February 25, 2024

তালাক – সায়েদুর রহমান

প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে জীব-জন্তু আর বৈরী প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করতে করতে মানুষ আজকের এই সভ্যতায় পৌঁছেছে ৷ কিন্তু এই সভ্য যুগেও অধিকাংশ মানুষের জীবনে যাপনের সাথে প্রাগৈতিহাসিক যুগের খুব একটা তফাত নেই ৷ তফাত এই জীব-জন্তুর স্থানটা মানুষ দখল করেছে প্রকৃতি এখনো অপরিবর্তিতই আছে ৷ নির্মল মানুষের ভয়ংকর রূপের মত মুখোশের আড়ালে প্রকৃতিরও একটা ভয়ংকর রূপ থাকে ৷ প্রকৃতির কন্যা বর্ষা যে মানুষের জন্য গান, কবিতা, খিচুড়ি আর কদম ফুলের শুভ্রতা নিয়ে আসে; সে বর্ষাই কৃষকের ফসল, মাটিয়ালের কোদাল, রাজমিস্ত্রীর কর্নি, দিনমজুরের কাজ কেড়ে নেয় ৷ সেই সাথে কেড়ে নেয় নদীর পাড়ে বাস করা মানুষের ভিটেমাটি আর প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মুখের হাসি ৷

মৎস্য শিকারের জন্য বর্ষা বেশ উপযোগী ৷ আদিম যুগের মানুষের পশু শিকারের মত দিনমজুর জাবেদ মৎস্য শিকারে বের হয়েছে, কিন্তু শিকার করবে কোথায়? যেখানেই জাল ফেলতে যায়, সেখানেই লাল কালিতে লেখা, “সাবধান! মৎস্য খামার ৷ এইখানে মাছ ধরা নিষেধ ৷” দেশের মানুষের কথা চিন্তা করে এক রাষ্ট্রপ্রধান খাল খনন করেছিলেন ৷ সে খালগুলোও এখন প্রভাবশালী কুমিরদের দখলে ৷ কুমিরদের উদ্দেশ্যে অশ্রাব্য কটু বাক্য উচ্চারণ করতে করতে জাবেদ খালি হাতে বাড়ি ফিরে ৷

হাত খালি থাকলেও পেট খালি রাখা যায় না ৷ একলা পেট হলে না হয় কারো কাছে চেয়ে-চিন্তে ভরা যেত, কিন্তু তার সাথে আরেকজনের পেটও জড়িত ৷ কোন রকম একটা কাজ করে স্বামী-স্ত্রী দু’জনের জন্য দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন জোগাড় করাই জাবেদের সুখ ৷ বর্ষা তার সেই সুখের ঘরে দুখের আগুন জ্বালিয়ে দিলো ৷ দাঁড়িযে দাঁড়িয়ে আগুনে জ্বলার দৃশ্য দেখার চেয়ে নেভানোর চেষ্টা করা শ্রেয় ৷ পেটের আগুন নেভানোর জন্য জাবেদ রিক্সা নিয়ে বের হয় ৷ সকালে আকাশটা ফর্সা ছিলো, কিন্তু বেলা বাড়ার সাথে সাথে ঝুম বৃষ্টি ৷ বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য প্রায় রিক্সার গদির নিচে পলিথিন থাকে ৷ প্যাসেঞ্জারের জন্য রক্ষিত সে পলিথিন রিক্সাওয়ালার গায়ে উঠে না ৷ এ যেন অলিখিত এক দাসত্বের শৃঙ্খল ৷ শতাব্দীর পর শতাব্দী মেহনতি মানুষগুলো সে শৃঙ্খলে বন্দী ৷

বৃষ্টিতে ভিজে রিক্সা চালানোর কারণে জাবেদের জ্বর আসে ৷ প্রায় এক সপ্তাহ ভোগান্তির পর কিছুটা সুস্থ হলেও শরীরে কাজ করার মত শক্তি প্রায় নেই বললেই চলে ৷ ঘরে সামান্য যে কয়টা টাকা জমা ছিলো ঔষধপত্রে সেগুলোও খরচ হয়ে গেছে ৷ সংসারে পুরুষ যেখানে ব্যর্থ নারীকে সেখানে হাল ধরতে হয় ৷ পরষ্পরের প্রতি সহযোগীতার হাত সম্প্রসারিত করে এভাবেই যুগ যুগ ধরে নর-নারী জীবন নদী পাড়ি দিচ্ছে ৷ অসুস্থ স্বামীর মুখে একটু খাবার তুলে দেওয়ার জন্য হুমায়রা কাজের খোঁজে বের হয় ৷

বর্ষায় গৃহস্ত বাড়িগুলোতেও তেমন কাজ থাকে না ৷ দু’চার বাড়ি খোঁজ করার পর অবশেষে জমিদার বাড়িতে মুড়ি ভাজার কাজ মিলে ৷ রসুই ঘরে হুমায়রাকে মুড়ি ভাজতে দেখে কামনার অনলে মতলব জমিদারের ঐতিহ্যবাহী রক্ত ফুটন্ত পানির মত টগবগ করে ফুটতে থাকে ৷ বাঈজী নাচ, বেশ্যাগমন এসব ছিলো জমিদারদের ঐতিহ্য ৷ শিকারী যেভাবে শিকারের আশায় ওৎ পেতে বসে থাকে জমিদারও সেভাবে বসেছিলো ৷ কাজ শেষে হুমায়রাকে যেতে দেখে হাঁক দিয়ে জিজ্ঞেস করে, “কিডা, কিডা যায়?”

জমিদারের ডাক শোনে হুমায়রা লম্বা ঘোমটা টেনে মুখের অর্ধেক ঢেকে বললো, “স্লামুলাইকুম চাচা, আমি আপনাগো জাবেদের বৌ৷”

“ওয়ালাইকুম সালাম৷ তা জাবেদ কই? হারামজাদাটার কারবার দেখছো? নিজে ঘরে বইসা বৌয়েরে কামে পাঠাইছে ৷”

জমিদারের কথায় মৃদু আপত্তি জানিয়ে হুমায়রা বললো, “ঊনার কোন দোষ নাই ৷ আইজ এক সপ্তাহ ধইরা ঊনার অসুখ ৷”

জিহবার আগা উপরের মাড়ির সাথে লাগিয়ে ছু! ছু! ছু! শব্দ করে জমিদার বললো, “তা আমারে একটা খবর দিলেই পারতা ৷ আমি একটা ব্যবস্থা কইরা দিতাম ৷ আমি কি তোমাগো পর? ইশ্ ৱে মুড়ি ভাজতে গিয়া সুন্দর চেহারাটা কেমন কালা হইয়া গেলো ৷” তারপর পকেট থেকে একটা পাঁচশ টাকা নোট বের করে হুমায়রার হাতে দিয়ে, হাত চেপে বললো, “মাঝে মাঝে আইসা তোমার চাচীর কাজ কাম কইরা দিও ৷ ট্যাকা পয়সা নিয়া ভাইবো না, আমি যা পারি দিমুনে ৷” হুমায়রা প্রথমে টাকাটা নিতে চায় নি, কিন্তু জমিদারের জোরাজুরিতে আর না করতে পারে নি ৷

মেয়ে মানুষের মন মোমের মত নরম, একটু ভালোবাসার উত্তাপে সহজেই গলে যায় ৷ জমিদারকে দেখে হুমায়রার বাবার কথা মনে পড়ে, তার বাবা বেঁচে থাকলে মেয়ের দূর্দিনে হয়ত এভাবেই সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতেন ৷ জমিদারতো আর তাদের পর না, হুমায়রার শ্বশুরের মানে জাবেদের বাবার চাচাত ভাইয়ের খালাত ভাই ৷ জমিদারের বদান্যতার কথা শোনে জাবেদের নিজের প্রতি ধিক্কার আসে ৷ এমন একজন পরোপকারী পরম আত্মীয়কে সে কোন দিন ঈদেও সালাম দেয় নাই৷ ঈদ উপলক্ষে জমিদার জাবেদের জন্য পাঞ্জাবী-লুঙ্গী আর হুমায়রার জন্য শাড়ি পাঠায় ৷

অনেক স্থানে নতুন জামা-কাপড় পৱে মুরুব্বীদের পা ছুঁয়ে সালাম দেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে ৷ ভক্তি প্রদর্শনের জন্য জমিদারের দেওয়া শাড়িটা পৱে হুমায়রা তার পদধূলি গ্রহণ করতে যায়, কিন্তু জমিদারের মন হুমায়রার ধারণার চেয়েও অনেক বড় ৷ হ্যাঁ, বড়ই বলতে হয় সে হুমায়রাকে পদধূলি না দিয়ে লোমশ বুকের স্পর্শ দিতে চেয়েছিলো ৷ হুমায়রা এক ঝটকায় তার বুক থেকে নিজেকে আলাদা করে দৌড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়িতে আসে ৷ সব শোনে জাবেদ বললো, “ঐ বাড়িতে গেছিলি কেন?”

হুমায়রা বললো, “আমিতো হেরে বাবার মত মনে করছিলাম, হেয় যে আস্ত একটা শয়তান আমি কি ঐডা জানতাম?”

“দুনিয়াতে আদম-হাওয়া এক লগে আইছে, তাগো পোলা-মাইয়া, আত্মীয়-স্বজন আছে ৷ শয়তান একলা আইছে, তাই তার কোন আত্মীয়-স্বজন নাই ৷ তার কাছে সব সমান ৷ আর কোনদিন ঐ শয়তানের সামনে যাইবি না ৷”

মাছ কি কভু বিড়ালের সামনে যায়? বিড়ালই মাছের সন্ধানে ঘুরে বেড়ায় ৷ পরদিন জমিদার হাজির হয় জাবেদের বাড়িতে ৷ জমিদারের চুলগুলো সাদা হয়ে গেছে, কিন্তু রং করে কালো রাখে ৷ চুলে রং করার মত মনেও তার রং লেগে থাকে ৷ সকাল-বিকাল দুুই বেলা নিয়মিত শেভ করে ৷ অচেনা কোন স্থানে মারা গেলে লুঙ্গী খোলা ছাড়া কেউ বলতে পারবে না এটা হিন্দু না মুসলমানের লাশ ৷ বয়স হয়েছে কিন্ত বদ স্বভাব যায়নি ৷ জাবেদের বাড়িতে গিয়ে ডাক দেয়, “জাবেদ ও জাবেদ, বাজান বাড়িতে আছো?”

ভিতর থেকে হুমায়রা জবাব দেয়, “জ্বে না, তিনি কামে গেছেন ৷”

জমিদার এই রকমই একটা মোক্ষম সুযোগ খুঁজছিলো, ঘরে গিয়ে হুমায়রাকে বললো, “এমন করলা কেন? আমিতো তোমার লগে ঈদের কোলাকুলি করতে চাইছিলাম ৷”

চোখের সামনে বাঘ দেখার মত আতংকিত হয়ে ঝাপসা গলায় সে বললো, “চাচা, আপনার শরম করে না, মাইয়ার বয়সী একটা মাইয়ারে এসব কইতে?”

“বেশরমের কি দেখলা? আমিতো আর ন্যাংটা থাকি না! তাছাড়া বাতি নিভাইলে সব সমান, কে মাইয়ার বয়সী কে বৌ এর বয়সী কিছুই ঠাওর করন যায় না ৷”

হুমায়রা উত্তেজিত কন্ঠে বললো, “আপনে বাইর হন আমাগো ঘর থেইকা, না হয় আমি চিৎকার করুম ৷” চিৎকার করার আগেই জাবেদ হাজির ৷

জমিদারকে ঘরে দেখে তার মাথায় খুন চেপে যায় ৷ রিক্সার গদির নিচ থেকে ছেঁড়া চেইন বের করে সে জমিদারের দিকে তেড়ে যায় ৷ জাবেদের মারমুখী অগ্নিমূর্তি দেখে হুমায়রা ঘর থেকে দৌড়ে এসে তার হাত থেকে চেইনটা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে ৷ কি হলো ব্যাপারটা কে জানে! জাবেদের রক্তে ঝড় বয়ে গেলো৷ তার মনে হলো, জমিদারকে বাঁচানোর জন্যই হুমায়রার এই প্রচেষ্টা ৷ দু’জনের না জানি কত দিনের প্রণয়! ঘরের ভিতর দু’জনে না জানি কত কি করেছে! চোখ মুখ লাল করে হুমায়রার চুলের মুঠি ধরে ঘরের দিকে ধাক্কা মারতে মারতে উত্তেজিত কন্ঠে জাবেদ বলতে লাগলো, “মাতারি, নাগরের লাইগা যহন এত টান তহন নাগরের লগেই থাক ৷ তোরে আমি তালাক দিলাম ৷ এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক, বাইন তালাক ৷”

ব্যস, সব নিশ্চুপ, নিঃশেষ ৷ ঘরের ঢেলার সামনে হুমায়রা বসে পড়লো ৷ এর চেয়ে বজ্রাঘাতে মরে যাওয়া অনেক ভালো ছিলো ৷ ভূমিকম্প গ্রাস করলেও আপত্তি ছিলো না ৷ জাবেদের মাথায় হাত ৷ জমিদারের মুখে চাঁদের হাসি ৷ লোকজন আস্তে আস্তে ভিড় করতে লাগলো, ঈদের চাঁদ দেখার মত সবাই হুমায়রাকে দেখতে লাগলো ৷

মানুষের রাগ হলো নেশার মত ৷ নেশা আর রাগ দু’টোই মানুষের হিতাহিতজ্ঞান নষ্ট করে দেয় ৷ রাগের মাথায় কি বলেছে সেটা বেমালুম ভুলে গিয়ে জাবেদ আবার ধমক দিয়ে বললো, “ঐ নঢী, এহনো বাইরে খাড়াই আছোস ক্যান? ঘরে যা ৷”

তিন অক্ষরের “কবুল” যেভাবে একজন অচেনা অজানা মানুষকে চির আপন করে দেয়, তিন অক্ষরের “তালাক” সেই চির আপন মানুষটাকে ঠেলে দেয় দূর থেকে বহুদূর ৷ দুই জনকে সাক্ষী রেখে যাকে এক দিন ঘরে তুলেছিলো, তাকে ঘর থেকে বের করে দশ জনকে ছাড়া আবার ঘরে তোলা যায় না ৷ জাবেদের মত মূর্খ হয়তো এ মহাসত্য উপলব্ধি করতে পারে নি, কিন্তু সমাজতো আর মূর্খ না ৷ সমাজ এমন অনাচার মেনে নেয় না ৷ এই অনাচার কিভাবে মাটি চাপা দেওয়া যায় জ্ঞানী, গুণী, শিক্ষিত সমাজ থেকে সেই সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত জাবেদ এবং হুমায়রাকে আলাদা থাকতে হবে ৷ হুমায়রার চাচা এসে তাকে নিয়ে যায় ৷

“কুহু, কুহু, কুহু” গভীর রাতে কোকিলের ডাকে হুমায়রা জানালার পাশে এসে দাঁড়ায় ৷ বর্ষার কোকিলের এই ডাক তার খুব পরিচিত ৷ জানালা খুলে অভিমান ভরা কন্ঠে ফিসফিসিয়ে বললো, “আপনি এইখানে কেন আইছেন? কি চান? এইখান থেইকা চইলা যান ৷”

কাতর কন্ঠে জাবেদ বললো, “তোরে ছাড়া আমার একদিনও চলবো না ৷ তোরে ছাড়া আমি দুই চোখে আন্ধার দেখি ৷ চল আমার লগে ৷”

“কেন? তালাক দেওনের সময় এই কথা মনে আছিলো না? তখন এত মায়া কই আছিলো?”

“আমার কি দোষ? ঐ হারামজাদারে ঘরে দেইখা আমার মাথায় রক্ত উইঠা গেছিলো ৷ তোর লাইগাইতো পারি নাই, না হয় শুয়োরের বাচ্চারে আমি খুন করতাম ৷”

“ইশ্! খুন করতাম ৷ খুন করলে যে ফাঁসি হয় হেইটা আপনে জানেন? আপনি কেন বোঝেন না, আপনার কিছু হইলে আমি কি নিয়া বাঁচুম?” বলেই হুমায়রা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করে ৷ জাবেদের ইচ্ছে করছে কোলের কাছে বসিয়ে হুমায়রার চোখের পানি মুছে দিতে ৷ তার চোখ দু’টোও অশ্রুতে টলমল ৷ নিজের চোখের জল লুকিয়ে প্রিয়জনের অশ্রু মোছার প্রাণান্তকর চেষ্টার নামই ভালেবাসা ৷

বর্ষার আকাশে আজ একটুও মেঘ নেই, রাজ্যের যত মেঘ হয়ত এই দুই মানব-মানবীর মনের আকাশে ভর করেছে ৷ তাদের চোখের বৃষ্টি ঝরবে বলেই হয়ত আজ এক ফোঁটা বৃষ্টিও ঝরেনি ৷ হাত দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে জাবেদ বললো, “কান্দিস না, আমিতো তোরে নিতে আইছি ৷ চল আমার লগে ৷”

