সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| পূর্ণ নাম | সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় |
| ছদ্মনাম | নীললোহিত, সনাতন পাঠক, নীল উপাধ্যায় |
| জন্ম | ৭ সেপ্টেম্বর ১৯৩৪ |
| জন্মস্থান | মাদারীপুর, ফরিদপুর, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত (বর্তমান বাংলাদেশ) |
| মৃত্যু | ২৩ অক্টোবর ২০১২, কলকাতা, ভারত |
| জাতীয়তা | ভারতীয় |
| পেশা | কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, সাংবাদিক |
| শিক্ষা | সুরেন্দ্রনাথ কলেজ; দমদম মতিঝিল কলেজ; সিটি কলেজ, কলকাতা; কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় — বাংলায় এমএ (১৯৫৪) |
| উল্লেখযোগ্য কর্ম | একা এবং কয়েকজন, হঠাৎ নীরার জন্য (কবিতা); সেই সময়, প্রথম আলো, পূর্ব-পশ্চিম, অরণ্যের দিনরাত্রি (উপন্যাস); কাকাবাবু সিরিজ |
| পুরস্কার | সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার (১৯৮৫), আনন্দ পুরস্কার (১৯৭২, ১৯৮৯), বঙ্কিম পুরস্কার (১৯৮২), সরস্বতী সম্মান (২০০৪) |
পরিচিতি
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (৭ সেপ্টেম্বর ১৯৩৪ – ২৩ অক্টোবর ২০১২) ছিলেন ভারতীয় বাংলা ভাষার অন্যতম জনপ্রিয় ও বহুমুখী লেখক — একই সঙ্গে কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার ও সাংবাদিক। দুই শতাধিক গ্রন্থের এই স্রষ্টাকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সৃষ্টিশীল বাংলা লেখকদের একজন বলা হয়ে থাকে। ১৯৫৩ থেকে ২০১২ — প্রায় ছয় দশকের সাহিত্যজীবনে তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার ভাষা বদলে দিয়েছেন, আবার সেই সময়, প্রথম আলো ও পূর্ব-পশ্চিম-এর মতো ঐতিহাসিক উপন্যাসে উনিশ শতকের কলকাতা ও দেশভাগের যন্ত্রণাকে মহাকাব্যিক রূপ দিয়েছেন। শিশুসাহিত্যে তার সৃষ্ট কাকাবাবু চরিত্রটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কিশোর পাঠকের প্রিয়।
জন্ম ও শিক্ষা
১৯৩৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর মহকুমায় এক বাঙালি হিন্দু পরিবারে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম। শৈশবেই পরিবারের সঙ্গে তিনি কলকাতায় চলে আসেন; ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর তার জন্মভূমি পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) অন্তর্ভুক্ত হয়। কলকাতার সুরেন্দ্রনাথ কলেজ, দমদম মতিঝিল কলেজ ও সিটি কলেজে পড়াশোনার পর ১৯৫৪ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
কর্মজীবন
১৯৫৩ সালে — তখন তিনি স্নাতক পর্যায়ের ছাত্র — বন্ধু দীপক মজুমদার ও আনন্দ বাগচীর সঙ্গে মিলে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন কৃত্তিবাস, বাংলা কবিতার ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী পত্রিকা। সম্পাদক হিসেবে তিনি পত্রিকাটিকে নতুন প্রজন্মের কবিদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মঞ্চে পরিণত করেন; বিষয়, ছন্দ ও ভাষায় নতুনত্বের এই আন্দোলন আধুনিক বাংলা কবিতার ধারা বদলে দেয়। পরে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকা গোষ্ঠীর বিভিন্ন প্রকাশনায় দীর্ঘকাল লেখালেখি করেন এবং দেশ পত্রিকায় তার গদ্য নিয়মিত প্রকাশিত হতো। বিট প্রজন্মের কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল; গিন্সবার্গ তার বিখ্যাত সেপ্টেম্বর অন জেসোর রোড কবিতায় সুনীলের উল্লেখ করেছেন। ২০০২ সালে তিনি কলকাতার শেরিফ মনোনীত হন এবং ২০০৮ সালে ভারতের জাতীয় সাহিত্য সংস্থা সাহিত্য অকাদেমির সভাপতি নির্বাচিত হন।
সাহিত্যজীবন
সুনীল নিজে বলতেন, কবিতাই তার প্রথম প্রেম। তার নিখিলেশ ও নীরা সিরিজের কবিতা — বিশেষ করে কাল্পনিক প্রেমিকা নীরাকে নিয়ে লেখা কবিতাগুচ্ছ — বাঙালি পাঠকের কাছে অসম্ভব জনপ্রিয় হয়। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ: একা এবং কয়েকজন (১৯৫৮), আমি কি রকম ভাবে বেঁচে আছি (১৯৬৬) ও হঠাৎ নীরার জন্য।
