February 25, 2024

যে জীবন ফড়িঙের যে জীবন জোনাকির | Je Jibon Foringer Je Jibon Jonakir

একসময়ের বিখ্যাত গলফ খেলোয়াড় টাইগার উডস। ছিলেন সবচেয়ে ধনী স্পোর্টসম্যান। নাম, যশ, খ্যাতি, অর্থ, সম্মান—এক জীবনে আর কী চাই! কিন্তু একদিন খুব ছোট্ট একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিমিষেই তার সমস্ত কিছু তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসার মতো, তার জীবনের সমস্ত অপকর্ম বেরিয়ে এলো। জানা গেল বছরের পর বছর ধরে অসংখ্য নারীর সাথে সে পরকীয়া, যৌনাচার করে বেড়াচ্ছে। তার সুখের সংসার ভাঙার উপক্রম হলো, সব স্পন্সররা তার সাথে চুক্তি বাতিল করল। দুনিয়াজুড়ে তার কোটি কোটি ভক্তের কাছে নিমিষেই এক হিরো হয়ে গেল ভিলেন। সেই মাঠেও আর সেভাবে কখনো পারফর্ম করতে পারেনি। একটি ঝলমলে তারকার কী কুৎসিত পতন।

হলিউড মিডিয়া মোগল হার্ভে ওয়েনস্টেইন, হঠাৎ একদিন তার বিরুদ্ধে একজন যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আনে। এরপর যা হয়েছে তা রীতিমত ইতিহাস। একে একে তার সমস্ত অপকর্ম বের হয়ে আসে। তৈরি হয় #metoo আন্দোলন। সেই আন্দোলনের ঝড়ে হলিউড-বলিউড থেকে সবখানে নামিদামি সব অভিনেতা, প্রযোজক, পরিচালক সকলের আকাম কুকাম সব বের হয়ে আসতে শুরু করে। এদের অনেকেই ফেঁসে গেছেন রীতিমত দশ-বিশ বছর আগের নানান কুকর্মের জন্য।

সম্প্রতি চিটাগাঙে এক ডাক্তারের আত্মহত্যার একটা ঘটনা সারাদেশে ভাইরাল হয়েছে। সে তার স্ত্রীর পরকীয়ার প্রমাণসহ সবকিছু ফাঁস করে নিজে আত্মহত্যা করেছে। মাত্র কিছু সময়ের ব্যবধানে একজন শিক্ষিত, ডাক্তার, আদর্শ স্ত্রী, পুত্রবধু নিমিষেই কী কুৎসিত চরিত্রের নারী হিসেবে সারাদেশের মানুষের কাছে এক্সপোসড হয়ে গেল। এর একদিন আগেও হয়তো মেয়েটি এরকম কিছু স্বপ্নেও ভাবেনি। সবকটা পত্রিকা, সারা ফেসবুকজুড়ে তার এই অপকর্ম ফলাও করে প্রচার হয়েছে। চট্টগ্রামের রাস্তায় রাস্তায় তার এসব অপকর্মের ছবি সম্বলিত পোস্টার লাগানো হয়েছে। তার শাস্তির জন্য মানববন্ধন হয়েছে অনেক জায়গায়।

এমনকি ইসলামি লেবাসধারী অনেকেরও দীর্ঘদিন ধরে চলা এরকম গোপন পাপের গোমর হঠাৎ একদিন ফাঁস হয়ে যায়। ফেনীর লম্পট মাদ্রাসা অধ্যক্ষ তার সাম্প্রতিক উদাহরণ। এরকম উদাহরণ মোটেই বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এভাবে পর্দার আড়ালে মানুষের গোপন পাপ, খেয়ানত, দুর্নীতি, নারী কেলেঙ্কারি, চারিত্রিক কলুষতা বের হয়ে এলে মানুষের নিতান্ত সহজ সরল চরিত্রের আসল রূপও বের হয়ে আসে।

একজন মানুষের বড় শাস্তি হলো আত্মসম্মান হারানোর শাস্তি। সামাজিকভাবে, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে একঘরে হয়ে যাওয়ার শাস্তি। গোপন পাপ প্রকাশ হওয়ার মাধ্যমে মানুষ এই শাস্তির মধ্য দিয়ে যায়।

আত্মহত্যা করা ডাক্তারের স্ত্রী সেই ঘটনায় জেলে গিয়েছিল। তার কী শাস্তি হবে আমি জানি না, কিংবা আদৌ কোনো শাস্তি হবে কি না সেটাও জানি না। কিন্তু তার আত্মসম্মানের যে মৃত্যু হয়েছে, সারা দেশের মানুষের কাছে তার ব্যক্তিত্বের যে মৃত্যু হয়েছে, সামাজিকভাবে তার সম্মান আর স্ট্যাট্যাসের যে পতন হয়েছে, তার পরিবার যেভাবে মানুষের কাছে মুখ দেখাতে পারছে না—এ এক ভয়াবহ শাস্তি।

মহান রব যে আমাদের পাপগুলো গোপন রাখেন, এটা তাঁর রাহমাহ। কিন্তু মানুষ যখন প্রতিনিয়ত গোপন পাপে লিপ্ত হয়ে নিজের উপর যুলুম করেই যায়, তখন আল্লাহ তার কিছু পাপকে মানুষের সামনে নিয়ে আসেন। তাকে নিবৃত করার জন্য।

শাইখ আবদুল আযীয আত তারিফী বলেন,

“আল্লাহ দুটি কারণে মানুষের দোষ প্রকাশ করে দেন:
—যদি সে অন্যের দোষ প্রচার করে বেড়ায়।
—যদি সে গোপনে অতিরিক্ত গুনাহ করে, তাহলে এর কিছু অংশ প্রকাশ করে আল্লাহ তাকে ও অন্যদের নিরস্ত করেন।”

এটা দুনিয়ার শাস্তি। আখিরাতের শাস্তি আরও ভয়াবহ, সেদিনের শাস্তি আরও আফসোসের। সেদিন সারা মানবজাতির সামনে আমাদেরকে বেইজ্জত হতে হবে। দুনিয়াতে আমাদের সকল গোপন কর্ম সেদিন ফাঁস হয়ে যাবে।

ইবনু মাজাহতে সহিহ সনদে এসেছে, সাওবান রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

“আমি আমার উম্মাতের কতক দল সম্পর্কে অবশ্যই জানি যারা কিয়ামতের দিন তিহামার শুভ্র পর্বতমালার সমতুল্য নেক আমল সহ উপস্থিত হবে। মহামহিম আল্লাহ সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করবেন। সাওবান রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! তাদের পরিচয় পরিষ্কারভাবে আমাদের নিকট বর্ণনা করুন, যাতে অজ্ঞাতসারে আমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত না হই। তিনি বলেন, তারা তোমাদেরই ভ্রাতৃগোষ্ঠী এবং তোমাদের সম্প্রদায়ভুক্ত। তারা রাতের বেলা তোমাদের মতোই ইবাদাত করবে। কিন্তু তারা এমন লোক যে, একান্ত গোপনে আল্লাহর হারামকৃত বিষয়ে লিপ্ত হবে।” (ইবনু মাজাহ: ৪২৪৫)

গোপন পাপের এই ফাঁদ থেকে নিজের মানসম্মান, নিজের আত্মাকে, নিজের দুনিয়া আখিরাত হিফাযত করার একমাত্র উপায় হলো আল্লাহর কাছে খালেস মনে তাওবা করা। সমস্ত পাপ থেকে, সমস্ত কুকর্ম থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এবং আর কখনো সেই পাপের জগতে ফিরে না যাওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হওয়া।

কিন্তু আমাদের গোপন পাপগুলো দুনিয়াতে মাফ হলেও যদি আখিরাতে সেগুলো ফাঁস হয়ে যায়?

রামাদানের শেষ দশদিনে একটি দুআ করতে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের শিখিয়েছেন। দুআটি হলো-

اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي

অর্থাৎ “হে আল্লাহ, নিশ্চয়ই আপনি পরম ক্ষমাশীল এবং ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, সুতরাং আমাকে ক্ষমা করে দিন।”

এখানে ‘ক্ষমা করা’ অর্থে ‘গাফুর’ শব্দটি ব্যবহার না করে ‘আফুউ’ ব্যবহার করা হয়েছে। যদিও শব্দ দুটির অর্থ একই, তাহলে ‘আফুউ’ ব্যবহার করার কারণ কী?

ওলামাদের কারও কারও মতে আল্লাহ তাআলার মাগফিরাতের অর্থ হচ্ছে আল্লাহ তাআলা আপনাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন, কিন্তু আপনার গুনাহগুলো তারপরও লিপিবদ্ধ হয়ে থাকবে এবং বিচার দিবসে আপনাকে এর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। অর্থাৎ আপনাকে মাফ করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বিচার দিবসের আগ পর্যন্ত সেগুলো মুছে ফেলা হবে না।
বুখারিতে বর্ণিত একটি হাদিসে এই ধরনের একটি কথা উল্লেখ আছে।
হাদিসটিতে বলা হয়েছে, আল্লাহ্ তাঁর এক বান্দাকে নিজের সান্নিধ্যে আনতে থাকেন, আর তাকে প্রশ্ন করতে থাকেন, তুমি কি নিজের অমুক গুনাহর কথা মনে করতে পারো? বান্দা বলবে, হ্যাঁ পারি। এরপর আল্লাহ আবার জিজ্ঞেস করবেন, তুমি কি তোমার তমুক গুনাহর কথা মনে করতে পারো? বান্দা আবারও বলবে, হ্যাঁ পারি। এভাবে বান্দা যখন নিজের সকল গুনাহর কথা স্বীকার করে নেবে, তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমি ইহকালে তোমার এই গুনাহগুলোকে গোপন রেখেছিলাম আর তারপর ক্ষমা করে দিয়েছি। ওলামারা বলেন এটা হলো ‘মাগফিরাহ’।

তাহলে ‘আফুউ’ কী? ‘আফুউ’ এর থেকেও অধিক মর্যাদাসম্পন্ন ক্ষমা। ‘আফুউ’ হলো যখন আল্লাহ তাআলা আপনার গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেবার পর তা পুরোপুরি মুছে ফেলেন। এমনকি বিচার দিবসেও সে সম্পর্কে কিছুই জিজ্ঞেস করা হবে না। আল্লাহ তাআলা বান্দা এবং ফেরেশতাদেরকেও এই গুনাহগুলোর কথা ভুলিয়ে দেন, যেন বিচার দিবসে আপনাকে এসব গুনাহর জন্য অপমানিত হতে না হয়। মানুষ তার পাপ কর্মের জন্য যখন একেবারে মন থেকে ক্ষমা চায়, তখন আল্লাহ অত্যন্ত খুশি হয়ে এই ধরনের ক্ষমা করে থাকেন।

এটাই হচ্ছে সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন এবং সম্মানজনক ক্ষমা। কুরআনে খেয়াল করলে দেখা যায়, আল্লাহ তাআলা যখন সবচেয়ে গুরুতর গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেন বা মানুষকে অন্যদের কোনো গুরুতর ব্যাপারে মাফ করে দেওয়ার নির্দেশ দেন, তখন ‘আফুউ শব্দটি ব্যবহার করেন।

আল্লাহ যেন আমাদেরকে গোপন পাপ থেকে হিফাযত করেন। এই দুনিয়া আর আখিরাতে বেইজ্জত হওয়া থেকে বাঁচিয়ে দেন। আল্লাহ যেন আমাদেরকে ‘আফুউ’ দান করেন। পাপগুলো এভাবে মুছে দেন যেন আমাদের রব ছাড়া আর কেউ না জানে। আমীন।

গোপন পাপ
বই : যে জীবন ফড়িঙের যে জীবন জোনাকির, পৃ : ৩৬-৩৯
Bookmark Publication

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *