February 25, 2024

কোথাও এখনো মায়া রহিয়া গেল – আহমাদ মোস্তফা কামাল

বইঃ কোথাও এখনো মায়া রহিয়া গেল
লেখকঃ আহমাদ মোস্তফা কামাল
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ১০০
প্রকাশনীঃ গদ্যপদ্য

আহমাদ মোস্তফা কামালের বই এর আগেও একটা পড়েছিলাম। তা ছাড়া তার একটা বক্তৃতা শোনার পর থেকে তার প্রতি এতোটা শ্রদ্ধাবোধ আর নাই। ব্যক্তিগতভাবে তাকে একজন তেলবাজ লেখক মনে করি। তারপরেও তার লেখার সৌন্দর্য ভালো লাগে। সে হিসেবেই বইটি পড়া।

অন্তর্জলী যাত্রা নামে কমলকুমার মজুমদারের একটা বই আছে। সে বইয়ের একটি লাইন “কোথাও এখনো মায়া রহিয়া গেল” এখান থেকেই বইয়ের নামকরণ। বইটা এগারটা গল্পের একটি সংকলন৷ প্রত্যেকটা গল্পেই নান্দনিকতার চর্চা স্পষ্ট। গল্পগুলো এ জন্য ভালো লাগবে। গল্পগুলোর মধ্যে মায়ার বিষয়টা এসেছে। প্রত্যেকটা গল্পেই এই ব্যাপারটা এনেছে লেখক৷ মূলত দেশ, ভিটামাটির প্রতি মানুষের টানটাকে ফুটিয়ে তুলেছে লেখক।

গল্পগুলোর মধ্যে সংখ্যালঘু শ্রেণীর উপর নির্যাতনটাকে প্রকট করে তুলে ধরেছে লেখক। দেশে ধর্ম কেন্দ্রিক বিভাজনকে স্পষ্ট করার চেষ্টা গল্পগুলোর মধ্যে। এ ছাড়াও বিতর্কিত লেখক হত্যার ব্যাপারটা কিছু কিছু গল্পে দেখা যায়। সবগুলো গল্পেই মূল চরিত্র হাজার বাধা বিপত্তি ও হুমকির মাঝে থেকেও দেশের প্রতি মায়া কাটিয়ে উঠতে পারে না৷ এ ছাড়াও নদী ভাঙ্গনে ভিটেমাটি হারিয়ে, পরিবার পরিজন সবাইকে হারিয়ে এক নারীর মনে দুঃখ এবং একটি শিশুর কবরকে কেন্দ্র করে তার মায়ার ব্যাপারটি দারুণ আবেগ সৃষ্টি করে।

নান্দনিকতার চর্চা গল্পগুলোর মধ্যে ভাবটাকে কিছুটা শৈথল্য এনে দিয়েছে। দেখা গেছে, উত্তেজনা রাগ বা অভিযোগের ব্যাপারগুলোও নান্দনিকতার চাদরে মুড়ে সাদামাটা রূপ দেওয়ার চেষ্টা। লেখক কি একটু বাড়াবাড়ি করেছে? আমার মনে হয়, এই বাড়াবাড়ি করতে গিয়েই গল্পগুলোর মধ্যে কিছুটা কৃত্রিমতা সৃষ্টি করা হয়েছে। তাই গল্পগুলোর সৌন্দর্য বা বর্ণনাভঙ্গি সুন্দর হলেও কৃত্রিমতার কারণে গল্পগুলো মন ছুঁয়ে যায় না।

ইদানিংকালের বাঙালি লেখকেরা বিশ্ব সাহিত্যের অনুকরণ করতে গিয়ে বাংলা সাহিত্যের গল্প বলার মজলিশি ভঙ্গি, যেটা পরশুরাম বা ইলিয়াস শহিদুল জহিরের লেখায় আমরা পেতাম সেটা হারিয়ে ফেলছেন। এই বইটা সেরকমই। দৃশ্যপট রচনায় এত বেশি মনোযোগী হয়েছে লেখক, যে মাঝখান দিয়ে হারিয়ে গেছে রস আর সম্পর্কের মজা। তা ছাড়াও গল্পের চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে বাঙালির অভাব বা দুঃখ কষ্টের সার্বজনীন প্রকাশ হয়নি। এখানে অভাববোধটাকে ভিন্ন খাতে ব্যবহার করেছে লেখক।

বইটাতে তিনটা গল্প বেশ ভালো লেগেছে।
“অপার্থিব” গল্পটায় কবর খুড়তে খুড়তে আজীজুল হকের মনের চিন্তা ভাবনা আর মৃত রাতুলের মনের ভাবনাকে বয়ান করা হয়েছে। গল্পটা নামের মতোই অপার্থিব।

“মায়ের মুখ” গল্পে দাম্পত্য জীবনের কলহ প্রকট হয়েছে। আনিস আর শেলীর সুখের সংসার, তাদের দুই মেয়েকে নিয়ে। কিন্তু শেলী ভীষণ রাগী হওয়ায় হুটহাট তর্ক বেধে যায়। যদিও আনিস সব কিছু মুখ বুজে সয়ে যায়। কিন্তু একদিন শেলী এমন একটা কথা বলে ফেলে যা এই সুখের সংসারটাকে এক মুহূর্তে এলোমেলো করে ফেলে। তবু আনিস তার ঘুমন্ত মেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে যেভাবে কাঁদতে থাকে তাতে গল্পটায় মায়া নামক অনুভূতির অস্বাভাবিক সুন্দর প্রকাশ ঘটে।

“কীর্তিনাশা” গল্পে পদ্মার গ্রাসে কীভাবে একটা সুখের সংসার হারিয়ে যায় সেটাই দেখতে পাই। সাজানো গোছানো সংসার হারিয়ে রাহেলার আর্তনাদ গল্পটাকে খুবই অর্থবহ আর বিষাদময় করে তোলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *