হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট চরিত্রগুলোর মধ্যে হিমু সবচেয়ে রহস্যময় ও জনপ্রিয়। খালি পায়ে ঢাকার রাস্তায় হাঁটা, হলুদ পাঞ্জাবি পরা এই যুবক মহাপুরুষ হওয়ার সাধনা করে — বাবার শেখানো পথে। হিমু সিরিজের বইগুলো পড়তে গিয়ে নতুন পাঠকদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন — কোন বই আগে পড়ব? প্রকাশের ক্রম অনুযায়ী পড়াই সবচেয়ে নিরাপদ ও আনন্দদায়ক, কারণ চরিত্রগুলোর বিকাশ ধারাবাহিকভাবে ঘটেছে।
এই নিবন্ধে হিমু সিরিজের মূল উপন্যাসগুলোর প্রকাশ-ক্রম অনুযায়ী সঠিক তালিকা, প্রতিটি বইয়ের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি এবং নতুন পাঠকদের জন্য পরামর্শ দেওয়া হলো।
হিমু চরিত্রের সংক্ষিপ্ত পরিচয়
হিমুর পুরো নাম হিমালয় — বাবার দেওয়া নাম। হিমুর বাবা ছিলেন একজন মনোবিজ্ঞানী ধরনের মানুষ, যিনি ছেলেকে “মহাপুরুষ” বানানোর পরীক্ষা চালিয়েছিলেন শৈশব থেকেই। মা মারা যান হিমুর ছোটবেলায়। বাবার মৃত্যুর পর হিমু সেই সাধনা চালিয়ে যায় — সংসার, চাকরি, স্বাভাবিক জীবন — সব ত্যাগ করে। তার জীবনদর্শন: মহাপুরুষদের কোনো মায়া থাকতে নেই, কোনো বন্ধন থাকতে নেই।
হিমুর চারপাশে ঘোরে কিছু স্থায়ী চরিত্র — খালাতো বোন রূপা, যার সঙ্গে হিমুর অসমাপ্ত প্রেম; মাজেদা খালা; বন্ধু-বান্ধব; আর পুলিশসহ নানা বিচিত্র মানুষ। প্রতিটি উপন্যাসে হিমু কোনো না কোনো রহস্য বা মানবিক সংকটে জড়িয়ে পড়ে, এবং তার অদ্ভুত যুক্তি ও অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে সেগুলোর সমাধান করে।
পড়ার সঠিক ক্রম: মূল সিরিজ
হিমুর মূল উপন্যাস ২২টি। প্রকাশের সাল অনুযায়ী ক্রম নিচে দেওয়া হলো:
- ময়ূরাক্ষী (১৯৯০): সিরিজের প্রথম বই। এখানেই হিমুর সঙ্গে পাঠকের প্রথম পরিচয় — তার বাবার মহাপুরুষ-বানানোর পরীক্ষা, তার দর্শন, রূপা ও মাজেদা খালার আবির্ভাব। হিমু-জগতে প্রবেশের জন্য অবশ্যপাঠ্য সূচনা।
- দরজার ওপাশে (১৯৯২): দ্বিতীয় পর্বে হিমু তার এক বন্ধুর চাকরি বরখাস্ত হওয়া ঠেকাতে এগিয়ে আসে। বন্ধুত্ব ও মানবিক দায়বোধের গল্পে হিমুর চরিত্র আরও গভীর হয়।
- হিমু (১৯৯৩): সিরিজের তৃতীয় বই, যার নামেই চরিত্রের নাম। এখানে হিমুর দৈনন্দিন জীবন, তার বিচিত্র কর্মকাণ্ড ও দর্শনের আরও বিস্তৃত প্রকাশ ঘটে।
- পারাপার (১৯৯৪): “পারাপার” অর্থ পার হওয়া — এই উপন্যাসে হিমু জীবনের এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে দাঁড়ায়, যেখানে তাকে বেছে নিতে হয় পথ।
- এবং হিমু… (১৯৯৫): ধারাবাহিকতার পঞ্চম কিস্তি। হিমুর রহস্যময়তা এখানে আরও ঘনীভূত; পাঠক বুঝতে শুরু করে, হিমুকে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়।
- হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম (১৯৯৬): নীলপদ্মের প্রতীকী ব্যবহারে সমৃদ্ধ এই বইয়ে হিমুর কোমল ও কাব্যিক দিকটি উঠে আসে।
- হিমুর দ্বিতীয় প্রহর (১৯৯৭): দিনের দ্বিতীয় প্রহরের মতোই এই উপন্যাসে হিমুর জীবনে নতুন ঘটনার সূত্রপাত ঘটে।
- হিমুর রূপালী রাত্রি (১৯৯৮): রাতের পটভূমিতে হিমুর বিচরণ; রহস্য ও মানবিকতার মিশেলে গড়া কাহিনি।
- একজন হিমু কয়েকটি ঝিঁ ঝিঁ পোকা (১৯৯৯): শিরোনামেই হুমায়ূন আহমেদের চিরচেনা রসবোধ। ছোট ছোট ঘটনার মধ্য দিয়ে হিমুর জগৎ আরও বিস্তৃত হয়।
- তোমাদের এই নগরে (২০০০): ঢাকা শহর এই উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র। নগরজীবনের বিচ্ছিন্নতা ও হিমুর তাতে ভাসমান উপস্থিতি — দুটোই এখানে প্রখর।
- চলে যায় বসন্তের দিন (২০০২): সময়ের প্রবাহ ও হারিয়ে যাওয়ার বেদনা এই বইয়ের মূল সুর। হিমুর জীবনেও বসন্তের দিন ফুরিয়ে আসার ইঙ্গিত।
- সে আসে ধীরে (২০০৩): ধীরলয়ে এগোনো কাহিনিতে রহস্যের উন্মোচন ঘটে হিমুর স্বভাবসুলভ ঠান্ডা মাথায়।
- আঙ্গুল কাটা জগলু (২০০৫): জগলু নামের বিচিত্র চরিত্রের আবির্ভাব। অপরাধজগতের ছায়া ও হিমুর নৈতিক অবস্থানের সংঘাত এই বইয়ের কেন্দ্রে।
- হলুদ হিমু কালো র্যাব (২০০৬): সিরিজের অন্যতম আলোচিত বই। র্যাবের হাতে আটক হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রক্ষমতা বনাম ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন ওঠে।
- আজ হিমুর বিয়ে (২০০৭): হিমুর বিয়ে! মহাপুরুষ-সাধকের জীবনে বিয়ের প্রসঙ্গ আসায় পাঠকদের মধ্যে তুমুল কৌতূহল তৈরি হয়েছিল। পরিণতি জানতে বইটি পড়তেই হবে।
- হিমু রিমান্ডে (২০০৮): আগের বইয়ের ঘটনার ধারাবাহিকতায় রিমান্ডের অভিজ্ঞতা। হিমুর নির্লিপ্ততা এখানে চরম পরীক্ষার মুখে পড়ে।
- ময়ূরাক্ষীর তীরে (২০০৯): প্রথম বইয়ের নামের সঙ্গে মিল রেখে লেখা এই উপন্যাসে হিমু ময়ূরাক্ষী নদীর তীরে ফিরে যায় — যেন বৃত্ত পূর্ণ হয়।
- হিমুর মধ্যদুপুর (২০০৯): জীবনের মধ্যদুপুরে দাঁড়িয়ে হিমুর আত্মজিজ্ঞাসা। সিরিজের পরিণত পর্বের সূচনা।
- হিমুর নীল জোছনা (২০১০): জোছনা-রাতের পটভূমিতে হিমুর কাব্যিক ও দার্শনিক দিকের প্রতিফলন।
- হিমুর আছে জল (২০১১): তৃষ্ণা ও পরিতৃপ্তির রূপক নিয়ে গড়া কাহিনি; হিমুর দর্শনের আরও এক স্তর উন্মোচিত হয়।
- হিমু এবং একটি রাশিয়ান পরী (২০১১): বিদেশি চরিত্রের আগমনে হিমুর জগতে নতুন মাত্রা। সংস্কৃতির সংঘাত ও মানবিক সংযোগের গল্প।
- হিমু এবং হার্ভার্ড পিএইচডি বল্টু ভাই (২০১১): লেখকের জীবদ্দশায় প্রকাশিত শেষ হিমু উপন্যাস। শিক্ষিত-অশিক্ষিতের দ্বন্দ্বকে হাস্যরসে মুড়ে উপস্থাপন করা হয়েছে।
সহযোগী ও পার্শ্ববই
মূল ২২টি উপন্যাসের বাইরে হিমু-জগতের আরও কিছু বই আছে, যেগুলো মূল ধারাবাহিকতার অংশ না হলেও পাঠকের জন্য মূল্যবান:
- হিমুর বাবার কথামালা (২০০৯): হিমুর বাবার দর্শন ও মহাপুরুষ-তত্ত্বের সরাসরি ব্যাখ্যা। হিমুকে বুঝতে চাইলে এই বই অপরিহার্য।
- হিমু মামা (২০০৪): ছোটদের জন্য লেখা হিমুকেন্দ্রিক বই।
- হিমুর একান্ত সাক্ষাৎকার ও অন্যান্য (২০০৮): সাক্ষাৎকার ও বিবিধ লেখার সংকলন।
নতুন পাঠকের জন্য পরামর্শ
হিমু সিরিজ পড়ার সময় কয়েকটি বিষয় মনে রাখলে আনন্দ দ্বিগুণ হবে:
- ক্রম মেনে পড়ুন: প্রতিটি বই স্বতন্ত্রভাবে পড়া যায়, কিন্তু রূপা, মাজেদা খালা ও অন্যান্য চরিত্রের সম্পর্ক বুঝতে প্রকাশ-ক্রম অনুসরণ করাই ভালো।
- ময়ূরাক্ষী দিয়ে শুরু করুন: কোনোভাবেই মাঝখান থেকে শুরু করবেন না। প্রথম বইটিই হিমুর দর্শনের ভিত্তি তৈরি করে দেয়।
- হিমুর বাবার কথামালা মাঝামাঝি পড়ুন: ৫-৬টি মূল বই পড়ার পর এই বইটি পড়লে হিমুর আচরণের পেছনের যুক্তি পরিষ্কার হবে।
- তাড়াহুড়ো করবেন না: হিমুর বইগুলো একটানা গল্পের বই নয়; প্রতিটি বইয়ের পর একটু থেমে ভাবুন। হুমায়ূন আহমেদের সংলাপ ও পরিস্থিতির রস তাড়াহুড়োয় ধরা পড়ে না।
- তুলনা এড়িয়ে চলুন: মিসির আলি যুক্তিবাদী, হিমু অন্তর্জ্ঞানবাদী — দুজনকে এক মাপকাঠিতে মাপবেন না।
হিমু সিরিজ শুধু বিনোদন নয়; এটি জীবন, মায়া, ত্যাগ ও স্বাধীনতা নিয়ে এক দীর্ঘ দার্শনিক সংলাপ। সঠিক ক্রমে পড়লে এই সংলাপের পূর্ণ স্বাদ পাওয়া যায় — শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হিমুর সঙ্গে হাঁটার মতো।
হিমুর দর্শন: মহাপুরুষতত্ত্ব
হিমুকে বুঝতে হলে তার বাবাকে বুঝতে হবে। হিমুর বাবা বিশ্বাস করতেন — মহাপুরুষ তৈরি করা যায়, যদি শৈশব থেকেই সঠিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তাঁর “পাঠ্যক্রম” ছিল অদ্ভুত: ছেলেকে কষ্ট দেওয়া, যাতে সে কষ্টকে জয় করতে শেখে; তাকে বিভ্রান্ত করা, যাতে সে সত্য খুঁজতে শেখে; তাকে একা ছেড়ে দেওয়া, যাতে সে নির্ভরশীলতা ত্যাগ করে।
এই প্রশিক্ষণের মূলনীতি কয়েকটি:
- মায়া ত্যাগ: মহাপুরুষের কোনো বন্ধন থাকতে নেই — না পরিবারের, না সম্পদের, না খ্যাতির। হিমু তাই সংসার করে না, চাকরি করে না, সঞ্চয় করে না।
- প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মতা: খালি পায়ে হাঁটা, রোদ-বৃষ্টি সহ্য করা — শরীরকে প্রকৃতির অংশ মনে করা। হলুদ পাঞ্জাবি তার “ইউনিফর্ম” — সরলতা ও দৃশ্যমানতার প্রতীক।
- অন্তর্দৃষ্টির চর্চা: যুক্তির বাইরে গিয়ে মানুষের মন পড়া, ভবিষ্যৎ আঁচ করা। হিমুর “অলৌকিক” ক্ষমতার অনেকটাই গভীর পর্যবেক্ষণ ও মানব-মনস্তত্ত্বের জ্ঞান।
- নিয়তির প্রতি সমর্পণ: হিমু পরিকল্পনা করে না; সে স্রোতে ভাসে। তার বিশ্বাস — যা হওয়ার তা হবেই; মানুষের কাজ শুধু সাক্ষী থাকা।
এই দর্শন হিন্দু সন্ন্যাস-ঐতিহ্য, বৌদ্ধ বৈরাগ্য ও সুফি ফকিরি — তিনটি ধারারই ছায়া বহন করে। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ তাকে আধুনিক ঢাকার পটভূমিতে স্থাপন করে একেবারে মৌলিক চরিত্র তৈরি করেছেন।
মিসির আলি বনাম হিমু: দুই মেরুর দুই নায়ক
হুমায়ূন আহমেদের দুই বিখ্যাত চরিত্র — মিসির আলি ও হিমু — পরস্পরের বিপরীত। মিসির আলি যুক্তিবাদী; তিনি প্রতিটি রহস্যের যৌক্তিক ব্যাখ্যা খোঁজেন। হিমু অন্তর্জ্ঞানবাদী; সে যুক্তির বাইরের সত্যে বিশ্বাস করে। মিসির আলি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সমাজের অংশ; হিমু সমাজের বাইরে, প্রান্তিক।
মজার ব্যাপার — দুজনেই সত্য-সন্ধানী, কিন্তু পথ আলাদা। মিসির আলি প্রমাণ চান; হিমু অনুভব করেন। পাঠকদের মধ্যে এই নিয়ে চিরন্তন বিতর্ক — কে বেশি প্রিয়? এই বিতর্কই প্রমাণ করে, হুমায়ূন আহমেদ দুটি পূর্ণাঙ্গ দার্শনিক জগৎ তৈরি করতে পেরেছিলেন। হিমু সিরিজ পড়ার সময় এই তুলনাটি মাথায় রাখলে পাঠ-অভিজ্ঞতা আরও সমৃদ্ধ হয়।
হিমুর সাংস্কৃতিক প্রভাব
হিমু শুধু বইয়ের চরিত্র নয়; সে বাংলাদেশের যুবসংস্কৃতির অংশ। হলুদ পাঞ্জাবি পরে খালি পায়ে হাঁটা — অনেক তরুণের কাছে এটি প্রতিবাদের ভাষা, সরল জীবনের ঘোষণা। হিমুর সংলাপ (“মহাপুরুষদের…”, “মায়া…”) দৈনন্দিন আলাপে ঢুকে গেছে।
হিমুকে নিয়ে পাঠকদের মধ্যে নানা কল্পনা-আলোচনা চলে — হিমু কি আসলেই মহাপুরুষ? তার ক্ষমতা কি বাস্তব? রূপার সঙ্গে তার সম্পর্কের পরিণতি কী? লেখক ইচ্ছে করেই অনেক প্রশ্নের উত্তর দেননি; এই অসমাপ্ততাই হিমুকে জীবন্ত রেখেছে। প্রতিটি পাঠক নিজের মতো করে হিমুকে সম্পূর্ণ করে।
হিমু সিরিজের আরেকটি অবদান — এটি প্রমাণ করেছে, দার্শনিক উপন্যাসও জনপ্রিয় হতে পারে। গভীর জীবনজিজ্ঞাসা আর সহজপাঠ্য গল্প — এই দুয়ের মিলন হুমায়ূন আহমেদের হাতে যেভাবে ঘটেছে, তা বাংলা সাহিত্যে বিরল। তাই হিমু সিরিজ শুধু বিনোদন নয়; এটি বাংলাদেশের পাঠক-সংস্কৃতির একটি অধ্যায়।