শহীদুল্লাহ কায়সার
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
এক নজরে
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| পূর্ণ নাম | শহীদুল্লাহ কায়সার |
| প্রকৃত নাম | আবু নঈম মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ |
| ইংরেজি নাম | Shahidullah Kaiser |
| জন্ম | ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯২৭ (কিছু ইংরেজি সূত্রে ১৯২৬) |
| জন্মস্থান | মজুপুর গ্রাম, সোনাগাজী, ফেনী (তৎকালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত) |
| অন্তর্ধান | ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১, ঢাকা (আর ফিরে আসেননি; মৃত বলে ধারণা করা হয়) |
| জাতীয়তা | বাংলাদেশি |
| পেশা | ঔপন্যাসিক, সাংবাদিক, সম্পাদক |
| শিক্ষা | প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা — অর্থনীতিতে অনার্সসহ বিএ (১৯৪৬) |
| উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ | সারেং বৌ (১৯৬২); রাজবন্দীর রোজনামচা (১৯৬২); সংশপ্তক (১৯৬৫); পেশোয়ার থেকে তাসখন্দ (১৯৬৬) |
| পুরস্কার | বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার; একুশে পদক (১৯৮৩, মরণোত্তর); স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৯৮, মরণোত্তর) |
পরিচিতি
শহীদুল্লাহ কায়সার (১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯২৭ – ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১) বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ঔপন্যাসিক, সাংবাদিক ও শহীদ বুদ্ধিজীবী। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গভীরভাবে সম্পৃক্ত এই লেখক সারেং বৌ ও সংশপ্তক-এর মতো উপন্যাসে মানুষের অস্তিত্বের সংগ্রাম ও রাজনৈতিক চেতনার চিত্র এঁকেছেন। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীদের হাতে অপহৃত হয়ে তিনি আর ফিরে আসেননি; বাংলাদেশ প্রতি বছর এই দিনটিকে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে স্মরণ করে।
জন্ম ও শিক্ষা
শহীদুল্লাহ কায়সারের প্রকৃত নাম আবু নঈম মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। তার জন্ম ফেনীর (তৎকালীন নোয়াখালী জেলার) সোনাগাজীর মজুপুর গ্রামে। বাবা মাওলানা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ কলকাতা আলিয়া ও ঢাকা আলিয়া মাদরাসার অধ্যাপক ছিলেন; মা সৈয়দা সুফিয়া খাতুন। আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ; প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান তার ছোট ভাই। সরকারি মডেল স্কুল ও মাদরাসা-ই-আলিয়ার অ্যাংলো-পার্সিয়ান বিভাগে পড়ে ১৯৪২ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯৪৬ সালে অর্থনীতিতে অনার্সসহ বিএ পাস করেন; এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ এবং রিপন কলেজে (বর্তমান সুরেন্দ্রনাথ আইন কলেজ) আইন পড়া শুরু করেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর বাবার সঙ্গে ঢাকায় চলে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে এমএ-তে ভর্তি হন, তবে ডিগ্রি শেষ করেননি। তথ্য-নোট: তার জন্মসাল নিয়ে সূত্রে ভিন্নতা আছে — বাংলা অধিকাংশ সূত্রে (বাংলা উইকিপিডিয়া, রকমারি) ১৯২৭, আর ইংরেজি উইকিপিডিয়ায় বর্তমানে ১৯২৬ লেখা আছে।
সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক জীবন
ছাত্রজীবন থেকেই শহীদুল্লাহ কায়সার রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন; ১৯৪৭ সালের পর তিনি পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। ১৯৪৯ সালে ঢাকায় সাপ্তাহিক ইত্তেফাকে যোগ দিয়ে সাংবাদিকতা শুরু করেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার জন্য ৩ জুন ১৯৫২ তারিখে গ্রেপ্তার হন এবং সাড়ে তিন বছর কারাভোগ করেন; ১৯৫৫ সালেও রাজনৈতিক ধরপাকড়ে আবার গ্রেপ্তার হন। ১৯৫৬ সালে মাওলানা ভাসানী পরিচালিত সাপ্তাহিক ইত্তেফাকে যোগ দেন এবং ১৯৫৮ সালে দৈনিক সংবাদের সহকারী সম্পাদক হন — আমৃত্যু এই পত্রিকার সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন। ১৯৫৮ সালের ১৪ অক্টোবর সামরিক আইন জারির পর আবার গ্রেপ্তার হয়ে ১৯৬২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন; মুক্তির পর দৈনিক সংবাদে ফিরে আসেন।
সাহিত্যজীবন
কারাজীবনের অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক চেতনা শহীদুল্লাহ কায়সারের সাহিত্যের প্রাণ। তার প্রধান গ্রন্থগুলো হলো: সারেং বৌ (১৯৬২) — মানুষের অস্তিত্বের সংগ্রাম নিয়ে লেখা উপন্যাস, যা পরে চলচ্চিত্রায়িত হয়; রাজবন্দীর রোজনামচা (১৯৬২) — কারাজীবনের বিবরণভিত্তিক অকল্পকাহিনী; সংশপ্তক (১৯৬৫) — মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সামাজিক বাস্তবতার মহাকাব্যিক উপন্যাস; পেশোয়ার থেকে তাসখন্দ (১৯৬৬) — রাজনৈতিক ভ্রমণকাহিনী। এছাড়া তার গ্রন্থের মধ্যে আছে কৃষ্ণচূড়া মেঘ, তিমির বলয়, দিগন্তে ফুলের আগুন, সমুদ্র ও তৃষ্ণা, চন্দ্রভানের কন্যা এবং অসমাপ্ত উপন্যাস কবে পোহাবে বিভাবরী।
ব্যক্তিগত জীবন
শহীদুল্লাহ কায়সার দুবার বিয়ে করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি পান্না চৌধুরীকে (পান্না কায়সার) বিয়ে করেন; পান্না কায়সার পরবর্তীতে লেখক হিসেবে পরিচিতি পান এবং ১৯৯৬–২০০১ মেয়াদে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন। তাদের দুই সন্তান — অমিতাভ কায়সার ও শমী কায়সার; শমী টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র অভিনেত্রী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন।
পুরস্কার ও সম্মাননা
তিনি পেয়েছেন আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬২), বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (বাংলা সূত্রে ১৯৬২; ইংরেজি উইকিপিডিয়ায় ১৯৬৯ উল্লেখ আছে), একুশে পদক (১৯৮৩, মরণোত্তর) এবং স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৯৮, মরণোত্তর)।
অন্তর্ধান ও উত্তরাধিকার
মুক্তিযুদ্ধের শেষলগ্নে, ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর রাতে, ঢাকার বাসা থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের স্থানীয় সহযোগী আল-বদর তাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়; তিনি আর ফিরে আসেননি। ধারণা করা হয়, অপহরণকারীদের হাতে তিনি নিহত হন। তাকে খুঁজতে গিয়ে তার ছোট ভাই জহির রায়হানও নিখোঁজ হন। বাংলাদেশ ১৪ ডিসেম্বরকে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে পালন করে। তার উপন্যাস সংশপ্তক বাংলাদেশের সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক উপন্যাস হিসেবে বিবেচিত।