মূল কন্টেন্টে যান

ভ্রমণে সঙ্গে নেওয়ার সেরা বই

October 6, 2026 · Rakibul Hasan · ব্লগ

ট্রেনের জানালা দিয়ে যখন মাঠ-ঘাট পেরিয়ে যাচ্ছে, কিংবা বাস থামিয়ে চায়ের দোকানে বসে অপেক্ষা করছেন পরের গাড়ির — ঠিক সেই মুহূর্তগুলোতে বইয়ের মতো সঙ্গী আর কিছু হয় না। ভ্রমণে বই নেওয়া শুধু সময় কাটানোর উপায় নয়; পথের অভিজ্ঞতাকে আরও গভীর করে তোলার একটা কৌশল। ভালো বই পথের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়, অচেনা জায়গার সঙ্গে আপনার সম্পর্ক গড়ে তোলে, কখনো কখনো পুরো ভ্রমণের মানেই বদলে দেয়।

কিন্তু ভ্রমণে কোন বই নেবেন, সেটা বাছাই করাও একটা শিল্প। ভারী বই ব্যাগে জায়গা খায়, গভীর দার্শনিক বই চলন্ত গাড়ির ঝাঁকুনিতে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। তাই ভ্রমণের বই হওয়া উচিত এমন — যা হাতে নিলেই পাতা ওল্টাতে ইচ্ছে করবে, যা পড়তে পড়তে মনে হবে লেখকও আপনার পাশের সিটেই বসে আছেন। নিচে রইল ভ্রমণে সঙ্গে নেওয়ার সেরা কিছু বইয়ের তালিকা, প্রতিটি বই কেন পথের সঙ্গী হিসেবে উপযুক্ত, সেই ব্যাখ্যাসহ।

ক্লাসিক ভ্রমণকাহিনী — পথের আসল স্বাদ

  • দেশে বিদেশে — সৈয়দ মুজতবা আলী: বাংলা ভাষায় লেখা সর্বকালের সেরা ভ্রমণকাহিনীগুলোর একটি। আফগানিস্তানে কাটানো দিনগুলোর বর্ণনা এমন রসালো ভাষায় লেখা যে পড়তে পড়তে মনে হবে আপনিও কাবুলের বাজারে ঘুরছেন। রসিকতা আর গভীর পর্যবেক্ষণের এই মিশ্রণ ভ্রমণের সময় মনকে সতেজ রাখে; হালকা মেজাজের লেখা বলে চলন্ত গাড়িতেও পড়তে আরাম।
  • পায়ের তলায় সর্ষে — সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়: দেশ-বিদেশের নানা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে সুনীলের এই বইটি যেন একটানা গল্পের ঝাঁপি। লেখকের চোখে দেখা অচেনা শহর, অপরিচিত মানুষ আর অদ্ভুত সব ঘটনা পড়তে পড়তে নিজের ভ্রমণটাকেও নতুন চোখে দেখতে শিখবেন। ছোট ছোট অধ্যায়ে ভাগ করা বলে যেকোনো ফাঁকে পড়া শুরু বা শেষ করা যায়।
  • জলে ডাঙায় — সৈয়দ মুজতবা আলী: শুধু ভ্রমণকাহিনী নয়, এই বই ভ্রমণের দর্শনও শেখায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার নানা দেশের অভিজ্ঞতা মুজতবা আলীর অনবদ্য রসবোধে রাঙানো। ভ্রমণে বসে এই বই পড়লে বুঝবেন, পথ শুধু গন্তব্যে পৌঁছানোর মাধ্যম নয়, পথ নিজেই একটা গন্তব্য।

প্রকৃতি আর অরণ্যের বই — পথের সঙ্গে মিলিয়ে পড়ুন

  • আরণ্যক — বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়: ভ্রমণে, বিশেষ করে পাহাড় বা বনের দিকে যাত্রা হলে, আরণ্যকের চেয়ে ভালো সঙ্গী কল্পনা করা কঠিন। সত্যচরণের চোখে দেখা অরণ্য-প্রকৃতির বর্ণনা পড়তে পড়তে জানালার বাইরের গাছপালাও যেন নতুন রূপে ধরা দেয়। ধীর, মন্থর, ধ্যানমগ্ন গদ্য — ভ্রমণের অবসর মুহূর্তগুলোর জন্য একেবারে উপযুক্ত।
  • মাধুকরী — বুদ্ধদেব গুহ: পৃথু ঘোষের বন-জঙ্গল, পাহাড় আর নদীর ভ্রমণকথা এই উপন্যাসের প্রাণ। যারা প্রকৃতির মধ্যে ঘুরতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য এই বই প্রায় আত্মজীবনীমূলক অভিজ্ঞতা। বুদ্ধদেব গুহের প্রকৃতি-বর্ণনা এতটাই জীবন্ত যে ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেও মনে হবে বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসেছে দৃশ্যগুলো।
  • অরণ্যের দিনরাত্রি — সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়: চার বন্ধুর জঙ্গলে বেড়াতে যাওয়ার গল্প — ভ্রমণের আমেজ এই বইয়ের প্রতিটি পাতায়। ছোট আকারের বই, এক বসাতেই শেষ করা যায়, আর গল্পের টান এমন যে বাস-ট্রেনের দীর্ঘ যাত্রা কখন শেষ হয়ে যাবে টেরই পাবেন না।

অ্যাডভেঞ্চার — রোমাঞ্চপ্রিয় ভ্রমণকারীদের জন্য

  • চাঁদের পাহাড় — বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়: আফ্রিকার জঙ্গলে শংকরের অভিযান — বাংলা সাহিত্যের সেরা অ্যাডভেঞ্চার উপন্যাস। ভ্রমণে থাকা মানেই তো এক ধরনের অভিযান; এই বই সেই অনুভূতিকে দশগুণ বাড়িয়ে দেয়। টানটান উত্তেজনার গল্প বলে দীর্ঘ পথের ক্লান্তি ভুলে থাকা সহজ হয়।
  • ঋজুদা সমগ্র — বুদ্ধদেব গুহ: ঋজুদা আর রুদ্রর জঙ্গল-অভিযানের গল্পগুলো ছোট ছোট, প্রতিটি গল্প একেকটা ভ্রমণ-বিরতির জন্য পারফেক্ট। যারা একটানা বড় উপন্যাস পড়তে চান না, তাদের জন্য এই সমগ্র আদর্শ — যেকোনো গল্প থেকে শুরু করা যায়।
  • ফেলুদা সমগ্র — সত্যজিৎ রায়: ফেলুদার রহস্য-অভিযানগুলোর বেশিরভাগই ভ্রমণের পটভূমিতে — দার্জিলিং, পুরী, কাশ্মীর, লখনউ। নিজে ভ্রমণে থাকতে থাকতে ফেলুদার ভ্রমণ-রহস্য পড়ার মজাই আলাদা। হালকা, মজাদার, আর প্রতিটি গল্প স্বতন্ত্র — যাত্রাপথের সেরা টাইমপাস।

ভ্রমণে বই বাছাইয়ের ব্যবহারিক টিপস

  • আকার ও ওজনের দিকে নজর দিন: পেপারব্যাক বা ছোট আকারের সংস্করণ বেছে নিন। ভারী হার্ডকভার ব্যাগে জায়গা খায়, হাতে ধরে পড়তেও কষ্ট হয়। দীর্ঘ ভ্রমণে ই-বুক রিডার বা ফোনে ই-বুক রাখা সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
  • গন্তব্যের সঙ্গে মিলিয়ে বই নিন: পাহাড়ে যাচ্ছেন তো প্রকৃতির বই, ঐতিহাসিক শহরে যাচ্ছেন তো সেই শহর নিয়ে লেখা বই নিন। গন্তব্য-সংক্রান্ত বই পড়তে পড়তে ঘুরলে জায়গাটার ইতিহাস-সংস্কৃতি বুঝতে সুবিধা হয়।
  • একটা নয়, দুটো বই রাখুন: একটা হালকা মেজাজের (গল্প/ভ্রমণকাহিনী), আরেকটা একটু গভীর। মেজাজ অনুযায়ী বদলে পড়া যায়। তবে বেশি বই নিয়ে ব্যাগ ভারী করবেন না।
  • ছোট অধ্যায়ের বই প্রাধান্য দিন: যাত্রাপথে বারবার বাধা আসে — টিকিট চেকার, চা-ওয়ালা, স্টেশন। ছোট অধ্যায় বা ছোটগল্পের বইয়ে যেকোনো জায়গায় থামা যায়, আবার শুরু করতেও সুবিধা।

