February 27, 2024

ছায়া সময় – শরীফুল হাসান

উনিশশো সাতাত্তর সালের ছয়‌ই মে। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক এবং রাজনৈতিক কাল চলছে এক অন্তর্বর্তী সময় দিয়ে যেন। মানুষজনের চাহিদা পাল্টাচ্ছে, পাল্টাচ্ছে খিদে। যা নিচ্ছে এক সর্বগ্রাসী রূপ।

বিশাল আকন্দ পরিবারের রত্ন কামরুল। অন্যান্যরা যেখানে তাঁর বাবা করিমের ধনসম্পদের উপর বসে বসে খাচ্ছে সেখানে কামরুল তৎপরতায় পূর্ণ এক যুবক। দোকান-ব্যবসা, লেনদেন, প্রায় সবকিছু শক্ত হাতে সামলাচ্ছিলো কামরুল। ঐদিন‌ই কে বা কারা গুলি করে দিল করিম আকন্দের পালক পূত্রকে।

বেশিরভাগ মানুষের মন যেন এক অন্ধকার গুহা।‌ লোভ এবং ভয় তাকে দিয়ে কি-না করিয়ে নেয়। তদন্ত কর্মকর্তা আমিন‌উদ্দিন কাজে নেমে পড়েন‌। কিন্তু এই কাজ করেছে কে? করিম আকন্দের শত্রু থাকলেও তাকে সবাই সমীহ করে। করে ভয়। এই ভয়ের পিছনে অবশ্য সঙ্গত কারণ রয়েছে। কামরুলের মৃত্যুর পর করিমের ভাই, ভাইয়ের ছেলেরা, মেয়ের জামাই গোবেচারা দেখতে ইউসুফ এবং আরো অনেকের মধ্যে একধরণের শীতল যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। অর্থ এবং ক্ষমতার লড়াই প্রায় সবসময় বিভীষণ তৈরি করে‌।

এই আখ্যানে আরো আছেন অনীমেষ চক্রবর্তী। তাঁর দু’ভাই সব বেচা-বিক্রি সেরে চলে গেছেন ইন্ডিয়া সেই কবে। অনীমেষ রয়ে গেছেন, এক হতাশার দৃষ্টি দিয়ে “আকন্দ বাড়ি” এর দিকে তাকিয়ে থাকেন যা একসময় ছিল “শ্রীলেখা ভবন”। অনন্যা অনীমেষের মেয়ে। যার প্রতি হয়তো অর্ণবের দূর্বলতা আছে। আবার মাটির টানে বারবার বাংলাদেশে ফিরে আসেন তপন‌। তপন অবশ্য একটু রহস্যময় চরিত্র। নকশাল করছে নাকি এখন সে।

ছয়‌ই মের ঘটনার পর এই উপন্যাসের প্রায় সকল চরিত্রের মাঝে যেন একধরণের পরিবর্তনের সূচনা হয়। করিম আকন্দের বড় মেয়ে আমিনার স্বামী ইউসুফ জালাল। নিজ ঘর থেকে সৎ মার কারণে বিতারিত এবং স্বশুড় বাড়ি এবং খোদ আমিনার কাছে ছোট হয়ে চলা ইউসুফের চরিত্রের ধীরে ধীরে যে বদল তা চোখে পড়ার মত। আমিনাও আকন্দ বাড়িতে দৌরাত্ম্য চায়। আরো অনেকে চান। এর মধ্যে ঘটতে থাকে একের পর এক ভায়োলেন্স। আধিপত্যের খেলার সাথে সমান্তরালে চলতে থাকে না বলা প্রেমের গল্প।

শরীফুল হাসানের এত প্রশংসা এতদিন কেন শুনেছি তা এই ব‌ই পাঠের পর বুঝতে পারলাম। প্রতিটি চরিত্রের রুপায়ন, সময়ের সাথে পরিবর্তন, এক‌ই মানুষের অবস্থা এবং সময় ভেদে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখি আচরণ, ময়মনসিংহের মফস্বলের মানুষজনের তৎকালীন মনস্তত্ত্ব এবং এক‌ইসাথে রাজনৈতিক একধরণের নতুন দুয়ারের আভাস, সবকিছুই প্রাঞ্জল ভাষায় উপস্থাপন করেছেন লেখক। আখ্যানটিকে থ্রিলার বলা যায়, আবার বলা যায় সামাজিক উপন্যাস‌ও। শরীফুলের লেখনী চমক, টুইস্ট এবং গিমিক সর্বস্ব নয়। অনেক কিছু পাঠক আগের থেকেই জেনে যাবেন কিন্তু তারপর‌ও আগ্রহের সাথে পড়ে যেতে থাকবেন। এর পিছনে অন্যতম প্রধান কারণ হল লেখকের গল্পকথনের সুচারুতা। আমি তাঁর অন্যান্য ব‌ই এখনো পড়িনি তবে কেন জানি মনে হয় এই গ্রন্থটি এখন পর্যন্ত লেখকের অন্যতম সেরা কাজ।

এক অদ্ভুত সময়ের গল্প আছে এই ব‌ইয়ের দুই মোড়কের মাঝটায়। সময় আমাদের একসময় শেষ করে দেয়। ছায়ার সাথে সময়ের একটি মিল আছে। সময়ের মত ছায়ার সাথেও পেরে ওঠা যায় না।

সময় এবং ছায়ার মাঝে বিলীন হ‌ওয়া যায়। সেই বিলীন হ‌ওয়ার গল্প-ই মনে হয় “ছায়া সময়”।

পাঠ প্রতিক্রিয়া

ছায়া সময়

লেখক : শরীফুল হাসান

প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০১৯

প্রকাশনা : বাতিঘর প্রকাশনী

প্রচ্ছদ : জিয়াউদ্দিন বাবু

জঁরা : সামাজিক উপন্যাস, থ্রিলার

রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *