সৈয়দ মুজতবা আলী
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
এক নজরে
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| পূর্ণ নাম | সৈয়দ মুজতবা আলী |
| জন্ম | ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯০৪ |
| জন্মস্থান | করিমগঞ্জ, সিলেট (বাবার কর্মস্থল; বর্তমানে আসাম, ভারত) |
| মৃত্যু | ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪, ঢাকা, বাংলাদেশ |
| সমাধিস্থল | আজিমপুর কবরস্থান, ঢাকা |
| জাতীয়তা | বাংলাদেশি |
| পেশা | লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, ভাষাবিদ, ভ্রমণকারী |
| শিক্ষা | সিলেট সরকারি পাইলট হাইস্কুল (ম্যাট্রিক); বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, শান্তিনিকেতন (বিএ, ১৯২৬); বন বিশ্ববিদ্যালয়, জার্মানি (পিএইচডি, ১৯৩২); আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো (১৯৩৪–৩৫) |
| উল্লেখযোগ্য কর্ম | দেশে বিদেশে (১৯৪৯), পঞ্চতন্ত্র (১৯৫২), চাচা কাহিনী (১৯৫৫), শবনম (১৯৬০), শহরিয়ার (১৯৬৯) |
| পুরস্কার | নরসিংহদাস পুরস্কার (১৯৪৯), আনন্দ পুরস্কার (১৯৬১), একুশে পদক (২০০৫, মরণোত্তর) |
পরিচিতি
সৈয়দ মুজতবা আলী (১৩ সেপ্টেম্বর ১৯০৪ – ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪) ছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বহুমুখী প্রতিভা — একাধারে লেখক, সাংবাদিক, ভ্রমণপিপাসু, শিক্ষাবিদ, পণ্ডিত ও ভাষাবিদ। বাংলাদেশ, ভারত, জার্মানি, আফগানিস্তান ও মিশর — পাঁচটি দেশে বসবাসের অভিজ্ঞতা তার রচনাকে দিয়েছে বিশ্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি। বাংলা ছাড়াও তিনি ফরাসি, জার্মান, ইতালীয়, আরবি, ফারসি, উর্দু, হিন্দি, সংস্কৃত, মারাঠি, গুজরাটি, পশতু ও ইংরেজিসহ প্রায় পনেরোটি ভাষা জানতেন। বাংলা গদ্যে “রম্যরচনা” — বাস্তব অভিজ্ঞতাভিত্তিক কৌতুকপূর্ণ আখ্যান — ধারার অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে তিনি আজও পাঠকের প্রিয় লেখক। তার ভ্রমণকাহিনী দেশে বিদেশে বাংলা সাহিত্যের ক্লাসিকের মর্যাদা পেয়েছে।
নাজেস আফরোজ দেশে বিদেশে-র ইংরেজি অনুবাদ করেন In a Land Far from Home নামে, ফলে আফগানিস্তানে তার অভিজ্ঞতার কাহিনী পৌঁছে যায় আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে। নুরুল মোমেন ও জাযাবরের পাশাপাশি তিনি বাংলা সাহিত্যে “রম্যরচনা” নামে এক অনন্য রচনাধারার পথিকৃৎ — ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, ইতিহাস, ভাষাতত্ত্ব ও কৌতুকের মিশেলে লেখা এই গদ্য বাংলা সাহিত্যে নতুন স্বাদ এনেছিল।
জন্ম ও শৈশব
১৯০৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর সিলেট জেলার করিমগঞ্জে — বাবার কর্মস্থলে — সৈয়দ মুজতবা আলীর জন্ম। তিনি ছিলেন খান্দকার বংশের বাঙালি মুসলিম সৈয়দ পরিবারের সন্তান; পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী তার পিতৃবংশের উৎস তরফের সুফি পীর শাহ সৈয়দ আহমদ মুতাওয়াক্কিল পর্যন্ত বিস্তৃত। বাবা খান বাহাদুর সৈয়দ সিকান্দার আলী ছিলেন সাব-রেজিস্ট্রার; মা আমাতুল মান্নান খাতুন ছিলেন কালা ও বাহাদুরপুরের চৌধুরী পরিবারের কন্যা। তিন ভাইয়ের মধ্যে মুজতবা ছিলেন সবার ছোট — তার বড় ভাই সৈয়দ মুর্তজা আলীও ছিলেন খ্যাতিমান লেখক। পরিবারের পৈতৃক বাড়ি ছিল হবিগঞ্জের বাহুবলের উত্তরসুর গ্রামের খান্দকার বাড়ি।
শিক্ষাজীবন
সিলেট সরকারি পাইলট হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন মুজতবা আলী। ১৯১৯ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিলেট সফরে এলে তার সঙ্গে মুজতবার সাক্ষাৎ হয় — এই সাক্ষাৎ তার সাহিত্যজীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। ১৯২১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিয়ে তিনি স্কুল ছাড়েন — জেলা কমিশনারের বাড়ি থেকে পুজোর ফুল তোলার অপরাধে কিছু হিন্দু ছাত্রকে শাস্তি দেওয়ার প্রতিবাদে এবং ওই বছরই শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন; ১৯২৬ সালে বিএ ডিগ্রি নিয়ে তিনি বিশ্বভারতীর প্রথম দিককার স্নাতকদের একজন হন। কিছুদিন আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়েন। এরপর ভিলহেল্ম হুমবোল্ট বৃত্তি নিয়ে ১৯২৯ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত জার্মানিতে পড়াশোনা করেন — বার্লিন ও বন বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৩২ সালে বন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খোজা সম্প্রদায়ের ওপর তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ববিষয়ক গবেষণায় তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন — গবেষণার বিষয় ছিল The Origin of the Khojahs and Their Religious Life Today। ১৯৩৪–৩৫ সালে কায়রোর আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন তিনি।
কর্মজীবন
মুজতবা আলীর কর্মজীবন ছিল তার ভ্রমণজীবনের মতোই বৈচিত্র্যময়। ১৯২৭ থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত তিনি কাবুলে শিক্ষা বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেন — আফগান গৃহযুদ্ধের সময় (১৯২৮–২৯) তিনি কাবুল ত্যাগ করেন। কথিত আছে, কাবুল থেকে ব্রিটিশদের উদ্ধার-তালিকা থেকে তার নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল, কারণ ইউরোপীয়দের আগে সরিয়ে নেওয়ার সমালোচনা করেছিলেন তিনি। ১৯৩৬ থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত বরোদার একটি কলেজে শিক্ষকতা করেন। ১৯৪৯ সালে তিনি বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ হন।
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে তার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা। ১৯৪৭ সালের ৩০ নভেম্বর সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদে তিনিই প্রথম পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার দাবি তোলেন। কলকাতার চতুরঙ্গ পত্রিকায় “পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা” শীর্ষক প্রবন্ধ লেখার পর পাকিস্তান সরকার তার কাছে কৈফিয়ত তলব করে — কিন্তু তিনি পদত্যাগ করে ১৯৪৯ সালের আগস্টে ভারতে চলে যান। ১৯৫০ সালে কিছুদিন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার পর তিনি ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনসের সচিব এবং এর আরবি পত্রিকা সাকাফাতুল হিন্দ-এর সম্পাদক হন। ১৯৫২ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত তিনি নয়াদিল্লি, কটক ও পাটনায় অল ইন্ডিয়া রেডিওতে কাজ করেন — বেতারের মাধ্যমে তার কণ্ঠ ও রচনা পৌঁছে যায় সারা ভারতে। ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি জার্মান ভাষা ও পরে ইসলামি সংস্কৃতির অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা করেন — যে প্রতিষ্ঠানে একদা তিনি ছাত্র ছিলেন, সেখানেই ফিরলেন শিক্ষক হয়ে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন — তার আগে ১৯৭২-এর গোড়া পর্যন্ত তিনি কলকাতায় বসবাস করছিলেন।
সাহিত্যজীবন
১৯৪৯ থেকে ১৯৭৪ — পঁচিশ বছরের লেখকজীবনে সৈয়দ মুজতবা আলী বিশের অধিক গ্রন্থ রচনা করেন। নাট্যগুরু নুরুল মোমেন ও জাযাবর (বিনয় মুখোপাধ্যায়)-এর পাশাপাশি তিনি বাংলা “রম্যরচনা” ধারার অন্যতম প্রবর্তক — বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে লেখা কৌতুকপূর্ণ, বুদ্ধিদীপ্ত আখ্যান, যা তার আকর্ষণীয় লেখনশৈলীর গুণে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। তার প্রধান গ্রন্থগুলো:
- দেশে বিদেশে (১৯৪৯) — কাবুলে অধ্যাপনার দিনগুলোর অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা ভ্রমণকাহিনী; দেশ পত্রিকায় ১৯৪৮–৪৯ সালে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কীর্তিগুলোর একটি। কাবুলের বাজার, পাঠান-তাজিক-হাজারা মানুষ, আফগান রাজনীতির টানাপোড়েন — সবকিছু তিনি তুলে ধরেছেন কৌতুক, মানবিকতা ও গভীর পর্যবেক্ষণের মিশেলে। বইটি পড়ে মনে হয় লেখকের সঙ্গে পাঠকও হেঁটে বেড়াচ্ছেন কাবুলের গলিতে।
- পঞ্চতন্ত্র (১৯৫২) — ইউরোপ, কায়রো ও বরোদার দিনগুলোর চিন্তা ও ছোটগল্পের সংকলন।
- চাচা কাহিনী (১৯৫৫) — কৌতুকপূর্ণ আখ্যানের সংকলন।
- শবনম (১৯৬০) — তার অন্যতম বিখ্যাত রচনা।
- জলে-ডাঙায় — ভ্রমণকাহিনী; পাঠকের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত।
- শহরিয়ার (১৯৬৯), ভবঘুরে ও অন্যান্য (১৯৬২), মুসাফির (১৯৭১) — ভ্রমণ ও আত্মজীবনীমূলক রচনা।
এছাড়া তার গ্রন্থের মধ্যে আছে অবিশ্বাস্য (১৯৫৫), ময়ূরকণ্ঠী (১৯৫৭), ধূপছায়া (১৯৫৮), চতুরঙ্গ (১৯৬০), পরশ পাথর (১৯৬২), টুনিমেম (১৯৬৪), দ্বন্দ্ব মধুর ও রাজা উজির। রম্যরচনা, ভ্রমণকাহিনী, ছোটগল্প ও প্রবন্ধ — গদ্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় তার বিচরণ ছিল।
তার রচনার অংশবিশেষ বাংলাদেশ ও ভারতের (বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা) স্কুল, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ের বাংলা সাহিত্যের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত আছে। মিত্র ও ঘোষ (কলকাতা) ১৯৭৪–৮৩ সালে এগারো খণ্ডে তার রচনাবলী প্রকাশ করে — সম্পাদনা করেন গজেন্দ্রকুমার মিত্র, সুমথনাথ ঘোষ, সবিতেন্দ্রনাথ রায় ও মণীশ চক্রবর্তী।
মুজতবা আলীর ভাষাজ্ঞান ছিল কিংবদন্তিতুল্য — মাতৃভাষা বাংলা ছাড়াও তিনি জানতেন ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, ইতালীয়, আরবি, ফারসি, উর্দু, হিন্দি, সংস্কৃত, মারাঠি, গুজরাটি, পশতু ও রুশ ভাষা। এই বহুভাষিক পাণ্ডিত্য তার রচনায় এনেছিল তুলনামূলক সংস্কৃতির অনন্য দৃষ্টি — কাবুলের বাজার থেকে বার্লিনের কফিঘর, কায়রোর মসজিদ থেকে বরোদার কলেজ — সব জায়গার মানুষ ও ভাষার প্রতি তার ছিল সমান কৌতূহল ও শ্রদ্ধা। ব্যঙ্গ-রচনাতেও তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত; মার্জার নিধন কাব্য-এর মতো রচনায় মক-এপিকের ছোঁয়া দেখেছেন সমালোচকরা।
ব্যক্তিগত জীবন
১৯৫১ সালে মুজতবা আলী রাবেয়া খাতুনকে বিয়ে করেন — বোনদের ঘটকালিতে এই বিয়ে হয়। রাবেয়া খাতুন শিক্ষকতা পেশায় ছিলেন; একসময় তিনি সরকারি অগ্রগামী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন। তাদের দুই পুত্র — সৈয়দ মোশাররফ আলী ফিরোজ ও সৈয়দ জাগলুল আলী ভোজু। দীর্ঘ প্রবাসজীবন ও বহুভাষিক পাণ্ডিত্যের অধিকারী এই মানুষটি ব্যক্তিজীবনে ছিলেন রসবোধে ভরপুর ও অতিথিপরায়ণ।
পুরস্কার ও সম্মাননা
- নরসিংহদাস পুরস্কার (১৯৪৯)
- আনন্দ পুরস্কার (১৯৬১) — আনন্দবাজার গোষ্ঠী প্রদত্ত
- একুশে পদক (২০০৫, মরণোত্তর) — বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসার অল্পদিন পর, ১৯৭৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় সৈয়দ মুজতবা আলী মারা যান; বয়স হয়েছিল ৬৯ বছর। তাকে ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। ভাষা আন্দোলনের অগ্রদূত, বহুভাষাবিদ পণ্ডিত ও রম্যরচনার জাদুকর হিসেবে তিনি বাংলা সাহিত্যে অনন্য স্থান দখল করে আছেন। তার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের পত্রিকায় আজও স্মরণ-নিবন্ধ প্রকাশিত হয়; গবেষকরা তার রচনাশৈলী ও বহুভাষিক পাণ্ডিত্য নিয়ে কাজ করে চলেছেন। তার রচনা আজও পাঠ্যপুস্তকে পড়ানো হয়, এবং ভ্রমণপিপাসু পাঠকের কাছে দেশে বিদেশে রয়ে গেছে চিরন্তন সঙ্গী।