February 26, 2024

পর্দা করতে চাইলে বিয়ের দিনও সম্ভব?

বিয়ের দিন শাড়ি গহনা খুলে বোরকা পড়তে চাওয়ায় আমার আম্মা খুবই বিরক্ত হলেন, একটানা কিছু রাগারাগিও করলেন। মানুষ কি বলবে, এতগুলো গয়না-শাড়ি কেন দিয়েছে?
.
আমি নাছোড়বান্দা, একটাই সিদ্ধান্ত আমার। বরপক্ষ থেকে শুধু মেয়েরাই আমার রুমে আসবে তারা দেখার পর আমি বোরকা পড়ে ফেলবো। আম্মু এগুলো শুনে রুম থেকে বের হয়ে গেল।
.
এরপর আমি বৌ সেজে বসে রইলাম, রুমে কয়েকজন পুরুষ মানুষ আমার চাচাতো ফুফাতো ভাইয়েরা ছবি তোলার জন্য ঢুকতে গিয়েও ব্যর্থ হলো। আজকের দিনেও সাক্ষাৎ না পাওয়া, বা ছবি তুলতে না পারায় তারা রাগে যেন গিজগিজ করছে।
.
শ্বশুড়বাড়ি থেকে লোক আসার পরপরই মেয়েরা হুড়মুড় করে বৌ দেখতে আসলো। সাথে পুরুষরা আসতে চাইলো আমি দরজা লাগিয়ে দিলাম। বিয়ের দিন, আমার উচিত লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে বসে থাকা। কিন্তু আমি বিচলিত কোনো পরপুরুষ আসছে কিনা সেটা নিয়ে। কেউই তা ভালো চোখে নিচ্ছে না, পর্দা নষ্ট হলে কারো কোনো যায়ও আসবেনা।
.
বিয়ের আগে আমি আমার ননদকে মোবাইলে যখন বললাম, “আপনি আমার বোনের মতো, আমায় পর্দা করতে সাহায্য করুন। কোনো গায়ের মাহরাম যেন আমার রুমে না আসে।”
.
তিনি আমাকে আশ্বস্ত করলেন, আমার আপন ভাসুর ৩ জন + চাচাতো ভাসুর ১৫-২০ জন, চাচাতো শ্বশুড়, এলাকার কাছের আত্মীয় ছাড়া কেউই আমাকে দেখবেনা।
.
আমি অবাক হতে গিয়েও মনকে বোঝালাম, নিজের হেফাজত আজ নিজের ওসিলায়ই করতে হবে। এরপর আমার অর্ধাঙ্গের সাথে কথা বলে নিলাম, কবুল বলার পর আমি আপনার স্ত্রীই হয়ে যাবো। এরপর আমাকে যত মানুষই দেখুক, দাইয়্যূস হবেন আপনিই৷ এমনিতেই একটু হুজুর মানুষ, তারপর দাইয়্যূসের ভয় দেখানোটা কাজে লাগলো। তিনি পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়েও সাপোর্ট দিলেন, এখনো দিয়ে যাচ্ছেন আলহামদুলিল্লাহ্।
.
সব মেয়েদের দেখা শেষ হলে দ্রুত বোরকা হিজাব নিকাব করে নিলাম। হুজুর বিয়ে পড়াতে আসলো, সাথে এসেছেন কমপক্ষে ৫০ জন পুরুষ। আশাহত হয়ে ফিরে যাচ্ছিলো, কেউ কেউ বলে যাচ্ছিলেন,”আরে সব ঢেকে রাখছে কিছু দেখার নাই”। আমার মনে একটা শান্তি অনুভূত হলো।
.
এরপর আবার সেই এক যুদ্ধ বৌভাতের দিন। ফুপু শ্বাশুড়ি জোর করে মেয়েদের মাঝে ওনার মেয়ের জামাইকে নিয়ে এসেছেন নতুন বৌ দেখাবে বলে। আমার অর্ধাঙ্গ কথা দিয়েছিলেন কোনো পুরুষ আসবেনা, তাই আমি বোরকাটাও পড়িনি।
.
রুমে গায়ের মাহরাম ঢুকেছে আমি কোনোভাবে বুঝতে পেরে সাথে সাথে শাড়ির আঁচল জড়িয়ে হিজাব পেঁচিয়ে ফ্লোরে বসে পড়ি। নতুন বৌয়ের কান্ড দেখে সবাই হয়ত অবাক হয়েছে। কিন্তু এরপর আর কারো সাহস হয়নি রুমে পুরুষ মানুষ ঢোকানোর।
.
এটা হলো আমার বিয়ের দিনে, একটা দ্বীনহীন পরিবেশে পর্দা ধরে রাখার একটা বিশাল বড় স্ট্রাগল। বিয়ের দিন কোনো পরপুরুষ আমাকে দেখেননি, কেউ আমাকে চক্ষু দিয়ে পরোখ করতে পারেননি। অনেক বোনেরা আছে, সারাবছর পর্দা করার পর এই দিনটাতে বিরতি নেয়। আর নিজের সবচেয়ে বড় সর্বনাশ করে ফেলে। আর ভাইয়েরা তো ইচ্ছে করে অথবা জোর করে দাইয়্যূস বানায় নিজেকে৷
.
এরপর শুরু আরেকরকম পথ চলা। প্রথম যেদিন ভাসুরের সামনে নিকাব করে গেলাম তখন তিনি মুখের উপর আমায় বললো এখানে কোনো বোরকা নিকাব চলবে না। আমি ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলাম কোনো কথা না বলে।
.
যৌথ পরিবারে বিয়ে হয়েছে, তিন ভাসুরের সাথে আমার পর্দা নিয়ে শুরু হলো লড়াই। ননদের ছেলেটাও আমাদের সাথেই থাকে।
.
বিয়ের পর সুন্নাতি জামা পড়ে বড় ওড়না দিয়ে শুরু করলাম শ্বশুড়বাড়ির পর্দা। নিকাব করে রান্নাঘরের যাবতীয় কাজ করতে হতো প্রচন্ড গরমের মধ্যে ও। বোরকা পড়ে বিয়ে করেছিলাম বলে কোনো গায়ের মাহরাম আমাকে দেখতে পারেনা।
.
এটা ছিলো আমার চাচাতো ভাসুরদের অন্যতম আক্ষেপ। তারা শুরু করলো লুকিয়ে আমাকে পর্যবেক্ষণ করা। আমি ঘুমিয়ে থাকলে হুটহাট জানালা খোলার চেষ্টা করতো।
.
একদিন রান্নার কাজে ব্যস্ত থাকার সময় আমার ননদ প্রচন্ড আক্ষেপের সাথে বলতে শুরু করলেন আমরা এত পর্দানশীল মেয়ে চাইনি। আমার মা চায় এমন একটা লক্ষ্মী বৌ আসবে যে সবার সাথে পুতুলের মতো হেসে খেলে গল্প করবে। আমি চুপ রইলাম। একদিন আমার বড় জা আমাকে ডেকে বললেন, “তোমার এ পর্দা তোমার ভাসুরের পছন্দ নয়!”
.
তখন ভেতরে কেমন যেন অসহায় লাগলো। বললাম ভাইকে খবর দেন,”তাঁর এরকম অপছন্দে আল্লাহ তাআ’লা অসন্তুষ্ট হয়েছেন।
.
আমি তো ভাইকে সন্তুষ্ট করতে এ বাড়িতে আসিনি, তাকে বলবেন আমি তাঁর ছোট ভাইয়ের আহলিয়া এবং তার জন্যে হারাম।”
.
এভাবে আমি যেন এ যুদ্ধে হেরে না যাই, আমার স্বামী দ্রুত তাঁর চাকরির অজুহাত দেখিয়ে আলাদা বাসার ব্যবস্থা করলেন। এতকিছুর ভেতর তিনি আমাকে মানসিকভাবে সাপোর্ট দেবার চেষ্টা করে গেছেন। তিনি নিজেও একা দ্বীনদার হওয়াতে, তাঁর সুন্নাতি দাড়ি লেবাস ধরে রাখতে এমন পরিবেশে ভীষন কষ্টের মধ্যে পড়তে হয়েছে।
.
এরপর আলাদা বাসায় গায়রে মাহরাম মেহমান আসলে আমি সম্পূর্ণ আয়োজন সেরে পর্দার আড়ালে চলে যেতাম এবং আমার স্বামী তাদের খেদমত করতে থাকেন। ননদ আমার বাসায় মেহমান হয়ে আসলেন, এখন তাঁর ছেলের সামনে আমার পর্দা করা নিয়ে সমস্যা দেখা গেল।
.
কিন্তু আমার কেন জানিনা কারো কথাই গায়ে লাগতো না! উল্টো তালিম করে তাকে দ্বীনি বুঝ ভেতরে ঢেলে বাড়ি পাঠিয়েছিলাম।
.
এরপর আমি ঠিক করলাম যখনই শ্বশুড়বাড়িতে থাকবো, যতক্ষণ। ঠিক ততক্ষণ আমি জিলবাব পড়ে থাকবো। ঠিক সেটাই করলাম। আমার স্বামী এই প্রথম বললো এরকম কেন! এটা খুলে ফেলো৷ আমি তাকে বললাম, আমি চাইনা আমার অর্ধাঙ্গ দাইয়্যুসের খাতায় চুল পরিমাণ নাম লেখাক। তিনি চুপ করে গেলেন।
.
এরপর থেকে শ্বশুড়বাড়িতে জিলবাব পড়ে ঘুমাতে শুরু করলাম, খেতে শুরু করলাম, কাজ করতে শুরু করলাম। আলহামদুলিল্লাহ্, কখনো মনে হয়নি কষ্টের এটা। বরং মনে হতে থাকলো, হে আল্লাহ তুমি আমায় সুযোগ দিলে। সত্যিই সুযোগ দিলে।জেনারেল থেকে পড়ে পর্দায় আসতে চেয়েছিলাম সে পথ তুমি সহজ করে দিলে সহ্যশক্তি বাড়িয়ে….
.
আল্লাহ তাআ’লা যাকে খুশি তাকে হেদায়েত দেন, যাকে খুশি তাকে পরীক্ষা নেন এবং সবাইকে দেন সবরের উত্তম প্রতিদান। আলহামদুলিল্লাহ আলা কুল্লি হাল। আর এই হেদায়েত ধরে রাখা আরো কঠিন, চুল পরিমাণ এদিক ওদিক হলে সব শেষ।
.
একটা মেয়ে চাইলেই পর্দা করার সুযোগ কম পায়। কিন্তু ভাইয়েরা যদি সাহায্য না করে তবে তা হয়ে যায় অসম্ভব রকমের কঠিন।জীবন দিয়ে হলেও বোনেরা নিজেদের হেফাজত করুন,স্বামীর কথায় বেপর্দা হয়ে লাভ নেই। দু’জনকেই জাহান্নামী হতে হবে।
.
আমি এই লিখাটা লিখেছি অনুপ্রেরণা হিসেবে, কেউ রিয়া খুঁজতে চাইলে আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। আল্লাহ তাআ’লাই তার বান্দার নিয়্যাত এবং অন্তর সম্পর্কে অবগত।

Wafilife Books

যোগাযোগ Head Office: House 310, Road 21 Mohakhali DOHS, Dhaka-1206 Phone: 017-9992-5050 096-7877-1365 sales@wafilife.com

View all posts by Wafilife Books →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *