February 25, 2024

ঘুমেই যেন স্বস্তি – ঐশ্বর্য্য বিজয়া দাস

মুক্তির ঠিকমতো রাতে ঘুমই হয় না। তাই সারাদিন কেমন একটা ঝিম ধরে থাকে। আবার পিউ মণি এতো বেশি ঘুমায় তবুও যেন ঘুম শেষ হয় না। এই ঘুম নিয়ে আমাদের এক একজনের এক এক রকম সমস্যা দেখা যায়। কম বা বেশি ঘুম এই দুটোর একটা ও কিন্তু আমাদের শরীরের জন্য ভালো না।
আচ্ছা একটা গড় হিসাবে আসা যাক। ধরলাম যে একজন মানুষের গড় আয়ু ৬০ বছর। এর ভিতর ২০ বছর সে ঘুমিয়ে কাটিয়েছে। বাকি ৪০ বছর ঘুমের বাইরে। তার মানে কী এই ২০ বছর তার বৃথা গেছে? মোটেও না। কারণ ঘুম আমাদের জীবনের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ যা ছাড়া বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। এই ঘুম আমাদের নতুন করে কাজ শুরু করার শক্তি দেয়। কিন্তু একজন মানুষের কতটুকু ঘুমের প্রয়োজন? কখন ঘুমানো প্রয়োজন? ঘুমের প্রয়োজনীয়তা কী? এই বিষয় গুলো নিয়ে আমাদের অনেকেরই কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। আজ আমরা এই বিষয়গুলোই জানবো।

সাধারণভাবে দিনে ৮ ঘন্টা ঘুমানোর কথা বলা হয়ে থাকে। অনেকেই এই পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন অন্য কথা। তাদের বক্তব্য বয়স, শারীরিক অবস্থা, কাজকর্ম, ওজনসহ একাধিক বিষয়ের উপর নির্ভর করে ঘুমের সময় পরিবর্তিত হয়। এই বিষয়ে একটা সময়সূচি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশন বা এন এস এফ। এই বয়স অনুযায়ী ঘুমের সময়টা হলোঃ

* নবজাত শিশু : ( ৩ মাস পর্যন্ত) ১৪ থেকে ১৭ ঘন্টা। যদিও ১১ থেকে ১৩ ঘন্টাও যথেষ্ট হতে পারে। তবে কোনোভাবেই ১৯ ঘন্টার বেশি সময় উচিত নয়।

* শিশু ( ৪ থেকে ১১ মাস) : কমপক্ষে ১০ ঘন্টা আর সর্বোচ্চ ১৮ ঘন্টা।

* শিশু ( ১ থেকে ২ বছর বয়স) : ১১ থেকে ১৪ ঘন্টা।

* প্রাক স্কুল পর্যায় ( ৩ – ৫ বছর বয়স) : বিশেষজ্ঞরা মনে করেন ১০ থেকে ১৩ ঘন্টা।

* স্কুল পর্যায় ( ৬ – ১৩ বছর বয়স) : এন এস এফ’র পরামর্শ ৯ – ১০ ঘন্টার ঘুম।

* টিন এজ ( ১৪ – ১৭ বছর) : ৮ থেকে ১০ ঘন্টার ঘুম প্রয়োজন।

* প্রাপ্ত বয়স্ক তরুণ ( ১৮ – ২৫ বছর) : ৭ থেকে ৯ ঘন্টা ঘুমানো উচিত।

* প্রাপ্ত বয়স্ক ( ২৬ – ৬৪ বছর) : ৭ থেকে ৯ ঘন্টা।

* অন্যান্য ( ৬৫ বা তার বেশি বছর) : ৭ / ৮ ঘন্টার ঘুম আদর্শ। কিন্তু ৫ ঘন্টার কম বা ৯ ঘন্টার বেশি ঘুমানো উচিত নয়।

অনেকেই আমাদের মধ্যে কম ঘুমানো নিয়ে রীতিমতো গর্ব করে থাকেন। বলেন যে এটা দীর্ঘদিনের অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে, কয়েক ঘন্টা ঘুমালেই হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে এই সমস্ত মানুষ একটা ভুল ধারণার মধ্যে আটকে আছে।
এই বিষয়ে ঘুম বিশেষজ্ঞ সিন্থিয়া লাজাম্বে ( Cynthia Lajambe) জানান, যারা ভাবছেন অল্প সময় ঘুমালে কোন অসুবিধা হয় না, তারা অজান্তেই নিজেদের ক্ষতি করছেন। দীর্ঘদিনের এই অভ্যাস নীরবে শরীরের ক্ষতি সাধন করে। যা সহজে বোঝা যায় না। পরে ধীরে ধীরে একাধিক সমস্যা সামনে আসতে থাকে। যেমন, আলঝেইমার্স বা স্মৃতিভ্রষ্টতার অন্যতম প্রধান কারণ অপর্যাপ্ত ঘুম।

সবচেয়ে বড়ো বিষয় হলো শরীর ও মস্তিষ্ক দুটিকে সতেজ ও কর্মোদ্যম রাখতে ঘুমের কোনো বিকল্প নেই। এটি মানসিক শান্তি ও শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখার পাশাপাশি শারীরিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া গুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে।

* ঘুমের উপকারিতাঃ

আইরিশ একটা প্রবাদ হলো, ” A good laugh & deep sleep is the best cures in the doctor’s book “, অর্থাৎ ডাক্তারদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাণবন্ত হাসি ও গভীর ঘুম সবচেয়ে ভালো রোগ নিরাময় কারী। যার ঘুম ভালো হয় তার অসুখ বিসুখ হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।

ঘুম ব্রেন সেলকে সতেজ রাখে। ভালো ঘুমালে স্মৃতি শক্তি ও ব্রেনের কার্যকারিতা বাড়ে। ফলে পূর্ণ একাগ্রতা ও সতর্কতার সাথে সব কাজগুলো করতে পারা যায়।

সারাদিনের কাজকর্মের মাসেল, সেল ও হাড়ের ক্ষয়ক্ষতির মেরামত হয় ঘুমের মাধ্যমে। এ সময়ে ইনসুলিন এর উৎপাদন বেড়ে যায় এবং অতিরিক্ত সুগার বার্ন আউট করে। যে কারণে ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।

পর্যাপ্ত ঘুম হৃদপিণ্ড কে সুস্থ রাখে। তাই দেহের ভেতরে রক্তপ্রবাহ সঠিকভাবে পরিচালিত হয়। শারীরিক কাজ করার সামর্থ্য বেড়ে যায়। রোগ প্রতিরোধক শক্তি বাড়ে।

দুপুরের হালকা ঘুম ( ২০ মিনিটের মতো পাওয়ার ন্যাপ) সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করে। হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখে। এমনকি হজম শক্তি বাড়াতেও সাহায্য করে।

* দ্রুত ঘুম আসার উপায়ঃ

৪ – ৭- ৮ থেরাপি
এটি মূলত একটি নিঃশ্বাসের ব্যায়াম। ডাঃ অ্যান্ড্রু ওয়েল এই পদ্ধতির কথা বলেছেন। এটা একটি প্রাচীন ইয়োগিক পদ্ধতি যা শরীরকে শান্ত করে এবং শরীরে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহের মাধ্যমে ভালো ঘুম ঘুমাতে সাহায্য করে। যেভাবে এটি করবেনঃ
ক. প্রথমে ৪ সেকেন্ড নাক দিয়ে শ্বাস নিন।
খ. এরপর ৭ সেকেন্ড দম ধরে রাখুন। শ্বাস ছাড়বেন না।
গ. এরপর ৮ সেকেন্ড ধরে মুখ দিয়ে শ্বাস ছাড়ুন।

এভাবে কয়েকবার করে ঘুমাতে যেতে পারেন।

এছাড়া ঘুমাতে যাওয়ার আগে বই পড়ার অভ্যাস করুন।

যদি প্রতি রাতে অল্প সময়ের জন্য মেডিটেশন করতে পারেন তাহলে তো কোনো কথাই নেই।

বিছানায় শুতে যাওয়ার পর মোবাইল ফোন টা যতটা পারেন দূরে রাখার চেষ্টা করুন। পারলে ঘুমাতে যাওয়ার ২ ঘন্টা আগে এসব ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করা বন্ধ করুন।

ঘুমাতে যাওয়ার আগে এক গ্লাস হালকা গরম দুধ মধু দিয়ে খেতে পারেন। এতে শরীর গরম হয়। ঠান্ডা, সর্দি, কাশি দূরে থাকে। ঘুম ও তাড়াতাড়ি আসে।

*কিছু সতর্কতাঃ

১. ঘুমানোর ২ ঘন্টা পূর্বে রাতের খাবার শেষ করতে হবে।
২. রাতে পরিমিত খাবার গ্রহণ করতে হবে।
৩. রাতে কম পানি পান করতে হবে।
৪.চিনি, মসলা ও চর্বি জাতীয় খাবার রাতে খাওয়া যাবে না।
৫. ক্যাফেইন এবং অ্যালকোহল খাওয়া বর্জন করতে হবে।
৬. দুপুরে অধিক ঘুমানো যাবে না।

* অতিরিক্ত ঘুমের অপকারিতাঃ

আসলে বেশি কোন কিছুই ভালো না। তেমনটা ঘুমের ক্ষেত্রেও। বেশি ঘুমালে শারীরিক বৈকল্য, বিষণ্নতা, অতিরিক্ত প্রদাহ, প্রজনন ক্ষমতা কমে যাওয়া, স্থূলতা সহ শরীরে অতিরিক্ত ব্যথা অনুভূতি হতে পারে। আবার হৃদযন্ত্রের সমস্যা ও ডায়াবেটিস বেড়ে যেতে পারে।
তাই আমাদের উপর্যুক্ত নিয়মগুলো মেনে পরিমিতভাবে ঘুমাতে হবে।

পরিশেষে বলা যায় যে, পরিমিত আনন্দদায়ক ঘুমই হলো সুস্থ জীবনের নির্দেশক। যা জীবনে স্বস্তি বয়ে আনে। ঘুমই প্রতিদিন নিজেদের ক্ষমতার শীর্ষস্তরে পৌঁছানোর চাবিকাঠি।

লেখাঃ ঐশ্বর্য্য বিজয়া দাস
জুনিয়র কন্টেন্ট রাইটার, রাইটার্স ক্লাব বিডি।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *