পরিতোষ বাড়ৈ
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
এক নজরে
| পূর্ণ নাম | পরিতোষ বাড়ৈ (Paritosh Baroi) |
| জাতীয়তা | বাংলাদেশি |
| পেশা | প্রকৌশলী (ইঞ্জিনিয়ার), লেখক |
| লেখার ধরন | উপন্যাস, কবিতা, নাটক, গান, কিশোরসাহিত্য |
| উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ | মায়ের চিঠি, দু’জনে দুজনার, প্রেমাঞ্জলি, আমরা দু’জন মুক্তিসেনা, উৎসর্গ |
| পুরস্কার | সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সাহিত্য পুরস্কার; নজরুল সাহিত্য সম্মাননা; আব্দুল আলীম স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার প্রভৃতি |
পরিচিতি
পরিতোষ বাড়ৈ বাংলাদেশের একজন বহুমুখী লেখক — পেশায় তিনি প্রকৌশলী, কিন্তু নেশায় ও সাধনায় পুরোদস্তুর সাহিত্যিক। “পেশায় ইঞ্জিনিয়ার, নেশা লেখা” — প্রকাশকদের লেখক-পরিচিতিতে এই এক লাইনেই তার দ্বৈত পরিচয়ের সারসংক্ষেপ ধরা পড়ে। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যের দিকে ঝুঁকে পড়া এই লেখক গান, কবিতা, নাটক, উপন্যাস — সাহিত্যের প্রায় সকল শাখাতেই বিচরণ করেছেন এবং নিরন্তর লিখে চলেছেন। তার লেখার ঘোষিত উদ্দেশ্য সরল ও মানবিক: মানুষকে নির্মল আনন্দ দেওয়া; আর তার অঙ্গীকার ও স্বপ্ন — সমাজ সংস্কার ও আলোকিত সমাজ গড়া। এই দুই মেরুর টানাপোড়েনেই তার সাহিত্যজীবনের গতিপথ নির্ধারিত হয়েছে।
তার জন্মতারিখ ও জন্মস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য সূত্র পাওয়া যায়নি; বইবাজার, রকমারিসহ প্রধান বই-বিক্রেতা সাইটগুলোর লেখক-পরিচিতিতে কেবল তার পেশা, সাহিত্যচর্চা ও পুরস্কারের বিবরণই দেওয়া আছে। এই প্রোফাইলে তাই যাচাইকৃত তথ্যের বাইরে কোনো অনুমান সংযোজন করা হয়নি।
জন্ম ও শিক্ষা
পরিতোষ বাড়ৈর জন্মসাল, জন্মতারিখ বা জন্মস্থান সম্পর্কে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য তথ্য এই প্রোফাইল তৈরির সময় যাচাই করা সম্ভব হয়নি — এটি একটি তথ্য-সীমাবদ্ধতা হিসেবে রেখে দেওয়া হলো। তবে প্রকাশক-সূত্রগুলো নিশ্চিত করে যে, তিনি প্রকৌশল বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নিয়ে পেশাগত জীবনে একজন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। প্রযুক্তি-পেশার কঠোর যুক্তিনির্ভর জগৎ আর সাহিত্যের কল্পনানির্ভর জগৎ — এই দুই জগতের সমান্তরাল বসবাসই তার লেখক-পরিচয়ের সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক দিক। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যের দিকে তার ঝোঁক ছিল; পেশাগত ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি লেখালেখিকে কখনো “শখের” পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখেননি — বরং তাকে করে তুলেছেন জীবনের দ্বিতীয় পেশা।
কর্মজীবন
প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও সাহিত্যচর্চা তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। দিনের বেলার প্রকৌশল-কাজ আর অবসরের সাহিত্যসাধনা — এই দ্বৈত জীবনযাপন বাংলাদেশের লেখক-সমাজে বিরল নয়, কিন্তু পরিতোষ বাড়ৈর ক্ষেত্রে এর বৈশিষ্ট্য হলো ধারাবাহিকতা ও বহুমুখিতা। তিনি একই সঙ্গে কবিতা লেখেন, গান লেখেন, নাটক লেখেন এবং উপন্যাস লেখেন। প্রকাশক-পরিসংখ্যান থেকে তার কর্মঠতার আঁচ পাওয়া যায়: শুধু পার্ল পাবলিশার্সের তালিকাতেই তার নামে ৪৫টি বই নথিভুক্ত আছে, আর সময় প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে তার ৪টি বই। এই সংখ্যা একজন “পেশাদার-বহির্ভূত” লেখকের জন্য রীতিমতো ঈর্ষণীয়।
তার লেখালেখির ঘোষিত লক্ষ্য দুটি — মানুষকে নির্মল আনন্দ দেওয়া এবং সমাজ সংস্কারের স্বপ্নকে এগিয়ে নেওয়া। প্রথমটি বিনোদনমূলক সাহিত্যের, দ্বিতীয়টি দায়বদ্ধ সাহিত্যের দাবি; পরিতোষ বাড়ৈ এই দুইয়ের মধ্যে সেতুবন্ধনের চেষ্টা করেছেন। তার ভাষায়, “সমাজ সংস্কার, লেখার অঙ্গীকার; আলোকিত সমাজ, লেখার স্বপ্ন” — অর্থাৎ লেখক হিসেবে তার কাছে কলম শুধু আনন্দের বাহন নয়, সমাজ বদলের হাতিয়ারও।
সাহিত্যকর্ম
পরিতোষ বাড়ৈর গ্রন্থতালিকা বৈচিত্র্যে ভরপুর — সমকালীন উপন্যাস, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস, কিশোর অ্যাডভেঞ্চার, কবিতা ও গল্প। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে আছে:
- মায়ের চিঠি — সমকালীন উপন্যাস; অনন্যা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত (ISBN 9789849119388)। মা-সন্তানের সম্পর্কের আবেগঘন আখ্যান হিসেবে পাঠকমহলে পরিচিত।
- দু’জনে দুজনার — সমকালীন উপন্যাস; নূর-কাসেম পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত।
- আমরা দু’জন মুক্তিসেনা — মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস; ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত।
- ক্যাপ্টেন রবিন বনাম দুর্ধর্ষ ছেলে ধরা ও ক্যাপ্টেন রবিন বনাম দুষ্ট ছেলের দল — ক্যাপ্টেন রবিন চরিত্রকে কেন্দ্র করে কিশোর অ্যাডভেঞ্চার সিরিজ; তরুণ পাঠকের মধ্যে জনপ্রিয়।
- প্রেমাঞ্জলি — কাব্যগ্রন্থ (হার্ডকভার সংস্করণসহ প্রকাশিত); প্রেম ও মানবিক অনুভূতির কবিতা।
- উৎসর্গ — পার্ল পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত গ্রন্থ।
- নরক নন্দিনী, হারিয়ে যাওয়া কানের দুল — কথাসাহিত্য।
এই তালিকা সম্পূর্ণ নয় — পার্ল পাবলিশার্সের ৪৫টি শিরোনামের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশকের ক্যাটালগে পাওয়া যায়। তার রচনার একটি লক্ষণীয় দিক হলো পাঠকবর্গের বিস্তার: একদিকে শিশু-কিশোরদের জন্য অ্যাডভেঞ্চার, অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের জন্য সমকালীন ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস, আবার কবিতাপ্রেমীদের জন্য কাব্যগ্রন্থ।
পুরস্কার ও সম্মাননা
লেখালেখির স্বীকৃতি হিসেবে পরিতোষ বাড়ৈ একাধিক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন — প্রকাশক-সূত্রগুলোতে (বইবাজারসহ) এই তালিকা অভিন্নভাবে উল্লেখ আছে:
- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সাহিত্য পুরস্কার, মাদারীপুর
- নজরুল সাহিত্য সম্মাননা, ঢাকা
- মরমী কণ্ঠশিল্পী আব্দুল আলীম স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার, বাংলাদেশ লোকগীতি শিল্পীগোষ্ঠি, ঢাকা
- মানবাধিকার সম্মাননা পদক, ঢাকা
- নির্ভিক সংবাদ স্বর্ণপদক, ঢাকা
পুরস্কারগুলোর প্রদানের সাল সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সূত্র পাওয়া যায়নি; তাই এই প্রোফাইলে সাল উল্লেখ করা হয়নি। লক্ষণীয় যে, পুরস্কারের তালিকায় সাহিত্য-স্বীকৃতির পাশাপাশি মানবাধিকার ও সাংবাদিকতা-সংক্রান্ত সম্মাননাও আছে — যা তার “সমাজ সংস্কার”-কেন্দ্রিক লেখক-ভাবমূর্তির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
রচনাশৈলী ও মূল্যায়ন
পরিতোষ বাড়ৈর রচনাশৈলীর মূল বৈশিষ্ট্য সরলতা ও পাঠক-বান্ধবতা। তার ঘোষিত লক্ষ্য “মানুষকে নির্মল আনন্দ দেওয়া” — এই লক্ষ্য তার গদ্যকে জটিলতামুক্ত, প্রবহমান ও আবেগঘন করে তুলেছে। তিনি কঠিন পরীক্ষামূলক ভাষা বা দুর্বোধ্য প্রতীকের পথে হাঁটেননি; বরং সাধারণ পাঠকের হৃদয়স্পর্শী গল্প বলার দিকেই মনোযোগ দিয়েছেন। মায়ের চিঠি-র মতো উপন্যাসে পারিবারিক আবেগ ও মানবিক সম্পর্কই কেন্দ্রীয় উপাদান।
একই সঙ্গে তার লেখায় সমাজ-সচেতনতার একটি স্পষ্ট স্রোত আছে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস আমরা দু’জন মুক্তিসেনা জাতীয় ইতিহাসের প্রতি তার দায়বদ্ধতার প্রমাণ; আর কিশোর অ্যাডভেঞ্চার সিরিজে তিনি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সাহস, সততা ও কৌতূহলের মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। গান ও কবিতায় তার বিচরণ — বিশেষ করে প্রেমাঞ্জলি — প্রমাণ করে যে, তিনি শুধু গদ্যের লেখক নন, ছন্দ ও সুরেরও সাধক।
সামগ্রিক মূল্যায়নে বলা যায়, পরিতোষ বাড়ৈ বাংলাদেশের সেই ধারার লেখকদের প্রতিনিধি, যারা সাহিত্যকে “শিল্পের জন্য শিল্প” হিসেবে নয়, “মানুষের জন্য শিল্প” হিসেবে দেখেন। পেশাগত জীবনের বাইরে দাঁড়িয়ে, কোনো সাহিত্যিক বলয় বা প্রতিষ্ঠানের ছত্রছায়া ছাড়াই, শুধু লেখার নেশা ও সমাজ বদলের স্বপ্নকে পুঁজি করে তিনি কয়েক ডজন গ্রন্থের রচয়িতা হয়েছেন — এই অধ্যবসায়ই তার সাহিত্যজীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়। ভবিষ্যতে তার জন্ম-পরিচয় ও পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থপঞ্জি নিয়ে আরও গবেষণা হলে বাংলাদেশের জনপ্রিয় ধারার সাহিত্যের ইতিহাসে তার অবস্থান আরও স্পষ্ট হবে।