মূল কন্টেন্টে যান
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

এক নজরে

বিষয় তথ্য
পূর্ণ নাম সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ
ইংরেজি নাম Syed Waliullah
জন্ম ১৫ আগস্ট ১৯২২
জন্মস্থান শোলাশহর, চট্টগ্রাম (তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত)
মৃত্যু ১০ অক্টোবর ১৯৭১, ম্যদোঁ, প্যারিস, ফ্রান্স
জাতীয়তা বাংলাদেশি
পেশা ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, সংবাদ সম্পাদক
শিক্ষা আনন্দমোহন কলেজ, ময়মনসিংহ (বিএ, ১৯৪৩); কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (এমএ অসমাপ্ত)
উল্লেখযোগ্য কর্ম লালসালু (১৯৪৮), চাঁদের অমাবস্যা (১৯৬৪), কাঁদো নদী কাঁদো (১৯৬৮), বহিপীর (১৯৬০), নয়নচারা (১৯৫১)
পুরস্কার বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬১), একুশে পদক (১৯৮৪, মরণোত্তর)

পরিচিতি

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (১৫ আগস্ট ১৯২২ – ১০ অক্টোবর ১৯৭১) বাংলাদেশের আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম প্রধান ঔপন্যাসিক, গল্পকার ও নাট্যকার। তার প্রথম উপন্যাস লালসালু (১৯৪৮) আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ক্লাসিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। চরিত্রের মনস্তত্ত্বের অস্তিত্ববাদী বিশ্লেষণ ও সামাজিক-মানসিক দ্বন্দ্বের মূলোৎপাটনমূলক চিত্রণে তিনি বাংলাদেশের সাহিত্যে অগ্রদূত হিসেবে বিবেচিত হন। চাঁদের অমাবস্যা ও কাঁদো নদী কাঁদো উপন্যাসে চরিত্রের অন্তর্জগৎ উন্মোচনে তার দক্ষতা পূর্ণরূপে প্রকাশ পায়।

জন্ম ও শিক্ষা

১৯২২ সালের ১৫ আগস্ট চট্টগ্রামের শোলাশহরে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর জন্ম। বাবা সৈয়দ আহমাদুল্লাহ ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা (ব্রিটিশ আমলের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট); মা নাসিম আরা খাতুন। বাবা মারা যান যখন ওয়ালীউল্লাহর বয়স বারো। বাবার বদলির চাকরির সুবাদে ময়মনসিংহ, ফেনী, কৃষ্ণনগর ও কুড়িগ্রামে কেটেছে তার শৈশব — ময়মনসিংহে বসবাসকালে লাল কাপড়ে ঢাকা একটি মাজার প্রায়ই তার চোখে পড়ত, যা পরবর্তীতে লালসালু উপন্যাসের অনুপ্রেরণা হয়। তিনি ১৯৩৯ সালে কুড়িগ্রাম হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, ১৯৪১ সালে ঢাকা কলেজ থেকে আইএ এবং ১৯৪৩ সালে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ থেকে স্নাতক পাস করেন। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে এমএ করতে ভর্তি হলেও বাবার অকালমৃত্যুর কারণে তা সম্পন্ন করতে পারেননি।

কর্মজীবন

শিক্ষাজীবন শেষে তিনি কলকাতার দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকায় ১৯৪৫–১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কাজ করেন। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে ঢাকায় এসে রেডিও পাকিস্তানে সহকারী সংবাদ সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন; ১৯৫০ সালে তাকে করাচিতে বদলি করা হয়। ১৯৫১ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত তিনি নয়াদিল্লি, সিডনি, জাকার্তা ও লন্ডনে পাকিস্তান মিশনের প্রেস অ্যাটাশে হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬০ সালে প্যারিসে পাকিস্তান দূতাবাসের প্রথম সচিব নিযুক্ত হন; ১৯৬৭ সালে তিনি প্যারিসে ইউনেস্কোতে যোগ দেন।

সাহিত্যজীবন

ওয়ালীউল্লাহর প্রথম প্রকাশিত গল্প ছাত্রজীবনেই বেরিয়েছিল; তবে তাকে খ্যাতির শীর্ষে তোলে প্রথম উপন্যাস লালসালু (১৯৪৮)। উপন্যাসের নায়ক মজিদ — দরিদ্র, ধর্মভীরু পটভূমির এক চতুর যুবক, যে এক প্রত্যন্ত গ্রামে এসে একটি পুরনো কবরকে পীরের মাজার ঘোষণা করে লালসালু দিয়ে ঢেকে দেয় এবং কথিত সাধুর প্রতিফলিত ক্ষমতা ব্যবহার করে গ্রামবাসীর জীবনে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। ধর্মীয় কুসংস্কার, ক্ষমতার লোভ ও মানুষের দুর্বলতার এই তীক্ষ্ণ চিত্রণ বাংলা সাহিত্যে অনন্য। উপন্যাসটি তিনি নিজেই ইংরেজিতে Tree Without Roots নামে রূপান্তর করেন; ২০০১ সালে তানভীর মোকাম্মেল একই নামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।

তার অন্য দুটি উপন্যাস — চাঁদের অমাবস্যা (১৯৬৪) ও কাঁদো নদী কাঁদো (১৯৬৮) — চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও অস্তিত্বের সংকটের গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের জন্য প্রশংসিত। এছাড়া ইংরেজিতে লেখা The Ugly Asian (১৯৫৯) তার একটি উপন্যাস। নাটক হিসেবে বহিপীর (১৯৬০; ১৯৫৫ সালে ঢাকায় আন্তর্জাতিক পেন ক্লাব সম্মেলনে পুরস্কৃত), তরঙ্গভঙ্গ ও সুড়ঙ্গ উল্লেখযোগ্য। গল্পগ্রন্থ নয়নচারা (১৯৫১) ও দুই তীর ও অন্যান্য গল্প (১৯৬৫) বাংলা ছোটগল্পে তার স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করে। (কিছু সূত্রে চাঁদের অমাবস্যা ১৯৬৩ ও কাঁদো নদী কাঁদো ১৯৬৬ সালও উল্লেখ আছে।)

ব্যক্তিগত জীবন

সিডনিতে কর্মরত অবস্থায় ফরাসি নারী অ্যান-মারি থিবোর (১৯২৯–১৯৯৭) সঙ্গে তার পরিচয় হয়; ১৯৫৫ সালে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই দম্পতির দুই সন্তান — সিমিন ও ইরাজ। অ্যান-মারি পরবর্তীতে লালসালু ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করেন। তিনি ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানী ও গণিতবিদ জামাল নজরুল ইসলামের চাচাতো ভাই।

পুরস্কার ও সম্মাননা

লালসালু উপন্যাসের জন্য তিনি ১৯৬১ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পান। এছাড়া আদমজী পুরস্কার (১৯৬৫), একুশে পদক (১৯৮৪, মরণোত্তর) এবং লালসালু চলচ্চিত্রের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা কাহিনি বিভাগে সম্মাননা (২০০১, মরণোত্তর) লাভ করেন।

মৃত্যু ও উত্তরাধিকার

১৯৭১ সালের ১০ অক্টোবর প্যারিসের ম্যদোঁতে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ মারা যান; মাত্র ৪৯ বছর বয়সে, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় না দেখেই তিনি চলে যান। তাকে ম্যদোঁতেই সমাহিত করা হয়। অল্পায়ু ও স্বল্প রচনাসম্ভার সত্ত্বেও তিনি সমকালীন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান লেখক হিসেবে স্বীকৃত। শহীদুল জহিরের মতো পরবর্তী লেখকদের ওপর তার প্রভাবের কথা সমালোচকরা উল্লেখ করেছেন। তার রচনা আজও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচি ও সাহিত্য-সংকলনে স্থান পায়।

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।