ইমাম নববি র.
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
এক নজরে
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| পূর্ণ নাম | আবু যাকারিয়া মুহিউদ্দীন ইয়াহইয়া ইবনে শারফ আন-নববী |
| জন্ম | অক্টোবর ১২৩৩ (৬৩১ হিজরির মুহাররম; নির্দিষ্ট তারিখ অজ্ঞাত), নাওয়া, সিরিয়া |
| মৃত্যু | ২৪ রজব ৬৭৬ হিজরি (২১ ডিসেম্বর ১২৭৭), নাওয়া |
| পেশা | ফকীহ, মুহাদ্দিস, পণ্ডিত |
| শিক্ষা | দামেস্কের মাদ্রাসা আর-রাওয়াহিয়া |
| উল্লেখযোগ্য কর্ম | রিয়াদুস সালেহীন, আল-আরবাঈন আন-নববীয়া, আল-আযকার, আল-মিনহাজ ফী শারহি সহীহ মুসলিম, মিনহাজুত তালিবীন |
পরিচিতি
ইমাম নববী (অক্টোবর ১২৩৩ – ২১ ডিসেম্বর ১২৭৭) ১৩শ শতকের একজন শাফেয়ী ফকীহ ও হাদিস-বিশারদ, যার রচনা প্রামাণ্য হাদিস-সংকলনগুলোর বাইরে সুন্নি ইসলামে সবচেয়ে বেশি পঠিত গ্রন্থের মধ্যে গণ্য হয়। মাত্র ৪৫ বছরের জীবনে তিনি হাদিস, ফিকহ, জীবনী ও ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে অসংখ্য দীর্ঘ রচনা রেখে গেছেন, যা আজও পঠিত হয়। শাফেয়ী মাযহাবে তিনি ও আবুল কাসিম আর-রাফিয়ী "দুই শাইখ" (আশ-শাইখান) হিসেবে পরিচিত।
জন্ম ও শিক্ষা
৬৩১ হিজরির মুহাররম মাসে (১২৩৩ সালের অক্টোবর; নির্দিষ্ট তারিখ অজ্ঞাত) দামেস্কের দক্ষিণে হাওরান সমভূমির নাওয়া গ্রামে তার জন্ম — "আন-নববী" উপাধি এই জন্মস্থান থেকেই এসেছে। শৈশব থেকেই তিনি খেলাধুলার প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন না; কুরআন মুখস্থে মগ্ন থাকার জন্য অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলতে অস্বীকার করার কাহিনী প্রচলিত আছে। ১৯ বছর বয়সে তিনি দামেস্কে গিয়ে মাদ্রাসা আর-রাওয়াহিয়ায় ভর্তি হন এবং যুগের শীর্ষ আলেমদের কাছে শিক্ষা লাভ করেন — বর্ণিত আছে, তিনি দিনে বারোটি পাঠ-অধিবেশনে অংশ নিতেন এবং বিশ জনেরও বেশি শিক্ষকের কাছে পড়েছেন। ১২৫৩ সালে তিনি হজ সম্পন্ন করেন।
কর্মজীবন
হজের পর তিনি দামেস্কে ব্যক্তিগত পণ্ডিত হিসেবে বসবাস শুরু করেন। ১২৬৭ সালে তিনি আশরাফিয়া মাদ্রাসায় হাদিসের অধ্যাপক হিসেবে আবু শামার স্থলাভিষিক্ত হন। বিচারক হিসেবেও তিনি পরামর্শ ও বিরোধ-নিষ্পত্তির জন্য বহুলভাবে খোঁজা হতেন। শাসকদের কাছ থেকে উপহার গ্রহণে তিনি অস্বীকৃতি জানাতেন এবং একবার শরিয়া-বিরোধী কর আরোপের জন্য মামলুক সুলতান বাইবার্সকে প্রকাশ্যে তিরস্কার করেছিলেন বলে বর্ণিত আছে।
রচনাবলি
তার রচনাসম্ভার ইসলামি জ্ঞানের প্রায় প্রতিটি শাখাকে স্পর্শ করেছে। সবচেয়ে বিখ্যাত: রিয়াদুস সালেহীন (সৎকর্মশীলদের বাগান) — ইসলামি আধ্যাত্মিক জীবনের সর্বজনীন নির্দেশিকা; আল-আরবাঈন আন-নববীয়া — চল্লিশ হাদিসের সংকলন (প্রকৃতপক্ষে ৪২টি হাদিস), যা প্রত্যেক ধর্মশিক্ষার্থীর মুখস্থ থাকে; আল-আযকার — দোয়া-যিকিরের অপরিহার্য গ্রন্থ; আল-মিনহাজ ফী শারহি সহীহ মুসলিম — সহীহ মুসলিমের মান্য ব্যাখ্যা; এবং মিনহাজুত তালিবীন — শাফেয়ী ফিকহের মৌলিক পাঠ্যগ্রন্থ, যার ব্যাখ্যা-গ্রন্থে পরবর্তী শতাব্দীগুলো ভরে আছে। এছাড়া রওদাতুত তালিবীন, আত-তিবয়ান ফী আদাবি হামালাতিল কুরআন ও বুসতানুল আরিফীন উল্লেখযোগ্য।
ব্যক্তিগত জীবন
ইমাম নববী বিয়ে করেননি। তিনি অত্যন্ত সাদাসিধে ও সংযমী জীবনযাপন করতেন — অল্প আহার করতেন এবং পড়াশোনা ও লেখালেখি ছাড়া অন্য সব কাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখতেন। পিতা যদিও বিখ্যাত বংশের ছিলেন না, তবে ধার্মিক ও খোদাভীরু হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
৬৭৬ হিজরির ২৪ রজব (২১ ডিসেম্বর ১২৭৭) তিনি জন্মস্থান নাওয়াতেই মৃত্যুবরণ করেন; বয়স হয়েছিল ৪৫ বছর। সেখানেই তার সমাধি, যা আজও জ্ঞানপিপাসুদের দর্শনস্থল। তার গ্রন্থগুলো পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি ঐতিহ্যবাহী সুন্নি মাদ্রাসা, ইসলামি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান ও মসজিদের পাঠচক্রের পাঠ্যক্রমের ভিত্তি হয়ে আছে — এটাই তার অমরত্বের প্রমাণ।