আব্দুর রহমান আযযাম
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
এক নজরে
| পূর্ণ নাম | আবদুর রহমান হাসান আযযাম (“আযযাম পাশা”) |
| জন্ম | ৮ মার্চ ১৮৯৩ |
| জন্মস্থান | শুবাক আল-গারবি, গিজা গভর্নরেট, মিশর (তৎকালীন খেদিভাতে মিশর) |
| মৃত্যু | ২ জুন ১৯৭৬, কায়রো, মিশর |
| সমাধিস্থল | হেলওয়ানের আযযাম মসজিদ |
| জাতীয়তা | মিশরীয় |
| পেশা | কূটনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ, লেখক |
| শিক্ষা | সেন্ট টমাস হাসপাতাল মেডিকেল স্কুল, লন্ডন (অসমাপ্ত); কাসর আল-আইনি মেডিকেল স্কুল, কায়রো |
| উল্লেখযোগ্য কর্ম | আর-রিসালাতুল খালিদা (The Eternal Message of Muhammad); আরব লীগের প্রথম মহাসচিব (১৯৪৫–১৯৫২) |
পরিচিতি
আবদুর রহমান হাসান আযযাম (৮ মার্চ ১৮৯৩ – ২ জুন ১৯৭৬), “আযযাম পাশা” নামে পরিচিত, ছিলেন একজন মিশরীয় কূটনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ ও লেখক। ১৯৪৫ সালে আরব লীগ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি এর প্রথম মহাসচিব নিযুক্ত হন — ১৯৪৫ সালের ২২ মার্চ থেকে ১৯৫২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ কূটনৈতিক ও সংসদীয় কর্মজীবনে তিনি মিশরীয় জাতীয়তাবাদ ও প্যান-আরব আদর্শের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার আরবি গ্রন্থ আর-রিসালাতুল খালিদা-এর ইংরেজি অনুবাদ দ্য ইটারনাল মেসেজ অব মুহাম্মদ পশ্চিমা পাঠকের কাছে ইসলামের পরিচয় হিসেবে বহুলপঠিত হয়।
জন্ম ও শিক্ষা
১৮৯৩ সালের ৮ মার্চ তৎকালীন খেদিভাতে মিশরের গিজা গভর্নরেটের শুবাক আল-গারবি গ্রামে তার জন্ম — তিনি ছিলেন বাবা-মায়ের বারো সন্তানের অষ্টম। পিতা হাসান বে ছিলেন এলাকার প্রতিষ্ঠিত ভূস্বামী পরিবারের সদস্য; পিতামহ সালিম আলি আযযাম ছিলেন দক্ষিণ গিজা গভর্নরেটের প্রথম আরব পরিচালকদের একজন। ১৯০৩ সালে পরিবারটি হেলওয়ানে চলে আসে। ধর্মীয় মাদ্রাসার বদলে আযযাম জাগতিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার ওপর জোর দেন এবং মাধ্যমিক শেষে চিকিৎসাবিদ্যা পড়ার সিদ্ধান্ত নেন — তার নিজের ভাষায়, রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি চিকিৎসা তাকে যেকোনো জায়গায় কর্মক্ষম রাখবে। ১৯১২ সালে তিনি লন্ডনের সেন্ট টমাস হাসপাতাল মেডিকেল স্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু প্রথম বর্ষ শেষে বলকানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে তিনি পড়াশোনা ছেড়ে ইস্তাম্বুল, আলবেনিয়া ও আনাতোলিয়া ঘুরে উসমানীয়দের পক্ষে যুক্ত হন। লন্ডনে ফেরার ওপর ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা এলে তিনি কায়রোর কাসর আল-আইনি মেডিকেল স্কুলে ভর্তি হন।
লিবিয়ায় প্রতিরোধযুদ্ধ (১৯১৫–১৯২৩)
আযযাম ১৯১৫ থেকে ১৯২৩ সাল পর্যন্ত ইতালীয়দের বিরুদ্ধে লিবিয়ার প্রতিরোধযুদ্ধে সক্রিয় অংশ নেন। ১৯১৫ সালের ডিসেম্বরে তিনি উসমানীয় কর্মকর্তাদের একটি দলের সঙ্গে মিলে সেনুসি বাহিনীতে যোগ দেন। ১৯১৮ সালের ১৮ নভেম্বর ত্রিপোলিতানিয়া প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়; ইতালীয়দের সঙ্গে চুক্তি লঙ্ঘনের পর তিনি ইতালীয়দের চাপ দিতে ন্যাশনাল রিফর্ম পার্টির নেতৃত্ব দেন এবং ১৯২৩ সালের জানুয়ারিতে সাইয়িদ ইদ্রিসের সঙ্গে নির্বাসনে মিশরে ফিরে আসেন। পরবর্তীতে আযযাম বলেন, লিবিয়ার এই অভিজ্ঞতাই তাকে আরববাদের দিকে টেনে এনেছিল। বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণের কারণে তাকে “আরব গেভারা” আখ্যাও দেওয়া হয়।
কর্মজীবন (কূটনীতি ও রাজনীতি)
মিশরে ফিরে ১৯২৪ সালে তিনি ওয়াফদ দলের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন; দলীয় সংবাদপত্রে নিবন্ধ লিখে তিনি পরিচিতি পান। ১৯৩২ সালে ওয়াফদ ত্যাগ করে তিনি রাজা ফারুকের ঘনিষ্ঠ মহলের সদস্য হন। ১৯৩৬ সালে তাকে ইরাক ও ইরানে মিশরের রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত করা হয়; ১৯৩৭ সালে এই দায়িত্বের আওতায় সৌদি আরবও যুক্ত হয়। ১৯৪৪ সালে তিনি আরব বিষয়ক মন্ত্রী হন। ১৯৪৫ সালে আরব লীগ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি এর প্রথম মহাসচিব নির্বাচিত হন — এই পদে তিনি ১৯৫২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছিলেন। ফিলিস্তিন বিভাজনের তিনি ঘোর বিরোধী ছিলেন এবং ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় আরব লীগের নেতৃত্ব দেন।
সাহিত্যজীবন
তার প্রধান গ্রন্থ আর-রিসালাতুল খালিদা (الرسالة الخالدة) — ইংরেজিতে The Eternal Message of Muhammad (ইসলামিক টেক্সটস সোসাইটি)। গ্রন্থটিতে তিনি কূটনীতি ও শাসনব্যবস্থার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে ইসলামী রাষ্ট্রের সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিকের ব্যাখ্যা দিয়েছেন; এতে তিনি মুহাম্মদ (সা.)-এর সাহস, ভালোবাসা, ক্ষমাশীলতা ও বাকপটুতার গুণগান করেছেন এবং ইসলামকে গোত্র, জাতি, বর্ণ, ভাষা বা সংস্কৃতির সংকীর্ণ আসক্তির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলেছেন। বইটির ভূমিকা লিখেছিলেন মার্কিন সাংবাদিক ভিনসেন্ট শীন। ১৯৯৮ সালে রালফ এম. কুরি তার প্রারম্ভিক জীবন নিয়ে The Making of an Egyptian Arab Nationalist শীর্ষক গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশ করেন।
ব্যক্তিগত জীবন
আযযাম ছিলেন সৌদি বাদশাহ আবদুল আজিজের লিবীয় উপদেষ্টা খালিদ আল-হুদ আল-গারগানির জামাতা। তার এক কন্যা সৌদি বাদশাহ ফয়সালের পুত্র মুহাম্মদ বিন ফয়সাল আল সউদের সঙ্গে বিবাহিত হন।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
১৯৭৬ সালের ২ জুন মিশরের কায়রোতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন; বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। হেলওয়ানের আযযাম মসজিদে তাকে দাফন করা হয়। তার উত্তরাধিকারের একটি উল্লেখযোগ্য দিক — ম্যালকম এক্স তার আত্মজীবনীতে দ্য ইটারনাল মেসেজ অব মুহাম্মদ পড়া ও আযযাম পাশার সঙ্গে সাক্ষাতের কথা বর্ণনা করেছেন; এই ঘটনাগুলো তার জীবনে প্রথাগত ইসলামের দিকে মোড় নেওয়ার সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করা হয়। আরব জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রাচীন ও স্পষ্টভাষী মিশরীয় প্রবক্তা হিসেবে তিনি ইতিহাসে স্মরণীয়।