মূল কন্টেন্টে যান
জহির রায়হান

জহির রায়হান

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

বিষয় তথ্য
পূর্ণ নাম মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ খান (জহির রায়হান)
জন্ম ১৯ আগস্ট ১৯৩৫
জন্মস্থান মজুপুর, সোনাগাজি, ফেনী (তৎকালীন নোয়াখালী জেলা), বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত
নিখোঁজ ৩০ জানুয়ারি ১৯৭২, মিরপুর, ঢাকা (দেহাবশেষ উদ্ধার হয়নি; আনুষ্ঠানিকভাবে নিখোঁজ)
জাতীয়তা বাংলাদেশি
পেশা ঔপন্যাসিক, গল্পকার, সাংবাদিক, চলচ্চিত্র পরিচালক
শিক্ষা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় — বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (১৯৫৮) ও স্নাতকোত্তর
উল্লেখযোগ্য কর্ম উপন্যাস — শেষ বিকেলের মেয়ে, হাজার বছর ধরে, আরেক ফাল্গুন, বরফ গলা নদী; চলচ্চিত্র — কখনো আসেনি, কাঁচের দেয়াল, সঙ্গম, জীবন থেকে নেয়া; প্রামাণ্যচিত্র — স্টপ জেনোসাইড
পুরস্কার আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৪); বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭২, মরণোত্তর); একুশে পদক (১৯৭৭, মরণোত্তর); স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৯২, মরণোত্তর)

পরিচিতি

জহির রায়হান (১৯ আগস্ট ১৯৩৫ – ৩০ জানুয়ারি ১৯৭২) ছিলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক, গল্পকার, সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা। মাত্র ছত্রিশ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি বাংলা সাহিত্য ও চলচ্চিত্র — দুই অঙ্গনেই অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। হাজার বছর ধরে, আরেক ফাল্গুন-এর মতো উপন্যাসের রচয়িতা হিসেবে তিনি যেমন পাঠকের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন, তেমনি জীবন থেকে নেয়া ও মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্যচিত্র স্টপ জেনোসাইড-এর নির্মাতা হিসেবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র-ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারের খোঁজে মিরপুর গিয়ে তিনি নিখোঁজ হন; তার দেহাবশেষ আর কখনো পাওয়া যায়নি।

জন্ম ও শৈশব

১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট তৎকালীন নোয়াখালী জেলার (বর্তমান ফেনী জেলার সোনাগাজি উপজেলার) মজুপুর গ্রামে জহির রায়হানের জন্ম। তার প্রকৃত নাম মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ খান; পরবর্তীতে ‘জহির রায়হান’ নামেই তিনি পরিচিতি পান। বাবা মাওলানা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ ছিলেন কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যাপক ও পরে ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ; মা সৈয়দা সুফিয়া খাতুন। বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সার ছিলেন খ্যাতিমান লেখক ও সাংবাদিক। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর পরিবারের সঙ্গে কলকাতা থেকে গ্রামে ফিরে আসেন তিনি।

শিক্ষাজীবন

কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার অ্যাংলো-পার্সিয়ান বিভাগে তার পড়াশোনা শুরু হলেও দেশবিভাগে তা ব্যাহত হয়। ফেনীর আমিরাবাদ স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (১৯৫৮) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ছাত্রজীবনেই তিনি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিলেন — ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক আমতলা সমাবেশে তিনি উপস্থিত ছিলেন এবং সেদিন গ্রেপ্তার হওয়া প্রথম দলের মধ্যে ছিলেন। পরে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানেও তিনি অংশ নেন।

সাংবাদিকতা

সাহিত্যের পাশাপাশি ১৯৫০ সালে ‘যুগের আলো’ পত্রিকায় যোগ দিয়ে সাংবাদিকতা শুরু করেন জহির রায়হান। পরে তিনি ‘খাপছাড়া’, ‘যান্ত্রিক’ ও ‘সিনেমা’ পত্রিকায় কাজ করেন এবং ১৯৫৬ সালে ‘প্রবাহ’ পত্রিকার সম্পাদক হন।

সাহিত্যজীবন

১৯৫৫ সালে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সূর্যগ্রহণ’ প্রকাশিত হয়। প্রথম উপন্যাস ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’ প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালে। ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসের জন্য ১৯৬৪ সালে তিনি আদমজী সাহিত্য পুরস্কার পান — গ্রামীণ জীবনের এই মহাকাব্যিক চিত্রণ বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলোর একটি হিসেবে গণ্য হয়। ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত ‘আরেক ফাল্গুন’ তার আরেকটি কালজয়ী উপন্যাস। তার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে আছে ‘বরফ গলা নদী’, ‘আর কতদিন’, ‘তৃষ্ণা’, ‘কয়েকটি মৃত্যু’ ও ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’; ছোটগল্পের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘একুশের গল্প’, ‘সোনার হরিণ’ ও ‘সময়ের প্রয়োজনে’।

চলচ্চিত্রজীবন

১৯৫৭ সালে উর্দু ছবি ‘জাগো হুয়া সাভেরা’-তে সহকারী পরিচালক হিসেবে চলচ্চিত্রজগতে তার পদার্পণ ঘটে; সালাউদ্দীনের ‘যে নদী মরুপথে’-তেও সহকারী হিসেবে কাজ করেন এবং এহতেশামের ‘এ দেশ তোমার আমার’ ছবির নামসঙ্গীত রচনা করেন। ১৯৬১ সালে ‘কখনো আসেনি’ দিয়ে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৬৩ সালের ‘কাঁচের দেয়াল’-এর জন্য তিনি নিগার পুরস্কার পান। ১৯৬৪ সালে নির্মাণ করেন পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র ‘সঙ্গম’ (উর্দু), আর পরের বছর প্রথম সিনেমাস্কোপ ছবি ‘বাহানা’। অন্যান্য ছবির মধ্যে আছে ‘বেহুলা’ (১৯৬৬), ‘আনোয়ারা’ (১৯৬৭) এবং ১৯৭০ সালের ‘জীবন থেকে নেয়া’ — সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে রূপকধর্মী এই রাজনৈতিক ছবি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক আলোড়ন তোলে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি কলকাতায় চলে যান। অসমাপ্ত ইংরেজি ছবি ‘লেট দেয়ার বি লাইট’-এর কাজ বন্ধ রেখে তিনি নির্মাণ করেন প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’ — পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার এই দলিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়া ‘এ স্টেট ইজ বর্ন’ প্রামাণ্যচিত্রও তিনি নির্মাণ করেন। কলকাতায় ‘জীবন থেকে নেয়া’-র প্রদর্শনী দেখে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন ও তপন সিংহ ভূয়সী প্রশংসা করেন; চরম অর্থকষ্টের মধ্যেও প্রদর্শনী থেকে পাওয়া পুরো অর্থ তিনি মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করে দেন।

ব্যক্তিগত জীবন

জহির রায়হান দুবার বিয়ে করেন — দুজনেই ছিলেন সে সময়ের খ্যাতিমান চলচ্চিত্র অভিনেত্রী। ১৯৬১ সালে তিনি সুমিতা দেবীকে বিয়ে করেন; ১৯৬৮ সালে তাদের বিচ্ছেদ হয়। এই সংসারে তার দুই পুত্র — বিপুল রায়হান ও অনল রায়হান। দ্বিতীয় বিয়ে করেন অভিনেত্রী সুচন্দাকে (বিয়ের সাল বিভিন্ন সূত্রে ১৯৬৬ বা ১৯৬৮ উল্লিখিত); তাদের দুই পুত্র আরাফাত রায়হান (অপু) ও তপু রায়হান।

পুরস্কার ও সম্মাননা

  • আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৪) — হাজার বছর ধরে
  • নিগার পুরস্কার — কাঁচের দেয়াল (সূত্রভেদে ১৯৬৪/১৯৬৫)
  • বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭২, মরণোত্তর)
  • বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার — বিশেষ পুরস্কার (১৯৭৫, মরণোত্তর)
  • একুশে পদক (১৯৭৭, মরণোত্তর)
  • স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৯২, মরণোত্তর)
  • বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার — শ্রেষ্ঠ কাহিনিকার (২০০৫, হাজার বছর ধরে ছবির জন্য, মরণোত্তর)

নিখোঁজ ও উত্তরাধিকার

১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর জহির রায়হান ঢাকায় ফিরে আসেন। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিনগুলোতে নিখোঁজ হওয়া বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে মিরপুরে আটকে রাখা হয়েছে — এমন খবর পেয়ে ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি সকালে তিনি মিরপুরের দিকে রওনা দেন। মিরপুরের ১২ নম্বর সেকশনে পাকিস্তানি সেনা ও তাদের সহযোগীদের গুলিবর্ষণে তিনি নিহত হন বলে দাবি করা হয়; কিন্তু তার লাশ কখনো পাওয়া যায়নি — আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি আজও ‘নিখোঁজ’। উল্লেখ্য, নিখোঁজ হওয়ার আগে তিনি বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের তদন্তে একটি কমিটি গঠন করেছিলেন; পান্না কায়সারের ‘মুক্তিযুদ্ধ: আগে ও পরে’ গ্রন্থে দাবি করা হয়েছে, এই তদন্তের সূত্র ধরেই তার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও সাহিত্যে জহির রায়হান কিংবদন্তিতুল্য ব্যক্তিত্ব। তার নামে ঢাকায় রাস্তার নামকরণ হয়েছে, জহির রায়হান ফিল্ম সোসাইটি তার স্মৃতি ধরে রেখেছে, এবং প্রতি বছর তার জন্ম ও নিখোঁজ দিবসে স্মরণানুষ্ঠান হয়।

প্রোফাইল ছবি: Wikimedia Commons (Public domain)

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।