হুমায়রার মনে পড়ে এমনি এক গভীর রাতে সে জাবেদের সাথে পালিয়ে ছিলো ৷ বিয়ের প্রথম মাসে কি নিয়ে যেন জাবেদের সাথে তার বাপ ঝগড়া করে তাকে বাড়ি নিয়ে এসেছিলো ৷ সে রাতেই জাবেদ এসে তাকে চুরি করে নিয়ে যায় ৷ নিজের সম্পদ অন্য কেউ ছিনতাই করলে তা চুরিতে পাপ নেই, তাই সেদিন জাবেদের সাথে গভীর রাতে বের হতে তার মনে কোন দ্বিধা, সংশয়, অপরাধবোধ কাজ করে নি ৷ কিন্তু তার মনে এখন রাজ্যের ভয়, সংকোচ, পাপবোধ কাজ করছে ৷ সেদিন তার উপর জাবেদের যে অধিকার ছিলো আজ তিন শব্দে জাবেদের সে অধিকার খর্ব হয়ে গেছে ৷ সম্পদের মালিকানা স্বত্ব ত্যাগ করে তা চুরি করা অপরাধ ৷ জাবেদকে সান্ত্বনা দিয়ে সে বললো, “আর দুইটা দিন সবুর করেন, চাচায় কইছে জুম্মাবারে সালিশ ৷ এর আগে আপনার লগে গেলে পাপ হইবো ৷”

জুম্মাবারের সালিশে ওসি আকবর, বদু চেয়ারম্যান, কামাল মেম্বার, রফিক মাষ্টার, সাদউল্যাহ দরবেশ, জমিদার সহ সহ গ্রামের অনেক গণ্য মান্য শিক্ষিত, অশিক্ষিত লোক উপস্থিত হয়েছে ৷ সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেয় হুমায়রাকে জমিদারের কাছে হিল্লা বিয়ে দিতে হবে ৷ জমিদারের সাথে আড়াই দিন সংসার করার পর, জমিদার তাকে তালাক দিবে, এরপর জাবেদ তাকে কলেমা পড়ে ঘরে তুলে নিবে ৷ সাত্তার মাওলানা এই এলাকায় এসেছেন মাত্র দুই সপ্তাহ ৷ এখানকার ভিলেজ পলিটিক্স সম্পর্কে তার এখনো কোন ধারণা হয়নি ৷ তাই কিছু না ভেবেই তিনি বললেন, “ইবলিস সবচেয়ে বেশি খুশি হয় স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ঝগড়া বাঁধাতে পারলে । হাদীসে উল্লেখ আছে শয়তানদের সর্দার ইবলিস প্রতিদিন পানির ওপর তার সিংহাসন বসিয়ে শয়তানদের কারগুজারি শুনে । শয়তানদের মধ্যে যে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ বা ঝগড়া বাঁধিয়েছে বলে কারগুজারি শোনায় ইবলিস তার প্রতি খুশি হয় । সে ওই শয়তানকে বাহবা দেয় ।”

মাওলানা সাহেবের কথা শোনে বদু চেয়ারম্যান তার স্বভাব সুলভ ঝাঁড়ি মেরে বললো, “মোল্লা কি কইতে চাও? খোলাসা কইরা কও ৷”

সাত্তার মাওলানা বললেন, “জ্বী, আমি বলতে চাইছি, হিল্লা বিয়ের সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই ৷ এগুলো ইবলিসের কাজ ৷ মুসলিম পারিবারিক আইনের ধারা অনুযায়ী, যে পক্ষ তালাক দিতে চাইবে, সে পক্ষ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অপর পক্ষের ঠিকানা-সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের কাছে নোটিশ লিখিতভাবে পাঠাবে ৷ যে পক্ষ থেকেই নোটিশ দেওয়া হোক না কেন, সংশ্লি­ষ্ট সালিশ পরিষদের চেয়ারম্যান নোটিশ পাওয়ার পর উভয় পক্ষের মনোনীত প্রতিনিধি নিয়ে আপসের চেষ্টা করবেন । উভয় পক্ষের মধ্যে আপস হয়ে গেলে তালাকের নোটিশের কোনো কার্যকারিতা থাকবে না এবং তারা পুনরায় সংসার করতে পারবেন । আমার মনে হয় ওসি সাহেব এ ব্যাপারে আরো ভালো এবং বিস্তারিত বলতে পারবেন ৷” বলেই তিনি বিস্তারিত শোনার আশায় ওসি সাহেবের দিকে ফিরলেন ৷

ওসি সাহেব সিনেমার জোকারের মত বত্রিশটা দাঁত বের করে বললো, “দেখুন ধর্মীয় ইস্যুগুলো খুবই সেন্সেটিভ ৷ এসব বিষয় কেয়ারফুলি ট্যাকল করতে হয় ৷ এখানে আমাদের গ্রাম্য আদালতের রায় ফলো করা উচিত ৷”

বৃটিশ আমলে অক্সফোর্ড পাশ করা শত শত অপদার্থ ছিলো, লম্বা পাগড়ী পরা হাজার হাজার ফতোয়াবাজ ছিলো, লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত চাকুরীজীবী দু’পেয়ে জীব ছিলো, কিন্তু আসানসোলের সেই স্বল্প শিক্ষিত মুয়াজ্জিন দুখু মিয়ার মত মানুষ ছিলো নগণ্য ৷ দুখু মিয়ার মত নিজের হাতে রুটি বানিয়ে খাওয়ার মত হিম্মত নেই বলেই, এসব উচ্চ শিক্ষিত লোকেরা রুটি কেনার টাকার জন্য কুকুরের মত ক্ষমতাবানদের পা চাটতে থাকে ৷ তাই যতই শিক্ষিত হোক তারা জীবসত্ত্বা থেকে মানব সত্ত্বায় উত্তীর্ণ হতে পারে না ৷ সেজন্য সমাজেও মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টি হয় না ৷ ওসি সাহেবের কথার কিছুটা অবাক হয়ে মাওলানা বললেন, “ধর্মের নির্দেশণাওতো প্রায় এমন! ইন্টারনেটে বিভিন্ন শায়খগণের ভিডিও দেওয়া আছে বিশ্বাস না হলে সেগুলো দেখে নিতে পারেন ৷”

সাত্তার মাওলানাকে লক্ষ্য করে কামাল মেম্বার উত্তেজিত কন্ঠে বললো, “ঐ মিয়া, এত ফটর ফটর করো কেন? এলাকায় আইছো এখনো দুই দিন হই নাই, এখনই রাজনীতি শুরু করছো? আমাগো চেয়ারম্যান সাহেব যে রায় দিছে হেইটাই ঠিক ৷”

নিজেকে ভালো মানুষ হিসেবে প্রমাণের জন্য চেয়ারম্যান সাহেব বললো, “আহা্! কামাল এত চ্যাতো ক্যান? আমরা হইলাম জনগণের সেবক ৷ আমাগো কি এত অল্পতে গরম হইলে হইবো? সবার কথা ধৈর্য্য ধইরা শোনা লাগবো ৷ মাওলানা সাহেবের যখন এতই আপত্তি, দরবেশ সাহেব মুরুব্বী মানুষ ৷ তিনি কি বলেন শুনি?”

সাদউল্যাহ কারো কাছে সাদু দরবেশ, কারো কাছে পীর, কারো কাছে সাদু বাবা ৷ মুখের সফেদ দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে আক্ষেপের স্বরে বললো, “আমি আর কি কমু চেয়ারম্যান সাহেব? আইজকালকার পোলাপাইনগো কাছে আমাগো কথার কি দাম আছে? সারা জীবন পানি পড়া, তাবিজ, কবচ দিয়া কত মানুষরে ভালা করলাম! এখনকার ইন্টারনেট না ফিন্টারনেট ঐসবের হুজুররা কয় এসব নাকি শিরক, বিদআত, নাউজুবিল্লাহ! বাপ দাদার আমল থেইকা হিল্লা বিয়া চইলা আসছে, এরা এখন নতুন কইরা ফতোয়া শিখাইবো ৷”

হাঙ্গর, তিমি, ডলফিন সাগরের বড় বড় মাছদের ভিন্ন নাম থাকে কিন্তু সব বড় মাছই ছোট মাছ খেয়ে বেঁচে থাকে ৷ জমিদারের এক ভাই সচিবালয়ে কাজ করে ৷ এলাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের দানে চলে ৷ জাবেদের মত দিন মজুররা সমাজের কোন কাজে লাগে? রফিক মাষ্টার জানেন, এই সমাজ ক্ষমতাবানদের ৷ ক্ষমতা ছাড়া এদের সামনে কিছু বলতে যাওয়া, ইসরাঈলী ভারী অস্ত্র, কামানের সামনে ফিলিস্তিনীদের ঢিল ছোঁড়ার মতই আত্মঘাতী ৷ বোবার দেশে কথা বলা অপরাধ, তাই বোবা থাকাই ভালো ৷

রাতে খাওয়ার পর মাওলানা সাহেব কিছুক্ষণ কোরআন তেলাওয়াত করে ঘুমাতে যাবেন, এমন সময় হুজরাখানার দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হয় ৷ দরজা খুলতেই জাবেদ হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বললো, “হুজুর! আমারে মাফ কইরা দেন ৷”

মাওলানা সাহেব জাবেদকে তার চৌকির উপর বসিয়ে বললো, “শোনেন জাবেদ ভাই, মানুষ এক আল্লাহর কাছে অপরাধী ৷ আর সে যার হক্ব নষ্ট করে তার কাছে অপরাধী ৷ আপনিতো আমার কোন ক্ষতি করেন নাই ৷ আপনি ক্ষমা চাইলে আল্লাহর কাছে, আর আপনার স্ত্রীর কাছে চান ৷”

“আল্লাহ কি আমার মত পাপীরে ক্ষমা করবো?”

“একজন কবি বলেছেন- ‘পাপ না করলে মাফ করবেন কি তক্তে খোদা বসিয়া, মাফ না করলে রহমান নাম যাইতো তাহার মুছিয়া ৷’ এইযে দুনিয়াতে এত মানুষ দেখছেন, একজনও নিষ্পাপ নাই ৷ কোটি কোটি মানুষ আমরা সবাই পাপী কিন্তু আল্লাহর রহমত তার চেয়ে কয়েক কোটিগুণ বেশি ৷”

“হুমায়রা যাওয়ার পর থেইকা মনডা অস্থির অস্থির লাগতাছে, আপনার কথা শুইনা শান্তি পাইলাম৷ আচ্ছা, সত্যি সত্যি কি হিল্লা বিয়া ছাড়াও হুমায়রারে আমি ঘরে তুলতে পারুম?”

“আমি স্বল্প জ্ঞানী মানুষ ৷ আপনার স্ত্রীকে ঘরে নিতে পারবেন কি পারবেন না সেটা নিয়ে বিশদ বলতে পারছি না ৷ তবে তাকে যে হিল্লা বিয়ে দিতে হবে না সেটা নিশ্চিত ৷ এ ব্যাপারে আপনি শহরের বড় বড় আলেমদের সাথে যোগাযোগ করে ফতোয়া নিতে পারেন ৷ আমার পরিচিত কয়জন আলেম আছেন কিন্তু আফসোস আমি আপনার জন্য কিছু করতে পারছি না ৷ আমাকে তারা এই সপ্তাহের মাঝে এখান থেকে চলে যেতে বলেছে ৷”

“আপনে কই যাইবেন?”

“আমার বাড়ি দক্ষিণের চর এলাকায় ৷ নদী-ভাঙ্গনে আমাদের সব জায়গা-জমীন বিলীন হয়ে গিয়েছিলো ৷ আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহর রহমতে সেখানে নতুন করে চর জাগছে ৷ ভাবছি নিজের এলাকায় গিয়ে দ্বীনের কাজ করবো ৷”

“হুজুর, আপনাগো চরে আমারে একটু আশ্রয় দিবেন? শুধু একটু মাথা গোঁজার জায়গা আর একটু কাজ কাম করে খাইতে পারলেই চলবো ৷”

“নাউজুবিল্লাহ্! জাবেদ ভাই ৷ মানুষ মানুষের খাদ্য, আশ্রয় কিছুই দিতে পারে না ৷ সব কিছু দেওয়ার মালিকতো আল্লাহ ৷ মানুষ উসিলা মাত্র ৷ আপনি যদি যেতে চান আমি ইনশাআল্লাহ ব্যবস্থা করে দিতে পারবো ৷”

সেদিন রাতেই সভ্য সমাজের মানুষদের তালাক দিয়ে তারা তিনজন রাতের আঁধারে নতুন ভোরের আশায় পালিয়ে যায় ৷ এদিকে সভ্য সমাজের মানুষের মুখে মুখে রটে যায় হুমায়রাকে হিল্লা বিয়ে করে নিজের খায়েশ পূরণের জন্যই সেদিন সালিশে সাত্তার মাওলানা এভাবে প্রতিবাদ করেছিললো ৷

#তালাক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *