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে তিনি গ্রেফতার হন এবং আট মাস আটক থাকেন। ১৯৬৯ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমির পদে অধিষ্ঠিত হন এবং ১৯৭১ সালের যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত এই পদে ছিলেন।

১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা

১৯৭১ সালে গোলাম আযম বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেন এবং আওয়ামী লীগ ও মুক্তিবাহিনীকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করেন বলে সূত্রে উল্লেখ আছে। তার মন্তব্য দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হতো। ১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল গঠিত শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি; তার বিরুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর সহায়তায় গঠিত রাজাকার, আলবদর ও আলশামস মিলিশিয়া গঠনের অভিযোগও রয়েছে। তিনি পরে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী থাকার কথা স্বীকার করেন, তবে তার বিরুদ্ধে আনীত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ অস্বীকার করেন।

স্বাধীনতার পর

স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের ১৮ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকার গোলাম আযমসহ ৪২ জন রাজনৈতিক ব্যক্তির নাগরিকত্ব বাতিল করে। তিনি বিদেশে অবস্থানকালে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দিতে মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য দেশের নেতাদের কাছে তদবির করেন বলে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের উপস্থাপিত অভিযোগপত্রে (১৯৯২) উল্লেখ আছে। ১৯৭৮ সালে পাকিস্তানি পাসপোর্ট ও বাংলাদেশের স্বল্পমেয়াদী ভিসা নিয়ে তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন; ১৯৭৮ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত বৈধ ভিসা ছাড়াই বাংলাদেশে অবস্থান করেন। ১৯৯৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তার নাগরিকত্ব পুনর্বহাল হয়। এরপর তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির হিসেবে ২০০০ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০০০ সালের ডিসেম্বরে সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নেন; তার উত্তরসূরী হন মতিউর রহমান নিজামী।

গ্রেফতার, বিচার ও রায়

২০১২ সালের ১১ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে গ্রেফতার করে; জামিনের আবেদন নাকচ করা হয়। ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ তার বিরুদ্ধে আনা ৬১টি অভিযোগের মধ্যে প্রমাণিত অভিযোগে তাকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেয় — রায়ে বলা হয়, তার অপরাধ মৃত্যুদণ্ডতুল্য হলেও বয়স ও স্বাস্থ্য বিবেচনায় তাকে এই দণ্ড দেওয়া হয়। তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং প্রমাণ হাজির করতে বলেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা এই বিচারিক প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে।

রচনাবলি

তিনি ইসলামি চিন্তা, রাজনীতি ও ইতিহাস নিয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করেন। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি: জীবনে যা দেখলাম (৯ খণ্ডের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ), কেয়ারটেকার সরকার পদ্ধতি: উদ্ভাবনা, প্রস্তাবনা ও আন্দোলন, পলাশী থেকে বাংলাদেশ, বাংলাদেশে ইসলামী ঐক্যপ্রচেষ্টার ইতিহাস, শিক্ষাব্যবস্থার ইসলামী রূপরেখা, ইসলাম ও গণতন্ত্র, ইসলাম ও বিজ্ঞান, ইকামাতে দ্বীন, মনটাকে কাজ দিন, সহজ বাংলায় আল কুরআনের অনুবাদ (৩ খণ্ড), ইসলামী আন্দোলন: সাফল্য ও বিভ্রান্তি এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে ঘটনাবহুল ৭৫ সাল।

ব্যক্তিগত জীবন

তার দাম্পত্য সঙ্গী ছিলেন সৈয়দা আফিফা আযম; তাদের ছয়জন সন্তান ছিল, যাদের মধ্যে আব্দুল্লাহিল আমান আযমী (আযমী) অন্যতম।

মৃত্যু

২০১৪ সালের ২৩ অক্টোবর রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসারত অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন; পরিবারের বর্ণনানুযায়ী মৃত্যুর কারণ স্ট্রোক। ২৫ অক্টোবর বাইতুল মুকাররম জাতীয় মসজিদে জোহরের নামাজের পর তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয় — ইমামতি করেন তার সন্তান আব্দুল্লাহিল আমান আযমী। জানাজার পর মগবাজারে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়। জানাজা ঘিরে কিছু সংগঠনের কর্মীরা বিরোধিতার চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয় বলে বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।

প্রোফাইল ছবি: Wikimedia Commons (CC BY-SA 3.0)

জনপ্রিয় বই

সব বই দেখুন →

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।