মূল কন্টেন্টে যান

শিশুকে বই পড়ায় আগ্রহী করার উপায়

October 5, 2026 · Rakibul Hasan · ব্লগ

যে শিশু ছোটবেলায় বই ভালোবাসতে শেখে, সে আজীবন জ্ঞানের সঙ্গী পায়। গবেষণা বলে, শৈশবে নিয়মিত বইয়ের সংস্পর্শে আসা শিশুদের ভাষা, কল্পনাশক্তি ও পড়াশোনায় এগিয়ে থাকার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু মোবাইল-ট্যাবের যুগে শিশুকে বইয়ের দিকে টানা বাবা-মায়ের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সুখবর: সঠিক কৌশলে এটা মোটেও কঠিন নয় — শিশুরা স্বভাবতই গল্প ভালোবাসে।

এই লেখায় বাবা-মা, অভিভাবক ও শিক্ষকদের জন্য শিশুকে বই পড়ায় আগ্রহী করার বাস্তবসম্মত উপায়।

নিজে পড়ুন: শিশু অনুকরণ করে, উপদেশ শোনে না

সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশল সবচেয়ে সহজ: শিশুর সামনে বই পড়ুন। শিশুরা বাবা-মাকে অনুকরণ করে — আপনি যদি অবসরে মোবাইল স্ক্রল করেন, শিশুও সেটাই শিখবে; আপনি যদি বই পড়েন, বই তার কাছে স্বাভাবিক ও আকর্ষণীয় মনে হবে। “বই পড়ো” বলে মোবাইলে ডুবে থাকা সবচেয়ে ব্যর্থ কৌশল।

পরিবারে “পড়ার সময়” চালু করুন — রাতে ২০ মিনিট সবাই নিজ নিজ বই পড়বে, মোবাইল দূরে। শিশু দেখবে পড়া শাস্তি নয়, পরিবারের আনন্দের অংশ। এই দৃশ্য শিশুর মনে বইয়ের প্রতি ইতিবাচক ছাপ ফেলে — যা কোনো উপদেশে সম্ভব নয়।

ছোটবেলা থেকে বই পড়ে শোনান

শিশু নিজে পড়তে শেখার অনেক আগে থেকেই তাকে বই পড়ে শোনান — এমনকি কয়েক মাস বয়স থেকেও। ছবিওয়ালা বই দেখিয়ে গল্প বলুন, কণ্ঠস্বর বদলে চরিত্র ফুটিয়ে তুলুন, ছবি নিয়ে প্রশ্ন করুন। এই “রিড-অ্যালাউড” শিশুর ভাষা-বিকাশে অসাধারণ ভূমিকা রাখে — সে নতুন শব্দ শোনে, বাক্যের ছন্দ শেখে, গল্পের কাঠামো বোঝে।

ঘুমানোর আগের গল্প সবচেয়ে কার্যকর রুটিন — শিশু এই সময়ের জন্য অপেক্ষা করে। বয়স বাড়লেও পড়ে শোনানো বন্ধ করবেন না; ৮-১০ বছরের শিশুকেও বড়দের বইয়ের মজার অংশ পড়ে শোনানো যায়। একসঙ্গে পড়ার এই মুহূর্তগুলো শিশুর স্মৃতিতে বইকে আনন্দের সঙ্গে বেঁধে দেয়।

শিশুর পছন্দকে সম্মান করুন

বড়দের মতো শিশুরও পছন্দ আছে — আর সেটা আপনার পছন্দের সঙ্গে নাও মিলতে পারে। শিশু যদি কমিকস, ভূতের গল্প বা মজার ছড়া পছন্দ করে, সেটাই পড়তে দিন। “ভালো বই” চাপিয়ে দিলে পড়াই বিরক্তিকর মনে হবে। গবেষণা বলে, শিশু যা আনন্দে পড়ে, তাই তার পড়ার দক্ষতা বাড়ায় — জনরা মুখ্য নয়।

বইয়ের দোকানে বা লাইব্রেরিতে শিশুকে নিজে বই বাছতে দিন। নিজের পছন্দে কেনা বইয়ের প্রতি মমতা বেশি থাকে। বয়স-উপযোগী বই বাছুন — খুব কঠিন বই হতাশা আনে, খুব সহজ বই বিরক্তি। বই বিক্রেতা বা লাইব্রেরিয়ানের পরামর্শ নিন।

বই সহজলভ্য করুন: শিশুর নাগালে

বই আলমারির ওপরে থাকলে শিশুর জগতে বই নেই। শিশুর ঘরে, বসার ঘরে নিচু তাকে রঙিন বই সাজিয়ে রাখুন — হাত বাড়ালেই পায়। ছেঁড়ার ভয়ে বই দূরে রাখবেন না; ছোটদের জন্য মোটা পাতার বোর্ড বই আছে। কিছু বই ছিঁড়বে — সেটা পড়ার যাত্রার স্বাভাবিক খরচ।

বই উপহার দিন — জন্মদিনে, ঈদে, পুরস্কার হিসেবে। বইকে “বিশেষ জিনিস” হিসেবে উপস্থাপন করুন। নিজের ছোট লাইব্রেরি গড়ার আনন্দ শিশুকে মালিকানার গর্ব দেয় — “এগুলো আমার বই” — এই অনুভূতি পড়ার প্রতি টান বাড়ায়।

পড়াকে খেলা ও আলোচনায় বদলান

পড়া শেষে প্রশ্নোত্তর পরীক্ষা নেবেন না — এতে পড়া “হোমওয়ার্ক” মনে হয়। এর বদলে গল্প নিয়ে মজার আলোচনা করুন: “তোমার প্রিয় চরিত্র কে?”, “তুমি হলে কী করতে?”, “এরপর কী হবে বলে মনে হয়?”। গল্পের চরিত্র সেজে অভিনয় করুন, ছবি আঁকুন, গল্পের শেষ বদলে নতুন শেষ বানান।

এই সৃজনশীল খেলা শিশুকে গভীরে ভাবতে শেখায় — যা পড়ার আসল উদ্দেশ্য। শিশু যখন দেখে বই নিয়ে মজা করা যায়, তখন বই তার কাছে খেলনার মতো প্রিয় হয়ে ওঠে।

লাইব্রেরি ও বইমেলায় নিয়ে যান

শিশুকে নিয়মিত লাইব্রেরিতে নিয়ে যান — হাজার বইয়ের মধ্যে নিজে বেছে নেওয়ার অভিজ্ঞতা কেনার চেয়ে বড়। অনেক লাইব্রেরিতে শিশু কর্নার, গল্প বলার আসর থাকে। বইমেলায় নিয়ে যান — ভিড়, স্টল, নতুন বইয়ের গন্ধ — এই উৎসবমুখর অভিজ্ঞতা বইকে জীবন্ত করে তোলে।

বই-সংক্রান্ত ইভেন্ট — লেখকের সঙ্গে দেখা, আবৃত্তি প্রতিযোগিতা — শিশুর জন্য অনুপ্রেরণামূলক। বই যে শুধু পড়ার জিনিস নয়, একটা জগৎ — এই বোধ তৈরি হয় এমন অভিজ্ঞতা থেকে।

স্ক্রিনের সঙ্গে যুদ্ধ নয়, সমঝোতা

মোবাইল-ট্যাব পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে লাভ নেই — নিষিদ্ধ জিনিসই বেশি আকর্ষণীয়। এর বদলে নিয়ম বানান: দিনে নির্দিষ্ট স্ক্রিন-সময়, তার বাইরে বই-খেলা-বাইরে। আর স্ক্রিনেও বই আনুন — ই-বুক, গল্পের অডিও, শিক্ষামূলক অ্যাপ। মাধ্যম নয়, বিষয়বস্তুই আসল।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: শিশুর সামনে নিজের ফোন ব্যবহার সীমিত করুন। “বাবা-মা সারাদিন ফোনে, আমাকে বই পড়তে বলে” — এই বৈপরীত্য শিশু তৎক্ষণাৎ ধরে ফেলে।

ধৈর্য ধরুন: প্রতিটি শিশুর ছন্দ আলাদা

কোনো শিশু তাড়াতাড়ি বইপ্রেমী হয়, কোনোটা দেরিতে — দুটোই স্বাভাবিক। জোর করে, তুলনা করে (“পাশের বাসার ছেলেটা কত পড়ে”) বা শাস্তি দিয়ে পড়ানো যায় না; এতে বইয়ের প্রতি বিতৃষ্ণা জন্মায়। বীজ বুনুন, পানি দিন, অপেক্ষা করুন — একদিন অঙ্কুরোদগম হবেই।

মনে রাখুন, লক্ষ্য “বেশি পড়ানো” নয় — লক্ষ্য “বই ভালোবাসানো”। ভালোবাসা একবার জন্মালে পরিমাণ নিজে নিজে বাড়বে।

বয়স অনুযায়ী বই বাছাইয়ের গাইড

০-২ বছর: মোটা পাতার বোর্ড বই, বড় রঙিন ছবি, কম শব্দ। এই বয়সে বই “পড়া” নয় — ধরা, চেনা, ছবি দেখা। কাপড়ের বই, স্নানের বই — ছিঁড়বে না, ভিজবে না। প্রতিদিন ছবি দেখিয়ে নাম বলুন — “এটা বিড়াল” — ভাষার বীজ বোনা হচ্ছে।

৩-৫ বছর: ছড়া, পুনরাবৃত্তিমূলক গল্প, ইন্টারঅ্যাক্টিভ বই (ফ্ল্যাপ তোলা, স্পর্শ করা)। এই বয়সে একই গল্প বারবার শুনতে চাওয়া স্বাভাবিক — বিরক্ত হবেন না; পুনরাবৃত্তিই শেখা। ৬-৮ বছর: ছবিসহ ছোট গল্প, কমিকস, সহজ অধ্যায়-বই। নিজে পড়ার চেষ্টাকে উৎসাহ দিন — ভুল হলেও সংশোধন নয়, প্রশংসা।

৯-১২ বছর: অ্যাডভেঞ্চার, রহস্য, ফ্যান্টাসি — কল্পনার জগৎ। এই বয়সে সিরিজ বই দারুণ কাজে দেয় — একটা শেষ হলে পরেরটার টান থাকে। টিনএজ: তাদের পছন্দকে পুরো স্বাধীনতা দিন — এমনকি আপনার অপছন্দের জনরাও। এই বয়সে পড়া “নিজের” হতে হয়, বাবা-মায়ের চাপিয়ে দেওয়া নয়।

পড়তে একদমই না চাইলে: বিশেষ কৌশল

কিছু শিশু বইয়ের দিকে তাকাতেই চায় না — হাল ছাড়বেন না, কৌশল বদলান। প্রথমে চাপ সম্পূর্ণ তুলে নিন — “পড়তেই হবে” বলা বন্ধ করুন। এর বদলে বইকে খেলার অংশ বানান: গল্পের চরিত্র নিয়ে খেলুন, বইয়ের ছবি দিয়ে গল্প বানাতে বলুন। কমিকস, গ্রাফিক নভেল দিয়ে শুরু করুন — ছবি বেশি, লেখা কম; “পড়া” মনে হয় না।

অডিওবুক গল্প শোনান — কানে গল্পের নেশা ধরলে চোখেও ধরবে। শিশুর আগ্রহের বিষয় খুঁজুন — ডাইনোসর পাগল শিশুকে ডাইনোসরের বই দিন, খেলাপ্রেমীকে খেলোয়াড়ের জীবনী। আর ধৈর্য ধরুন — গবেষণা বলে, দেরিতে পড়া শুরু করা শিশুরাও উপযুক্ত পরিবেশে ধরে ফেলে। আপনার কাজ বীজ বোনা ও পানি দেওয়া; অঙ্কুরোদগমের সময় প্রকৃতির হাতে।

বই নিয়ে পারিবারিক আচার-অনুষ্ঠান গড়ুন

বইকে দৈনন্দিন জীবনের আচারে বাঁধুন — আচারই ঐতিহ্য হয়। আচার ১: ঘুমানোর আগের গল্প — প্রতিরাতে ১৫ মিনিট, বাবা বা মা পড়ে শোনাবেন। এই ১৫ মিনিট শিশুর দিনের সবচেয়ে নিরাপদ, আনন্দের সময় হয়ে উঠবে। আচার ২: সাপ্তাহিক লাইব্রেরি-ভ্রমণ — শনিবার সকালে সবাই মিলে লাইব্রেরি, প্রত্যেকে নিজের বই বাছবে।

আচার ৩: “গল্প-মঞ্চ” — মাসে একবার পরিবারের সবাই মিলে একটা গল্প অভিনয় করুন বা পাঠ করুন। শিশু চরিত্র সাজবে, সংলাপ বলবে — পড়া তখন আর নীরব কাজ নয়, উৎসব। আচার ৪: বই-উপহারের ঐতিহ্য — জন্মদিন, ঈদ, পরীক্ষায় ভালো ফলে বই উপহার। শিশু শিখবে: বই মানে উদযাপন।

আচার ৫: “নীরব পড়ার সময়” — সপ্তাহে ২ দিন সন্ধ্যায় ৩০ মিনিট পুরো পরিবার নিজ নিজ বই পড়বে — বাবা-মাও। এই দৃশ্য শিশুর মনে গেঁথে যায়: পড়া আমাদের পরিবারের কাজ। আচারগুলো ছোট, কিন্তু বছর বছর পুনরাবৃত্তিতে এগুলোই হয় শিশুর শৈশবের সোনালি স্মৃতি — আর বইপ্রেমের ভিত্তি।

দাদা-দাদি ও শিক্ষকের ভূমিকা

শিশুর বইপ্রেমে বাবা-মায়ের পাশাপাশি দাদা-দাদি ও শিক্ষকের ভূমিকা বিশাল। দাদা-দাদির গল্প বলার ঐতিহ্য — রূপকথা, পারিবারিক ইতিহাস, ছোটবেলার স্মৃতি — শিশুর কল্পনা ও ভাষার ভান্ডার সমৃদ্ধ করে। দাদা-দাদিকে উৎসাহ দিন নিয়মিত নাতি-নাতনিকে গল্প শোনাতে; এই প্রজন্ম-সংযোগ বইয়ের বাইরেও মূল্যবান।

শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে “পড়ার কর্নার” বানাতে পারেন — রঙিন বইয়ের ছোট সংগ্রহ, যেখানে শিশু অবসরে পড়বে। পাঠ্যবইয়ের বাইরের বই নিয়ে আলোচনা, গল্প বলার প্রতিযোগিতা, লাইব্রেরি-ভ্রমণ — স্কুলই পারে পড়াকে “পরীক্ষার বাইরের” আনন্দ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে। বাবা-মা, দাদা-দাদি, শিক্ষক — তিন প্রজন্মের সম্মিলিত চেষ্টায় শিশুর জগতে বই হয় স্বাভাবিক, অবিচ্ছেদ্য অংশ।

উপসংহার

শিশুকে বইপ্রেমী করা কোনো কৌশলের খেলা নয় — এটা ভালোবাসার সংক্রমণ। নিজে পড়ুন, পড়ে শোনান, পছন্দকে সম্মান করুন, বই হাতের কাছে রাখুন, মজা করুন। আজ রাতেই শুরু করুন — একটা গল্পের বই নিয়ে শিশুর পাশে বসুন। এই ছোট মুহূর্তটাই হয়তো তার আজীবন পাঠক-যাত্রার প্রথম পৃষ্ঠা।

আরও পড়ুন

বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে থাকুন

নতুন বই, কবিতা ও লেখক আপডেট পেতে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।