বাংলা সাহিত্যের এমন কোনো চরিত্র আছে কি, যাকে দেবদাসের চেয়ে বেশি মানুষ চেনে? শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দেবদাস শুধু একটি উপন্যাস নয়; এটি বাঙালি সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। প্রেমে ব্যর্থ, মদ্যপ, আত্মধ্বংসী নায়কের প্রতিশব্দই হয়ে গেছে দেবদাস। ১৯১৭ সালে প্রকাশিত এই ছোট উপন্যাস এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে পাঠককে মুগ্ধ করে চলেছে, আর চলচ্চিত্রের পর্দায় বারবার নতুন রূপে ফিরে এসেছে।
মজার ব্যাপার হলো, শরৎচন্দ্র এই উপন্যাস লিখেছিলেন মাত্র সতেরো বছর বয়সে, ১৯০১ সালে। প্রকাশিত হয় ষোলো বছর পর, ১৯১৭ সালে। একজন কিশোরের লেখা বই কীভাবে কালজয়ী হলো — এই রিভিউতে আমরা সেই রহস্যের সন্ধান করব।
লেখক পরিচিতি: শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬–১৯৩৮) বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় ঔপন্যাসিকদের একজন। হুগলির দেবানন্দপুরে জন্ম নেওয়া এই লেখক দারিদ্র্য ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন। তার সাহিত্যে বারবার ফিরে এসেছে সমাজের অবহেলিত মানুষ — বিশেষ করে নারী। পথের দাবী, শ্রীকান্ত, চরিত্রহীন, গৃহদাহ — প্রতিটি বইতেই তিনি সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন।
দেবদাস তার প্রথম দিকের রচনা হলেও, এতেই প্রকাশ পেয়েছে তার ভবিষ্যৎ মহত্ত্বের আভাস — মানবিক সহানুভূতি, সামাজিক সমালোচনা আর চরিত্রসৃষ্টির অসাধারণ ক্ষমতা।
কাহিনির সারসংক্ষেপ
গল্পের শুরু বাংলার একটি গ্রামে। জমিদারপুত্র দেবদাস মুখোপাধ্যায় আর প্রতিবেশী মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে পার্বতী — ডাকনাম পারো — ছেলেবেলা থেকে একসঙ্গে বড় হয়েছে। খেলার সাথী থেকে কখন যে ভালোবাসা জন্ম নিয়েছে, তারা নিজেরাও জানে না।
কিন্তু ভালোবাসা আর বিয়ে এক নয় — বিশেষ করে তৎকালীন সামন্ততান্ত্রিক সমাজে। দেবদাসের বাবা-মা পারোকে পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করেন — কারণ পারোর পরিবার তাদের চেয়ে নিচু সামাজিক স্তরের। দেবদাস, যে কখনো বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখেনি, নীরবে মেনে নেয় এই সিদ্ধান্ত।
পারোর বিয়ে হয়ে যায় অন্যত্র — একজন বয়স্ক, বিপত্নীক জমিদারের সঙ্গে। বিয়ের আগে পারো দেবদাসকে শেষবারের মতো অনুরোধ করে — পালিয়ে যেতে, সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে। কিন্তু দেবদাস পারে না। তার দুর্বলতা, তার সিদ্ধান্তহীনতাই এই ট্র্যাজেডির বীজ।
পারো চলে যাওয়ার পর দেবদাস ভেঙে পড়ে। কলকাতায় গিয়ে সে ডুবে যায় মদ্যপানে। সেখানে তার পরিচয় হয় চন্দ্রমুখীর সঙ্গে — একজন বারবনিতা, যার জীবনে দেবদাসই প্রথম পুরুষ যে তাকে মানুষ হিসেবে দেখে, শুধু ভোগের বস্তু হিসেবে নয়। চন্দ্রমুখী দেবদাসকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে; কিন্তু দেবদাসের হৃদয়ে তখনো পারোই অধিষ্ঠিত।
দেবদাসের আত্মধ্বংসের যাত্রা ক্রমশ তীব্র হয়। সে জানে সে মরছে, তবু থামে না। এই যাত্রার শেষ কোথায় — তা পাঠক নিজে আবিষ্কার করুক। শুধু এটুকু বলা যায়, বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে মর্মান্তিক পরিণতিগুলোর একটি অপেক্ষা করছে শেষ পৃষ্ঠায়।
চরিত্র বিশ্লেষণ
দেবদাস: বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বিতর্কিত নায়ক। কেউ তাকে ভালোবাসে, কেউ ঘৃণা করে। সমালোচকদের একাংশ বলেন, দেবদাস কাপুরুষ — যে ভালোবাসার জন্য লড়তে পারেনি, সে শুধু নিজেকে ধ্বংস করেছে। অন্যরা বলেন, দেবদাস একটি পচনশীল সমাজব্যবস্থার শিকার — সামন্ততান্ত্রিক মূল্যবোধ আর আধুনিক ব্যক্তিস্বাধীনতার মধ্যে আটকে পড়া এক প্রজন্মের প্রতীক। সত্য সম্ভবত দুটোর মাঝামাঝি। দেবদাস দুর্বল, কিন্তু তার দুর্বলতার পেছনে আছে একটি পুরো সমাজকাঠামো।
পার্বতী (পারো): উপন্যাসের সবচেয়ে শক্তিশালী চরিত্র। তিনি শুধু প্রেমিকা নন; তিনি সিদ্ধান্ত নিতে জানেন। যখন দেবদাস দ্বিধায় ভোগে, পারো স্পষ্ট প্রস্তাব দেয়। বিয়ের পর তিনি স্বামীর সংসারে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন মর্যাদার সঙ্গে। পারো প্রমাণ করেন, নারী শুধু ভালোবাসার বস্তু নয় — তিনি নিজেই একজন ব্যক্তিত্ব।
চন্দ্রমুখী: শরৎচন্দ্রের মানবিকতার সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ। সমাজ যাকে পতিতা বলে ঘৃণা করে, সেই নারীর মধ্যে লেখক দেখিয়েছেন নিঃস্বার্থ ভালোবাসার সর্বোচ্চ রূপ। চন্দ্রমুখী দেবদাসের কাছ থেকে কিছু চায় না — শুধু দিতে চায়। এই চরিত্রের মধ্য দিয়ে শরৎচন্দ্র সমাজের ভণ্ডামির মুখোশ খুলে দিয়েছেন।
সামাজিক সমালোচনা
দেবদাস শুধু প্রেমের গল্প নয়; এটি তৎকালীন বাঙালি সমাজের কঠোর সমালোচনা:
- জাতপাত ও শ্রেণিবৈষম্য: দেবদাস-পারোর বিয়েতে বাধা শুধু সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নে — ভালোবাসার কোনো মূল্য নেই এই সমাজে।
- পিতৃতান্ত্রিক কর্তৃত্ব: দেবদাসের বাবা-মায়ের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত; সন্তানের ইচ্ছার কোনো দাম নেই।
- নারীর প্রতি দ্বিচারিতা: পারোর মতো ভদ্রঘরের মেয়ের ভালোবাসা সমাজ মেনে নেয় না, আবার চন্দ্রমুখীর মতো নারীকে ভোগ করে সেই সমাজই।
- মদ্যপান ও আত্মধ্বংস: দেবদাসের মদ্যপান শুধু ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়; এটি একটি অসুস্থ সমাজ থেকে পালানোর প্রচেষ্টা।
চলচ্চিত্রে দেবদাস: বারবার ফিরে আসা
দেবদাস সম্ভবত ভারতীয় চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বেশিবার চিত্রায়িত সাহিত্যকর্ম। উল্লেখযোগ্য সংস্করণগুলো:
- ১৯৩৫: পি.সি. বরুয়ার বাংলা ও হিন্দি সংস্করণ — প্রথম সাড়া জাগানো চলচ্চিত্রায়ণ।
- ১৯৫৫: বিমল রায়ের পরিচালনায় দিলীপ কুমার, সুচিত্রা সেন ও বৈজয়ন্তীমালা — ক্লাসিক হিসেবে স্বীকৃত।
- ২০০২: সঞ্জয় লীলা বানসালির জাঁকজমকপূর্ণ সংস্করণ — শাহরুখ খান, ঐশ্বর্য রাই, মাধুরী দীক্ষিত।
প্রতিটি প্রজন্ম দেবদাসকে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করেছে। এই পুনর্ব্যাখ্যার ক্ষমতাই প্রমাণ করে উপন্যাসটির কালজয়ী আবেদন। তবে মনে রাখতে হবে, চলচ্চিত্র আর মূল বই এক নয় — শরৎচন্দ্রের সূক্ষ্ম সামাজিক সমালোচনা চলচ্চিত্রে অনেক সময় ম্লান হয়ে যায়।
সমালোচনা: দেবদাস কি নায়ক?
আধুনিক সমালোচকদের অনেকেই প্রশ্ন তোলেন — দেবদাস কি আদৌ নায়ক হওয়ার যোগ্য? একজন পুরুষ যে নারীর ভালোবাসা গ্রহণ করতে পারে না, যে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় — তাকে কি আদর্শ মানা উচিত? এই প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, শরৎচন্দ্র দেবদাসকে আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করেননি; তাকে উপস্থাপন করেছেন সতর্কবাণী হিসেবে। দেবদাসের পরিণতি দেখিয়ে তিনি বলতে চেয়েছেন — দুর্বলতা ও পলায়নবৃত্তির পরিণাম কী হয়।
আবার নারীবাদী সমালোচকরা বলেন, উপন্যাসের আসল নায়ক পারো ও চন্দ্রমুখী — দেবদাস তো শুধুই একটি দুর্বল পুরুষ, যার চারপাশে শক্তিশালী নারীরা ঘোরে। এই পাঠও কম আকর্ষণীয় নয়।
কাদের পড়া উচিত
- বাংলা সাহিত্যের পাঠক: না পড়লে সাহিত্য-শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
- তরুণ প্রেমিক-প্রেমিকা: ভালোবাসা মানে শুধু আবেগ নয়, দায়িত্ব ও সাহস — এই শিক্ষা দেবে।
- চলচ্চিত্রপ্রেমী: মূল বই পড়ে দেখুন, সিনেমার সঙ্গে তুলনা করুন।
উপসংহার
এক শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, তবু দেবদাস আজও আমাদের সঙ্গে কথা বলে। কারণ সমাজ বদলালেও মানুষের মৌলিক দ্বন্দ্ব বদলায়নি — ভালোবাসা বনাম কর্তব্য, ব্যক্তি বনাম সমাজ, সাহস বনাম ভয়। শরৎচন্দ্র সতেরো বছর বয়সে যা লিখেছিলেন, তা আজও সত্য।
দেবদাস পড়ুন — শুধু একটি প্রেমের গল্প হিসেবে নয়, একটি সমাজের আয়না হিসেবে। আর পড়া শেষে নিজেকে প্রশ্ন করুন: আমি কি দেবদাসের মতো ভুল করছি না তো?
শরৎচন্দ্রের নারীদৃষ্টি
দেবদাসে শরৎচন্দ্রের নারীদৃষ্টির পূর্ণ প্রকাশ ঘটেছে — যা তার সারাজীবনের সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য হয়ে রইল। লক্ষ করুন: উপন্যাসের তিন প্রধান নারী চরিত্র — পারো, চন্দ্রমুখী — প্রত্যেকেই দেবদাসের চেয়ে শক্তিশালী, সিদ্ধান্তে অটল, আত্মমর্যাদাশীল।
পারো যখন দেখেন দেবদাস দুর্বল, তখন তিনি নিজের ভবিষ্যৎ নিজে গড়েন। চন্দ্রমুখী সমাজের সবচেয়ে ঘৃণিত পেশায় থেকেও ভালোবাসার সর্বোচ্চ আদর্শ ধারণ করেন। শরৎচন্দ্র দেখিয়েছেন — নারীর মর্যাদা তার পেশা বা সামাজিক অবস্থানে নয়; তার চরিত্রে, তার ভালোবাসার গভীরতায়।
ঊনবিংশ-বিংশ শতকের সন্ধিক্ষণে — যখন নারীশিক্ষা সবে শুরু, বাল্যবিবাহ ও পর্দাপ্রথা প্রবল — তখন এমন নারীচরিত্র সৃষ্টি করা ছিল বৈপ্লবিক। শরৎচন্দ্রের এই নারীদৃষ্টিই তাকে সমকালীন অনেক লেখক থেকে আলাদা করেছে এবং আজও তাকে প্রাসঙ্গিক রেখেছে।
ভাষা ও শিল্পরূপ
দেবদাসের ভাষা শরৎচন্দ্রের স্বাক্ষরবাহী — সহজ, সরল, কিন্তু গভীরভাবে আবেগময়। তিনি কঠিন শব্দ ব্যবহার করেন না; সাধারণ শব্দেই অসাধারণ অনুভূতি তৈরি করেন। পারো-দেবদাসের শৈশবের বর্ণনা, চন্দ্রমুখীর নীরব ভালোবাসার চিত্রণ — প্রতিটি অংশে ভাষা ও অনুভূতি একাকার।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তার সংলাপ। চরিত্ররা যেভাবে কথা বলে, তাতে তাদের শ্রেণি, শিক্ষা, মানসিকতা ফুটে ওঠে। দেবদাসের দ্বিধাগ্রস্ত সংলাপ, পারোর স্পষ্ট ও দৃঢ় কথা, চন্দ্রমুখীর বিনয়ী কিন্তু গভীর উক্তি — প্রতিটি সংলাপ চরিত্রের আয়না।
উপন্যাসের গঠনও চমৎকার — শুরুতে শৈশবের নির্মলতা, মাঝে প্রেম ও বিচ্ছেদের তীব্রতা, শেষে ধ্বংসের গভীরতা। এই ত্রিস্তরীয় কাঠামো পাঠককে ধীরে ধীরে ট্র্যাজেডির দিকে নিয়ে যায়।
দেবদাস ও বিশ্বসাহিত্যের ট্র্যাজিক নায়করা
দেবদাসকে প্রায়ই তুলনা করা হয় বিশ্বসাহিত্যের অন্যান্য ট্র্যাজিক চরিত্রের সঙ্গে — শেক্সপিয়রের হ্যামলেটের সিদ্ধান্তহীনতা, ফ্লবেয়রের এমা বোভারির আদর্শ ও বাস্তবের দ্বন্দ্ব। কিন্তু দেবদাসের ট্র্যাজেডি স্বতন্ত্র — এটি একটি নির্দিষ্ট সমাজব্যবস্থার ট্র্যাজেডি।
হ্যামলেটের দ্বিধা দার্শনিক; দেবদাসের দ্বিধা সামাজিক। সে জানে কী করা উচিত, কিন্তু সমাজের ভয়ে করতে পারে না। এই সামাজিকতাই দেবদাসকে বাঙালি পাঠকের এত কাছের করে তুলেছে — কারণ প্রতিটি বাঙালিই কখনো না কখনো সমাজের ভয়ে নিজের ইচ্ছাকে বিসর্জন দিয়েছে।
পাঠ-পরামর্শ
দেবদাস পড়ার আগে কয়েকটি কথা মনে রাখুন:
- এটি ছোট উপন্যাস — একবসায় পড়া যায়, কিন্তু তাড়াহুড়ো করবেন না।
- চলচ্চিত্র দেখে থাকলে বইয়ের সঙ্গে তুলনা করুন — পার্থক্যগুলো চমকপ্রদ।
- দেবদাসকে ঘৃণা বা ভালোবাসার আগে তার সমাজটাকে বুঝুন।
- পারো ও চন্দ্রমুখীর দিকে বিশেষ নজর দিন — তারাই আসল নায়িকা।
আর পড়া শেষে ভাবুন — আজকের সমাজে কি দেবদাস-পারোর ট্র্যাজেডি অসম্ভব? জাতপাত গেছে, কিন্তু শ্রেণিবৈষম্য, পারিবারিক চাপ — এগুলো কি গেছে? উত্তরটা হয়তো আপনাকে ভাবিয়ে তুলবে।