ইমাম ইবনু কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
এক নজরে
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| পূর্ণ নাম | শামসুদ্দীন আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনু আবি বকর ইবনু আইয়ূব আয-যুরঈ আদ-দিমাশকি |
| পরিচিত নাম | ইবনু কায়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ (সংক্ষেপে ইবনুল কায়্যিম) |
| জন্ম | ২৯ জানুয়ারি ১২৯২ (৭ সফর ৬৯১ হিজরি), দামেস্ক |
| মৃত্যু | ১৫ সেপ্টেম্বর ১৩৫০ (১৩ রজব ৭৫১ হিজরি), দামেস্ক — বয়স ৫৮ |
| সমাধিস্থল | বাবুস সাগির কবরস্থান, দামেস্ক |
| জাতীয়তা | সিরীয় (মামলুক যুগ) |
| পেশা | ইসলামি পণ্ডিত, ফকিহ, ধর্মতত্ত্ববিদ, হাদিস-বিশারদ, আধ্যাত্মিক লেখক |
| মাযহাব | হানবালি |
| শিক্ষা | দামেস্কে ধ্রুপদি ইসলামি শিক্ষা; ত্রিশের অধিক আলেমের কাছে অধ্যয়ন; প্রধান শিক্ষক ইবনু তাইমিয়্যাহ |
| উল্লেখযোগ্য কর্ম | মাদারিজুস সালিকীন; যাদুল মাআদ; ই’লামুল মুওয়াক্কিঈন; আদ-দা ওয়াদ-দাওয়া; আল-ফাওয়াইদ; আল-ওয়াবিলুস সায়্যিব; মিফতাহু দারিস সাআদাহ; তাহযীবু সুনানি আবি দাউদ |
পরিচিতি
শামসুদ্দীন আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনু আবি বকর ইবনু আইয়ূব আয-যুরঈ আদ-দিমাশকি — “ইবনু কায়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ” নামে পরিচিত — ছিলেন চতুর্দশ শতকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম চিন্তাবিদ। হানবালি মাযহাবের এই ফকিহ, ধর্মতত্ত্ববিদ ও আধ্যাত্মিক লেখক ছিলেন সংস্কারক ইবনু তাইমিয়্যার সর্বাপেক্ষা ঘনিষ্ঠ শিষ্য ও আজীবন সঙ্গী। হানবালি ফিকহের কঠোর যুক্তিনিষ্ঠার সঙ্গে হৃদয়, আত্মার অবস্থা ও বিশ্বাসীর অন্তর্জীবনের অসাধারণ গভীর আলোচনার সমন্বয় তার রচনার বৈশিষ্ট্য — এ কারণে “হৃদয়ের আলেম” হিসেবেও তিনি অভিহিত হন। তার গ্রন্থাবলি আজও সুন্নি জগতে ইসলামি জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্রীয় পাঠ।
জন্ম ও শিক্ষা
৬৯১ হিজরির ৭ সফর (২৯ জানুয়ারি ১২৯২ খ্রিস্টাব্দ) দামেস্কে তার জন্ম। তার বাবা আবু বকর ইবনু আইয়ূব ছিলেন দামেস্কের আল-জাওযিয়্যাহ মাদরাসার অধ্যক্ষ (কায়্যিম) — এই মাদরাসা দামেস্কের হানবালি বিচারকের আদালত হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। বাবার এই পদ থেকেই তার উপাধি “ইবনু কায়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ” অর্থাৎ “জাওযিয়্যাহ (মাদরাসার) অধ্যক্ষের পুত্র”।
তিনি ত্রিশের অধিক সমকালীন প্রখ্যাত আলেমের কাছে অধ্যয়ন করেন। তবে তার বৌদ্ধিক জীবনের নির্ণায়ক ঘটনা ঘটে ১৩১২ সালে, একুশ বছর বয়সে, যখন তিনি ইবনু তাইমিয়্যার সাক্ষাৎ পান। এরপর থেকে ইবনু তাইমিয়্যার মৃত্যু (৭২৮ হিজরি/১৩২৮ খ্রিস্টাব্দ) পর্যন্ত তিনি তার সর্বাপেক্ষা ঘনিষ্ঠ শিষ্য ও সঙ্গী ছিলেন; ইবনু তাইমিয়্যার সঙ্গে তিনি দামেস্কের দুর্গে কারারুদ্ধও হন।
সাহিত্যজীবন ও রচনাবলি
ইবনু কায়্যিম ছিলেন অত্যন্ত প্রসূত লেখক — আকিদা, ফিকহ, হাদিস, কুরআন-ভাষ্য ও আধ্যাত্মিকতা বিষয়ে তার রচনাসম্ভার “মতবাদগত ও সাহিত্যিক” উভয় দিক থেকেই সমৃদ্ধ। তার প্রধান গ্রন্থগুলো:
- মাদারিজুস সালিকীন — আবু ইসমাঈল আল-হারাবির মানাযিলুস সায়িরীন-এর বিস্তারিত ভাষ্য; আধ্যাত্মিক পথের স্তরসমূহের মানচিত্র
- যাদুল মাআদ (পরকালের পাথেয়) — ইবাদত, আচরণ ও দৈনন্দিন জীবনে নববী পদ্ধতির বিস্তারিত নির্দেশিকা; এই গ্রন্থ থেকেই তার চিকিৎসা-বিষয়ক অংশ পৃথকভাবে “তিব্বে নববী” নামে পরিচিতি পায়
- ই’লামুল মুওয়াক্কিঈন — ফতোয়া-প্রদানের মূলনীতি বিষয়ে
- আদ-দা ওয়াদ-দাওয়া — হৃদয়ের রোগ ও তার প্রতিকার বিষয়ে
- আল-ফাওয়াইদ — আধ্যাত্মিক ও বৌদ্ধিক প্রতিফলনের বিখ্যাত সংকলন
- আল-ওয়াবিলুস সায়্যিব মিনাল কালিমিত তাইয়্যিব — আল্লাহর যিকিরের ফযিলত বিষয়ে
- মিফতাহু দারিস সাআদাহ ও শিফাউল আলীল — তাকদির, ঐশী প্রজ্ঞা ও কার্যকারণ বিষয়ে
- তাহযীবু সুনানি আবি দাউদ — হাদিস-সংকলনের পরিমার্জন
তার ছাত্র ও প্রভাবিতদের মধ্যে ছিলেন শাফিঈ ঐতিহাসিক ইবনু কাসির, হানবালি হাদিস-বিশারদ ইবনু রাজাব এবং ইবনু হাজার আল-আসকালানি। আত্মার বিজ্ঞান-বিষয়ক তার আলোচনা পরবর্তী ইসলামি নীতিশাস্ত্র ও মনোবিজ্ঞানের বহু বিষয়কে পূর্বাভাস দেয় বলে গবেষকরা মনে করেন।
ব্যক্তিগত জীবন
তার জীবনের বেশিরভাগ সময় দামেস্কেই কেটেছে। মুক্তির পর তিনি কয়েকবার মক্কায় হজ্জ পালন করেন এবং কখনো কখনো কাবা শরিফের তাওয়াফ ও ইবাদতে দীর্ঘ সময় মক্কায় অবস্থান করতেন বলে জীবনীসূত্রে উল্লেখ আছে।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
৭৫১ হিজরির ১৩ রজব (১৫ সেপ্টেম্বর ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ) দামেস্কে ৫৮ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়; তাকে দামেস্কের বাবুস সাগির কবরস্থানে দাফন করা হয়। ইবনু তাইমিয়্যার একনিষ্ঠ শিষ্য হলেও স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর ও আধ্যাত্মিক বিষয়ে নিরন্তর আলোচনা — যার মধ্যে সুফি ঐতিহ্যের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য সংলাপও রয়েছে — তার রচনাকে বিভিন্ন মাযহাব ও ধারার পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। মাদারিজুস সালিকীন ও যাদুল মাআদ আজও ধ্রুপদি ইসলামি আধ্যাত্মিকতার সর্বাধিক পঠিত গ্রন্থের অন্যতম।