মূল কন্টেন্টে যান
উবায়দুর রহমান খান নদভী

উবায়দুর রহমান খান নদভী

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

এক নজরে

পূর্ণ নাম উবায়দুর রহমান খান নদভী (Ubaidur Rahman Khan Nadvi)
জন্ম ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৬৬
জন্মস্থান নূর মঞ্জিল, জামিয়া রোড, কিশোরগঞ্জ
জাতীয়তা বাংলাদেশি
পেশা ইসলামি চিন্তাবিদ, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, খতিব
লেখার ধরন ইসলামি প্রবন্ধ, ভ্রমণ-সাহিত্য, সীরাত-গবেষণা, সাংবাদিকতা
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ আফগানিস্তানে আমি আল্লাহকে দেখেছি, রক্তভেজা গুজরাট, মোল্লা ওমরের আফগানিস্তান, অমুসলিম মনীষীর চোখে আমাদের প্রিয় নবী (ﷺ), মুজাহিদদের জীবনকথা
পুরস্কার কিশোরগঞ্জ সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদ পদক; শুরূক সাহিত্য পদক; শিকড় সম্মাননা পদক প্রভৃতি
বর্তমান দায়িত্ব সিনিয়র সহকারী সম্পাদক, দৈনিক ইনকিলাব; মহাপরিচালক, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ

পরিচিতি

মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী বাংলাদেশের সমসাময়িক ইসলামি অঙ্গনের একজন বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব — একই সঙ্গে তিনি বিদগ্ধ আলেম, দার্শনিক বক্তা, সমাজকর্মী, শিক্ষক, খতিব এবং সাংবাদিক। দৈনিক ইনকিলাবের “স্বর্ণযুগ” থেকেই এই পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি বর্তমানে এর সিনিয়র সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন; পাশাপাশি তিনি বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্বে আছেন। সমসাময়িক একটি সূত্র তাঁকে “দেশের শীর্ষ ইসলামিক প্রাবন্ধিক ও দায়ী” হিসেবে অভিহিত করেছে — এই পরিচয় তাঁর লেখক-জীবনের সারসংক্ষেপই বটে।

তাঁর লেখনীর সবচেয়ে চেনা পরিচয় হলো মাঠ-পর্যায়ের প্রতিবেদনধর্মী ইসলামি সাহিত্য। আফগানিস্তানের যুদ্ধবিধ্বস্ত ভূমিতে গিয়ে তিনি লিখেছেন আফগানিস্তানে আমি আল্লাহকে দেখেছি; গুজরাট দাঙ্গার রক্তাক্ত পটভূমিতে লিখেছেন রক্তভেজা গুজরাট; তালেবান-শাসিত আফগানিস্তান নিয়ে লিখেছেন মোল্লা ওমরের আফগানিস্তান। আবার সীরাত-গবেষণার ধারায় তিনি লিখেছেন অমুসলিম মনীষীর চোখে আমাদের প্রিয় নবী (ﷺ) এবং আধুনিক বিশ্বের চল্লিশজন নওমুসলিমের আত্মকাহিনি — অর্থাৎ একদিকে সংঘাত-বিধ্বস্ত মুসলিম বিশ্বের সরেজমিন প্রতিবেদন, অন্যদিকে নবীজীবন ও ইসলাম-গ্রহণের বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণ; এই দুই মেরুতেই তাঁর কলম সমান সাবলীল।

জন্ম ও শিক্ষা

উবায়দুর রহমান খান নদভী ১৯৬৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জ শহরের জামিয়া রোডস্থ নূর মঞ্জিলে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মাওলানা আতাউর রহমান খান (রহ.) ছিলেন কিশোরগঞ্জের কৃতী সন্তান, দেশবরেণ্য আলেমে-দ্বীন ও সংসদ সদস্য; মাতার নাম মুরশিদা-ই-আমিনা। অর্থাৎ তিনি জন্মেছেন এমন এক পরিবারে, যেখানে ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা ও জনসেবা — দুটোই ছিল পারিবারিক ঐতিহ্য।

তাঁর শিক্ষাজীবনও এই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা। ১৯৮৩ সালে তিনি কিশোরগঞ্জের জামিয়া ইমদাদিয়া থেকে দাওরায়ে হাদীস সমাপ্ত করেন। এরপর ১৯৮৪ সালে চট্টগ্রামের জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়া থেকে আরবি সাহিত্যে তাখাসসুস (বিশেষায়ন) করেন এবং ১৯৮৫–৮৬ সালে ভারতের লখনৌস্থ নদওয়াতুল ওলামা থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন — এই প্রতিষ্ঠানের স্নাতক হিসেবেই তাঁর নামের সঙ্গে “নদভী” উপাধি যুক্ত হয়েছে। এরই মাঝে ১৯৮৫ সালে মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামি দাওয়াহ ও সংস্কৃতির ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ নেন; ১৯৯২ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে রাষ্ট্র ও রাজনীতিবিজ্ঞানে ডিপ্লোমা করেন এবং ১৯৯৪ সালে এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন। দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে তিনি সম্মানসূচক সনদও লাভ করেছেন। এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে মিডিয়া-বিষয়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ কোর্স, রিয়াদ থেকে মিডিয়া ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক-বিষয়ক বিশেষ ডিগ্রি এবং ভারত থেকে কূটনীতি ও পারস্পরিক সংলাপ-বিষয়ক সার্টিফিকেট কোর্সও তিনি সম্পন্ন করেছেন। এই বৈচিত্র্যময় শিক্ষা-পটভূমিই ব্যাখ্যা করে, কেন তাঁর লেখায় ধর্মীয় গভীরতার সঙ্গে সাংবাদিকতার মাঠ-বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষণ একসঙ্গে মেলে।

কর্মজীবন

লেখালেখির জগতে তাঁর অভিষেক ঘটে ছাত্রজীবনেই — ১৯৭৮ সালে দৈনিক আল-আজাদে তাঁর প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়, যার শিরোনাম ছিল “সাহিত্য সাধনা”। এরপর দৈনিক ইনকিলাবের স্বর্ণযুগ থেকে তিনি এই পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন এবং ধাপে ধাপে সিনিয়র সহকারী সম্পাদকের পদে উন্নীত হন। দীর্ঘ সাংবাদিক-জীবনে তিনি ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সাপ্তাহিক মুসলিম জাহানের নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন এবং মাসিক নেয়ামত পত্রিকার উপদেষ্টা সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন।

সাংবাদিকতার বাইরেও তাঁর কর্মপরিধি বিস্তৃত। তিনি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন উচ্চতর ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অতিথি অধ্যাপক; ফরিদাবাদ, যাত্রাবাড়ী ও মারকাজুদ দাওয়াহর তাখাসসুস বিভাগে উস্তাজ হিসেবে পাঠদান করেছেন। ইসলাম প্রচারের লক্ষ্যে তিনি ব্যাপক ভ্রমণ, লেকচার ও গণসংযোগ করেছেন। প্রায় ২৫ বছর ধরে তিনি ঢাকার মিরপুরস্থ মদিনা নগর মসজিদে জুমার খতিবের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। সংগঠন-পর্যায়ে তিনি দেশ অধ্যয়ন কেন্দ্রের সভাপতি, রাবেতা আল-আদাবিল ইসলামি আল-আলামিয়্যার বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সেক্রেটারি জেনারেল এবং বিএসআরসির প্রেসিডেন্ট। ২০২০ সালের হেফাজতে ইসলামের প্রতিনিধি সম্মেলনে তিনি তথ্য ও গবেষণা সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। সর্বশেষ, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের মহাপরিচালক হিসেবে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন — এই পদে তাঁর পূর্বসূরি ছিলেন মাওলানা যোবায়ের আহমদ চৌধুরী (২০১৬–২০২২)।

সাহিত্যকর্ম

উবায়দুর রহমান খান নদভীর গ্রন্থতালিকা তাঁর বহুমুখী আগ্রহের প্রতিফলন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে আছে:

  • আফগানিস্তানে আমি আল্লাহকে দেখেছি — যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানে সরেজমিন সফরের অভিজ্ঞতা-নির্ভর গ্রন্থ; তাঁর সবচেয়ে আলোচিত বইগুলোর একটি।
  • রক্তভেজা গুজরাট — গুজরাট দাঙ্গার পটভূমিতে রচিত প্রতিবেদনধর্মী গ্রন্থ।
  • মোল্লা ওমরের আফগানিস্তান — তালেবান-যুগের আফগানিস্তান নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী রচনা।
  • মুজাহিদদের জীবনকথা (১–২ খণ্ড) — মুসলিম বিশ্বের সংগ্রামী ব্যক্তিত্বদের জীবনী-সংকলন।
  • অমুসলিম মনীষীর চোখে আমাদের প্রিয় নবী (ﷺ) (অন্যদের চোখে আমাদের প্রিয়নবী নামেও প্রচলিত) — অমুসলিম পণ্ডিতদের দৃষ্টিতে নবীজীবন-বিষয়ক গবেষণা।
  • আধুনিক বিশ্বের চল্লিশজন নওমুসলিমের আত্মকাহিনি — সমকালীন বিশ্বের ইসলাম-গ্রহণকারীদের জীবনকথা।
  • বয়ানে আল্লামা আবুল হাসান আলি নদভি — সাইটের তথ্য অনুযায়ী, নদওয়াতুল ওলামার সাবেক রেক্টর ও ইসলামি চিন্তার এই মহান মনীষীর জীবন ও চিন্তা নিয়ে তাঁর রচিত স্মরণ-গ্রন্থ। লক্ষণীয় যে, “নদভী” হিসেবে তিনি নিজেও সেই নদওয়াতুল ওলামারই স্নাতক, যে প্রতিষ্ঠানের প্রাণপুরুষ ছিলেন আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.); ফলে এই গ্রন্থটি তাঁর কাছে শুধু গবেষণা নয়, এক ধরনের প্রতিষ্ঠানিক কৃতজ্ঞতারও প্রকাশ। স্বাধীন সূত্রে এই শিরোনামটি যাচাই করা যায়নি — একটি সূত্রে মাকতাবাতুল আযহার প্রকাশিত “বয়ানদের চোখে সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নাদভী” শিরোনামের একটি সম্পর্কিত গ্রন্থের উল্লেখ পাওয়া গেছে।

এই তালিকা সম্পূর্ণ নয় — পাঠাগার, বইমেটসহ বিভিন্ন ক্যাটালগে তাঁর নামে আরও অসংখ্য গ্রন্থ নথিভুক্ত আছে। তাঁর রচনার একটি বৈশিষ্ট্য হলো সমসাময়িক মুসলিম বিশ্বের সংকটকে তিনি শুধু সংবাদ-দৃষ্টিতে নয়, ঈমানি ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করেন।

পুরস্কার ও সম্মাননা

সাহিত্য ও সমাজসেবায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বেশ কিছু জাতীয় সম্মাননা পেয়েছেন:

  • কিশোরগঞ্জ সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদ পদক
  • শুরূক সাহিত্য পদক
  • শিকড় সম্মাননা পদক
  • আদর্শ নারী গুণীজন সম্মাননা
  • মারকাজুত তাহফিজ সম্মাননা

পুরস্কারগুলো প্রদানের সাল সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সূত্র পাওয়া যায়নি; তাই এই প্রোফাইলে সাল উল্লেখ করা হয়নি।

রচনাশৈলী ও মূল্যায়ন

উবায়দুর রহমান খান নদভীর রচনাশৈলীর মূলে আছে সাংবাদিকের চোখ ও আলেমের হৃদয় — এই দ্বৈত পরিচয়। তিনি ঘটনাস্থলে যান, মানুষের সঙ্গে কথা বলেন, তারপর সেই অভিজ্ঞতাকে ইসলামি ইতিহাস ও আকিদার কাঠামোয় বসিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরেন। আফগানিস্তানে আমি আল্লাহকে দেখেছি-র শিরোনামেই এই শৈলীর ইঙ্গিত আছে: এটি কোনো নিরপেক্ষ ভ্রমণকাহিনি নয়, বরং ঈমানের চশমা দিয়ে দেখা একটি যুদ্ধক্ষেত্রের সাক্ষ্য। তাঁর ভাষা সরল, প্রবহমান ও আবেগঘন; জটিল তাত্ত্বিক পরিভাষার বদলে তিনি গল্প ও দৃশ্যের মাধ্যমে পাঠককে টেনে নেন।

একই সঙ্গে তাঁর সীরাত-বিষয়ক রচনায় — বিশেষ করে অমুসলিম মনীষীর চোখে আমাদের প্রিয় নবী (ﷺ)-তে — দেখা যায় গবেষকের ধৈর্য: অমুসলিম পণ্ডিতদের উদ্ধৃতি সংগ্রহ করে তিনি নবীজীবনের সার্বজনীনত্ব প্রমাণের চেষ্টা করেছেন, যা বাংলাদেশের ইসলামি সাহিত্যে তুলনামূলকভাবে কম-চর্চিত একটি ধারা। সমালোচকরা তাঁকে “দেশের শীর্ষ ইসলামিক প্রাবন্ধিক” বলেছেন — এই মূল্যায়নের পেছনে আছে তাঁর ধারাবাহিকতা: প্রায় পাঁচ দশক ধরে তিনি লিখে চলেছেন, কখনো দৈনিকের কলামে, কখনো সাপ্তাহিকের সম্পাদকীয়তে, কখনো গ্রন্থের পাতায়।

সামগ্রিকভাবে বলা যায়, উবায়দুর রহমান খান নদভী বাংলাদেশের সেই ধারার ইসলামি লেখকদের প্রতিনিধি, যারা মাদ্রাসা-শিক্ষার গভীরতাকে আধুনিক সাংবাদিকতার ভাষায় পাঠকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছেন। সাংবাদিকতা, খেতাবত, শিক্ষকতা ও সংগঠন-নেতৃত্ব — এই চার ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা তাঁর লেখাকে শুধু তথ্যপূর্ণই করেনি, পাঠকের জীবনের সঙ্গে প্রাসঙ্গিকও করে তুলেছে।

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।