February 25, 2024

পায়ের তলায় সর্ষে – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

দুই খণ্ড নিয়ে গঠিত ‘পায়ের তলায় সর্ষে‘ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভ্রমন সমগ্র। অ্যান্টার্কটিকা বাদে বাকি ৬ মহাদেশেই লেখক তাঁর পদচিহ্ন রেখেছেন,একারনে তাঁকে সহজেই ‘বিশ্ব নাগরিক’ উপাধিতে ভূষিত করা যায়। কলকাতায় তাঁর স্থায়ী বাসা না থাকলে বাংলা অভিধানের ভাষায় তাকে স্বচ্ছন্দে যাযাবর বলা যেত।


বিয়ের পরে বরের সাথে বিস্তর ট্যুর প্ল্যান করতে গিয়ে ফ্যামিলি প্ল্যানিং এর ব্যাপারটা ধামাচাপা পড়ে যায়। ফলাফল- বিয়ের এক বছর হতে না হতেই এক পুত্রের পিতা-মাতা হয়ে সাময়িক ভাবে যাবতীয় ট্যুর ক্যান্সেল। তবুও আলহামদুলিল্লাহ!
হানিমুনে মধ্যবিত্ত বাঙালির তীর্থস্থান “কক্সবাজার” যাওয়া হয়েছিল ভাগ্যিস। সেই স্মৃতি হাতড়েই দুজন দুজনকে তখন সান্ত্বনা দিতাম। বাবুটা একটু বড় হোক। এরপর জামাই, বউ আর বাচ্চা মিলে শুধু ঘুরব আর চিল করব। মাটির ব্যাংক কিনে টুকটাক টাকা-পয়সা জমাতাম। ভ্রমণখাতের খরচ হিসেবে!
বাবুকে সামলে, সংসারের কাজ করে যেটুকু সময় পেতাম বই পড়তাম বা মুভি দেখতাম। কখনো এলাকার আশেপাশে ঘুরতে যেতাম। কিন্তু এসবে কী আর শখ মেটে?


বাবু যখন একটু বড় হলো, সতের মাসের ওকে নিয়ে আবার সেই কক্সবাজারই ঘুরে এলাম। কারণ ভদ্রলোককে নাকি দিন-রাত সমুদ্র ডাক পারে। এদিকে আমাকে যে পাহাড় ডাকাডাকি করে সেটা ধোপে এবং অন্যান্য পার্থিব কারণে টিকল না। তবুও আমি খুশি।
ফিরে এসে আবার কোথায় যাব- এসব নিয়ে আলাপ আলোচনা করতে করতেই ভিলেনের মত করোনা এসে আস্তানা গাড়ল। এরপর গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত লকডাউন। রাগে-দুঃখে-হতাশায় পাথর হয়ে গেলাম। নিজেকে সামলানোই তখন মুশকিল। কিচ্ছু ভালো লাগে না। সব কিছু বিষের মত মনে হয়।
দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে একদিন “পায়ের তলায় সর্ষে” নিয়ে বসলাম। সুনীলের বাস আমার হৃদয়ের খুব কাছাকাছি । তাঁর লেখনীতে আমি মোহগ্রস্ত হই।


ভ্রমণকাহিনি আগে তেমন পড়তে ইচ্ছা করত না। কিন্তু সুনীলের ভ্রমণকাহিনী গুলোতে চমৎকার সব গল্প থাকে। পড়তে পড়তে ডুব দেওয়া যায়। আর ভাসতে ইচ্ছা করে না। মনে হয়, সব বাদ দিয়ে লোকটার পাশে বসে গল্প শুনে যাই।
এরপর দিন রাত শুধু বেড়িয়েছি। ভারত থেকে আমেরিকা। ইউরোপ। বনে-জঙ্গলে, পাহাড়-নদী-সমুদ্রে। স্বশরীরে না হোক, মানস চোখে তো কত কিছুই দেখাল আমায় লোকটা! কত গল্প শোনাল! মন খারাপেরা এক নিমিষে পালিয়ে যেত। এজন্যই তো এত ভাল লাগে তাঁকে!
বইয়ে কী আছে, সেই বিষয়ে নাই বা বলি। পাতায় পাতায় যে কত গল্প, কত রহস্য, হাসি-আনন্দ, প্রেম আর রোমান্টিকতা আছে, পাঠক পড়লেই বুঝতে পারবেন। হয়তো সিনেমার ঢং-এ বই হাতে গাইতে ইচ্ছে করবে, “এই বই যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বল তো?”
প্রথম খন্ড শেষ হতে হতে আমার ডিপ্রেশন এবং করোনা দুটোই ঝিমিয়ে পড়ল। লকডাউন শেষ হলো। এরপর সুযোগ পেয়ে আমরাও সত্যি সত্যি ঘুরতে গেলাম। অধিক আনন্দে দ্বিতীয় খন্ড আর পড়াই হলো না।


মাঝে মাঝে ভাবি, পড়ে ফেলি। আবার মনে হয়, থাক। পড়লে তো ফুরিয়েই গেল। এরচেয়ে অন্য কোন বিষণ্ণ প্রহরের জন্য তোলা থাক। আবার কখনো ঘরবন্দী হলে সুনীলের সাথেই বেরিয়ে পড়ব!
যাই হোক, পায়ের তলায় সর্ষে পড়ুক বা না পড়ুক, বইটা অবশ্যই পড়ার চেষ্টা করবেন, প্রিয় বন্ধুগণ। আমার মতো যাদের প্ল্যান করে করেই সময় যায়, ঘোরাঘুরির সুযোগ আর হয় না, তাদের জন্য সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এটা দারুণ এক সান্ত্বনা পুরষ্কার!
আর হ্যাঁ, এটা কিন্তু বইয়ের রিভিউ না। আমি অত খুঁটিনাটি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিচার-বিশ্লেষণ করতে পারি না। হাঁসফাঁস লাগে! আমার ভালোলাগাটুকুই লিখলাম মাত্র।


ভালো থাকুন সবাই। বইটা পড়ে কার কেমন লেগেছে জানাবেন কিন্তু!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *