আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
এক নজরে
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| পূর্ণ নাম | আখতারুজ্জামান মোহাম্মদ ইলিয়াস |
| ডাকনাম | মঞ্জু |
| ইংরেজি রূপ | Akhtaruzzaman Elias |
| জন্ম | ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৩ |
| জন্মস্থান | গটিয়া গ্রাম, সাঘাটা, গাইবান্ধা (মামার বাড়ি; পৈতৃক বাড়ি বগুড়া) |
| মৃত্যু | ৪ জানুয়ারি ১৯৯৭, ঢাকা |
| জাতীয়তা | বাংলাদেশি |
| পেশা | ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, অধ্যাপক |
| শিক্ষা | বগুড়া জিলা স্কুল; ঢাকা কলেজ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (বাংলায় স্নাতক ১৯৬৩, স্নাতকোত্তর ১৯৬৪) |
| উল্লেখযোগ্য কর্ম | চিলেকোঠার সেপাই (১৯৮৬), খোয়াবনামা (১৯৯৬); গল্পসংকলন অন্য ঘরে অন্য স্বর, খোঁয়ারি, দুধভাতে উৎপাত, দোজখের ওম, জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল |
| পুরস্কার | বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৩), আনন্দ পুরস্কার (১৯৯৬), মরণোত্তর একুশে পদক (১৯৯৯), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (২০১৪, মরণোত্তর) |
পরিচিতি
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৩ – ৪ জানুয়ারি ১৯৯৭) বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পী — ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার ও অধ্যাপক। তিনি ছিলেন স্বল্পপ্রজ লেখক: মাত্র দুটি উপন্যাস, পাঁচটি গল্পসংকলন ও একটি প্রবন্ধসংকলন নিয়ে তার রচনাসম্ভার। কিন্তু এই সীমিত পরিসরেই তিনি বাংলা কথাসাহিত্যে অসাধারণ উচ্চতা স্পর্শ করেছেন। বাস্তবতার নিপুণ চিত্রণ, ইতিহাস ও রাজনৈতিক জ্ঞান, গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও সূক্ষ্ম কৌতুকবোধ তার রচনাকে দিয়েছে ব্যতিক্রমী সুষমা; তাকে বলা হয়েছে সমাজবাস্তবতার অনন্যসাধারণ রূপকার। সংলাপে কথ্যভাষার ব্যবহারে তার রচনাশৈলী বাংলা কথাশিল্পে স্বকীয় ও অনন্য। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর পর তাকে সর্বাধিক প্রশংসিত বাংলাদেশি লেখক হিসেবে গণ্য করা হয়। হাসান আজিজুল হক বলেছিলেন, “ইলিয়াসের উপন্যাস প্রকৃতপক্ষেই বিশ্বমানের”; পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী বলেছিলেন, “কী পশ্চিম বাংলা, কী বাংলাদেশ সবটা মেলালে তিনি শ্রেষ্ঠ লেখক।”
জন্ম ও শিক্ষা
১৯৪৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা উপজেলার ভরতখালী ইউনিয়নের গটিয়া গ্রামে মামার বাড়িতে তার জন্ম; ডাকনাম ছিল মঞ্জু। বাবা বদিউজ্জামান মোহাম্মদ ইলিয়াস ছিলেন পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (১৯৪৭–১৯৫৩) ও মুসলিম লীগের পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি; মায়ের নাম বেগম মরিয়ম ইলিয়াস। পৈতৃক বাড়ি বগুড়া শহরের চেলোপাড়ায় হলেও বাবা করতোয়া নদীর তীরে নারুলি গ্রামে স্থানান্তরিত হন; ১৯৪৬ সালের দিকে পরিবার ঢাকায় চলে আসে। তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় ১৯৪৯ সালে ঢাকার সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স স্কুলে; পরে কেএল জুবিলি স্কুল ও ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল হয়ে ১৯৫২ সালে বগুড়া জিলা স্কুলে ভর্তি হন এবং ১৯৫৮ সালে সেখান থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৬০ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৬৩ সালে বাংলায় স্নাতক ও ১৯৬৪ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
কর্মজীবন
কর্মজীবন শুরু করেন করটিয়া সা’দত কলেজে; কিছুদিন পর জগন্নাথ কলেজে প্রভাষক পদে যোগদান করেন (পরে ১৯৭৯ সালে সহকারী অধ্যাপক ও ১৯৮৪ সালে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি)। ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত জগন্নাথে অধ্যাপনা করার পর ১৯৮৭ সালে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়ের উপাধ্যক্ষ, মফিজউদ্দীন শিক্ষা কমিশনের বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা কলেজের বাংলার অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পরিচিত মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেন ও গোপনে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। তিনি বাংলাদেশ লেখক শিবিরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এবং পরে এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সাহিত্যজীবন ও রচনাবলি
বিদ্যালয়ে পড়ার সময় কবিতা দিয়ে তার লেখালেখিতে হাতেখড়ি ঘটে — ১৯৫২ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত সত্যযুগ পত্রিকার সাহিত্যপাতায় তার কবিতা ছাপা হয়। ষাটের দশকে তিনি লেখালেখিতে পুরোপুরি সক্রিয় হন। ১৯৭৬ সালে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ অন্য ঘরে অন্য স্বর প্রকাশিত হয়; হাসান আজিজুল হক এ সম্পর্কে বলেছিলেন, “এটি তীরের মতো ঋজু, ধানি লঙ্কার মতো বদমেজাজি, পরনারীর মতো আকর্ষণীয়।” এরপর খোঁয়ারি (১৯৮২), দুধভাতে উৎপাত (১৯৮৫), দোজখের ওম (১৯৮৯) ও জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল (১৯৯৭) — পাঁচটি গল্পসংকলনে প্রকাশিত গল্প ২৩টি; প্রকাশিত, অপ্রকাশিত ও অগ্রন্থিত মিলিয়ে তার সর্বমোট ৩১টি গল্প রয়েছে। “প্রতিশোধ”, “খোঁয়ারি”, “মিলির হাতে স্টেনগান”, “অপঘাত”, “রেইনকোট” প্রভৃতি গল্পে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধপরবর্তী রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা।
তার দুটি উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের মাইলফলক। চিলেকোঠার সেপাই (১৯৮৬) — ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের পটভূমিতে রচিত; এই উপন্যাসের জন্য তিনি আলাওল সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। খোয়াবনামা (১৯৯৬) — তেভাগা আন্দোলন, ১৮৫৭-এর সিপাহি বিদ্রোহ ও ১৯৪৭-এর বঙ্গভঙ্গের ঐতিহাসিক পরিসরে বগুড়ার পটভূমিতে রচিত মহাকাব্যিক উপন্যাস; এর জন্য তিনি সা’দত আলি আখন্দ সাহিত্য পুরস্কার ও আনন্দ পুরস্কার পান। তার একটি প্রবন্ধসংকলন সংস্কৃতির ভাঙ্গা সেতু (১৯৯৮, মরণোত্তর, কলকাতা) প্রকাশিত হয়েছে এবং অসমাপ্ত উপন্যাস করতোয়া মাহাত্ম্য। “রেইনকোট” গল্প অবলম্বনে ২০১৪ সালে মেঘমল্লার চলচ্চিত্র নির্মিত হয়, যার জন্য তিনি মরণোত্তর শ্রেষ্ঠ কাহিনীকার হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।
ব্যক্তিগত জীবন
১৯৭৩ সালে ইলিয়াস বিয়ে করেন। তার স্ত্রীর নাম সুরাইয়া তুতুল; তিনি সিরাজগঞ্জ মহিলা কলেজের ইতিহাসের প্রভাষক ছিলেন। ১৯৭৪ সালে তাদের পুত্র আন্দালিব ইলিয়াসের জন্ম হয়।
পুরস্কার ও সম্মাননা
সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন: হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৭৬, অন্য ঘরে অন্য স্বর); বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৩); আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৭, চিলেকোঠার সেপাই); আনন্দ পুরস্কার (১৯৯৬, খোয়াবনামা); সা’দত আলি আখন্দ সাহিত্য পুরস্কার; কাজী মাহবুবুল্লাহ স্বর্ণপদক; মরণোত্তর একুশে পদক (১৯৯৯); এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (২০১৪, মরণোত্তর — শ্রেষ্ঠ কাহিনীকার, মেঘমল্লার)।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
১৯৯৬ সালের ১৩ জানুয়ারি তার ক্যানসার ধরা পড়ে। রোগটি দেরিতে ধরা পড়ায় অবস্থার ক্রমশ অবনতি ঘটে এবং ওই বছরের ২০ মার্চ ক্যানসার-আক্রান্ত ডান পা পুরোপুরি কেটে বাদ দিতে হয়। কিছুদিন ভোগার পর ১৯৯৭ সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকার মালিবাগের কমিউনিটি হাসপাতালে মাত্র ৫৩ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন; তাকে দক্ষিণ বগুড়া গোরস্থানে সমাহিত করা হয়। স্বল্পপ্রজ হয়েও তিনি বাংলা কথাসাহিত্যের ধ্রুবতারা: তার রচনা একাধিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং তার সৃষ্টিকর্মের অভিযোজনে চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও মঞ্চনাটক নির্মিত হয়েছে।