গল্পঃ একটি সুসাইড কেস অতঃপর… (প্রথম পর্ব) ©মারুফ হুসাইন।

গল্পঃ একটি সুসাইড কেস অতঃপর… (প্রথম পর্ব)
©মারুফ হুসাইন।
১.
সালেহা অনেক দিন ধরেই বাবার বাড়ি যাওয়ার কথা বলছে। আমি বলেছিলাম যে মেয়েকে নিয়ে সে যেনো যায়। কিন্তু সে আমাকে ছাড়া যাবে না৷ আমারো যেতে হবে। কিন্তু অফিস থেকে ছুটিও পাচ্ছিলাম না৷ মাস খানেক আগে দরখাস্ত দিয়েছি। 

1 suicide case after by Maruf hossin

সে ছুটি আজ মিলল। সালেহাকে ফোন দিয়ে জানিয়ে দিলাম, ‘ছুটি পেয়েছি৷ ব্যাগ পত্তর গুছিয়ে রাখো৷ কাল বাড়ি যাচ্ছি৷’
বিকেলে অফিস শেষ করে বাসায় ফিরলাম৷ সালেহা ব্যাগ গোছাচ্ছে৷ মেয়েটাও বেশ খুশি নানা বাড়ি যাবে বলে। আমি বাসায় ঢুকতেই দৌড়ে এসে আমার কোলে উঠে বলল, ‘পাপা পাপা! আমরা কাল নানু বাড়ি যাচ্ছি৷ তুমি যাবা না?’
আমি মেয়ের হাতে চকোলেট দিয়ে বললাম, ‘হ্যাঁ মামনি আমরা সবাই যাবো।’
আমার কোল থেকে নেমে মেয়েটা হাত তালি দিতে দিতে সুর করে বলল, ‘কি মজা কি মজা পাপাও আমাদের সাথে যাবে।’
‘আচ্ছা তোমার কি কি নিবো বললে না তো!’ সালেহা আলমারি থেকে আমার দিকে মুখ ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করলো। 
‘তিনটা প্যান্ট, তিনটা শার্ট আর কয়েকটা টি শার্ট নেও৷ ওর বেশি কিছু নিয়ো না৷ ছুটিই তো পেয়েছি এক সপ্তাহ৷ চার-পাঁচদিনের বেশী তো আর থাকা যাচ্ছে না।’
সালেহা দাঁতে দাঁত কামড়ে বলল, ‘জীবনে কি পাপ করেছিলাম কে জানে, এমন পুলিশের সাথে বিয়ে হতে গেলো।’
‘উহু ভুল বললে তুমি, কথাটা এমন হবে জীবনে কি পাপ করেছো যে তোমার প্রেমিকের পুলিশে চাকরী হয়েছিল।’ থেমে মৃদু কেশে বললাম, ‘অবশ্য তার প্রস্তুতিতে সহযোগীতা করার পাপটাই তুমি করেছো।’ বলে মুচকি হেসে গলার আওয়াজ বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, ‘কি পাপ করেছো বলে দিয়েছি৷ এখন তা নিয়া মাথা ঘামিয়ে মাথা নষ্ট না করলেও চলবে।’
সালেহা চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ফাজলামো হচ্ছে আমার সাথে! ভেবেছিলাম বিয়ের পর তার সাথে দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াবো। আর এখন কি না সহজে তাকে পাওয়াই যায় না৷ সারাদিন অফিস আর চোর-ডাকাত নিয়ে পড়ে থাকে।  ঘরে যে বউ বাচ্চা আছে সে খবর তো আর নেই।’
সালেহার সাথে এখন আর মুখ লাগাতে ইচ্ছে করলো না। অফিস থেকে ফেরার পর থেকেই ক্লান্তি লাগছে৷ আমি বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম৷  সালেহা বকবক করেই যাচ্ছে৷ আমি ডান কান বালিশে চাপা দিয়ে বাম কানের উপর বাম হাত রেখে চোখ বুজে রইলাম৷ কিছুক্ষণ পর ক্লান্ত হয়ে সালেহা এমনিই থেমে যাবে৷
২.
সকাল সকাল আমরা বের হয়ে গেলাম৷ এখান থেকে  অবশ্য সালেহাদের  বাড়ি বেশী দূরে নয়। যেতে দু ঘন্টার মতো লাগে। প্রথমে বাস, তারপর আধ ঘন্টার মতো সিএনজির পথ। তারপর পনেরো-বিশ মিনিট নদী পথ৷ মানে ট্রলারে করে যেতে হয়৷ সিএনজি থেকে নেমে ট্রলারে উঠলাম৷ ট্রলারে কয়েকজন পুলিশ বসে আছে। আমাকে দেখে তারমধ্যে একজন এগিয়ে আসলো। কাছে আসতেই তাকে চিনতে পারলাম, সজিব। আমার ব্যাচমেট। আমরা একই সাথে ট্রেনিং নিয়েছি৷ সে এগিয়ে এসে বলল, ‘আহমেদ! তুমি এখানে?’
‘আমার শশুর বাড়ি৷ কিন্তু তুমি এখানে কি করছো?’
সজিব আমার কানের কাছে মুখ এনে বলল, ‘যার সাথে ট্রেনিংয়ে থাকতে ফুসুর ফুসুর করতে সে তো?’ সে হেঁসে উঠলো।
‘হ্যাঁ বন্ধু’ ততক্ষণে সালেহা মেয়েকে দোকান থেকে চিপস কিনে দিয়ে ট্রলারে এসে উঠেছে। আমি সালেহাকে ডাক দিয়ে সজিবকে দেখিয়ে বললাম, ‘ও সজিব আমার ব্যাচমেট। ভালো বন্ধুও বটে৷ কিন্তু ট্রেনিং এর পর দুইজনের চাকরী দুই জায়গায় হওয়ায় দেখা সাক্ষাৎ আর তেমন হয়নি।’ আমি সজিবের দিকে তাকিয়ে সালেহার পরিচয় দিতে গেলাম৷ কিন্তু সজিব আমাকে কিছু বলতে না দিয়েই সালেহাকে সালাম দিয়ে বলে উঠলো, ‘ভাবি! ট্রেনিং এ থাকতে তো ওর মুখে সারাদিন আপনার কথাই লেগে থাকতো।’
‘হ্যাঁ ভাই তখন প্রেমিকা ছিলাম বলে বলতো। এখন তো বউ হয়ে গেছি৷ এখন আর বলবে না।’
সজিব খিলখিল করে হেসে উঠলো। সালেহাও মুচকি হাসতে লাগলো। সজিব আমার মেয়েটাকে কাছে ডেকে জিজ্ঞাসা করলো, ‘মামনি নাম কি তোমার?’
মেয়েটা কিছু বলল না। কেমন হা করে তাকিয়ে রইল। আমি মেয়েটাকে অভয় দিয়ে বললাম, ‘মামনি! চাচ্চুকে নাম বলো!’
তারপরও নাম বলল না। তখন আমিই বললাম, ‘মাইশা নাম। তোমাকে তো আগে কখনো দেখেনি। তাই হয়তো কিছু বলতে পারছে না।’
‘বাচ্চারা এমনি হয়। নতুন কাউকে দেখলে প্রথমেই কথা বলতে পারে না৷’
‘আচ্ছা বললে না তো কোথায় যাচ্ছো তুমি? তোমার পোস্টিং কি এখানে হয়েছে?’
‘গ্রামে একটা মেয়ে সুসাইড করেছিলো৷ সেটার ফর্মালিটিজের জন্যই যাচ্ছি।’
আমার ভ্রু কুচকে গেলো, ‘কে সুসাইড করেছে? কেনো করেছে?’
‘কেনো করেছে বলতে পারবো না। তবে মেয়েটার নাম সম্ভবত হাবিবা।’
‘কবে করেছে?’
‘তিন দিন আগে।’
আমি সালেহার দিকে তাকালাম। সালেহা মেয়েকে নিয়ে খেলা করছে। তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললাম, ‘হাবিবা কে?’
‘হাবু ভাইয়ের মেয়ে। কেনো কি হয়েছে?’
‘সুসাইড করেছে বলে!’
সালেহা অনেকটা অবাক হয়ে বলল, ‘ও কেনো সুসাইড করতে যাবে৷ কত ভালো একটা মেয়ে।’
‘সুসাইডের কোনো কারণ জানা গেছে?’ আমি সজিবকে জিজ্ঞাসা করলাম৷
‘না কোনো কারণ জানা যায়নি। সেটা জানার চেষ্টাই করছি৷ তবে আপাদত ধারণা করছি, প্রেমঘটিত কোনো ব্যাপার হবে।’
ততক্ষণে ট্রলার ঘাটে পৌছে গেছে৷ ভাড়া মিটিয়ে দিলাম৷ সজিব ভাড়া দিতে চেয়েছিলো। কিন্তু আমিই জোর করে সবার ভাড়া দিয়ে দিয়েছি৷ অবশ্য সজিব ভাড়া দিলে সেটা সরকারি খাত থেকে যেতো। আমি ট্রলার থেকে নামার আগে বললাম, ‘বন্ধু! এখন তো ডিউডিতে আছো। ডিউটি শেষে একবার বাড়িতে আসো। ঘুরে যাও!’
‘হ্যাঁ অবশ্যই যাবো।’
ওর থেকে বিদায় নিয়ে  ট্রলার নামার সময় স্পষ্ট শুনতে পেলাম, একজন কন্সটেবল সজিবকে  বলছে, ‘স্যার! উনি আপনার বন্ধু মানুষ৷ আবার পুলিশেই আছেন৷ তারপরও কেনো সত্যটা লুকোলেন?’
‘রতন! এগুলো তুমি বুঝবে না।…’
সজিব আরো কি কি বলছিলো কিন্তু আমি শুনতে পাইনি৷ মেয়েকে নিয়ে ট্রলার  থেকে নেমে উপরে উঠে এসেছি৷ তখন সজিব একজন কন্সটেবলকে ডেকে বলল, ‘স্যারের ব্যাগগুলো নামিয়ে দেও।’
আমি না করা সত্ত্বেও একজন কন্সটেবল লাগেজ, ব্যাগগুলো নামিয়ে দিলো। তারা বাড়ি পর্যন্ত পৌছে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি তাদের মানা করি। ঘাট থেকে দশ মিনিট হাঁটার পথ আছে৷ কিন্তু এতোগুলো ব্যাগ নিয়ে যাওয়া কষ্টকর। তাই কাউকে খুঁজতে লাগলাম। ঠিক তখন আসাদ এসে সালেহাকে সালাম দিয়ে লাগেজ আর ব্যাগগুলো নিতে নিতে বলল, ‘আপা! আপনারা কখন আসলেন? এখানে দাঁড়িয়ে আছেন৷ আমাকে ডাক দিলেই তো হতো।’ সালেহাদের দুই বাড়ি পরই আসাদদের বাড়ি। সালেহা সবসময়ই আসাদকে অনেক স্নেহ করে। তার প্রতিদানস্বরূপ আসাদ সালেহার যেকোনো প্রয়োজনে এগিয়ে আসে।
‘ধুর বোকা! তুই এতোগুলা নিতে পারবি নাকি! শুধু লাগেজ নে। বাকিগুলা আমরা নিচ্ছি।’ আসাদকে সবগুলো ব্যাগ নেয়ার চেষ্টা করতে দেখে সালেহা বলল।
‘না আপা সমস্যা নেই৷ নিতে পারবো। এর চেয়ে কত ভারি ভারি জিনিষ বয়ে বেড়াই৷ এইগুলা আর তেমন কি!’ সবগুলো ব্যাগ নিয়েই সে হাঁটতে শুরু করেছে। 
‘আরে বোকা নাকি!’ বলে আমি তার থেকে একটা ব্যাগ নিয়ে নিলাম৷ আরেকটা নিতে চাইলাম। কিন্তু সে দিল না। ভারি লাগেজ আর একটা ব্যাগ বয়ে নিয়ে দিব্যি হেঁটে চলছে। 
৩.
শশুড় বাড়িতে দিনকাল ভালোই যাচ্ছিলো। কোনো ব্যস্ততা নেই৷ সারাদিন ঘরে বসে থেকে খাওয়া আর ঘুম ছাড়া কোনো কাজ নেই। দু দিন বোরিং সময় কাটিয়ে ভাবলাম, মাছ ধরতে যাওয়া যায়। আসাদকে সে কথা জানাতেই বলল যে নৌকা বড়শি-টড়শি সব ঠিক করে রাখবে।
ভোরে ভালো মাছ পাওয়া যায়৷ তাই পরদিন ভোরেই মাছ ধরতে যাওয়া সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। ভোরে এসে আসাদ আমাকে ডেকে তুলবে। তারপর শালা-দুলাভাই মিলে মাছ ধরতে চলে যাবো।
ফজরের আধ ঘন্টা আগে আসাদ এসে আমাকে ডেকে তুলল। আমরা নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পরলাম৷ সাথে বড়শি, কেঁচো আর আটার গোলা।  মাছ ধরার জন্য কেঁচো একটা ভালো টোপ। তাই রাতে আসাদ কেঁচো খুড়ে রেখেছিলো।
ঘন্টা দেড়েক চেষ্টা করেও আমরা তেমন মাছ পাইনি৷ তাই আমি এক প্রকার হতাশ হয়ে আসাদকে বাড়ির দিকে চলে যেতে বললাম। ততক্ষণে দিনের আলো পুরাপুরি ফুটে উঠেছে। মানুষজনও চলাফেরা করা শুরু করেছে৷ ঘাটে গিয়ে নেমেই শুনলাম, নদীর ঐ পাড়ের ঘাটে কে নাকি খুন হয়েছে৷ ধান কাটার কাস্তে দিয়ে গলা কাটা হয়েছে৷ কিন্তু কে খুন হয়েছে কেউ বলতে পারছে না৷ অনেকেই লাশ দেখতে যাচ্ছে৷  আমি আসাদকে বললাম, ‘চল তো ভাই দেখে আসি কাহিনি কি!’
একটা ট্রলারে উঠে আমরা চলা আসলাম। ট্রলার থেকে নেমেই কিছু দূর চরের মধ্যে ভিড় দেখতে পেলাম। আমার আর বুঝতে বাকি রইলো না, লাশটা ওখানেই৷ আমরা এগিয়ে গেলাম। ভিড় ঠেলে ভিতরে ঢুকলাম৷ কিন্তু লাশের চেহারা দেখা যাচ্ছে না৷ উবুড় করে ফালানো। 
সারা শরীরে, মুখে কাঁদা মাখা। লোকদেরকে জিজ্ঞাসা করলাম,  পুলিশে খবর দেয়া হয়েছে কি না! খবর দেয়া হয়েছে বলে জানালো। কিন্তু এখনো পুলিশ আসেনি৷ তখন আমার সজীবের কথা মনে পরলো। সেই তো এখানকার ওসি৷ ভাবলাম ওরে একবার ফোন দেই। সেদিন ওর পার্সোনাল নাম্বার আমাকে দিয়েছিলো।  ভিড় থেকে বেরিয়ে আমি মোবাইল বের করে নাম্বার ডায়াল করলাম। ফোন বেজে উঠলো৷ 
সেদিন ট্রলারে বসে সজীবের রিংটোন শুনেছিলাম। মনে হতে লাগলো আশে-পাশ সজীবের রিংটোন শোনা যাচ্ছে। আমি এদিক-উদিক তাকালাম। পুলিশ আসেনি৷ মানে সজীবের আসারও কোনো সম্ভাবনা নেই৷ আবার ফোন দিলাম। আবার আশেপাশেই কোনো মোবাইল বেজে উঠলো৷ মোবাইলের উৎস বোঝার চেষ্টা করতে লাগলাম। তখন মনে হলো ভিড়ের মাঝ থেকে আওয়াজ আসছে৷ আমি আওয়াজ অনুসরণ করে ভিড়ে ঢুকলাম। ততক্ষণে আমার কল কেটে গেছে৷ আবার ডায়াল করলাম। ফোন বেজে উঠলো। আমি শব্দের উৎস বোঝার চেষ্টা করলাম। হঠাৎ মনে হলো লাশের পকেটে মোবাইল বাজছে৷ আমি লাশের প্যান্টের পকেটের দিকে খেয়াল করলাম৷ হ্যাঁ সেখান থেকেই আওয়াজ ভেসে আসছে। মোবাইলের স্ক্রিনের মৃদু আলোও দেখা যাচ্ছে৷ 
আমার বুক কেপে উঠলো, ‘তাহলে কি……’ না আমি আর ভাবতে পারলাম না। মোবাইলটা পকেটে রেখে রুমাল বের করলাম। লাশের চেহারা দেখা দরকার। এখনো স্থানীয় পুলিশ আসছে না বলে আমার মেজাজ গরম হয়ে গেলো৷ তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, নিজেই লাশ ঘুরিয়ে চেহারা দেখবো, কে সে?
চলবে………..
একটি সুসাইড কেস অতঃপর…
©মারুফ হুসাইন
বইপাও থেকে আপনি আর কি কি কন্টেন্ট পেতে চান?