দীর্ঘ যাত্রার জন্য বড় উপন্যাস

ঢাকা থেকে দীর্ঘ পথ — ধরুন ট্রেনে সিলেট বা বাসে কক্সবাজার — এমন যাত্রায় ছোট বই দ্রুত শেষ হয়ে যায়। তখন দরকার এমন উপন্যাস যা একটানা টেনে নিয়ে যাবে।

  • সেই সময় — সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়: উনিশ শতকের কলকাতার পটভূমিতে লেখা এই বিশাল উপন্যাস দীর্ঘ যাত্রার জন্য আদর্শ। নবীনকুমারের জীবন, তৎকালীন সমাজ, ইতিহাস আর মানবিক টানাপোড়েন — পড়তে পড়তে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যাবে টেরই পাবেন না। বইটা মোটা হলেও পেপারব্যাক সংস্করণ ব্যাগে নেওয়া যায়।
  • পূর্ব-পশ্চিম — সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়: দেশভাগের পটভূমিতে দুই বাংলার গল্প। ভ্রমণে, বিশেষ করে সীমান্ত পেরিয়ে যাত্রায়, এই বইয়ের আবেদন দ্বিগুণ। ইতিহাস আর ব্যক্তিগত গল্পের মিশ্রণে লেখা এই উপন্যাস দীর্ঘ পথের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেবে।
  • শাপমোচন — ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়: প্রেমের এই ক্লাসিক উপন্যাস অনেক পাঠকের প্রিয় ভ্রমণসঙ্গী। আবেগঘন গল্প, সহজ ভাষা — চলন্ত গাড়ির ঝাঁকুনিতেও মনোযোগ ধরে রাখা সহজ। এক বসায় শেষ করার মতো টান আছে গল্পে।

শিশুদের সঙ্গে ভ্রমণে বই

বাচ্চাদের নিয়ে ভ্রমণে বই আরও জরুরি — নইলে তারা বিরক্ত হয়ে পুরো যাত্রা মাটি করে দিতে পারে! শিশুদের জন্য ছবিসহ, বড় হরফের, মজার বই নিন।

  • ঠাকুরমার ঝুলি — দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার: রূপকথার এই সংকলন শিশুদের ভ্রমণের সেরা সঙ্গী। একটা গল্প শেষ হলে আরেকটা শোনার বায়না — যাত্রাপথ কখন শেষ হবে টের পাবেন না। বড়রাও পড়ে মজা পাবেন।
  • আবোল তাবোল — সুকুমার রায়: ছড়া আর হাসির এই বই শিশুদের হাসিয়ে যাত্রা আনন্দময় করে। জোরে জোরে পড়ে শোনান — আশপাশের যাত্রীরাও মজা পাবেন!
  • ফেলুদার গোয়েন্দা গল্প (কিশোরদের জন্য): একটু বড় বাচ্চাদের জন্য ফেলুদার ছোট রহস্যগল্পগুলো দারুণ। তাদের চিন্তা করতে শেখায়, আর যাত্রার একঘেয়েমি দূর করে।

ভ্রমণে পড়ার আধুনিক কৌশল

  • অডিওবুক ব্যবহার করুন: পাহাড়ি পথে হাঁটার সময় বা গাড়ি চালানোর সময় বই পড়া যায় না — তখন অডিওবুক সেরা সমাধান। কানে ইয়ারফোন, চোখে পথের দৃশ্য — দুটোর আনন্দ একসঙ্গে।
  • ভ্রমণ ডায়েরি লিখুন: পড়ার পাশাপাশি ছোট নোটবুকে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা লিখে রাখুন। কোন জায়গায় কোন বইটা পড়লেন — এই স্মৃতি পরে অমূল্য হয়ে ওঠে। অনেক লেখকের ভ্রমণকাহিনীই এমন ডায়েরি থেকে জন্ম নিয়েছে।
  • স্থানীয় বইয়ের দোকান ঘুরুন: ভ্রমণে গিয়ে স্থানীয় বইয়ের দোকানে ঢুঁ মারুন। সেখানকার লেখক, ইতিহাস আর সংস্কৃতির বই পাবেন যা ঢাকায় মেলে না। এটা ভ্রমণের সেরা স্যুভেনির।
  • বই শেয়ার করুন: হোস্টেল বা রিসোর্টে অনেক সময় বইয়ের ছোট সংগ্রহ থাকে। নিজের পড়া বই রেখে আসুন, বদলে আরেকটা নিন — ভ্রমণকারীদের মধ্যে এই অলিখিত বিনিময় প্রথা বিশ্বজুড়ে প্রচলিত।

ভ্রমণসঙ্গী বইয়ের যত্ন ও প্যাকিং

  • পলিথিনে মুড়ে নিন: হঠাৎ বৃষ্টি বা পানির বোতল লিকেজে বই নষ্ট হতে পারে। পেপারব্যাক বই পলিথিন ব্যাগে মুড়ে ব্যাগে রাখুন।
  • বুকমার্ক ব্যবহার করুন: পাতা মুড়ে চিহ্ন রাখার অভ্যাস বই নষ্ট করে। ছোট একটা বুকমার্ক সঙ্গে রাখুন — এমনকি বাসের টিকিটও বুকমার্ক হতে পারে, পরে স্মৃতি হিসেবে থেকে যায়।
  • ভারী বই ভাগ করে নিন: দল বেঁধে ভ্রমণে প্রত্যেকে একটা করে বই নিন, পড়া শেষে বদলে নিন। এতে ব্যাগ হালকা থাকে, পড়ার ভ varietyও বাড়ে।
  • ফেরার পথের বই আলাদা রাখুন: যাওয়ার পথে পড়া বই ফেরার পথে আর মজা নাও লাগতে পারে। ফেরার জন্য একটা নতুন বই রিজার্ভ রাখুন — ক্লান্ত শরীরে নতুন গল্পের টানই সেরা।

সবশেষে মনে রাখুন — ভ্রমণে বই মানে শুধু সময় কাটানো নয়, এটা দুটো জগতের একসঙ্গে ভ্রমণ। বাইরের পথ আর ভেতরের কল্পনা — দুটো একসঙ্গে চললে যাত্রা হয় পরিপূর্ণ। তাই ব্যাগে জায়গা কম থাকলেও একটা বইয়ের জায়গা রাখতেই হবে।

শেষ কথা

ভ্রমণ শেষ হয়ে যায়, ছবিগুলো একসময় ফোনের গ্যালারিতে হারিয়ে যায় — কিন্তু পথে পড়া একটা ভালো বইয়ের স্মৃতি থেকে যায় অনেকদিন। বহু বছর পরেও মনে পড়ে, অমুক ট্রেনযাত্রায় অমুক বইটা পড়েছিলাম। তাই পরের বার ব্যাগ গোছানোর সময় জামাকাপড়ের পাশাপাশি একটা ভালো বইয়ের জায়গাও রাখুন। পথ আর পাঠ — এই দুইয়ের মিলনেই ভ্রমণ হয়ে ওঠে সত্যিকারের অভিজ্ঞতা। শুভযাত্রা!

আরও পড়ুন

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।