মূল কন্টেন্টে যান

পথের পাঁচালী বই রিভিউ — বিভূতিভূষণ

October 6, 2026 · Rakibul Hasan · ব্লগ

বাংলা সাহিত্যে এমন কিছু বই আছে, যা পড়া মানে শুধু গল্প জানা নয়, একটি সম্পূর্ণ জগতে প্রবেশ করা। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী ঠিক তেমনই একটি বই। এটি একটি দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারের গল্প, দুটি শিশুর শৈশবের গল্প, আর একটি গ্রামের গল্প — কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, এটি মানুষের বেঁচে থাকার, স্বপ্ন দেখার আর প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার গল্প। প্রকাশের প্রায় এক শতাব্দী পরেও এই উপন্যাসের আবেদন এতটুকু কমেনি।

কাহিনির সংক্ষিপ্ত রূপরেখা

নিশ্চিন্দিপুর গ্রামে বাস করে হরিহর রায়ের পরিবার। হরিহর স্বপ্নালু, কবিমনের মানুষ — পুরোহিতগিরি আর সামান্য চাকরির আয়ে সংসার চলে না, কিন্তু তার মন পড়ে থাকে দূরের কল্পনায়। তার স্ত্রী সর্বজয়া বাস্তববাদী, সংসারের হাল ধরে রাখা কঠিন-স্বভাবের নারী। তাদের দুই সন্তান — বড় মেয়ে দুর্গা আর ছোট ছেলে অপু। আর আছে বৃদ্ধা পিসি ইন্দির ঠাকরুণ, যিনি এই সংসারেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

উপন্যাসের তিনটি খণ্ডে ধরা পড়ে এই পরিবারের জীবন। প্রথমে গ্রামের শান্ত, স্নিগ্ধ জীবন — আমবাগান, বাঁশঝাড়, পুকুরঘাট, আর দুই ভাইবোনের দুষ্টুমি আর কৌতূহল। অপু-দুর্গা মিলে আবিষ্কার করে তাদের ছোট্ট জগৎ — রেললাইন দেখতে যাওয়া, কাশবনে ঘোরা, ফল চুরি করে খাওয়া। শৈশবের এই নির্মল আনন্দের ছবি বাংলা সাহিত্যে বিরল।

কিন্তু দারিদ্র্য ধীরে ধীরে এই সুখের ওপর ছায়া ফেলে। হরিহরের অনুপস্থিতিতে সংসার আরও কঠিন হয়ে ওঠে। উপন্যাসের মাঝামাঝি ঘটে সেই হৃদয়বিদারক ঘটনা, যা প্রতিটি পাঠকের মনে দাগ কাটে — দুর্গার অকালমৃত্যু। এই শোকের পর পরিবারটি ভেঙে পড়ে, আর শেষ পর্যন্ত তারা নিশ্চিন্দিপুর ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। শেষ দৃশ্যে অপুর চোখে নতুন জীবনের দিকে তাকানোর আশা — যা পাঠককে কাঁদায় আবার আশাও জাগায়।

অপু ও দুর্গা — বাংলা সাহিত্যের অমর শিশুচরিত্র

অপু বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে প্রিয় শিশুচরিত্রগুলোর একটি। তার চোখে পৃথিবী এক বিস্ময়ের জায়গা। রেলগাড়ির ধোঁয়া, দূরের পাহাড়, আকাশের মেঘ — সবকিছুই তার কাছে নতুন, সবকিছুই প্রশ্ন জাগায়। অপুর এই বিস্ময়বোধই উপন্যাসের প্রাণ। লেখক শিশুমনের এই নির্মল কৌতূহলকে এত সত্যিভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে, পড়তে পড়তে পাঠক নিজের শৈশবে ফিরে যান।

দুর্গা অপুর চেয়ে বড়, আর একটু বেশি দুরন্ত। সে ফল চুরি করে, বনে বনে ঘোরে, ভাইকে নিয়ে নানা অভিযানে বেরোয়। কিন্তু তার দুরন্তপনার আড়ালে আছে গভীর স্নেহ — ভাইয়ের প্রতি, মায়ের প্রতি। দুর্গার মৃত্যু শুধু একটি চরিত্রের মৃত্যু নয়, শৈশবেরই মৃত্যু। তার চলে যাওয়ার পর উপন্যাসের সুর বদলে যায়, যেন পৃথিবী থেকে রঙ মুছে যায়।

  • অপু: কৌতূহলী, স্বপ্নালু শিশু — বিস্ময় আর প্রশ্নের প্রতীক।
  • দুর্গা: দুরন্ত, স্নেহময়ী বড় বোন — শৈশবের প্রাণচাঞ্চল্যের প্রতিমূর্তি।
  • সর্বজয়া: কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়ানো মা — দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করা নারী।
  • হরিহর: স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝে দোলায়মান পিতা।
  • ইন্দির ঠাকরুণ: বৃদ্ধা পিসি — গ্রামবাংলার স্নেহময়ী, অবহেলিত প্রবীণ প্রজন্মের প্রতিনিধি।

প্রকৃতি — উপন্যাসের আরেক নায়ক

পথের পাঁচালীতে প্রকৃতি শুধু পটভূমি নয়, একটি জীবন্ত চরিত্র। বাঁশবনের শনশন শব্দ, বর্ষার মেঘ, শরতের কাশফুল, পুকুরের জলে চাঁদের প্রতিবিম্ব — বিভূতিভূষণ প্রকৃতিকে এমনভাবে বর্ণনা করেছেন, যেন তা গল্পের সমান অংশীদার। অপুর আনন্দের মুহূর্তে প্রকৃতি হাসে, আর দুঃখের মুহূর্তে প্রকৃতিও বিষণ্ণ হয়।

এই প্রকৃতিচেতনা বিভূতিভূষণের লেখার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। তিনি নিজে গ্রামবাংলায় বড় হয়েছিলেন, প্রকৃতিকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। তাই তার বর্ণনায় কৃত্রিমতা নেই — আছে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সত্যতা। পথের পাঁচালী পড়লে মনে হয়, লেখক শুধু গল্প বলছেন না, পাঠককে হাত ধরে গ্রামে ঘুরিয়ে দেখাচ্ছেন।

দারিদ্র্য ও মানবিক মর্যাদা

উপন্যাসের আরেকটি গভীর দিক হলো দারিদ্র্যের চিত্রণ। হরিহরের পরিবার গরিব, কিন্তু তাদের দারিদ্র্য কখনোই কুৎসিত বা করুণার পাত্র হিসেবে দেখানো হয়নি। সর্বজয়া দারিদ্র্যের মধ্যেও মর্যাদা ধরে রাখেন। দুর্গা-অপু গরিব বলেই তাদের শৈশব কম সুন্দর নয়। লেখক দেখিয়েছেন — অভাব থাকতে পারে, কিন্তু মানুষের ভেতরের ঐশ্বর্য, স্নেহ, স্বপ্ন — এগুলো অভাব মাপতে পারে না।

এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই পথের পাঁচালীকে শুধু একটি গ্রামের গল্প থেকে বিশ্বসাহিত্যের মর্যাদায় উন্নীত করেছে। দারিদ্র্য সব দেশে আছে, শৈশব সব দেশে একই রকম সুন্দর — তাই এই গল্প সারা পৃথিবীর পাঠকের হৃদয় ছুঁয়েছে।

চলচ্চিত্র ও বিশ্বখ্যাতি

পথের পাঁচালীর কথা বলতে গেলে সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রের কথা না বললেই নয়। এই উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ছবি দিয়েই সত্যজিৎ বিশ্বচলচ্চিত্রে পা রাখেন, আর বাংলা সাহিত্য পায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। তবে মনে রাখতে হবে — ছবি আর বই দুটি আলাদা শিল্পকর্ম। বইয়ে যে অন্তর্জগৎ, যে প্রকৃতির বর্ণনা, যে ধীর লয় আছে, তা ছবিতে পুরোপুরি ধরা সম্ভব নয়। তাই ছবি দেখে থাকলেও বইটি পড়া জরুরি।

কারা এই বইটি পড়বেন

  • প্রতিটি বাঙালি পাঠক: এটি বাংলা সাহিত্যের মৌলিক পাঠ — না পড়লে সাহিত্যপাঠ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
  • শিশু-কিশোর: অপুর সঙ্গে নিজেদের মিল খুঁজে পাবে, শৈশবকে নতুনভাবে ভালোবাসবে।
  • প্রকৃতিপ্রেমী: গ্রামবাংলার প্রকৃতির এত জীবন্ত বর্ণনা আর কোথাও পাওয়া কঠিন।
  • সাহিত্যের ছাত্র: বাংলা উপন্যাসের আধুনিক ধারার সূচনাপর্ব বুঝতে এই বই অপরিহার্য।
  • প্রবাসী বাঙালি: শিকড়ের টান অনুভব করতে, ফেলে আসা গ্রামের স্মৃতি ফিরে পেতে।

তিনটি খণ্ড — জীবনের তিনটি পর্যায়

পথের পাঁচালী তিনটি খণ্ডে বিভক্ত — বল্লালী বালাই, আম-আঁটির ভেঁপু, আর অক্রূর সংবাদ। এই তিনটি খণ্ড শুধু কাহিনির ভাগ নয়, জীবনের তিনটি পর্যায়ের প্রতীক। প্রথম খণ্ডে শৈশবের নির্মল আনন্দ — খেলাধুলা, কৌতূহল, প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মতা। অপু-দুর্গার দুষ্টুমি, ইন্দির ঠাকরুণের স্নেহ, গ্রামের শান্ত জীবন — এই অংশ পড়লে মনে হয়, পৃথিবীতে কোনো দুঃখ নেই।

দ্বিতীয় খণ্ডে ধীরে ধীরে বাস্তবতা প্রবেশ করে। দারিদ্র্যের চাপ বাড়ে, হরিহরের অনুপস্থিতি সংসারকে কঠিন করে তোলে। শিশুদের খেলার মধ্যেও দুশ্চিন্তার ছায়া পড়ে। এই খণ্ডেই ঘটে সেই মর্মান্তিক ঘটনা, যা উপন্যাসের সুর চিরদিনের জন্য বদলে দেয়। আনন্দ আর বেদনা এখানে পাশাপাশি — যেমন বাস্তব জীবনে। লেখক দেখিয়েছেন, সুখ কখনোই চিরস্থায়ী নয়।

তৃতীয় খণ্ডে বিচ্ছেদ আর নতুন শুরুর গল্প। পরিবার নিশ্চিন্দিপুর ছেড়ে চলে যায় — যে গ্রাম ছিল তাদের সমগ্র পৃথিবী, তা পেছনে ফেলে। কিন্তু শেষে আছে আশা — অপুর চোখে ভবিষ্যতের দিকে তাকানো। এই ত্রিধারা গঠন উপন্যাসকে শুধু গল্প নয়, জীবনেরই প্রতিচ্ছবি করে তুলেছে। প্রতিটি মানুষের জীবনেই এই তিনটি পর্যায় আসে — আনন্দ, সংগ্রাম, আর নতুন শুরু।

সর্বজয়া — বাংলা সাহিত্যের মহান মা

পথের পাঁচালীর আলোচনায় অপু-দুর্গার কথা বেশি হলেও, সর্বজয়া চরিত্রটি সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আদর্শ মায়ের গতানুগতিক ছবি নন — তিনি কঠোর, কখনো কখনো রূঢ়, সন্তানদের বকাঝকা করেন। কিন্তু এই কঠোরতার আড়ালে আছে গভীর ভালোবাসা আর অসহায়ত্ব। দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করা একজন নারীর মানসিক চাপ তার আচরণে ফুটে ওঠে। তিনি দেবী নন — তিনি রক্তমাংসের মানুষ।

দুর্গার মৃত্যুর পর সর্বজয়ার ভেঙে পড়া বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী দৃশ্যগুলোর একটি। যে মা মেয়েকে বকতেন, সেই মা-ই মেয়ের শোকে পাথর হয়ে যান। এই দৃশ্যে বিভূতিভূষণ দেখিয়েছেন — মায়ের ভালোবাসা কতটা গভীর, আর হারানোর বেদনা কতটা অসহনীয়। পাঠকের চোখে জল আসা অস্বাভাবিক নয়।

সর্বজয়ার চরিত্রের মধ্য দিয়ে লেখক গ্রামবাংলার নারীর বাস্তব ছবি এঁকেছেন — যার রাগ আছে, দুঃখ আছে, ভুল আছে — কিন্তু যিনি সংসারকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকেন। এই মানবিকতাই সর্বজয়াকে শুধু একটি চরিত্র নয়, প্রতিটি সংগ্রামী মায়ের প্রতীক করে তুলেছে।

ইন্দির ঠাকরুণ — ভুলে যাওয়া প্রজন্মের গল্প

পথের পাঁচালীর সবচেয়ে করুণ চরিত্র হয়তো ইন্দির ঠাকরুণ — বৃদ্ধা পিসি, যিনি হরিহরের সংসারেই থাকেন, কিন্তু যেন কেউ নন। তার নিজের ঘর নেই, নিজের জায়গা নেই — তিনি আছেন দয়ার ওপর। তবু তার মুখে হাসি, মনে স্নেহ — বিশেষ করে অপু-দুর্গার প্রতি। শিশুদের সঙ্গে তার সম্পর্ক উপন্যাসের সবচেয়ে মধুর দিকগুলোর একটি।

ইন্দির ঠাকরুণের মৃত্যু উপন্যাসের একটি নীরব ট্র্যাজেডি। তিনি মারা যান প্রায় নিঃশব্দে — বাঁশঝাড়ের পাশে, একা। এই মৃত্যুতে কোনো নাটকীয়তা নেই — আছে শুধু জীবনের নির্মম সত্য। সমাজের প্রান্তিক মানুষেরা এভাবেই চলে যান — কেউ খেয়াল করে না। বিভূতিভূষণ এই চরিত্রের মধ্য দিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন — আমরা বয়স্ক, অসহায় মানুষদের সঙ্গে কেমন আচরণ করি?

ইন্দির ঠাকরুণ গ্রামবাংলার সেই প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা ঐতিহ্য বহন করতেন — রূপকথা বলতেন, গান জানতেন, কিন্তু যাদের কোনো অর্থনৈতিক মূল্য ছিল না। আধুনিকতার স্রোতে এই প্রজন্ম হারিয়ে গেছে। তাদের স্মৃতি ধরে রেখেছে শুধু সাহিত্য — আর পথের পাঁচালী সেই স্মৃতির সবচেয়ে সুন্দর সংরক্ষণ।

শেষ কথা

পথের পাঁচালী পড়া শেষ হলে মনে হয়, একটি দীর্ঘ যাত্রা শেষ হলো — যে যাত্রায় আমরা হেসেছি, কেঁদেছি, আর অনেক কিছু শিখেছি। অপু-দুর্গার গল্প শুধু তাদের গল্প নয়, এটি প্রতিটি মানুষের শৈশবের গল্প, প্রতিটি গ্রামের গল্প, আর সবচেয়ে বড় কথা — বেঁচে থাকার গল্প। বিভূতিভূষণ এই একটি বই দিয়েই বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন, আর থাকবেন।

আরও পড়ুন

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।