একটি সুসাইড কেস অতঃপর…(ষষ্ঠ এবং শেষ পর্ব )
©মারুফ হুসাইন।
১৩.
ভোর রাতে অপরিচিত একটা নাম্বার থেকে কল আসে। ঘুম চোখে ‘হেলো বলতেই ওপাশ থেকে চাপা আওয়াজে বলে, ‘ভাই আমাকে বাঁচান!’
‘কে বলছেন? কোথা থেকে বলছেন?’
লোকটা কিছু বলার আগেই কেউ একজন বলে উঠে, ‘শুয়োরের বাচ্চায় কারে জানি কল দিসে!’ তারপর একটা আর্তচিৎকার ভেসে আসে। কল কেটে যায়। আমি কল দেই। ওপাশ থেকে কোনো মেয়েলি কন্ঠ জানায়, ‘আপনার ডায়ালকৃত নাম্বারটি এই মুহূর্তে বন্ধ আছে৷’
কয়েক বার কল দেই। একই ফলাফল। মোবাইল বিছানার উপর রেখে ভাবতে থাকি কি করবো? কিছুই মাথায় আসে না৷ উঠে হাত মুখে পানি দেই। ঘুম চলে যায়। বুঝতে পারি, আমি গুরুত্বপূর্ণ কিছু পেতে যাচ্ছি। কিন্তু কি সেটা বুঝতে পারছি না৷ তবে এইটুকু নিশ্চিত যে ফোন দিয়েছে সে বিপদে আছে৷ কি করবো ভাবতেই মনে হলো, নাম্বারটা ট্রেক করে লোকেশন জানতে পারলে হয়তো কিছু একটা করা যাবে। মিলনকে ফোন দেই৷ আমার টিমে সেই এইসব ব্যাপার দেখাশোনা করে। কিন্তু সে ফোন ধরে জানায় সে অফিসে নেই৷
‘আমি একটা নাম্বার মেসেজ করে দিচ্ছি। তুমি দ্রুত অফিসে যাও। নাম্বারটা ট্রেক করে জানাও।’
‘আধ ঘন্টার মধ্যে আপনাকে ফোন দিচ্ছি৷’ বলে মিলন কল কেটে দেয়৷
আমি বের হওয়ার জন্য রেডি হতে থাকি। সালেহার ঘুম ভেঙ্গে গেছে। আমাকে রেডি হতে দেখে জিজ্ঞাসা করলো, ‘এতো রাতে কোথায় যাচ্ছো?’
‘জরূরী কাজ আছে। থানায় যাচ্ছি।’
‘তাই বলে এতো রাতে! তুমি একটু শান্তি দিবে না।’
আমি কোনো উত্তর দিলাম না। ঘুম চোখেই সালেহা উঠে বসল, ‘দু দিন আগে মাথা ফাটিয়ে এসেছো। মাথায় এখনো ব্যান্ডেজ। তবুও তুমি ক্ষান্ত দিচ্ছো না।’
আমি সালেহার কথা কানে নিলাম না৷ বের হয়ে গেলাম৷ সে পিছন থেকে ডেকে বলল, ‘কিছু না বলেও চলে যাচ্ছো কেন?’
‘এসে বলবো।’
গভীর রাত। তাই ভাবলাম আসাদকে নিয়ে যাই। ওর বাড়ির সামনে গিয়ে ওকে ডাকলাম৷ কোনো উত্তর পাওয়া গেলো না। কয়েকটা ডাক দিতেই চাচির গলা শোনা গেলো, ‘কে জামাই?’
‘হ্যাঁ’
‘আসাদ তো বাড়ি নেই। কোন বন্ধুর বাড়িতে গিয়েছে৷ এক সাথে সিনেমা দেখবে বলে।’
আসাদকে না পেয়ে একাই থানার উদ্দেশ্যে ট্রলারব উঠে পরলাম৷ ওপারে গিয়ে একটা সিএনজিও পেয়ে গেলাম। থানায় আসতে কোনো ঝামেলা হলো না। থানায় ঢুকে দেখি সবাই ঝিমুচ্ছে৷ পায়ের আওয়াজ পেয়ে ধরফর করে উঠে আমাকে সালাম দিলো৷ ভিতরে ঢুকতেই রতনকে পেয়ে গেলাম, ‘বুলবুল কোথায়?’ জিজ্ঞাসা করলাম।
‘স্যারের তো দিনে ডিউটি ছিল।’
‘আর কোনো অফিসার নেই?’
