March 2, 2024

পশ্চিমের মেঘে সোনার সিংহ – শাহাদুজ্জামান

পশ্চিমের মেঘে সোনার সিংহ
শাহাদুজ্জামান
পাঠক সমাবেশ
৬৯৫ টাকা (রচনাসংগ্রহ ১)

বর্তমান সময়ের বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র শাহাদুজ্জামান। মননশীল কথাসাহিত্য রচনায় তাঁর কলমের ধার; সমসাময়িক সাহিত্য সম্পর্কে ধারণা রাখা সকলেই কমবেশি জানেন। ‘পশ্চিমের মেঘে সোনার সিংহ’ একটি গল্পগ্রন্থ। বইটিতে মোট ১১ টি ছোটগল্প সংকলিত হয়েছে। ছোট অথচ প্রতীকী কিংবা বড় গল্পের কাছাকাছি রচনার মধ্য দিয়ে দারুণ কিছু উপহার দিয়েছেন লেখক।

সাধারণত গল্পগ্রন্থে নাম ভূমিকায় গল্প থাকলেও এই বইটিতে তা অনুপস্থিত। তবে সেই গল্পটি পাওয়া যায় ‘১৮৯৯’-তে। ১৮৯৯ সালে জন্ম নেওয়া বিষন্ন কবি জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে লেখা প্রথম গল্পটি। অন্তর্মুখী কবিকে নিয়ে লেখকের ভাবনাকে মাত্র দুই পৃষ্ঠায় অসাধারণ বর্ননার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন লেখক।

‘কাগজের অ্যারোপ্লেন’ গল্পটা বেশ ভালো লেগেছে। গল্পকথকের ব্রিজের রেলিং-এ বসে থাকতে ভালো লাগে। সেখানে বসেই নানামুখী ভাবনায় বিভোর হয়ে যায় সে। একসময় অদ্ভুত এক লোক আসে আর জিজ্ঞাসা করে বসে ‘আই ফল আপওন দি থর্ন অব লাইফ, আই ব্লিড’ বইটি কার লেখা? কথক উত্তর দিতে পারেনা। আবার লোকটা ফেরত আসে এবং সাহিত্যের সৃষ্টি কীভাবে হয়েছিল তার গল্প বলে চলে যায়। এখানে বসেই আরো সব ভাবনা কথকের মস্তিষ্ককে জর্জরিত করে তখনই ব্রিজ পেরিয়ে যাওয়া নাইটকোচ থেকে উড়ে আসে একটি কাগজের অ্যারোপ্লেন।

‘শিং মাছ, লাল জেল এইসব’ গল্পটায় আমরা দেখতে পাই সমাজতন্ত্রের উত্থান-পতনের প্রভাব। হামিদ হোসেন বাজার থেকে শিং মাছ কিনে বাড়ি ফিরছিলেন। তখনই ব্যাগ ছিঁড়ে একটি শিং মাছ ধুলোতে পড়ে যাওয়ায় তিনি সেই মাছ আবার ধরতে চেষ্টা করেন। কিন্তু পারছেন না। এই মাছ ধরতে না পারার মাঝেই তাঁর মনে পড়ে মাও সেতুং এর পৌত্রের বিলাসী জীবনের খবরের কথা। অন্যমনস্ক হয়ে ভাবতে থাকেন তাঁর অতীত জীবনের সমাজতান্ত্রিক আদর্শ ও বিপ্লবী ধারার রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ।

‘পন্ডিত’ গল্পটা একটি প্রতীকী গল্প। আমাদের দেশের এনজিওগুলোর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের টাকার ঝনঝনানিকে গ্রামের ছোট বাচ্চাদের অদ্ভুত এক ছড়ার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন লেখক।

‘আন্না কারেনিনার জনৈকা পাঠিকা’ গল্পটা আমার মতে সকল পাঠকের পড়া উচিত। গল্পকথক পুরনো বইয়ের দোকান হতে দুই খন্ড আন্না কারেনিনা কিনেছিলেন। সেই বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠায় হাসান ও মমতা নামক দুইজন মানুষের একটি কথোপকথন ছিল। সেই কথোপকথনকে গল্পকথক নিজের কল্পনাকে কাজে লাগিয়ে আরো সামনে এগিয়ে নিয়েছেন। তবে গল্পের মূল আকর্ষণ এক নাবিকের সাথে এক পাঠিকার রোমান্টিসিজমের ঘটনাটুকু। তবে সেই ঘটনার সমাপ্তি টানেননি লেখক। পাঠকের উপর ছেড়ে দিয়েছেন।

বইটির সর্বশেষ এবং সবচেয়ে বড় গল্প ‘ইব্রাহিম বক্সের সার্কাস’। একজন চিকিৎসক গ্রামে চাকরি করে। সেখানে তার সাথে পরিচয় হয় মধুচাষী ও সার্কাসে খেলা দেখানো ইব্রাহিম বক্সের সাথে। ইব্রাহিম বক্সের সাথে পরিচয়ের পর যুবক চিকিৎসক অনেককিছু জানতে পারে জীবন সম্পর্কে। অথচ গ্রামের জীবন তার কাছে রোমাঞ্চহীন মনে হয়েছিল। ইব্রাহিম বক্সের অদ্ভুত কার্যকলাপ সম্পর্কে জানতে গিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করে যুবক চিকিৎসক। এই গল্পের বেলাতেও লেখক সমাপ্তি টেনেছেন পাঠকের উপর ভার ছেড়ে দিয়ে। বেশ ভালো একটা গল্প।

শাহাদুজ্জামানের অনেকগুলো বই পড়া হয়েছে। তার মধ্যে এই বইটা ভালো লাগার সারিতে উপরের দিকে থাকবে। পাঠকমাত্রই নিজেকে অন্যরকম আঙ্গিকে আবিষ্কার করবেন। হ্যাপি রিডিং।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *