বৃষ্টিভেজা বিকেল – লেখক : নুসরাত জাহান মুন | Brishtiveja Bikel By Nusrat Jahan Mun

বৃষ্টিভেজা বিকেল (pdf link available short)..⤵️

লেখক : নুসরাত জাহান মুন
প্রকাশনী : মুহাম্মদ পাবলিকেশন
বিষয় : ইসলামী সাহিত্য
অনুবাদক : মহিউদ্দিন কাসেমী
সম্পাদক : মুহাম্মদ পাবলিকেশন সম্পাদনা পর্ষদ
পৃষ্ঠা : 128, কভার : পেপার ব্যাক
আইএসবিএন : 9789849570738, 

ভাষা : বাংলা।

Image

                    টবের গাছ….

আজ নিলয়ের ইন্টারভিউ। বেশ নামিদামি কোম্পানির ম্যানেজার পদের জন্য অ্যাপ্লাই করেছে সে। প্রাথমিক ইন্টারভিউ খুব সহজেই পার করে এসেছে। এখন ফাইনাল ইন্টারভিউর জন্য ডিরেক্টরের সাথে দেখা করতে হচ্ছে। এতটা নার্ভাস লাগছে, মনে হচ্ছে যেন হার্টটা দৌড়ে কোথাও পালাতে চেষ্টা করছে।
ডিরেক্টর সিভি হাতে নিয়ে দেখলেন তার সামনে বসে থাকা এই উদ্যমী তরুণের একাডেমিক রেজাল্ট খুবই ভালো। তাই কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি স্কুলে কোনো রকম স্কলারশিপ পেয়েছিলে?
নিলয় বিনয়ের সাথে জবাব দিল, ‘না, স্যার।’
‘তাহলে কি তোমার বাবা স্কুলের সব ফি দিতেন?’
‘জি না, স্যার। আমার বয়স যখন ১ বছর ছিল, তখন তিনি মারা যান।’ উত্তর দিল নীরব।
চোখ সরু করে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালেন ডিরেক্টর।
ডিরেক্টরের দৃষ্টির প্রশ্ন বুঝতে পেরে নিলয় আবার বলল, ‘আমার মা আমার পড়াশোনার জন্য সব রকমের খরচ করতেন।’
কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে ডিরেক্টর জিজ্ঞেস করলেন, ‘উনি কোথায় কাজ করেন?’
‘বিভিন্ন বাসা থেকে কাপড় এনে ধুয়ে দেন।’
কফির কাপটা টেবিলে রেখে একটু সামনের দিকে ঝুঁকে এসে ডিরেক্টর বললেন, ‘তোমার হাতটা একটু আমাকে দেখাতে পারবে?’
‘জি নিশ্চয়’ বলে নিজের দুটি হাত ডিরেক্টরের সামনে মেলে ধরল নিলয়।
একেবারে দাগহীন, কোমল হাত। ডিরেক্টর জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা, তুমি কি কখনো তোমার মাকে কাপড় ধুতে সাহায্য করেছ?’
‘কখনই না। মা সব সময়ই চেয়েছেন আমি যেন ভালো করে পড়াশোনা করি। বেশি বেশি বই পড়ি। এর বাইরে কোনো কাজ আমাকে কখনো করতে দেন না। তা ছাড়া, মা আমার থেকেও অনেক দ্রুত কাপড় ধুয়ে ফেলেন। আমি ধুতে গেলে অনেক দেরি হয়ে যায়।
‘আমি তোমাকে একটা অনুরোধ করতে চাই। রাখবে?’
‘জি, স্যার। নিশ্চয়।’ বিনয়ী কণ্ঠে বলল নিলয়।
‘আজ বাসায় গিয়ে তোমার মায়ের হাত জোড়া নিজের হাতে ধুয়ে দিবে। তারপর কাল সকালে আমার সাথে দেখা করবে।’
܀܀܀
অফিস থেকে বের হয়ে মনটা বেশ প্রফুল্ল লাগছে নিলয়ের। মনে হচ্ছে চাকরিটা হয়ে যাবে। বাড়ি ফিরে মায়ের কাছে তার হাত জোড়া চাইল ধুয়ে দিতে। ছেলের এমন অদ্ভুত আবদারে মা বেশ অবাক হলেন। সাথে খুব খুশিও হলেন। আনন্দ আর আশ্চর্যের এক মিশ্র অনুভূতি খেলা করে গেল মায়ের মন জুড়ে। হাসি মুখে নিজের হাত জোড়া বাড়িয়ে দিল ছেলের দিকে।
তরুণ বেশ মনোযোগ দিয়ে ধীরে ধীরে মায়ে হাত ধুয়ে দিতে লাগল। ধুয়ে দিতে দিতে ছেলেটার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এল। জীবনে এই প্রথম ছেলেটা তার মায়ের কুঁচকে যাওয়া হাতটা খেয়াল করল। হাত দুটোর এখানে সেখানে কত ক্ষত চিহ্ন। কিছু ক্ষত তো এখনো তাজা। ছেলের স্পর্শে মা ‘উফ!’ বলে ব্যথায় চোখ বুজে ফেলছে।
এই হাত জোড়া প্রতিদিন কত কাপড় ধুয়ে, কত পরিশ্রম করে তার পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছে। প্রতিটা ক্ষত চিহ্ন যে তার স্কুলের ফি, বইপত্রের খরচ আর ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়; নিলয় এই প্রথম তা উপলব্ধি করল।
মায়ের হাত ধুয়ে দিয়ে নিলয় নীরবে মায়ের বাকি কাপড়গুলোও ধুয়ে দিল। মা ছেলে খুব
গল্প করল সে রাতে।
܀܀܀
পরদিন সকালে ডিরেক্টরের অফিসে পৌঁছে নিলয়। ‘কাল তুমি কী করলে বা কী শিখলে আমাকে কি বুঝিয়ে বলতে পারবে?’ বলে এক দৃষ্টিতে তরুণের দিকে তাকিয়ে রইল।
ডিরেক্টর। ‘আমি আমার মায়ের হাত ধুয়ে দিয়েছি। আর মায়ের বাকি কাপড়গুলোও ধুয়ে দিয়েছি।’
কথাটা বলতে বলতে যে তরুণের চোখের কোণ চিকচিক করে উঠল তা ডিরেক্টরের দৃষ্টি এড়াল না।
কিছুক্ষণ নীরব থেকে নিলয় আবার বলা শুরু করল, “আজ আমি যা তা সবটাই আমার
মায়ের জন্য।’
ডিরেক্টর এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তরুণের দিকে। ছলছল দৃষ্টি নিয়ে বলে চলল তরুণ, ‘আজ বুঝতে পারছি কাজের মূল্যায়ন কাকে বলে। মাকে সাহায্য করে আজ আমি বুঝলাম, একা একা নিজে থেকে কোনো কাজ করাটা কতটা কঠিন। আর নিজের পরিবারকে সাহায্য করার গুরুত্ব এবং মূল্যও আমি আজ উপলব্ধি করতে পারলাম।’
‘আমি একজন ম্যানেজারের মধ্যে এই গুণটাই খুঁজছিলাম।’ এটুকু বলে ডিরেক্টর নিজের চেয়ারে হালকা করে হেলান দিয়ে বললেন, ‘এমন একজন যে অন্যের সাহায্যের মূল্যায়ন করতে পারে। অন্যের কাজের প্রশংসা করতে পারে। যে কিনা অন্যের কতটুকু কাজ করার ক্ষমতা আছে তা বুঝবে। অন্যের কষ্ট নিজে উপলব্ধি করতে পারবে। এমন কেউ যে নিজের জীবনের লক্ষ্য হিসেবে টাকাকে রাখে না’—বলতে বলতে একটু থামলেন ডিরেক্টর। চেয়ারে সোজা হয়ে বসে নিলয়ের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ‘ইউ আর হায়ারড, ইয়াং ম্যান।’
কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে অধীনস্থদের সম্মান অর্জন করে নিল নিলয়। অন্য সবাইও খুব যত্নের সাথে দলীয়ভাবে কাজ করে। ফলে সেই কোম্পানির পারফরম্যান্স অনেক উন্নতির দিকে এগুচ্ছিল।
খুব আদর যত্নে তুলুতুলু করে যে শিশুকে বড় করা হয়, সে নিজেকে ছাড়া আর কিছুই বুঝে না; এমনকি তার বাবামায়ের যত্নেরও মূল্যায়ন করতে জানে না। কর্মক্ষেত্রে তাই সহকর্মীদের কায়ক্লেশ তাকে নাড়া দিতে পারে না। অন্যের কাজের দোষ ধরায় বা খুঁত খুঁজতেই ব্যস্ত থাকে সে। এমন মানুষরা হয়তো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে খুব ভালো হতে পারে; হয়তো সাময়িকভাবে সফলও হতে পারে; কিন্তু দিন শেষে তাদের অন্তরটা শূন্য পড়ে রয়। কৃতিত্বের কোনো অনুভূতিই তাদের ছুঁয়ে যেতে পারে না, ফলে তারা খুব ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তাদের বুকের ভেতরটা ভরে ওঠে অন্যের প্রতি ঘৃণায়। এর থেকে বের হতে তাদের মধ্যে ‘আরও চাই আরও লাগবে’ এমন একটা মনোভাব গড়ে ওঠে।
আম্মি একটা কথা প্রায়ই বলে, “টবের গাছ হবা না’ কথাটার ভাব-সম্প্রসারণ হলো, টবের গাছের খুব বেশি যত্ন নেওয়ার পরও তা হয় দুর্বল। কিন্তু এই একই গাছ রুক্ষ শুষ্ক কোথাও একেবারে যত্নহীন অবস্থায় বেড়ে ওঠেও হৃষ্টপুষ্ট ফল দেয় Read more after buy.

       লেইম কোয়েশ্চেন অর নট!?

উমর ক্লাস এইটে পড়ে। এই বয়সেই খুব ব্যস্ত। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর দুটো প্রাইভেট। তারপর স্কুল। স্কুল থেকে ফিরে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাসাতেই থাকা হয়। তারপর হয় ঘুম, নতুবা টিভি দেখা কিংবা গেইম খেলা অথবা ছাদে গিয়ে অন্যদের সঙ্গে খেলা করা। সন্ধ্যার পর আবার দুটো প্রাইভেট। বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত ৯/১০টা। খেতে খেতে একটু টিভি দেখা, তারপর ঘুম। সামনে জেএসসি, তাই নাকি এ বছরটা একটু কষ্ট করতেই হবে, ওর আম্মু বলে। কথাটা শুনলে বিরক্ত লাগে উমরের। কী অদ্ভুত! আম্মু প্রতিবছর এই একই কথা বলে। আজ সকালে প্রাইভেট নেই।
পড়াশোনায় খুব একটা ভালো ছিল না আগে; তবে ক্লাসে যেতে ভালোই লাগত। কিন্তু গত ২/৩ মাস থেকে সে আগের তুলনায় বেশি আগ্রহ নিয়ে পড়াশোনা করে। তার এই পরিবর্তনটা এসেছে তুহিন ভাইয়ার কাছে প্রাইভেট পড়া শুরু করার পর থেকে। গত ৭ মাস আগে পাশের বাসায় নতুন ভাড়াটে হিসেবে এসেছিল ওরা। কেমন অদ্ভুত ধরনের এক মানুষ! প্রাইভেট শুরুর আগে ভাইয়া বাচ্চাদের সাথে ছাদে খেলতেন।
প্রথম দিন উমর যখন ভাইয়ার বাসায় পড়তে যাবে তখন কেমন যেন লাগছিল। ভাবছিল, এই ভাইয়া আর কী পড়াবে! নরমাল ক্রিকেট খেলাই তো পারে না। এত্ত ইজি খেলা আর আছে?
মাত্র এক সপ্তাহের মাঝেই উমর বুঝে গেল, নাহ, খেলার সময়ের তুহিন ভাইয়া আর পড়ার টেবিলের ভাইয়া এক মানুষ নয়। খেলার সময় যাকে সমবয়সী মনে হয়, তাকেই পড়তে বসলে মনে হয় কোনো স্কুলের টিচার। আরও অদ্ভুত ব্যাপার হলো, তিনি কাউকে মারেন না, কিন্তু চোখ বড় করে কঠিন করে এমনভাবে ‘পড়ো’ বলেন, তাতেই কাজ হয়ে যায়। যে ম্যাথ নিয়ে ওর এত্ত ভয় ছিল, সেটা এখন ওর পছন্দের বিষয়।
আরও অবাক লাগে, যখন এই কঠিন ভাইয়াটাই অন্যদের লেইম কোয়েশ্চেনগুলো অনেক আগ্রহের সঙ্গে শোনেন। আবার খুব সুন্দর করে উত্তরও বুঝিয়ে বলেন। উমর নিজেও অনেক সময় অনেক লেইম কোয়েশ্চেন করে বসে। বোঝার পর নিজেই আবার নিজেকে নিয়ে হাসে। আর ভাবে, এতটা বোকা বোকা প্রশ্ন সে কী করে করল!
আজ ক’দিন থেকেই তার মাথায় একটা প্রশ্ন ঘুর ঘুর করছে। সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না, এটা কী গুড কোয়েশ্চেন নাকি লেইম কোয়েশ্চেন।
একটা কোয়েশ্চেন নিয়ে তার এত ভাবার কারণ, তুহিন ভাইয়ার কাছে পড়ার আগে সে মোবারক স্যারের কাছে পড়ত। সেখানে স্যারকে কোনো কোয়েশ্চেন করলে যদি সেটা লেইম কোয়েশ্চেন হতো, তাহলে পিটুনি খেতে হতো। সেই ভয়টা তার এখনো কাটেনি। মোবারক স্যার খুবই ভুলো মনের ছিলেন। হয়তো স্যারই বললেন, কাল ৫ টায় যেতে; কিন্তু উনি নিজেই তা ভুলে গেলেন; তখন দেরি করে যাওয়ার অপরাধে কানমলা বা পিটুনি খেতে হতো। তুহিন ভাইয়া আবার এই দিক দিয়ে অনেক আলাদা। ভাইয়া অযথা বকাও দেন না। আগে থেকে ওয়ার্নিং দিয়ে বকা দেন। বলে দেন, ‘কাল এই পড়াটা শিখে না এলে কিন্তু তুমি অনেক বকা খাবা।’ আর যা বলে ঠিক তাই করে। কিছুই ভুলেন না।
হায় হায়! গতকাল তো উমরকেও বলে দেওয়া হয়েছে—“ঠিক ৮ টায় আসবা। ৫ মিনিটও যেন লেট না হয়। লেট হলে শাস্তি আছে।’ অলরেডি ৭ : ৩০ বেজে গেছে! এক লাফে শোয়া থেকে উঠে রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়ল উমর। খুব দ্রুত সিড়ি ভেঙে ঠিক ৭ : ৫৮ তে ভাইয়ার বাসার বেল বাজাল। ভাইয়া নিজেই দরজা খুলে খুব মিষ্টি ও হাসি হাসি কণ্ঠে বলল, ‘ভেরি গুড়! একদম পার্ফেক্ট টাইম।’ উমরের মনটা ভালো হয়ে গেল। মনে মনে ভাবল, গুড হোক আর লেইম হোক, আজ কোয়েশ্চেনটা করবেই সে। ভাইয়া অলওয়েজ প্রথমে আগের দিনের পড়া রিভিউ করে। তারপর নতুন টপিক স্টার্ট করেন। তো আজ রিভিউ শেষে উমর বলল, “ভাইয়া একটা কোয়েশ্চেন করি?’ ভাইয়া খুবই আগ্রহ নিয়ে বলল, ‘হুম বলো।’
‘আচ্ছা ভাইয়া, আমার অনেক ফ্রেন্ড আছে, যারা স্কুলে জোহরের নামাজ পড়ে না। ওদের নামাজ পড়তে বললে বলে যে, আল্লাহ নাকি সব মুসলিমকেই একটা সময় ক্ষমা করে জান্নাতে নিয়ে যাবেন। জাহান্নামে নাকি শুধু কাফিররা থাকবে, তাহলে আর এখন নামাজ পড়ার দরকার কী! আমরা তো মুসলিমই, জান্নাতে তো যাবই। এটা কি ঠিক?’
‘উমর, তোমাকে কুরআনের কিছু আয়াত পড়ে শুনাই। তুমি নিজেই সব বুঝবা।’ এই বলে ভাইয়া ফোন থেকে কুরআনের সুরা বাকারা ওপেন করে পড়া শুরু করলেন—
তারা বলে, আমাদের কখনও আগুন স্পর্শ করবে না; শুধু কয়েকটা দিন। বলে দিন, তোমরা কি আল্লাহর কাছ থেকে কোনো অঙ্গীকার পেয়েছ, যা তিনি কখনও খেলাফ করবেন না? তোমরা যা জানো না, তা আল্লাহর সাথে জুড়ে দিচ্ছ! ১)
‘ঐ কথাটা কি তাহলে ভুল, ভাইয়া?’ উমর বলে উঠল।
তুহিন ভাইয়া বললেন, ‘পড়াটা শেষ করি! তুমি মনোযোগ দিয়ে শোনো, এই বলে ভাইয়া আবার পড়া শুরু করলেন—
হ্যাঁ, যারা গুনাহ করে এবং যাদের গুনাহ তাদের পরিবেষ্টন করে, তারাই জাহান্নামবাসী,
যেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। পক্ষান্তরে, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকাজ করে, তারাই জান্নাতবাসী, সেখানে তারা চিরস্থায়ী। ‘এইত্ত ভাইয়া, এখানে তো বললই, যারা বিশ্বাস করে তারা জান্নাতবাসী!’ খুশি হয়ে
বলে ওঠে উমর।
তুহিন ভাইয়া শান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘উমর, একটু মনোযোগ দিয়ে শোনো।’ এই বলে ভাইয়া একই আয়াতগুলো আরও দুবার পড়লেন। দুবারই ‘বিশ্বাস’ শব্দটা খুব স্পষ্ট ও দৃঢ় করে পড়লেন; যেন এই শব্দের মধ্যে ভাবার মতো কিছু আছে।
উমর কনফিউজড হয়ে বলল, ‘আমরা তো বিশ্বাস করিই যে, আল্লাহ আছেন।’ ভাইয়া হেসে হেসে বললেন, ‘আচ্ছা, তুমি তাহলে বিশ্বাস করো যে আল্লাহ আছেন, তাই না?’
উমর অবাক হয়ে গেল; এটা আবার কেমন কোয়েশ্চেন! আল্লাহ আছেন এটা বিশ্বাস না
করার প্রসঙ্গ এল কোথা থেকে! তবু সব বিস্ময় গোপন করে উমর বলল, ‘হ্যাঁ ভাইয়া!
আমি বিশ্বাস করি।’
তুহিন ভাইয়া এবার যেন আগের সব কথা হঠৎ ভুলে গেলেন। বললেন, ‘ওকে, বাদ দাও এই টপিক। বলো, তুমি আজ একদম পার্ফেক্ট টাইমে কী করে এলে? ডেইলি তো লেট করো।’
‘কী ব্যাপার! তুহিন ভাইয়াও কি মোবারক স্যারের মতো ভুলোমনা হয়ে যাচ্ছেন নাকি?’ ভাবতে ভাবতে উমর বলল, ‘কারণ, আপনিই তো গতকাল বলেছিলেন যে, আজ ৫ মিনিট লেট হলেও শাস্তি পেতে হবে।
‘তার মানে, তুমি আমার কথাটা বিশ্বাস করেছিলা যে, লেট করে এলে তুমি সত্যিই শাস্তি পাবা।’ উমর ‘হ্যাঁ’-সূচক মাথা নাড়ায়।
‘তুমি তো বললা, তুমি আল্লাহকে বিশ্বাস করো; তাহলে আল্লাহ যখন বললেন, নামাজ না পড়লে শাস্তি পাবা, খারাপ কাজ করলে শাস্তি পাবা। তো সব জেনে বুঝেও কেন তাহলে নামাজ না পড়েই থাকো, খারাপ কাজ করো?’ এইটুকু বলে তুহিন ভাইয়া থামলেন। হয়তো উমরের পক্ষ থেকে কোনো উত্তর আশা করছিলেন; কিন্তু উমর চোখ বড় বড় করে শুধু শুনছে।
তুহিন ভাইয়া আবার বলা শুরু করলেন, “শোনো উমর, মানুষ যখন কোনো কিছু বিশ্বাস করে, তখন সেই বিশ্বাসটা তার এক্টিভিটিতে ফুটে ওঠে। যেমন ধরো, টিভিতে কিছুদিন থেকে নিউজ আসছে, আমাদের এলাকাজুড়ে ছিনতাই বেড়েছে। তখন দেখা যাবে, তোমার আম্মু বাসা থেকে বের হওয়ার সময় খুব অল্প টাকা নিয়ে অনেক কম সেজে বের হচ্ছেন। তিনি এমনটা কারার কারণ—তিনি বিশ্বাস করেছেন, টিভিতে যে নিউজটা দেখেছেন তা সত্যি। আর তা সত্যি মানে যে কোনো সময় এমন বিপদের মুখোমুখি তিনি নিজেও হতে পারেন। তাই যতটা সম্ভব নিজেকে সেইফ করে চলার চেষ্টা করছেন। ঠিক কি না?’
উমর মাথে নেড়ে বলল, ‘হ্যাঁ ঠিক।’
ভাইয়া বললেন, আল্লাহ বলেছেন, ‘যারা গুনাহ করে এবং যাদের গুনাহ তাদের পরিবেষ্টন করে তারাই জাহান্নামবাসী, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে।’ তুমি বললে যে, তুমি আল্লাহকে বিশ্বাস করো। অথচ তুমি সৎকাজ করছ না, গুনাহ করছ, আবার এটাও বলছ যে, ‘আমি তো আল্লাহকে বিশ্বাস করি।’ এটা কেমন বিশ্বাস, উমর?’ কেনো যেন উমরের গায়ের লোম কাঁটা দিয়ে উঠল। সে কোনো উত্তর দিতে পারল না।
‘আচ্ছা উমর, ধরো আজ তুমি আমার বাসায় আসতে লেট করে ফেললে, তাই আমি তোমাকে ১০ বার কান ধরে উঠবস করার শাস্তি দিলাম। তাই তুমি বললে, আমি কেন শাস্তি পাব ভাইয়া, আমি তো তোমার কথাটা বিশ্বাস করেছিলাম। এটা কী লজিক্যাল হবে?’ উমর মাথা নিচু করে ‘না’-সূচক মাথা নাড়ে।
ভাইয়া জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কী তোমার কোয়েশ্চেনের অ্যানসার পেয়েছ, উমর?’ উদাস ভঙ্গিতে ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস মিশিয়ে উমর বলল, ‘হুম!’ একটু থেমে জিজ্ঞেস করল, ‘এটা কোন আয়াত, ভাইয়া?
‘সুরা বাকারার ৮০-৮২। পড়া শুরু করো এখন। এমনিতেই অনেক টাইম ওয়েস্ট হয়েছে আজ।’ উমরের পড়ায় মন বসছে না। সে বার বার শুধু একটা কথাই ভাবছে, সত্যিই কুরআনে এত ইজি করে এই আয়াতগুলো আছে! বাসায় গিয়ে অবশ্যই মিলিয়ে দেখতে হবে। সে সব বুঝবে তো। থাক তাও সে দেখবেই; এখন না বুঝলেও ভাইয়ার মতো বড় হলে তো বুঝবে। Read More After Buy This Book
We Respect Every Author Hardwork – boipaw.com™
বইপাও থেকে আপনি আর কি কি কন্টেন্ট পেতে চান?