মূল কন্টেন্টে যান

কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সাহিত্যকর্ম

October 5, 2026 · Rakibul Hasan · ব্লগ

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কবি বিরল, যিনি একই সঙ্গে বিদ্রোহের অগ্নিশিখা ও প্রেমের কোমলতা ধারণ করেছেন নিজের বুকে। কাজী নজরুল ইসলাম সেই কবি — যাঁর কলমে জ্বলে উঠেছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার আগুন, আবার সেই কলমেই ঝরেছে মানবতার মধুর বাণী। জাতীয় কবি হিসেবে পরিচিত নজরুল শুধু বাংলাদেশের নন, সমগ্র বাঙালি জাতির আত্মার কবি। তাঁর জীবন ছিল সংগ্রামের, তাঁর সাহিত্য ছিল মুক্তির — আর এই দুয়ের মিলনেই তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলা সাহিত্যের চির-বিদ্রোহী বীর।

জন্ম ও শৈশবের সংগ্রাম

কাজী নজরুল ইসলাম ১৮৯৯ সালের ২৪ মে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা কাজী ফকির আহমদ ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও মাযারের খাদেম — ধর্মপ্রাণ কিন্তু দরিদ্র এক মানুষ। মাতা জাহেদা খাতুনের কোলে নজরুলের শৈশব কাটে চরম অভাবের মধ্যে। মাত্র আট বছর বয়সে পিতৃহারা হওয়ার পর সংসারের বোঝা এসে পড়ে কিশোর নজরুলের কাঁধে।

গ্রামের মক্তবে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ নেন। এ সময়ই তাঁর ডাক নাম হয় “দুখু মিয়া” — দুঃখ যাঁর নিত্যসঙ্গী। কিন্তু দুঃখ তাঁকে ভাঙতে পারেনি; বরং দুঃখই তাঁকে শিখিয়েছে মানুষের বেদনা বোঝার পাঠ। লেটো গানের দলে যোগ দিয়ে তিনি গান লিখতে ও গাইতে শুরু করেন। গ্রামের আসরে আসরে গাওয়া এই গানগুলোই ছিল তাঁর সাহিত্যজীবনের প্রথম ধাপ। লেটো দলের ওস্তাদের কাছে তিনি হিন্দু পুরাণ, রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনিও শোনেন — যা পরবর্তীকালে তাঁর রচনায় হিন্দু-মুসলিম ঐতিহ্যের সমন্বয়ের বীজ বপন করে।

অর্থের অভাবে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হলেও মেধার জোরে তিনি আসানসোলের রানীগঞ্জ শিয়ারসোল রাজ স্কুলে ভর্তি হন। পরে ময়মনসিংহের ত্রিশালের দরিরামপুর স্কুলে পড়াশোনা করেন। এই স্কুলজীবনেই তাঁর কবিপ্রতিভার প্রথম স্বীকৃতি মেলে। দরিদ্র ছাত্রটি যে একদিন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস বদলে দেবে, তা তখন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।

সৈনিক জীবন — নতুন দিগন্ত

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯১৭ সালে নজরুল ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ৪৯তম বাঙালি পল্টনে যোগ দেন। করাচিতে কর্মরত অবস্থায় তিনি ফারসি ভাষা ও সাহিত্য অধ্যয়ন করেন — হাফিজ, রুমি, ওমর খৈয়ামের কবিতায় ডুবে যান। ফারসি সাহিত্যের এই পাঠ তাঁর কবিতায় নতুন মাত্রা যোগ করে; পরবর্তীকালে তাঁর গজল ও ইসলামি গানে এই প্রভাব স্পষ্ট।

সৈনিক জীবনের শৃঙ্খলা, সহযোদ্ধাদের সঙ্গে কাটানো দিন, যুদ্ধের ভয়াবহতা — সব মিলিয়ে নজরুলের দৃষ্টিভঙ্গি প্রশস্ত হয়। তিনি বুঝতে পারেন, শৃঙ্খলিত জীবন কেমন, আর মুক্তির আকাঙ্ক্ষা কত তীব্র হতে পারে। ১৯২০ সালে পল্টন ভেঙে দেওয়া হলে তিনি সেনাবাহিনী ছেড়ে কলকাতায় ফিরে আসেন এবং পুরোদমে সাহিত্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। সৈনিকের পোশাক খুলে তিনি তুলে নেন কলম — যা হয়ে ওঠে তাঁর আসল অস্ত্র।

কলকাতায় সাহিত্যজীবনের সূচনা

কলকাতায় এসে নজরুল মুসলিম ভারত, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, প্রবাসী, মোসলেম ভারত প্রভৃতি পত্রিকায় লিখতে শুরু করেন। এ সময় তাঁর কবিতায় একদিকে যেমন ইসলামি ঐতিহ্যের ছোঁয়া, অন্যদিকে তেমনি বিদ্রোহের সুর ধ্বনিত হতে থাকে। ১৯২১ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থের আগের কবিতাগুলো, যা পাঠকমহলে সাড়া ফেলে।

এই সময়ে তিনি মুজফ্‌ফর আহমদের সঙ্গে নবযুগ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। সাংবাদিক হিসেবে তিনি শ্রমিক আন্দোলন, খিলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনের পক্ষে লেখেন। তাঁর কলম ক্রমশ রাজনৈতিক চেতনায় শাণিত হয়ে ওঠে।

“বিদ্রোহী” — বাংলা কবিতায় ভূমিকম্প

১৯২২ সালের জানুয়ারিতে বিজলী পত্রিকায় “বিদ্রোহী” কবিতা প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা সাহিত্যে ভূমিকম্প ঘটে যায়। “বল বীর — বল উন্নত মম শির! শির নেহারি’ আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!” — এই উদ্দীপ্ত পঙ্‌ক্তিমালা বাঙালি পাঠকের হৃদয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং এই কবিতা পড়ে মুগ্ধ হন এবং নজরুলকে আশীর্বাদ করেন।

বিদ্রোহী কবিতায় নজরুল নিজেকে ঘোষণা করেন চির-বিদ্রোহী বীর হিসেবে — যিনি অন্যায়, শোষণ, পরাধীনতা ও সব ধরনের বন্ধনের বিরুদ্ধে চিরকাল লড়বেন। কবিতাটির ছন্দ, ভাষা ও ভাবের তীব্রতা বাংলা কবিতায় আগে কখনো দেখা যায়নি। একে বলা হয় বাংলা সাহিত্যের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বিদ্রোহী কবিতা। এই একটি কবিতাই নজরুলকে রাতারাতি “বিদ্রোহী কবি” উপাধিতে ভূষিত করে।

ধূমকেতু, কারাবাস ও অদম্য কলম

১৯২২ সালেই নজরুল ধূমকেতু পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন — নামের মতোই যা ছিল বিস্ফোরক। এই পত্রিকার মাধ্যমে তিনি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ চালান। “আনন্দময়ীর আগমনে” কবিতায় তিনি দেবী দুর্গার আগমনকে ভারতের মুক্তির রূপক হিসেবে ব্যবহার করেন, যা ব্রিটিশ সরকারের চক্ষুশূল হয়।

রাজদ্রোহের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে তাঁকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু কারাগার তাঁর কলমকে থামাতে পারেনি। জেলে বসে তিনি রচনা করেন “রাজবন্দীর জবানবন্দী” — ব্রিটিশ বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক প্রতিবাদপত্র। কারাগারে বন্দীদের দুর্দশা দেখে তিনি অনশনও করেন। এই সময়ের রচনাগুলোতে তাঁর বিদ্রোহী চেতনা আরও শাণিত হয়।

কাব্যগ্রন্থসমূহ — বৈচিত্র্যের ভান্ডার

নজরুলের কাব্যপ্রতিভার বিস্তার দেখা যায় তাঁর অসংখ্য কাব্যগ্রন্থে। প্রধান কাব্যগ্রন্থগুলো হলো:

  • অগ্নিবীণা (১৯২২) — প্রথম কাব্যগ্রন্থ; “বিদ্রোহী”, “প্রলয়োল্লাস”, “রক্তাম্বরধারিণী মা”, “আগমনী”সহ বিদ্রোহ ও প্রেমের কবিতার সংকলন।
  • বিষের বাঁশী (১৯২৪) — ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক কবিতার সংগ্রহ; প্রকাশের পরপরই ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করে।
  • ভাঙার গান (১৯২৪) — কারাগারে রচিত কবিতার সংকলন; বন্দীজীবনের বেদনা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।
  • সাম্যবাদী (১৯২৫) — সাম্য ও মানবতার বাণীবাহী; “মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান” — এই পঙ্‌ক্তি আজও সাম্যের মন্ত্র।
  • সর্বহারা (১৯২৬), ফণীমনসা (১৯২৭), চক্রবাক (১৯২৯), সিন্ধু-হিন্দোল (১৯২৭), নতুন চাঁদ (১৯৩৯) — পরবর্তীকালের উল্লেখযোগ্য সংকলন।
  • চিরকুট, মরু-ভাস্কর, শেষ সওগাত — শেষ পর্বের রচনা।

গল্প, উপন্যাস ও নাটক

কবিতার পাশাপাশি গদ্যসাহিত্যেও নজরুলের অবদান উল্লেখযোগ্য। বাঁধনহারা (১৯২৭) বাংলা সাহিত্যের প্রথম পত্রোপন্যাস — চিঠির আকারে লেখা এই উপন্যাসে যুদ্ধফেরত সৈনিকদের জীবন ও প্রেমের চিত্র আছে। মৃত্যুক্ষুধা (১৯৩০) উপন্যাসে দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও সামাজিক অবক্ষয়ের মর্মস্পর্শী চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। কুহেলিকাতে রাজনৈতিক সচেতনতার পরিচয় মেলে।

ছোটগল্পের মধ্যে ব্যথার দান, রিক্তের বেদন, শিউলিমালা উল্লেখযোগ্য। নাটকের মধ্যে ঝিলিমিলি, আলেয়া, মধুমালা, পুতুলের বিয়ে জনপ্রিয়তা পায়। তাঁর প্রবন্ধ ও সমালোচনামূলক রচনাও বাংলা গদ্যকে সমৃদ্ধ করেছে।

নজরুলগীতি — সংগীতের অফুরন্ত ভান্ডার

নজরুল প্রায় চার হাজার গান রচনা করেছেন, যা নজরুলগীতি নামে পরিচিত। এই বিশাল সংগীতভান্ডারে আছে শ্যামাসংগীত, ভক্তিগীতি, ইসলামি গান, গজল, খেয়াল, ঠুমরি, কীর্তন, বাউলাঙ্গের গান — এমন কোনো ধারা নেই যেখানে তাঁর অবদান নেই। তিনি নিজে সুরও করেছেন বহু গানের।

বাংলাদেশের রণসংগীত “চল্‌ চল্‌ চল্‌ ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল” তাঁরই রচনা। “মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম”, “কারার ওই লৌহকপাট” — এই গানগুলো স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেরণা জুগিয়েছে। তাঁর গানে হিন্দু-মুসলিম ঐতিহ্যের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে — একই স্রষ্টার কলমে রচিত হয়েছে “আল্লাহ্‌ আমার প্রভু” ও “শ্যামা মায়ের কোলে”। এই সমন্বয়ই তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

অসাম্প্রদায়িকতা, নারীমুক্তি ও মানবতাবাদ

নজরুলের সবচেয়ে বড় পরিচয় — তিনি ছিলেন মানুষের কবি। ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তিনি আজীবন লড়েছেন। “মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান” — এই পঙ্‌ক্তি আজও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে উচ্চারিত হয়। হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সময় তিনি উভয় সম্প্রদায়ের উগ্রবাদীদের বিরুদ্ধে কলম ধরেন।

নারীর মুক্তি নিয়েও তিনি ছিলেন অগ্রসর চিন্তার মানুষ। “নারী” কবিতায় তিনি লিখেছেন — “বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।” শ্রমিক-কৃষকের অধিকার, শোষিত-বঞ্চিতের পক্ষে তাঁর কলম কখনো থামেনি। “কুলি-মজুর” কবিতায় তিনি শ্রমজীবী মানুষের মহিমা গেয়েছেন।

ব্যক্তিজীবন ও শেষ পর্ব

১৯২৪ সালে নজরুল প্রমীলা দেবীকে বিয়ে করেন। তাঁদের সংসারে জন্ম নেয় চার পুত্র। পারিবারিক জীবনে তিনি ছিলেন স্নেহশীল পিতা ও স্বামী। কিন্তু ১৯৪২ সালে মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে তিনি দুরারোগ্য স্নায়বিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হন এবং ধীরে ধীরে বাকশক্তি ও স্মৃতিশক্তি হারান। এরপর দীর্ঘ চৌত্রিশ বছর তিনি নীরব জীবন কাটান — যে কবির কণ্ঠে একদিন বিদ্রোহের ঝড় উঠেছিল, তিনি হয়ে পড়েন নীরব দর্শক।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে তাঁকে সপরিবারে ঢাকায় নিয়ে আসা হয় এবং জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয়। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকার পিজি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। জাতীয় কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয় — তাঁর ইচ্ছানুযায়ী, “মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিয়ো ভাই”।

উপসংহার — চিরঞ্জীব নজরুল

কাজী নজরুল ইসলাম মাত্র দুই দশকের সক্রিয় সাহিত্যজীবনে যা রচনা করেছেন, তা বাংলা সাহিত্যের চিরসম্পদ। বিদ্রোহ, প্রেম, সাম্য ও মানবতার যে বাণী তিনি রেখে গেছেন, তা প্রতিটি প্রজন্মের বাঙালির প্রেরণার উৎস। একুশের ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ — প্রতিটি সংগ্রামে তাঁর গান ও কবিতা যোদ্ধাদের প্রেরণা জুগিয়েছে। তিনি শুধু জাতীয় কবি নন — তিনি বাঙালির আত্মার কবি, যাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে মুক্তিকামী মানুষের চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা। যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে, ততদিন নজরুল বেঁচে থাকবেন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে।

আরও পড়ুন

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।