একটি সুসাইড কেস অতঃপর…(তৃতীয় পর্ব)
©মারুফ হুসাইন।
৭.
থানায় গতকালই লেটার পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে৷ থানায় গিয়ে আমার নাম বললেই হবে। তাদের চিনতে অসুবিধা হবে না৷ থানায় ঢুকতেই কন্সটেবল রতনের দেখা পেয়ে যাই। আমাকে দেখে সে আগ বাড়িয়ে এসে সালাম দিয়ে বলে, ‘স্যার! কোনো কাজে এসেছেন?’
‘রতন সাহেব! আমার নাম জানেন?’
‘জ্বী না স্যার।’
‘আচ্ছা এক কাজ করুন, দায়িত্বরত অফিসারকে গিয়ে বলুন আহমেদ আলি এসেছে।’
‘জ্বী স্যার!’ সজীব মার্ডার কেসটার দায়িত্ব আমাকে দেয়া হয়েছে রতন না জানলেও তার এইটুকু জানা আছে যে আমি পুলিশের একজন উর্ধতন কর্মকর্তা। তাই সে আমার সাথে যথেষ্ট সহযোগি আচরণ করছে৷ দায়িত্বরত অফিসারকে খবর দেয়ার জন্য রতন মিয়ার যেতে হলো না৷ তার আগেই ভিতরের এক কক্ষ থেকে এসআই বুলবুল বেরিয়ে আসলো। গতকাল তাকেই সজিব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম৷ আমার আইডি কার্ডও দেখিয়েছিলাম৷ তারপরও সে কোনো তথ্য দেয়নি, ‘সরি স্যার! কালকে আসলে আমি বুঝতে পারিনি।’ আমাকে স্যালুট করে বুলবুল বলল।
‘সমস্যা নেই৷ আপনি আপনার কাজ করেছেন।’ আমি তাকে অভয় দিয়ে বললাম, ‘আচ্ছা আমার বসে কাজ করার জন্য চেয়ার টেবিল ঠিক করেছেন?’
‘জ্বী স্যার! ঠিক করেছি৷ আপনি ওসি স্যারের অফিসটাই ব্যবহার করবেন৷’
‘ঠিক আছে চলুন।’
মাঝারি সাইজের কক্ষ। পিছনের দেয়ালের সাথে লাগুয়া একটা রোলিং চেয়ার। ডান পাশের দেয়াল ঘেষে টেবিল পাতানো৷ টেবিলের উপর একটা কম্পিউটার আর কিছু ফাইল রাখা। বুলবুল চেয়ারটা ঠিক করে দিয়ে আমাকে বসতে বলল। আমি বসে পরলাম। আমার ঠিক বরাবর টেবিলের ওপাশের চেয়ারে বুলবুল বসলো৷
‘সজিবের লাশ কি পোস্টমর্টেমের জন্য পাঠানো হয়েছে?’
‘জ্বী স্যার! গতকালই পাঠিয়ে দিয়েছি৷’
‘পোস্টমর্টেম রিপোর্ট কবে পাওয়া যাবে?’
‘স্যার! চা দিয়ে যাবো?’ রতন গেটের পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলো।
‘হ্যাঁ নিয়ে আসো!’ বুলবুল পিছনে তাকিয়ে উত্তর দিয়েই আমার দিকে ফিরে বলল, ‘স্যার! আশা করি দুয়েক দিনের মধ্যেই পেয়ে যাবো।’
রতন চা নিয়ে এসেছে৷ টেবিলে চায়ের ট্রেটা রেখে বলল, ‘স্যার বিস্কুট দিয়ে যাবো?’
‘না আর কিছু লাগবে না৷ যান আপনি!’
রতন চলে গেলো। বুলবুল আমার দিকে চায়ের কাপ এগিয়ে দিলো। আমি কাপে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘বুলবুল সাহেব! আপনি এখানে কতদিন যাবত আছেন?’
‘দুই বছর হয়েছে।’
‘সজিব কবে এসেছে?’
‘ওসি স্যার এসেছেন ছ মাস হয়নি এখনো৷’
‘তাকে কেনো এভাবে মারা হয়েছে বলতে পারেন?’
‘স্যার! আমরা পুলিশ। কতভাবে কত ধরণের শত্রু সৃষ্টি হয়ে যায়। এখন কে কেনো মেরেছে তা কি আর বলা যায়।’
‘আপনার কোনো ধারণা?’
‘না স্যার!’
আমি চায়ের কাপে চুমুক দিতে গিয়ে খেয়াল করলাম চা শেষ। কাপটা টেবিলের উপর রেখে দিলাম।
‘স্যার! আরেক কাপ চা দিতে বলবো?’
‘না লাগবে না। আপনি আপাদত যান। রতনকে পাঠিয়ে দিয়েন।’
বুলবুল উঠে দরজার দিকে পা বাড়ালো, ‘বুলবুল সাহেব!’ আমি বুলবুলকে ডাক দিলাম। সে পিছনে ফিরে তাকালো, ‘ জ্বী স্যার!’
‘একজন পুলিশ অফিসার খুন হয়েছে। আমার মনে হয় তার পিছনের কারণ সম্পর্কে কিছুটা হলেও আপনারা অবগত আছেন। আশা করি, আপনারা খুনি ধরতে আমার সাথে কম্প্রোমাইজ করবেন।’
আমি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলাম। কেসের আগা মাথা কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার মন বলছে হাবিবার মৃত্যুর সাথে এটা কোনোভাবে সম্পৃক্ত। কিন্তু কিভাবে তা জানি না। আর কিভাবে ব্যাপারটাকে সমাধান করবো তাও বুঝতে পারছি না৷
‘স্যার আসবো?’ রতন গেটের পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলো। আমি চেয়ার থেকে হেলান ছেড়ে সোজা হয়ে বললাম, ‘হ্যাঁ আসুন!’
রতন টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালো। আমি তাকে ইশারায় বসতে বললাম৷ সে বসে পরলো, ‘আচ্ছা যেদিন আপনাদের সাথে ট্রলারে আমার দেখা হয়েছে। তখন নামার সময় আপনি সজিবকে বলেছিলেন যে সে আমার সাথে কেনো সত্য লুকিয়েছে। মনে আছে?’
‘জ্বী স্যার মনে আছে।’
‘তো সত্যটা কি ছিলো?’
‘স্যার আমি কন্সটেবল। এতো কিছু জানি না।’
‘যতটুকু জানেন ততটুকুই বলেন।’
রতন আমতা আমতা করতে লাগলো। আমি তাকে ধমলের স্বরে বললাম, ‘কি হলো বলেন না!’
‘স্যার! আমি শুধু এইটুকুই জানি যে মেয়েটা আত্নহত্যা করেনি। তাকে খুন করা হয়েছে।’
‘আর কিছু জানেন না?’
‘সত্যি বলছি স্যার আর কিছু জানি না।’
‘মেয়েটার পোস্টমর্টেম রিপোর্ট কোথায়?’
‘ওসি স্যারের কাছেই তো ছিলো। এখন কোথায় আছে আমি জানি না। হয়তো বুলবুল স্যার বলতে পারবে।’
‘ঠিক আছে যান। বুলবুল সাহেবকে পাঠিয়ে দিন।’
রতন চেয়ার থেকে উঠে বলল, ‘তবে স্যার! মেয়েটা মরার তিন-চার দিন আগে মেয়েটার বাবা একবার থানায় এসেছিলো। কিন্তু কেনো এসেছিলো আমি জানি না।’
রতন যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই বুলবুল আসলো। তাকে দেখেই আমি বললাম, ‘সুসাইড কেসটার ফাইলটা দিন।’
‘স্যার! ঐ ফাইলটা তো ওসি স্যারের কাছে ছিল। কোথায় রেখেছে বলতে পারবো না৷ খুঁজে বের করতে হবে।’
‘তাহলে বের করুন।’
‘স্যার! কিছু মনে না করলে একটা কথা বলবো?’
‘জ্বী বলুন!’
‘আপনাকে তো ওসি স্যারের খুনটা তদন্ত করার জন্য বলা হয়েছে৷ কিন্তু আপনি এটা কেনো ঘাটছেন!’
বুলবুলের কথা শুনে আমার মাথায় রক্ত উঠে গেলো। তার প্রশ্নে তেমন অস্বাভাবিক কিছু না থাকলেও আমার প্রচন্ড রাগ হলো৷ আমি তার দিকে তাকাতেই সে বলল, ‘সরি স্যার! আমি ফাইলটা খুঁজে দিচ্ছি।’
৮.
হাবিবার ফাইল আর আমার দেখা হয়নি। দুপুর দিকে থানা থেকে বাড়ি ফিরে এসেছি। এসেই কতক্ষণ সালেহার ঘ্যানর ঘ্যানর শুনতে হয়েছে৷ গতকাল সালেহার সাথে আমার সমঝোতা হলেও কোনো ফায়দা হয়নি। এখানে এসেও কেস হাতে নেয়ায় কথা শোনাচ্ছে। অবশ্য গতকাল ভেবেই রেখেছিলাম, সমঝোতা হলেও কথা শোনা থেকে আমি রেহাই পাবো না৷ সেটাই হলো। আমি তার কথার কোনো জবাব দেই না। জবাব দিলেই পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে যাবে৷
তাই আদর্শ স্বামীর মতো তার চেঁচামেচি মেনে নেই৷ সেও কিছুক্ষণ চেঁচামেচি করে ঠান্ডা হয়ে আমার ভালোমন্দ দেখা শুরু করে দিলো। গোসলে গেলে পুকুর পাড়ে সাবান, লুঙ্গি নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। যত্ন করে খাবার রেডি করে দিলো। খেতে বসলে মাইশা এসে পাশে বসে বাবার হাতে খাওয়ার বায়না ধরে।
তখন সালেহা বলে, ‘মেয়েটা সারাদিন বাবা বাবা করে। আর সে কিনা কাজ নিয়েই পড়ে থাকে। মেয়েটাকে একটু সময়ও দেয় না।’ আমি সালেহার কথায় কান দিলাম না৷। মেয়েকে খাইয়ে দিয়ে নিজেও খাওয়া-দাওয়া শেষ করলাম।
দুপুরে ঘন্টাখানেক বিশ্রাম নিলাম। তারপর আসাদকে নিয়ে চেয়ারম্যানের বাড়ির উদ্দেশ্যে বের হয়ে যাই৷ চেয়ারম্যানের বাড়ির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আসাদ বলে, ‘চেয়ারম্যান চাচা বাড়িতে আছেন?’
‘কে?’ ভিতর থেকে মহিলা কন্ঠে আওয়াজ আসে।
‘চাচি আমি আসাদ। সালেহা আপার স্বামী আইসে। চাচার লগে দেখা করবো’
‘তোর চাচায় বাথরুমে গেছে। ভিতরে আইয়া বো তোরা।’
আসাদ ভিতরে ঢুকে। তার পিছু পিছু আমিও যাই। ড্রয়িং রুমে বসে থাকি। কিছুক্ষণ পর চেয়ারম্যান গামছায় হাত মুছতে মুছতে আসে, ‘আরে জামাই! গরীবের বাড়িতে কি মনে করে?’ চেয়ারম্যানের সাথে আমার পরিচয় আছে৷ গ্রামে সবাই সবাইকে চেনা জানাটা তেমন বড় কিছু নয়। এলাকার জামাইদেরকে সবাই ভালোভাবেই চিনে৷ কার মেয়ের কেমন ঘরে বিয়ে হয়েছে সে খবর সবাই ভালোভাবেই রাখে। চেয়ারম্যানের সাথে বেশ কয়েকবার আমার কথাও হয়েছে। চায়ের দোকানে বসলে মাঝে মাঝে দেখা হয়ে যেতো। সে আমার সাথে টুকটাক আলাপ জুড়ে দিতো।
‘হাবিবার কেসটা নিয়ে আপনার সাথে কথা আছে।’
‘আহা! তুমি এলাকার জামাই মানুষ৷ পুলিশে চাকরী করো ঠিক আছে৷ কিন্তু এসবে জড়ানোর কি দরকার।’ চেয়ারম্যান একটা চেয়ার টেনে বসতে বসতে খুব সরল গলায় কথাগুলো বলল।
‘কিছুদিনের জন্য আপনাদের থানার দায়িত্ব আমাকে দেয়া হয়েছে৷ ওসি যে খুন হয়েছে সে খবর তো জানেন?’
‘শুনেছি৷ কিন্তু দেখিনি৷ ওসি সাহেব বড্ড ভালো মানুষ ছিলেন।’ আফসোসের স্বরে চেয়ারম্যান বলল।
‘কেসটা আমাকে দেয়া হয়েছে। তাই আশা করি, আপনাদের সহযোগিতা পাবো।’
‘জামাই! তোমারে বলি কি, কেসটা তুমি ছেড়ে দেও। তুমি এলাকার জামাই মানুষ। এলাকার এসব উটকো ঝামেলায় তুমি কেন জড়িয়ে পড়ছো।’ বলে চেয়ারন্যান উঠে দাঁড়ায়, ‘গরীবের বাড়িতে এসেছো। নাশতা করে যাও।’ বলেই সে হাক ছাড়ে, ‘শাহেদের মা! জামাইকে নাশতা দেও।’
আমি উঠে দাঁড়ালাম, ‘তার দরকার পরবে না। আজ চলি!’ আমি গেটের দিকে পা বাড়ালাম।
‘জামাই! এখানকার ঝামেলায় জড়ানোটা তোমার জন্য ভালো হবে না।’ পিছন থেকে চেয়ারম্যান বলে উঠলো।
আমি থামলাম, ‘হুমকি দিচ্ছেন?’
‘যদি তুমি হুমকি মনে করো। তাহলে তাই দিচ্ছি।’ চেয়ারম্যান চোয়াল শক্ত করে বলল।
আমি মুচকি হেঁসে চেয়ারম্যানের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসলাম।
‘ভাইয়া! আপনাকে তো হুমকি দিয়ে বসলো। এখন কি করবেন?’
‘আসাদ! পুলিশে চাকরী করলে এমন কত হুমকি-ধামকি শুনতে হয়। কিন্তু সেগুলোকে পাত্তা দিতে হয় না। পাত্তা দিলেই বিপদ। বুঝলে!’
‘হ্যাঁ ভাইয়া!’
‘চলো মাস্টারের বাড়িতে গিয়ে তোমাদের হাদির সাথে দেখা করে আসি।’
আসাদের সাথে মাস্টার বাড়িতে গেলাম৷ কিন্তু হাদিকে পাওয়া গেলো না। সে নাকি কি কাজে ঢাকা গেছে। কাল-পরশু আসবে।
হাবু ভাইয়ের সাথে একবার দেখা করলাম, ‘হাবিবার মৃত্যুর আগে আপনি থানায় গিয়েছিলেন?’
‘হ গেসিলাম৷ চেয়ারম্যান আর তার পোলার নামে কেস করতে।’
‘করেছেন?’
‘না। করিনি৷’
‘কেনো?’
‘যেই পুলিশটা মারা গেসে সে কইসিলো এইসব ছোট খাটো বিষয়ে কেস করতে না৷ আর কেস করলে বলে মেলা টাকা খরচ হয়৷ তাই আর কেস করি নাই৷ সে কইলো অভিযোগ লেখায় যেতে। সেটাই লেখায় আসছি।’
‘অভিযোগের কপি আছে?’
‘হ্যাঁ আছে’ বলে হাবু ভাই তোশকের নিচ থেকে জিডির কপি বের করে আমার হাতে দিল।
‘এটা কি আপনি লিখেছেন?’
‘না পুলিশ নিজেই লিখসে৷ আমি শুধু বুইড়া আঙ্গুলের ছাপ দিয়া আসছি।’
আমি জিডির কপি নিয়ে হাবু ভাইয়ের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসলাম৷ সন্ধ্যা হয়ে গেছে৷ জিডিটা পড়তে ইচ্ছে করছে না। ভাজ করে পকেটে রেখে দিলাম। পরে পড়বো৷ আমার নদীর পাড়ে ধরে হাঁটতে ইচ্ছে করছে৷ সেদিকে পা বাড়িয়ে ভাবতে লাগলাম, ‘কেসটা মাত্র শুরু হলো। সাস্পেক্ট লিস্টে এখন পর্যন্ত শুধুই চেয়ারম্যানের ছেলে৷ আর কেউ নেই৷ তাই ধারণা করছি কেসটা দ্রুত সলভ হয়ে যাবে৷ ক্রিটিকাল কিছু নেই। শুধু আসল ঘটনাটা জানা আর প্রমাণ সংগ্রহ করাটা মুখ্য বিষয়৷’ এসব ভাবনা ভাবতে ইচ্ছে করছে না। নদীর পাড়ে হাঁটতে এসেছি৷ এখন অন্ধকার, নদী আর চাঁদ মিলে যে সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে তা উপভোগ করার সময়। তাই করি। অন্য চিন্তা দূরে থাকুক।
চলবে……..