ঔপন্যাসিক হিসেবে তার অভিষেক আত্মপ্রকাশ (১৯৬৪) দিয়ে — দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত এই উপন্যাস তরুণ কলকাতার বোহেমিয়ান জীবনের বর্ণনায় আলোড়ন তোলে। এরপর অরণ্যের দিনরাত্রি-সহ একের পর এক উপন্যাসে তিনি নাগরিক মধ্যবিত্তের অস্তিত্ব-সংকটের গল্প বলেন। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় কীর্তি ঐতিহাসিক উপন্যাসত্রয়ী: উনিশ শতকের নবজাগরণের কলকাতা নিয়ে সেই সময় (১৯৮৫ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত), তার অনুবর্তী প্রথম আলো (১৯৯৬) এবং দেশভাগের বেদনাকে তিন প্রজন্মের চোখে দেখা মহাকাব্যিক পূর্ব-পশ্চিম। বাউল সাধক লালন ফকিরের জীবন নিয়ে লেখা মনের মানুষও তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। ভ্রমণকাহিনী পায়ের তলায় সর্ষে (দুই খণ্ড) এবং আত্মজীবনীমূলক অর্ধেক জীবন তার গদ্যের অন্য দুটি মাত্রা।
শিশু-কিশোর সাহিত্যে তার অমর সৃষ্টি কাকাবাবু — পঙ্গু, দুঃসাহসী রহস্য-সন্ধানী রাজা রায়চৌধুরী, যার সঙ্গী ভাইপো সন্তু ও বন্ধু জোজো। ১৯৭৪ সাল থেকে তিনি এই সিরিজের ছত্রিশটির বেশি উপন্যাস লিখেছেন, যার বেশিরভাগ প্রথম প্রকাশিত হয় আনন্দমেলা পত্রিকায়। নীললোহিত, সনাতন পাঠক ও নীল উপাধ্যায় — এই তিন ছদ্মনামেও তিনি লিখতেন। সত্যজিৎ রায় তার প্রতিদ্বন্দ্বী ও অরণ্যের দিনরাত্রি অবলম্বনে দুটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন; মনের মানুষ, সবুজ দ্বীপের রাজা, মিশর রহস্য-সহ তার বহু রচনা চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে।
তার গদ্যের বৈশিষ্ট্য ছিল সহজ, স্পষ্ট ও কথোপকথনধর্মী ভাষা — সঙ্গে শুকনো রসিকতা। এই ভঙ্গি বাংলা ও বাংলার বাইরের বহু লেখককে অনুপ্রাণিত করেছে। কবি শঙ্খ ঘোষের মতে, সমসাময়িক ভাষা ব্যবহার করে সুনীল পাঠককে নিজের এমন দিক দেখিয়েছেন যা তারা হয়তো দেখতে চায়নি; ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তিকে তিনি রূপ দিয়েছেন সবার অভিজ্ঞতায়। মনের মানুষ অবলম্বনে গৌতম ঘোষ ২০১০ সালে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন; দুই নারী হাতে তরবারি অবলম্বনে নির্মিত হয় অপরাজিতা তুমি (২০১২)।
ব্যক্তিগত জীবন
১৯৬৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তিনি স্বাতী বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিয়ে করেন। তাদের একমাত্র পুত্র সৌভিক (জন্ম ১৯৬৭), যিনি বোস্টনে বসবাস করেন। জীবনের শেষ দিকে তিনি প্রোস্টেট ক্যানসারে ভুগছিলেন এবং চিকিৎসার জন্য মুম্বাই গিয়েছিলেন।
পুরস্কার ও সম্মাননা
- আনন্দ পুরস্কার (১৯৭২ ও ১৯৮৯)
- বঙ্কিম পুরস্কার (১৯৮২)
- সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার (১৯৮৫, সেই সময় উপন্যাসের জন্য)
- সরস্বতী সম্মান (২০০৪)
- কলকাতার শেরিফ (২০০২)
- সাহিত্য অকাদেমির সভাপতি (২০০৮–২০১২)
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
২০১২ সালের ২৩ অক্টোবর ভোররাতে দক্ষিণ কলকাতার নিজ বাসায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মারা যান; বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। ২৫ অক্টোবর কেওড়াতলা শ্মশানে অসংখ্য গুণমুগ্ধের উপস্থিতিতে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি শোক প্রকাশ করে বলেন, তার মৃত্যুতে সৃষ্ট শূন্যতা পূরণ হবার নয়। তার স্মরণে ২০১২ সালেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় স্মৃতি পুরস্কার প্রবর্তিত হয়। আজও প্রতি বছর বইমেলায় ও জন্মদিনে দুই বাংলার পাঠক তাকে স্মরণ করে — কবিতায়, উপন্যাসে ও কাকাবাবুর দুঃসাহসিক অভিযানে তিনি বেঁচে আছেন।
প্রোফাইল ছবি: Wikimedia Commons (CC BY 3.0 (Wikimedia Commons user Gangulybiswarup))