মূল কন্টেন্টে যান

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনী

October 6, 2026 · Rakibul Hasan · ব্লগ

“পথের পাঁচালী”র স্রষ্টা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের এমন এক লেখক, যিনি প্রকৃতিকে দেখেছেন ঈশ্বরের মতো করে। তাঁর রচনায় বাংলার গ্রাম, অরণ্য, নদী ও আকাশ জীবন্ত হয়ে ওঠে। অপু-দুর্গার কাহিনি শুধু একটি পরিবারের গল্প নয় — এটি বাংলার মাটি ও মানুষের চিরন্তন গল্প। এই নিবন্ধে জানুন এই মহান সাহিত্যিকের জীবন ও কর্মের কথা।

জন্ম ও শৈশব

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৯৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার মুরাতিপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল বারাকপুরের কাছে। পিতা মহানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন সংস্কৃত পণ্ডিত ও কথক — যিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে পুরাণকথা শোনাতেন।

শৈশব থেকেই বিভূতিভূষণ প্রকৃতির সান্নিধ্যে বড় হন। গ্রামের মাঠ, বন, নদী — এইসবই ছিল তাঁর খেলার মাঠ। পিতার মুখে শোনা পুরাণকাহিনি ও প্রকৃতির সান্নিধ্য — দুটোই তাঁর ভবিষ্যৎ সাহিত্যজীবনের ভিত্তি তৈরি করে দেয়। দারিদ্র্যের মধ্যেও তাঁর শৈশব ছিল আনন্দময় — প্রকৃতিই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় সম্পদ।

শিক্ষা ও কর্মজীবন

বিভূতিভূষণ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। কিন্তু চাকরিজীবনে তিনি কখনো স্থির হতে পারেননি। শিক্ষকতা, পত্রিকা সম্পাদনা, এমনকি খনি অঞ্চলে চাকরি — নানা পেশায় তিনি কাজ করেছেন। এই বিচিত্র অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে।

বিহারের ঘাটশিলা অঞ্চলে চাকরি করার সময় তিনি অরণ্যপ্রকৃতির গভীর সান্নিধ্য পান, যা পরবর্তীকালে আরণ্যক উপন্যাসের উপাদান হয়। ভাগলপুরের পথে পথে ঘোরা, আদিবাসী জনপদ দেখা — এইসব অভিজ্ঞতা তাঁর রচনায় অরণ্যের প্রতি গভীর ভালোবাসার জন্ম দেয়।

“পথের পাঁচালী” — অমর সৃষ্টি

১৯২৯ সালে প্রকাশিত পথের পাঁচালী বিভূতিভূষণের শ্রেষ্ঠ কীর্তি এবং বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারের কাহিনি — হরিহর, সর্বজয়া, অপু ও দুর্গা। দুর্গার মৃত্যু বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী দৃশ্যগুলোর একটি।

উপন্যাসটির সবচেয়ে বড় শক্তি এর প্রকৃতিবর্ণনা। বর্ষার মেঘ, শরতের কাশফুল, গ্রামের পথ — সবই এত জীবন্ত যে পাঠক নিজেই যেন নিশ্চিন্দিপুরে হেঁটে বেড়ান। সত্যজিৎ রায় এই উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে বিশ্বখ্যাতি অর্জন করেন। “পথের পাঁচালী” আজ বিশ্বসাহিত্যের সম্পদ।

“অপরাজিত” ও অপুর জীবন

অপরাজিত (১৯৩২) হলো “পথের পাঁচালী”র পরবর্তী পর্ব — অপুর বড় হওয়ার কাহিনি। গ্রাম ছেড়ে শহরে আসা, শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন, বিবাহ ও পিতৃত্ব — অপুর জীবনের এই পর্যায়গুলোতে বিভূতিভূষণ দেখিয়েছেন, কীভাবে গ্রামের ছেলে শহুরে জীবনে নিজেকে খুঁজে পায়।

দুটি উপন্যাস মিলে গঠিত হয় অপু-ত্রয়ীর প্রথম দুটি পর্ব (তৃতীয় পর্ব সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রে)। অপুর চরিত্রে বিভূতিভূষণ এঁকেছেন একজন সংবেদনশীল, কল্পনাপ্রবণ মানুষের প্রতিকৃতি — যিনি প্রকৃতি ও জীবনকে গভীরভাবে ভালোবাসেন।

“আরণ্যক” — অরণ্যের মহাকাব্য

আরণ্যক (১৯৩৯) বিভূতিভূষণের আরেকটি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। বিহারের অরণ্য অঞ্চলে জমি জরিপের কাজে যাওয়া সত্যচরণের কাহিনি। অরণ্য, আদিবাসী জনপদ ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক — এই উপন্যাসের বিষয়।

বিভূতিভূষণ অরণ্যকে দেখেছেন জীবন্ত সত্তা হিসেবে। গাছপালা, পশুপাখি, নদীনালা — সবই তাঁর কাছে ঈশ্বরের প্রকাশ। “আরণ্যক” পড়লে মনে হয়, লেখক শুধু গল্প বলছেন না — তিনি প্রকৃতির স্তোত্র রচনা করছেন। বাংলা সাহিত্যে প্রকৃতি নিয়ে এত গভীর ও ব্যাপক রচনা আর নেই।

অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রচনা

বিভূতিভূষণের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে:

  • মেঘমল্লার — বর্ষা ও প্রকৃতি নিয়ে লেখা।
  • চাঁদের পাহাড় — আফ্রিকার পটভূমিতে লেখা রোমাঞ্চকর উপন্যাস; কিশোর পাঠকের অত্যন্ত প্রিয়। শঙ্করের অভিযান আজও পাঠককে মুগ্ধ করে।
  • আদর্শ হিন্দু হোটেল — হাজারি ঠাকুরের জীবনসংগ্রামের মর্মস্পর্শী কাহিনি।
  • দেবযান, হীরামানিক জ্বলে — আধ্যাত্মিক ও রহস্যময় উপন্যাস।
  • ইছামতী — নদীকেন্দ্রিক উপন্যাস; তাঁর শেষ পর্বের রচনা।

ছোটগল্পেও তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। পুঁইমাচা, তালনবমী, মৌরীফুল — এই গল্পগুলোতে গ্রামবাংলার জীবন্ত চিত্র আছে।

সাহিত্যদর্শন — প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিকতা

বিভূতিভূষণের সাহিত্যদর্শনের মূলে ছিল প্রকৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসা ও আধ্যাত্মিকতা। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃতির মধ্যেই ঈশ্বরের প্রকাশ। তাঁর রচনায় বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গির বদলে আছে এক ধরনের মরমি আনন্দ — জীবনকে তিনি দেখেছেন বিস্ময়ের চোখে।

দারিদ্র্য, দুঃখ, মৃত্যু — সবই তাঁর রচনায় আছে, কিন্তু এর মধ্যে কখনো হতাশা নেই। তিনি বিশ্বাস করতেন, জীবন সুন্দর এবং প্রতিটি মুহূর্তই মূল্যবান। এই আশাবাদী দর্শন তাঁকে অন্য লেখকদের থেকে আলাদা করেছে।

দিনলিপি ও ব্যক্তিজীবন

বিভূতিভূষণ নিয়মিত দিনলিপি লিখতেন, যা পরে প্রকাশিত হয়েছে। এই দিনলিপিগুলো থেকে জানা যায় তাঁর গভীর পাঠাভ্যাস, প্রকৃতিপ্রেম ও আধ্যাত্মিক চিন্তার কথা। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সংবেদনশীল ও নিরহংকারী মানুষ।

ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন সরল ও সৎ। খ্যাতির আকাঙ্ক্ষা তাঁর ছিল না; তিনি লিখতেন নিজের আনন্দের জন্য। ১৯৫০ সালের ১ নভেম্বর ঘাটশিলায় তাঁর মৃত্যু হয় — প্রকৃতির কোলে, যেখানে তিনি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন।

উত্তরাধিকার

বিভূতিভূষণের মৃত্যুর পর তাঁর খ্যাতি আরও বেড়েছে। সত্যজিৎ রায়ের “পথের পাঁচালী” চলচ্চিত্র তাঁকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করে। আজ তিনি বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিকদের একজন হিসেবে স্বীকৃত।

তাঁর রচনা আজও পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। যান্ত্রিক নগরজীবনে ক্লান্ত মানুষ বিভূতিভূষণের বইয়ে খুঁজে পান প্রকৃতির শান্তি ও জীবনের আনন্দ। পরিবেশচেতনার এই যুগে তাঁর প্রকৃতিপ্রেম আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।

“চাঁদের পাহাড়” — রোমাঞ্চের জগৎ

চাঁদের পাহাড় (১৯৩৭) বিভূতিভূষণের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর উপন্যাস। বাঙালি যুবক শঙ্করের আফ্রিকা অভিযানের কাহিনি — যেখানে আছে হিংস্র জন্তু, দুর্গম অরণ্য, আর হীরার খনির সন্ধান। শঙ্করের সঙ্গী আলভারেজ — পর্তুগিজ অভিযাত্রী — যার সঙ্গে শঙ্করের বন্ধুত্ব উপন্যাসের হৃদয়।

এই উপন্যাসের বিশেষত্ব হলো — লেখক নিজে কখনো আফ্রিকা যাননি, তবু বই পড়ে পড়ে তিনি এত নিখুঁত বর্ণনা দিয়েছেন যে পাঠকের মনে হয় তিনি নিজে সেখানে ছিলেন। কিশোর পাঠকের কাছে এই বই অত্যন্ত প্রিয় — শঙ্করের দুঃসাহস প্রতিটি কিশোরকে অনুপ্রাণিত করে। এই উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে।

“আদর্শ হিন্দু হোটেল” — সাধারণ মানুষের মহাকাব্য

আদর্শ হিন্দু হোটেল (১৯৪০) বিভূতিভূষণের অন্যতম মর্মস্পর্শী উপন্যাস। হাজারি ঠাকুর — এক দরিদ্র রাঁধুনি — যার স্বপ্ন নিজের একটি হোটেল খোলার। বছরের পর বছর ধরে সে সঞ্চয় করে, অপমান সহ্য করে, কিন্তু স্বপ্ন ছাড়ে না। শেষ পর্যন্ত তার স্বপ্ন পূরণ হয়।

এই উপন্যাসে বিভূতিভূষণ দেখিয়েছেন, সাধারণ মানুষের স্বপ্নও কত মহৎ হতে পারে। হাজারির সংগ্রাম পড়তে পড়তে পাঠকের চোখে জল আসে — আনন্দের জল। এটি প্রমাণ করে, মহাকাব্যের নায়ক হতে রাজা-মহারাজা হওয়ার দরকার নেই; একজন সামান্য রাঁধুনিও মহাকাব্যের নায়ক হতে পারে।

ছোটগল্পের ভুবন

উপন্যাসের পাশাপাশি ছোটগল্পেও বিভূতিভূষণ ছিলেন অসাধারণ। পুঁইমাচা গল্পে এক দরিদ্র পরিবারের মেয়ে ক্ষেন্তির মৃত্যু — পুঁইশাকের মাচার মতোই তার জীবন অকালে ঝরে যায়। এই গল্প পড়ে পাঠকের হৃদয় ভেঙে যায়। তালনবমীতে গ্রামের উৎসবের আনন্দময় চিত্র আছে।

তাঁর গল্পগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো — ছোট ঘটনার মধ্যে বড় জীবন। একটি পুঁইমাচা, একটি তালগাছ, একটি মৌরীফুলের গাছ — এইসব সাধারণ জিনিসকে কেন্দ্র করে তিনি গড়ে তোলেন অসাধারণ কাহিনি। তাঁর গল্প পড়লে মনে হয়, জীবনের প্রতিটি কোণেই কবিতা লুকিয়ে আছে — শুধু দেখার চোখ থাকতে হয়।

প্রকৃতিদর্শন — বিভূতিভূষণের দর্শন

বিভূতিভূষণের সাহিত্যের মূলে আছে এক গভীর প্রকৃতিদর্শন। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃতি হলো ঈশ্বরের সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ। গাছপালা, নদীনালা, পশুপাখি — সবকিছুর মধ্যেই তিনি ঈশ্বরকে দেখতেন। এই দর্শন তাঁকে শুধু লেখক নয়, একজন মরমি সাধকের মর্যাদা দিয়েছে।

তাঁর রচনায় প্রকৃতি কখনো শুধু পটভূমি নয় — প্রকৃতি নিজেই একটি চরিত্র। “আরণ্যক”এ অরণ্য যেন জীবন্ত মানুষের মতো কথা বলে। “পথের পাঁচালী”তে বর্ষার মেঘ, শরতের কাশফুল — সবই কাহিনির অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজকের পরিবেশ-সচেতন যুগে বিভূতিভূষণের এই প্রকৃতিপ্রেম আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তিনি ছিলেন প্রকৃতির পূজারি — আর তাঁর সাহিত্য সেই পূজারই ফুল।

বিভূতিভূষণের দিনলিপি — লেখকের অন্তর্জগৎ

বিভূতিভূষণ নিয়মিত দিনলিপি লিখতেন — যা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম মূল্যবান দলিল। এই দিনলিপিগুলোতে ফুটে উঠেছে তাঁর গভীর পাঠাভ্যাস, প্রকৃতিপ্রেম, আধ্যাত্মিক চিন্তা ও দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটি। তিনি কী বই পড়ছেন, কী ভাবছেন, প্রকৃতিতে কী দেখছেন — সবই তিনি লিখে রাখতেন।

দিনলিপি থেকে জানা যায়, তিনি ছিলেন অত্যন্ত সংবেদনশীল মানুষ। একটি ফুল ফোটা, একটি পাখির ডাক — এইসব ছোট ঘটনাও তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিত। তিনি বিশ্বাস করতেন, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই মূল্যবান এবং প্রতিটি মুহূর্তেই ঈশ্বরের প্রকাশ আছে। এই দর্শন তাঁর সাহিত্যেরও মূল দর্শন।

তাঁর দিনলিপি পড়লে মনে হয়, তিনি শুধু লেখক ছিলেন না — তিনি ছিলেন জীবনের ছাত্র। প্রতিদিন তিনি নতুন কিছু শিখতেন, নতুন কিছু অনুভব করতেন। এই নিরন্তর শেখার মানসিকতাই তাঁর সাহিত্যকে চিরসতেজ রেখেছে। নতুন লেখকদের জন্য তাঁর দিনলিপি একটি আদর্শ পাঠ — কীভাবে জীবনকে দেখতে হয়, কীভাবে লিখতে হয়।

উপসংহার

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় শিখিয়েছেন, সাহিত্যের সবচেয়ে বড় বিষয় হলো জীবন নিজে — আর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর রূপ হলো প্রকৃতি। নতুন পাঠকদের জন্য পরামর্শ — পথের পাঁচালী দিয়ে শুরু করুন, তারপর পড়ুন আরণ্যক ও চাঁদের পাহাড়। বিভূতিভূষণের জগতে প্রবেশ করা মানে প্রকৃতির কোলে ফিরে যাওয়া — যেখানে জীবন এখনো সহজ, সুন্দর ও অর্থপূর্ণ।

আরও পড়ুন

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।