‘না অন্য স্যার সপ্তাহ দুয়েক হয়েছে ছুটিতে গেছে।’
‘আচ্ছা। ঠিক আছে৷ আমাকে চা দেও!’ বলে নিজ টেবিলে বসলাম। পাঁচ মিনিটের মাথায় রতন চা দিয়ে গেলো। চায়ের কাপ হাতে নিতেই ফোন বেজে উঠলো। মিলনের ফোন। রিসিভ করলাম, ‘স্যার! নাম্বারটা ডিস্কানেক্ট দেখাচ্ছে৷ ঘন্টাখানেক আগে শেষ কানেক্টেড ছিল যে লোকেশনে সেটা মেসেজ করে দিয়েছি৷ লোকেশন অনুযায়ী গুগল ম্যাপের লিঙ্কও এড করে দিয়েছি।’
‘ঠিক আছে। আগে যে নাম্বারটা দিয়ে ছিলাম সেটার ডিটেইলস বের করেছো?’
‘না স্যার! কাল সকালের মধ্যে পেয়ে যাবেন।’
‘ঠিক আছে। জলদি করো! আর্জেন্ট।’ বলে ফোন রেখে দিলাম। রতনকে ডেকে বললাম, কয়েকজনকে রেডি করে গাড়ি বের করো।’
মিনিট দশেক পর গাড়ি বের করে রতন আমাকে ডাক দিল। গাড়িতে উঠতে গিয়ে দেখি। গাড়িতে দুইজন কন্সটেবল বসে আছে। আর ড্রাইভিং সিটে একজন। আমি রতনকে ডেকে বললাম, ‘কারো কাছেই তো হ্যান্ডগান নেই। যেই বন্দুক আছে, তা থেকে কি বুলেট বের হয়?’
রতন কিছু বলে না। দাঁত কেলিয়ে হেসে উঠলো। আমার আর বুঝতে বাকি থাকে না, এই বন্দুকগুলা শুধুই ডেমো, ‘লকারের চাবি কার কাছে? আমাকে হ্যান্ডগান বের করে দেও।’
‘স্যার চাবি তো আমার কাছে নেই৷ বুলবুল স্যারের কাছে চাবি।’
‘তাহলে কি খালি হাতে যেতে হবে?’
রতন উত্তর দেয় না। আমি কোনো উপায় না পেয়ে গাড়িতে উঠে বসি। ম্যাপ অনুযায়ী গাড়ি চালানোর নির্দেশ দেই৷ ঘন্টাখানেক গাড়ি চালিয়ে একটা গ্রামের ভিতর দিয়ে অনেকটা দূরে চলে আসি। সুনসান রাস্তা। কোনো গাড়ি চলে না। এক জঙ্গলের পাশে এসে ম্যাপের রাস্তা শেষ হয়ে যায়। কিন্তু লোকেশন খেয়াল করে দেখি, জঙ্গলের ভিতরে দেখাচ্ছে। গাড়ি থামিয়ে বলি, ‘জঙ্গলের ভিতর যেতে হবে।’
দুয়েকজন গড়িমসি করতে লাগলো। কিন্তু কিছু বলার সাহস পেলো না। আমি ভিতরের দিকে হাঁটা দিলাম৷ তারা আমাকে অনুসরণ করতে লাগলো। পনেরো মিনিটের মতো হাঁটার পর জঙ্গল শেষ হয়ে খোলা মাঠ দেখা গেলো। দূরে আবছা আবছা একটা ঘর দেখা যাচ্ছে। ম্যাপে দেখলাম৷ লোকেশন সেটাই দেখাচ্ছে। সবাইকে সাবধানে আমার পিছু পিছু আসতে বললাম৷ যেনো কোনো শব্দ না হয়৷
ঘরের দরজায় পৌছে একটা বন্দুক হাতে নিয়ে দরজায় নক করলাম। খুললো না। দুয়েকবার নক করতেই ভিতর থেকে আওয়াজ আসলো, ‘কেডা?’
কিছু বললাম না। চুপ করে রইলাম। আবার জিজ্ঞাসা করলো, ‘কন না কে?’
আরেকজন বলে উঠলো, ‘খুইলা দে! স্যারে আইসে মনে হয়।’
গেট খুলতেই একজন লোক উকি দিলো। আমি তার কপাল বরাবর বন্দুকের বাটালি দিয়ে বারি দিলাম৷ সে পরে গেলো। আমি বন্দুক তাক করে ভিতরে ঢুকে গেলাম৷ একটা লোককে ঘরের সিমেন্টের খুটির সাথে বেধে রাখা হয়েছে৷ তার চেহারা দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে তাকে প্রচুর মারধর করা হয়েছে। তার সামনে দুই জন লোক বসে তাস খেলছিল। আচমকা হামলায় তারা থতমত খেয়ে গেলো।
হাত উঁচু করে দাঁড়িয়ে গেলো৷ বন্দুকে বুলেট নেই আমি জানলেও তারা জানে না। তাই হয়তো সহজে ধরা পড়ে গেছে। না হলে আমাদেরকেও আক্রমণ করার চেষ্টা করতো৷ আমি রতনকে ডাক দিলাম, ‘তাদেরকে হ্যান্ডক্যাফ পরিয়ে নিয়ে যাও! গাড়িতে নিয়ে বসাও!’ বলে বেঁধে রাখা লোকটার দিকে এগিয়ে গেলাম৷ কাছে যেতেই আমার চিনতে আর অসুবিধে হলো না।
তার সাথে কখনো কথা না বললেও দেখেছি৷ চেহারায় চিনি৷ তাতেই ধারণা করে নিলাম, সে হাদি ছাড়া আর কেউই নয়। আমি তার বাঁধন খুলতে লাগলাম৷ ঠিক তখনি বিকট শব্দে কান ধরে আসলো। বন্দুক থেকে গুলি ছোড়ার শব্দ। গোঙ্গানির আওয়াজ করে একজন ধপাস করে পরে গেলো। আমার ঘাড়ে, পিঠে এসে রক্ত লেগেছে৷ আমার পিছনে ফিরে তাকালাম৷
মাত্র দু হাত দূরে লাশটা পড়েছে৷ হাতে থাকা রডটা কিছুটা ছিটকে দূরে গিয়ে পড়েছে৷ ঘরের দরজার পাশেই বুলবুল বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে আছে। আমি তাকাতেই বলল, ‘আরেকটু হলেই আপনাকে মেরে দিতো!’
‘আপনি আসলেন কখন?’
‘আপনারা বের হওয়ার পর পরই থানা থেকে ফোন দিয়ে জানালো কোনো অপারেশনে যাচ্ছেন। তাই আর আমি দেরী করিনি। বের হয়ে গেছি।
‘অহ আচ্ছা।’ বলে আমি লাশটার কাছে আসলাম। মাথার পিছনে গুলি বিধেছে৷ স্পট ডেট৷ বেঁচে থাকার আর কোনো সম্ভাবনা নেই৷ লাশের মাথাটা ঘুরিয়ে চেহারাটা দেখলাম৷ পরিচিত চেহারা।
বেধে রাখার লোকটার বাধন খুলে দিলাম, ‘আহমেদ ভাই! ধন্যবাদ। আপনি না আসলে আজকেই ওরা আমাকে মেরে ফেলতো!’
‘আপনি আমাকে চিনেন কিভাবে?’
‘আপনি সালেহা আপুর বর। স্কুল জীবনে আপু আমার দু ক্লাস সিনিয়র ছিলেন৷ কিন্তু আমি তাকে পছন্দ করতাম৷ আপনার সাথে বিয়ে হয়ে যাওয়ায় আপনাকে অনেক গালি-গালাজও করেছি৷ আর আজ কি না আপনি আমার জীবন বাঁচালেন! আপুর বিয়েটা আমার কাছে মন্দ লাগলেও মন্দ হয়নি। তার বিয়ের জন্যই আমি আজ বেঁচে গেলাম৷’ বলে লোকটা ফাটা ঠোঁট প্রসারিত করে হাঁসার চেষ্টা করলো।
‘আপনার নাম?’
‘হাদি।’
ঘটনাটা আমি অনেকটা ধারণা করে নিলাম। এখন হাদির কাছ থেকে ভালোভাবে জানতে হবে। আগে তার চিকিৎসা দেয়া দরকার। হাদিকে নিয়ে বের হওয়ার আগে বুলবুলকে উদ্দেশ্য করে বললাম, ‘লাশ নেয়ার ব্যবস্থা করেন! আমি ওদের নিয়ে যাচ্ছি।’
গেট পর্যন্ত এগিয়ে গিয়েও আবার পিছিয়ে আসলাম। লাশটার পাশে গিয়ে বসলাম। আমার চোখ বেয়ে পানি ঝরে পরলো। লাশটার দিকে তাকিয়ে ভাবলাম, ‘নিজের জীবনটা কেনো এভাবে নষ্ট করলি আসাদ! তোর বাবা-মায়ের কাছে এখন কি বলবো! তারা কিভাবে সহ্য করবে? সালেহার কাছেই বা কি জবাব দিবো! ও তোকে কতো আদর করতো!’
১৪.
হাবিবার কেসটা মোটামুটি ক্লিয়ার। তবে সজিবের মার্ডারটা এখনো ক্লিয়ার হতে পারছি না। তবে আশা করছি আজকের মধ্যেই হয়ে যাবো। হাদিকে সেবা-শুশ্রূষা দিয়ে কিছুটা স্বাভাবিক করা হয়েছে৷ হাসপাতালে তার সাথে দেখা করতে এসেছি৷
কিছুক্ষণ আগে বুলবুল ফোন দিয়ে জানিয়েছে, লাশ মর্গে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে৷ এখন সে থানায় বসে কেসটার ফাইল রেডি করছে। আমি গেলেই আমাকে দেখিয়ে সাবমিট করে দিবে৷
হাদির কাছ থেকে পুরো ঘটনা জানতে চাইলাম। সে বলতে শুরু করলো, ‘সেদিন হাবিবার পড়া শেষ করতে দেরী হয়ে যায়। আমিও তাকে এগিয়ে দিতে যাই। ঘর থেকে বের হতেই এক চাচার সাথে দেখা হয়৷ তার সাথে কথা বলা শেষ করে দেখি, হাবিবা নেই।
কিছু দূর হেঁটে গিয়েও যখন তাকে দেখলাম না তখন ভাবলাম সে চলে গেছে৷ বাড়ির দিকে ফেরার সময় মনে হয় একটা সিগারেট খাওয়া দরকার। তাই পুকুরের ওপারের জঙ্গলটার কাছাকাছি যাই। সেখানে গিয়ে হাতাহাতির শব্দ পেয়ে ভিতরে ঢুকে হাবিবাকে দেখতে পাই৷ আসাদসহ আরো চারজন লোক তাকে জোর-জবরদস্তি করে বেঁধে ফেলেছে৷
আমি তাদেরকে বাঁধা দিতে গেলে আমার উপর হামলা করে। মেরে আমাকে অজ্ঞান করে ফেলে। তারপর কি হয়েছে আমি আর বলতে পারবো না৷ জ্ঞান ফিরতেই আসাদ আমাকে বাড়িতে ফোন দিয়ে বলতে বাধ্য করে যে আমি ঢাকা যাচ্ছি। আমার বন্ধু এক্সিডেন্ট করেছে বলে। আমাকে ঐ বাড়িটাতে বেঁধে রেখে অত্যাচার করা শুরু করে।
একদিন আসাদ কার সাথে ফোনে কথা বলছিলো, তার কথাতেই বুঝতে পারি যে কেসটা আপনি দেখছেন৷ আপনার একটা ভিজিটিং কার্ড আমার মানিব্যাগে ছিলো৷ অনেক আগেই নিয়ে রেখেছিলাম। ভেবেছিলাম, আপনি আমার পছন্দের মানুষকে বিয়ে করেছেন। আপনাকে মাঝে মধ্যে ফোন করে বিরক্ত করবো। তাই নিয়েছিলাম৷ কখনো ফোন না দিলেও ফালানো হয়নি৷’ বলে হাদি আমার দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হেসে দিলো।
‘তারপর বলুন!’
‘তার কয়েক দিন পর এক দুপুরে তাদের অনুপস্থিতিতে আমি পালিয়ে যাই। বাজারে গিয়ে আপনাকে ফোন দেই। কিন্তু ভালোভাবে কিছু বলিনি কারণ আসাদ যদি আপনার সাথে থাকে তাহলে বিপদ হয়ে যেতো। তাই এভাবে বলি। কিন্তু এরপর দিন সকালে আসাদের সাথে থাকা লোকগুলোর কাছে আমি ধরা খেয়ে যাই।
তারা আমাকে আবার ধরে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখে। আজ রাতে আমার পাশে মোবাইল রেখে তারা বাইরে যায়৷ সে সুযোগেই আপনাকে ফোন দেই।’ হাদি থামে।
‘স্যার! আপনি সেদিন যে ক্রিমিনালটাকে ভর্তি করেছেন। তার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি৷ তাকে মারা হয়েছে। আজ সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে গিয়ে চোখে পরলো, তার অক্সিজেন মাস্ক খুলে দেয়া হয়েছিলো। যার কারণে তার মৃত্যু ঘটে৷’ একজন ডাক্তার এসে বললেন।
‘কে মেরেছে?’
‘স্যার আপনি এসেই ফুটেজ দেখে যান!’
আমি ডাক্তারের সাথে গেলাম। সিসিটিভি রুমে গিয়ে কম্পিউটারে ফুটেজ অন করলো। খুনিকে চিনতে আমার আর দেরী হয়নি৷ আমি ডাক্তার সিসিটিভি ফুটেজের কপি আমাকে দিতে বলে সিকিউরিটি রুম থেকে বেরিয়ে আসলাম।
আমার মোবাইল বেজে উঠলো। মিলনের কল, ‘নাম্বারের ডিটেইলস পাঠিয়ে দিয়েছে।’ আমি হাদির কেবিনে গিয়ে বললাম, ‘আপনি থাকুন! আমি কাজ সেড়ে আসছি।’ আমি থানার উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেলাম৷ থানায় ঢুকতেই বুলবুল এসে আমার কাছে ফাইলটা দিয়ে বলল, ‘দেখুন স্যার! ঠিক আছে কি না!’
আমি ফাইলটা হাতে নিয়ে বললাম, ‘আমার রুমে আসুন! তার আগে চা দিতে বলেন।’
আমি চেয়ার বসতেই বুলবুল নিজেই হাতে করে চায়ের কাপ নিয়ে আসলো। আমি কাপ হাতে নিয়ে তাকে বসতে বললাম। সে বসলো। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বললাম, ‘আপনার বন্দুকটা দিন তো!’
সে কোমড় থেকে খুলে আমার হাতে দিল। বন্দুকটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে আমি বললাম, ‘ঘটনা কি আপনি বলবেন না আমি বলবো?’
‘ঠিক বুঝলাম না স্যার!’
‘নাটক করবেন না৷ আমাকে বলতে বাধ্য করবেন না৷ তাহলে আপনারই ক্ষতি।’
‘মানে স্যার?’
‘আমি কোথায় যাচ্ছি কাউকে জানায়নি। এমনকি আমি নিজেও জানতাম না৷ কিন্তু আপনি কিভাবে গেলেন সেখানে?’
বুলবুল আমতা আমতা করতে লাগলো৷ কিছু বলতে পারছে না।
আমিই আবার বললাম, ‘আমার উপর হামলাকারীকে যখন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে৷ তাকে হাসপাতালে মাস্ক খুলে মেরে ফেলেন৷ হয়তো খেয়াল করেননি। পুরো হাসপাতাল সিসিটিভির আওতাধীন। হাবিবার পোস্টমর্টেম রিপোর্ট আপনার কাছেই ছিল। কিন্তু আপনি আমাকে না দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে তাতে পানি ফেলে নষ্ট করে ফেলেছেন৷’
‘না স্যার! এগুলা মিথ্যা কথা!’
‘এখনো অস্বীকার করছেন! আমাকে কি কঠিন হতে বাধ্য করবেন?’ কড়া গলায় বললাম।
বুলবুল বুঝে গেলো, এখন আর মিথ্যা বলে লাভ হবে না৷ তার বন্ধুকটাও নিয়ে নিয়েছি৷ সে বলতে শুরু করলো, ‘হাবিবার কেসটা যখন আমাদের কাছে আসে, স্পষ্ট বুঝতে পারি যে এটা মার্ডার কেস।
কিন্তু ওসি স্যার কিছুতেই সেটা প্রমাণ করতে দিচ্ছিলেন না৷ এমনকি কেসটা নিয়ে মাথা ঘামাতে গেলে আমাদেরকে হুমকি-ধমকি দিয়ে সড়িয়ে দিতো। সেও জানতো না খুনটা কে করেছে! হাবিবার বাবার জিডির উপর ভিত্তি করে সে চেয়ারম্যান ও তার ছেলের বিরুদ্ধে প্রমাণ রেডি করেছে৷ কেসটার দায়ে চেয়ারম্যান ও তার ছেলেকে ফাঁসিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে টাকা হাতাচ্ছে৷
ব্যাপারগুল যখন বুঝতে পারি তখন টাকার ভাগ দিয়ে আমাদেরকে চুপ করিয়ে দিতে চাইলো। টাকার ভাগ আমি সমান সমান চেয়েছিলাম৷ কিন্তু সে দিতে অস্বীকার জানালো৷ সহ্য করতে পারলাম না৷ তখনি তাকে খুন করে পুরো টাকাটা হাতিয়ে নেয়ার কথা ভাবি। কিন্তু কাজটা কিভাবে করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না।’ বলে বুলবুল থামলো। একটু পানি চাইল। তাকে পানি এগিয়ে দিলাম। সে দুই ঢোক পানি গিলে বলতে শুরু করলো, ‘এরপর একদিন হঠাৎ করে আসাদ আমার সাথে দেখা করতে আসলো। তার কি একটা সহযোগীতা লাগবে বলে!…..’
‘তাকে আপনি আগে থেকেই চিনতেন?’
‘হ্যাঁ!’
‘কিভাবে?’
‘বিশ্ববিদ্যালয়ে সে আমার জুনিয়র ছিল। এক সাথে ছাত্র রাজনীতি করেছি৷’
‘আচ্ছা তারপর বলুন!’
‘কিন্তু আসাদ আমাকে ব্যাপারটা বলতে পারছিল না। আমি তাকে অভয় দিলাম। তখন সে বলল, হাবিবার সাথে কাজটা সে করেছে৷’
‘কেনো করেছে?’
‘হাবিবাকে ও অনেক দিন থেকেই পছন্দ করতো। পিছনে বেশ কিছু দিন ঘুরিয়ে হাবিবা চেয়ারম্যান পুত্রের সাথে প্রেম শুরু করে দেয়৷ সেটা আসাদ সহ্য করতে না পেরে ওরে রেপ করার কথা ভাবে। কিন্তু একা করাটা ওর সাহসে কুলাচ্ছিলো না৷ তাই ওর খেতে কামলা খাটা লোকগুলোকেও জড়িয়ে নেয়৷
চেয়ারম্যানের সাথে ঝামেলাটা ছড়িয়ে গেলে সে সুযোগটা নেয়। ওর প্ল্যানমাফিক সব ঠিকই ছিল। কিন্তু মাঝে হাদি এসে ভেজাল বাঁধিয়ে দেয়। ওরা হাবিবাকে মেরে পুকুরে ফেলে দেয়। হাদির আকষ্মিক ইনভলভমেন্টে ওরা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে থাকে। কি করবে ভেবে না পেয়ে হাদিকে ওখানে নিয়ে বেঁধে রাখে। তারপর তাকে মারতেও পারছিল না। ছেড়েও দিতে পারছিল না৷ তাই আমার সাহায্য চায়।’
‘তখন আপনি এই সুযোগটা নিলেন। আপনি আসাদকে হেল্প করবেন। কিন্তু তাকেও আপনাকে হেল্প করতে হবে।’
‘হ্যাঁ। সে সুযোগটাই নিয়েছি৷ আমি পুরো ঘটনা ওরে খুলে বললাম। ওসিকে মেরে টাকা হাতিয়ে নিতে চাই সে কথাও বললাম৷ টাকা সবাই ভাগ করে নিবো বলতেই আসাদ রাজি হয়ে গেলো। টাকা নিয়ে ফেরার সময় আসাদের লোক ওসি স্যারকে মেরে দিল।
আমরা টাকা নিয়ে চলে ওখান থেকে চলে গেলাম৷’ একটু থেমে রাগি স্বরে বুলবুল বলে উঠলো, ‘কেস আমার কাছে আসার কথা ছিল। আমি সামলে নিবো ভেবেছিলাম৷ কিন্তু কোথা থেকে আপনি এসে উদয় হয়ে সব গড়মিল করে দেন৷ তাই আপনাকে মারার জন্যও ওদেরকে পাঠাই কিন্তু আপনি বেঁচে যান৷ আবার একটাকে ধরেও ফেলেন৷
তাই ওরে মারতে বাধ্য হই।’ বুলবুল থেমে টেবিলের উপর থাপ্পড় দিলো, ‘আসাদ শালারে বলছিলাম আপনারে মেরে ফেলতে। কিন্তু শালায় দরদ দেখাইয়া সব ভেজাল লাগায় দিল।’ বুলবুল শান্ত হয়৷ শান্ত গলায় বলতে থাকে, ‘শালায় একটা কামও ঠিক মতো করতে পারেনি। ধরা পরে গেলো। তাই নিজে বাঁচার জন্য ওরে ওখানেই মেরে দিলাম। তবুও আমি বাঁচতে পারলাম না।’
‘অপরাধী কখনোই বাঁচতে পারে না।’ বলে আমি উঠে দাঁড়ালাম। গেটে রতনকে দেখা যাচ্ছে৷ বুলবুল রতনকে দেখতে পেয়ে চেচিয়ে বলল, ‘রতন বাঁচতে চাইলে শালারে ধর! নাইলে আমরা সবাই ফেঁসে যাবো। ওসি শালায় মরসে কিন্তু আমাদেরকে ফাঁসিয়েই মরসে৷ হাবিবার কেসে আমরা ফেঁসে যাবো।’ রতন চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। আমি একটা সিগারেট ধরিয়ে বুলবুলের মাথায় হাত রেখে বললাম, ‘বুলবুল সাহেব! চেচিয়ে লাভ নেই।
আপনারা কিভাবে ব্ল্যাকমেইল করে চেয়ারম্যান থেকে টাকা নিচ্ছিলেন সেটা রতন আমাকে আগেই বলেছে। সে আপনাদের সাথে জড়াতে চায়নি৷ কিন্তু সে একজন কন্সটেবল৷ তার কিছুই করার ছিল না৷ তাই আমি গোয়েন্দাতে আছি শুনে সে ইচ্ছে করেই আমাকে শুনিয়েছিল যে সজিব আমাকে কেনো মিথ্যে বলেছে।’ আমি সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে বললাম, ‘অপেক্ষা করুন! ঢাকা থেকে আমার টিম মেম্বাররা আসছে। তারা আসলেই আপনাকে এরেস্ট করা হবে।’
পরিশিষ্ট
আসাদের বাবা-মা পুরাপুরি ভেঙ্গে পরেছে। তারা ছেলের এমন অবস্থা, এমন মৃত্যু কোনোটাই সহ্য করে নিতে পারেনি।
হাবু ভাইয়ের একটা মাত্রই সন্তান ছিল। স্ত্রীও মারা গেছে বহু বছর হয়ে গেছে৷ চার কূলে তার আর কেউ নেই। শাহেদ নিজে সেধে বলে হাবু ভাইয়ের দায়িত্ব নেয়। তাকে সারা জীবন দেখা রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়৷
কেস সলভ হয়েছে জানতে পেরে চেয়ারম্যান আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল। তখন বাইরে থেকে আমার আর সালেহার কথা শুনতে পায় যে বান্দরবন যাওয়ার কথা বলছি। তখন সে নিজে টিকেট কিনে এনে দেয়। শাহেদকে বলে ওখানে থাকা খাওয়ার সব ব্যবস্থা করে দিতে। সে অনুযায়ী শাহেদ ব্যবস্থা করেও দেয়। কিন্তু সালেহা আর বান্দরবন যায়নি।
সে এখন আমার সাথে ঠিক মতো কথাও বলে না। আসাদকে সে অনেক স্নেহ করতো। আসাদের বাবা-মাকে সে নিজের বাবা-মায়ের মতো ভাবতো৷ কারণ ছোটবেলা থেকেই আসাদের বাবা-মা তাকে অনেক আদর করতো। তাই তাদের এই অবস্থা সে সহ্য করতে পারেনি। আর এর জন্য সে আমাকেই দায়ী ভাবে। আমরা এক ছাদের তলায় থাকলেও আমাদের কোনো কথা হয় না৷ সে স্ট্রেইট কাট বলে দিয়েছে, পুলিশের চাকরী না ছাড়লে আমার সাথে কথা বলবে না৷ তাই আমি চাকরী ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।
চাকরী ছাড়ার মাস খানেক পর পত্রিকা উল্টে দেখলাম, বুলবুল ও তার বাকি তিন সাথির ফাঁসির রায় হয়ে গেছে।
সমাপ্ত