ইমাম শামসুদ্দীন আয যাহাবী
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
এক নজরে
| পূর্ণ নাম | আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবন আহমদ ইবন উসমান ইবন কায়মায আত-তুরকুমানি আল-ফারিকি আদ-দিমাশকি, শামসুদ্দীন আয-যাহাবী |
| জন্ম | ৫ অক্টোবর ১২৭৪ খ্রি. (৬৭২/৬৭৩ হিজরি — সূত্রভেদে ভিন্ন) |
| জন্মস্থান | দামেস্ক, মামলুক সালতানাত (বর্তমান সিরিয়া) |
| মৃত্যু | ৩ ফেব্রুয়ারি ১৩৪৮ খ্রি. (৭৪৮ হিজরি), দামেস্ক |
| জাতীয়তা | সিরীয় (দামেস্ক-ভিত্তিক) |
| পেশা | ইতিহাসবিদ, হাদিসবেত্তা, জীবনীকার, কিরাআত-বিশেষজ্ঞ |
| শিক্ষা | দামেস্কে প্রাথমিক শিক্ষা; কায়রোসহ বিভিন্ন শহরে জ্ঞানার্জন-ভ্রমণ |
| উল্লেখযোগ্য কর্ম | সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, তারিখুল ইসলাম আল-কাবির, মিযানুল ই’তিদাল, তাযকিরাতুল হুফ্ফায, কিতাবুল কাবায়ির |
| পুরস্কার | — (মধ্যযুগীয় প্রেক্ষাপটে প্রযোজ্য নয়) |
পরিচিতি
শামসুদ্দীন আয-যাহাবী (১২৭৪–১৩৪৮) মধ্যযুগীয় ইসলামী জগতের অন্যতম প্রধান ইতিহাসবিদ, হাদিস-সমালোচক ও জীবনীকার। ইসলামের ইতিহাস ও হাদিস-বর্ণনাকারীদের জীবনী নিয়ে তার রচিত বিশালাকার গ্রন্থমালা আজও এ দুই শাস্ত্রের মৌলিক উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। হাদিসের বর্ণনাকারীদের নির্ভরযোগ্যতা যাচাইয়ের শাস্ত্রে (ইলমুর রিজাল) তাকে অগ্রগণ্য কর্তৃপক্ষ হিসেবে গণ্য করা হয়।
জন্ম ও শিক্ষা
তিনি দামেস্কে ১২৭৪ খ্রিস্টাব্দের ৫ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন; হিজরি সাল নিয়ে সূত্রে মতভেদ আছে — কোনো সূত্রে ৬৭২, কোনো সূত্রে ৬৭৩ হিজরি উল্লেখ আছে। তিনি ছিলেন তুর্কমান বংশোদ্ভূত; তার পূর্বপুরুষদের আবাস ছিল মায়্যাফারিকিন (দিয়ারবাকরের উত্তর-পূর্বাঞ্চল)। প্রাথমিক শিক্ষা দামেস্কে সম্পন্ন করে তিনি জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে কায়রোসহ বিভিন্ন শহর ভ্রমণ করেন। তার উল্লেখযোগ্য শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন আল-মিযযি, আল-বিরযালি ও ইবন তাইমিয়্যাহ। হাদিসশাস্ত্রের পাশাপাশি তিনি কুরআনের কিরাআত (প্রামাণ্য পাঠপদ্ধতি) শাস্ত্রেও বিশেষজ্ঞ হিসেবে স্বীকৃতি পান এবং ফিকহে শাফিঈ মাযহাবের অনুসারী ছিলেন।
কর্মজীবন
আয-যাহাবী জীবনের বড় অংশ দামেস্কে শিক্ষাদান ও গ্রন্থরচনায় কাটান। হাদিসের বর্ণনাকারীদের জীবনী ও নির্ভরযোগ্যতা নিরূপণে তিনি যে পদ্ধতিগত ও সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করেন, তা পরবর্তী শতাব্দীর গবেষকদের জন্য আদর্শ হয়ে ওঠে। তার দ্বারা প্রভাবিত পণ্ডিতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ইবন কাসির, তাজুদ্দীন আস-সুবকি, ইবন রাজাব ও ইবন হাজার আল-আসকালানি। জীবনীকারদের বর্ণনা অনুযায়ী, মৃত্যুর প্রায় সাত বছর আগে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারান; তবুও রচনার কাজ চালিয়ে যান।
রচনাবলি
তার রচিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় একশত বলে উল্লেখ করা হয়। প্রধান গ্রন্থগুলো:
- সিয়ারু আ’লামিন নুবালা — ইসলামী ইতিহাসের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জীবনীসংকলন; তেইশ খণ্ডের বিশাল গ্রন্থ।
- তারিখুল ইসলাম আল-কাবির — ইসলামের বৃহৎ ইতিহাস; প্রায় ছত্রিশ খণ্ডে রচিত।
- মিযানুল ই’তিদাল ফি নাকদির রিজাল — হাদিস-বর্ণনাকারীদের সমালোচনামূলক নিরূপণ।
- তাযকিরাতুল হুফ্ফায — হাদিস-স্মারকদের (হাফিয) জীবনীসংকলন।
- আল-মুগনি ফিদ দু’আফা, কিতাবুল কাবায়ির প্রভৃতি।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
১৩৪৮ খ্রিস্টাব্দের ৩ ফেব্রুয়ারি (৭৪৮ হিজরি) দামেস্কেই তার মৃত্যু হয়; বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। তার রচনাবলি, বিশেষ করে সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ও তারিখুল ইসলাম, পরবর্তী প্রায় সাত শতাব্দী ধরে ইসলামী ইতিহাস-গবেষণার অপরিহার্য উৎস হিসেবে টিকে আছে। হাদিস-সমালোচনা ও জীবনী-সাহিত্যের ক্ষেত্রে তার প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি আজও অনুসরণীয়।