March 2, 2024

শিশুদের প্রশংসা করার ৭টি সঠিক উপায়

মাহিম তার প্যারেন্টিং স্টাইল নিয়ে অনেক সচেতন। কিন্তু ইদানিং সে তার ছেলের ভিতরে কিছু নেতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করছে। সে লক্ষ্য করেছে তার ছেলের মধ্যে অহংকার বৃদ্ধি, সমালোচনা নিতে না পারা এবং অন্যদের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করার প্রবণতা প্রবল আকার ধারণ করছে। ফাহিমের সাথে আলাপচারিতায় সে একদিন এই বিষয়টা তুলে আনলো। আলাপচারিতার মাঝে ফাহিম মাহিমের প্রশংসা করার ধরনে ত্রুটি দেখতে পেল। এরপর ফাহিম মাহিমের সাথে প্রশংসা করার সঠিক পদ্ধতি নিয়ে বিস্তর আলোচনা করলো।


শিশুদের মানসিক বিকাশে প্রশংসা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রশংসা আপনার সন্তানের উপর ইতিবাচক না নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে তা নির্ভর করে আপনি কিভাবে এবং কখন তার প্রশংসা করছেন। তাই চলুন আজ জেনে নেয়া যাক শিশুদের প্রশংসা করার সঠিক পদ্ধতিগুলো সম্বন্ধে।


• এমন কিছু নিয়ে প্রশংসা করুন যেটা তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে
“তুমি অনেক প্রতিভাবান” বা “তুমি অনেক বুদ্ধিমান” এই কথাগুলো আমরা প্রায়ই কাউকে প্রশংসা করার জন্য বলে থাকি। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের ক্ষেত্রে এই প্রশংসাগুলোর নেতিবাচক প্রভাব দেখা যায়। তাদের সবসময় উচ্চ স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখার বিষয়টি নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে দেখা যায়। কার্ল ডোয়েক এবং তার সহকর্মীরা এসব শিশুদের নিয়ে কয়েক দফায় করা পরীক্ষালব্ধ স্টাডি থেকে তাদের মধ্যে প্রতিকূলতাকে এড়িয়ে চলার প্রবণতা লক্ষ্য করেন। এছাড়াও এই ধরণের প্রশংসা তাদের পরোক্ষভাবে একটি বার্তা দেয় যেটা হচ্ছে, প্রতিভা হয়তো কারো ভেতর থাকে আর কারো ভেতর থাকেনা। যেটা অন্য শিশুদের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে। যখন তারা কোনো ভুল করে তখন তারা অসহায়ত্ব অনুভব করে।


তাদের মনের ভেতর খটকা তৈরী হয় যদি ভুল করা দূর্বল বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ হয় তাহলে ভুলকে শোধরানোর কি পয়েন্ট থাকে? এছাড়াও এইসব শিশুদের মাঝে ব্যর্থতা সামলানোর ব্যাপারে অদক্ষতা লক্ষ্য করা যায়। এছাড়াও ভালো গ্রেডের জন্য যাদের প্রশংসা করা হয় তাদের অনেকের মধ্যে শেখার সুযোগ এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় যদি সেটা তাদের ভালো রেজাল্ট ধরে রাখার ব্যাপারটিকে ঝুঁকিতে ফেলে। অপরদিকে শিশুদের প্রচেষ্টা এবং কাজ সম্পাদনের প্রসেসের জন্য প্রশংসা করা হলে সেটি শিশুদের প্রাণবন্ত ও অধ্যবসায়ী করে তোলে। তাই শিশুদের এমন কিছু নিয়ে সবসময় প্রশংসা করুন যেটা তাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। যেমন তাদের পরিশ্রম, প্রচেষ্টা, কাজ সম্পাদন করার জন্য তাদের ব্যবহৃত স্ট্র্যাটেজি, ধৈর্য্য ধরে লেগে থাকা এই বিষয়গুলো।


উদাহরণ:
“গতকাল প্রস্তুতির সময় তোমার ইয়র্কার পারফেক্ট করার প্রচেষ্টা খুবই ভালো ছিল। যার ফলাফল আজকে ম্যাচে পেয়েছো”
“পরীক্ষায় ভালো করার জন্য তেমার পরিশ্রমের প্রশংসা না করে পারলামনা।”


• প্রশংসায় আন্তরিকতা থাকাটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ
প্রশংসায় যদি আন্তরিকতার অভাব থাকে এবং অতিরঞ্জিত হয় তাহলে সেটি শিশুদের উৎসাহিত করেনা। ধরুন একটা বাচ্চা পরীক্ষায় ৫টি প্রশ্নের ভিতরে প্রথম ৩টি প্রশ্নই ভুল করলো। এক্ষেত্রে আপনার প্রশংসার ধরণ যদি এমন হয় যে, “বাহ! প্রশ্নের উত্তর লেখার দিক দিয়ে তুমি তো অনেক পটু। ” এই প্রশংসা শুনে ঐ শিশুর মনে প্রথমেই যে প্রশ্নটা আসার সম্ভাবনা থাকবে সেটা হচ্ছে, “প্রশ্নোত্তরে পটু হলে আমি ৩টি প্রশ্ন কেন পারলামনা? ” এক্ষেত্রে প্রসংশার ধরণ যেরকম হওয়া উচিত ছিলো তা হলো, “তোমার লিখা শেষের দুইটি প্রশ্নের উত্তর অসাধারণ ছিলো।” একইভাবে প্রশংসা যদি ম্যানুপুলেটিভ হয় সেই প্রশংসাও অন্তঃসারশূন্য হয়। যেমন কোনো শিশুর প্রশ্নের উত্তরে যদি আপনি বলেন,”তোমার লিখা উত্তরটা দারুণ হয়েছে আর আমি জানি ভবিষ্যতেও তেমার উত্তরগুলো এমনই দারুণ হবে।” তাহলে সেটি ম্যানুপুলেটিভ শোনাবে। তাই এই ধরণের প্রশংসা বর্জন করুন।


• চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশংসা করুন
লস অ্যাঞ্জেলোসের সাইকোলজিস্ট মোনা ডেলাহোক, পিএইচডি বলেন, “প্রশংসা করার ধরণ অনেকসময় প্রশংসায় আপনি কি শব্দ ব্যবহার করছেন সেটির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।” তাই প্রশংসা করার সময় শিশুদের নাম উল্লেখ করুন। চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশংসা করুন। হাসিমুখে প্রশংসা করুন।


• নির্দিষ্ট করে বর্ণনামূলক প্রশংসা করুন
আপনার প্রশংসা যত বেশী স্পেসিফিক এবং বর্ণনামূলক হবে, সেই প্রশংসার কার্যকারিতাও ততো বেশী হবে। ধরুন একটি শিশু খুব সুন্দর করে একটি গ্রামের দৃশ্য অঙ্কন করলো। এখন যদি আপনার প্রসংশা এমন হয় যে, “বাহ! খুব সুন্দর।” তাহলে এই প্রশংসাতে নির্দিষ্ট করে আপনার কোন জিনিসগুলো ভালো লেগেছে সেটি কিন্তু ঐ শিশুটি জানতে পারবেনা। এটার বদলে আপনি বলতে পারেন, “রংতুলির ছোয়াতে তুমি যেভাবে নদী, পাহাড়, আকাশ, ঘর-বাড়ি ফুটিয়ে তুলেছো সেটি আমার খুবই ভালো লেগেছে।”


• তুলনামূলক প্রশংসা বর্জন করুন
আমাদের সমাজে এই ধরনের প্রশংসা আমরা অনেক বেশী শুনতে পাই। এই ধরনের প্রশংসা হয়তো শিশুদের কোনো কাজ বা পড়াশোনা বেশী করতে সাহায্য করে কিন্তু শিশু যখন ব্যার্থ হয় তখন সেটা ব্যাকফায়ার করে। এই ধরনের প্রশংসায় শিশুটি যখন অন্য কারো সাথে প্রতিযোগিতা করে জেতে তখন তার ভালো অনুভব হলেও যখন সে হারবে তখন ঘুরে দাড়ানোর বদলে সে আরো হতাশ হয়ে পড়বে। এ ধরনের শিশুদের ভবিষ্যতে ব্যর্থতা সামলানোতে অদক্ষ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশী থাকে। এই ধরনের প্রশংসা শিশুদের কেনো কিছু শেখাকে বাদ দিয়ে জেতাকে লক্ষ্য বানাতে শেখায়। তাই শিশুদের তুলনা না করে তাদের নিজস্ব স্বকীয়তার জন্য প্রশংসা করুন।


• মাত্রাধিক প্রশংসা করার ব্যাপারে সতর্ক থাকুন
শিশুদের কোনো পছন্দের কাজে যদি আপনি মাত্রাধিক প্রশংসা করে ফেলেন তাহলে সেটি তাদের পছন্দের কাজ করার মোটিভেশনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ধরুন একটি শিশু ফল খেতে অনেক ভালোবাসে। এখন যদি তার মা যখনই সে ফল খায় তখনই তার প্রশংসা করে তাহলে সচেতনভাবে বা অচেতনভাবে ঐ শিশুটি তার ফল খাওয়ার মোটিভেশনকে প্রশ্ন করবে।তার মনে হবে, “আমি কি শুধু প্রশংসার জন্য ফল খাই?” যখনই ফল খাওয়ার জন্য তার মা আর তাকে প্রশংসা করবেনা তখন তার ফল খাওয়াতে আগ্রহ হারানোর একটা বড় সম্ভাবনা থাকবে।


• এক্সট্রিম লেভেলের প্রশংসা করা থেকে বিরত থাকুন
“তুমি পারফেক্ট” “এই কাজ তোমার চেয়ে ভালো কেউ করতে পারবেনা “
প্রশংসা যদি এই ধরনের এক্সট্রিম হয় তাহলে সেটি শিশুর মনে অবাস্তব স্ট্যান্ডার্ড তৈরী করবে যা তাকে হতাশার দিকে নিয়ে যাবে। আস্তে আস্তে যখন সে বড় হতে থাকবে সে তার ভবিষ্যত পারফর্মেন্স নিয়ে সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকবে। তার আত্নসম্মানবোধ কমার সম্ভাবনা বেশী থাকবে। এই ধরণের প্রশংসা শিশুকে নার্সিসিজমের দিকে ধাবিত করে।


সচেতনভাবে সঠিক পদ্ধতিতে প্রশংসা করার দক্ষতাকে নিজের আয়ত্তে আনতে আমাদের সময় লাগতে পারে যেটা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। আমরা আমাদের আশেপাশে যেসব প্রশংসা শুনে বড় হয়েছি সেসব প্রশংসার পুনরাবৃত্তি আমরা সাধারণত করে থাকি। তাই প্রশংসা করার ধরণে আমাদের মাঝেমাঝে ভুল হওয়াটাও স্বাভাবিক। আমাদের শুধু প্রশংসা করার ধরনে একটু বেশী সচেতন হতে হবে এবং সঠিক পদ্ধতিতে প্রশংসা করার অভ্যাস গড়তে হবে যাতে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম সঠিক প্রশংসা পেয়ে বড় হতে পারে।


Name: Asif Khan
Designation: Volunteer content writer

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *