February 27, 2024

কুনালের চোখ : রোকেয়া আশা | Kunaler Chokh By Rokea Asha

❝শুভ্রর সবথেকে সুন্দর জিনিস তার চোখ। চশমার জন্যে তার চোখ কখনো দেখা যায় না। It’s a pity.❞

ফিকশনাল প্রিয় চরিত্র ❛শুভ্র❜ এর চশমার আড়ালে ঢাকা পড়া সুন্দর চোখের কথা আমরা সবাই জানি। তবে জানি কি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর চোখ কার ছিল? হুমায়ূন আহমেদ তার ❛দেয়াল❜ উপন্যাসে লিখেছিলেন, ❝পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর চোখ ছিল অশোকপুত্র কুনাল আর ইংরেজ কবি পি.বি. শেলীর❞


সম্রাট অশোক তখন ❛চন্ডাশোক❜ থেকে ❛ধর্মাশোক❜ হিসেবে আর্বিভূত হয়েছেন। তার স্ত্রী রাণী পদ্মাবতী পুত্রসন্তান জন্ম দিয়ে ইহলোক ত্যাগ করেন। জন্ম নেয়া পুত্র সন্তানটির চোখ যেন পদ্মের মতো। ❛অজ্ঞাত নয়❜ এর আচার্য ধীমান এই পদ্মচোখের শিশুপুত্রের নাম রাখলেন ❛কুনাল❜। ভাগ্যের পরিহাসে পদ্মচোখা কুনাল তার চোখ দুটো বিসর্জন দিলেন। আচার্য ধীমান অশোকরাজ্য ত্যাগ করে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমালেন।
মহাবালাচলে আচার্য চাণক্যের শিশুপুত্র জন্মের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করলেন আচার্য ধীমান। বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত অসুর সর্দারের স্ত্রীর পুত্রকে পৃথিবীর আলো দেখালেন। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন অশোকপুত্র কুনালের মতোই এই অসুরপুত্রের চোখ দুটোও ভারী সুন্দর। একেবারে পদ্মের মতো। আবারও তার মনের ভেতরের এক বাসনা আশার আলো দেখতে পেলো।


ধীমান সেই পুত্রের নামও রাখলেন ❛কুনাল❜।
সময়ের পরিক্রমায় অসুরপুত্র কুনাল বেড়ে উঠতে লাগলো। আচার্য ধীমান তাকে শিক্ষা দিতে লাগলেন। এদিকে মহাবালাচলের রাজ্যপাল অসুর বংশোদ্ভুত মহিষাসুর। তিনি গোপনে ছক কষছেন। ক্ষমতা পুঞ্জীভূত করছেন। সঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছেন আচার্য ধীমান এবং অপরিণত কুনালকে। কুনালকে নিয়ে রাজ্যপালের অভিসন্ধি কী? কিসের অংশ হবে পদ্মচোখা কুনাল।
অসুরপাড়ায় কয়েকঘর ব্রাহ্মণের বাস। তাদের মধ্যেই একজন উমাচরণ। অশোকরাজের অনুগত। রাজ্যপালের মতিগতি যে বিশেষ সুবিধার নয় তিনি আঁচ করতে পারেন।


কুনাল আচার্য ধীমানের সাথে মহিষাসুরের প্রাসাদে বাস করা শুরু করে। এখানেই দেখা পায় ছোট্ট চামুণ্ডেশ্বরীর। সূচনা হয় অন্য এক অ্যাখ্যানের।
কুনাল, চামুণ্ডেশ্বরীর মধ্যে গড়ে ওঠে এক মধুর সম্পর্ক। কিন্তু তৎকালীন সমাজের কাছে এ সম্পর্ক অনৈতিক। কারণ চামুণ্ডেশ্বরী এক পক্ষাঘাতগ্রস্ত পুরুষের বিবাহিতা স্ত্রী।
সময় গড়িয়ে যায়। মহিষাসুর তার ক্ষমতা বাড়াতে থাকেন। ধীমান বুঝতে পারেন সামনে কঠিন সময় আসতে চলেছে। কুনালও পরিণত হয়ে বুঝতে পারে মহিষাসুরের কোন পরিকল্পনার অংশ সে হতে যাচ্ছে। কোমল হৃদয়ের কুনাল মেনে নিতে পারে না আসন্ন ভবিষ্যৎ।


চামুণ্ডেশ্বরীর দেবর উমাচরণ কুনালের সাথে তার বৌঠানের সম্পর্কের কথা জেনে যায়। আর তখনই সে ছক কষে চামুণ্ডেশ্বরীকে কাজে লাগিয়ে নিজের স্বার্থ সিদ্ধির।
চামুণ্ডেশ্বরী নিরুপায়। কুনালকে সে সত্যিই ভালোবাসে। সেই বাল্যকাল থেকেই পোড় খাওয়া চামুণ্ডেশ্বরী নিজেকে তৈরি করেছে বুদ্ধিমতী, প্রজ্ঞাময়ী হিসেবে। শুধু রূপ দিয়ে সংসারে টিকে থাকা যায় না। ঘটে বুদ্ধিও দরকার।


মহিষাসুরের পরিকল্পনা কি সফল হবে? আর্য আর অসুরদের মাঝে যুদ্ধ কি বাধবেই? কুনালের কোমল হৃদয় আর চামুণ্ডেশ্বরীর বিচক্ষণতা কি পারবে আসন্ন ভবিষ্যতকে পরিবর্তন করতে?

পাঠ প্রতিক্রিয়া

সম্রাট অশোকের শাসনকালের শেষদিকের এক আবহ নিয়ে লেখিকা তার প্রথম বইয়ের সূচনা করেছেন।
মানব ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর চক্ষুধারী অশোকপুত্র কুনালের ইতিহাস দিয়ে শুরু হলেও পুরো বইতে মূল আকর্ষণে সে ছিল খুব অল্পই। গল্পের লাইমলাইটে ছিল রাজ্যপাল, ধীমান, অসুরপুত্র পদ্মচোখা কুনাল আর ব্রাহ্মণের স্ত্রী চামুণ্ডেশ্বরী।
থ্রিলার ফ্যান্টাসি সাথে ঐতিহাসিক ঘরনার উপন্যাস বলা হলেও উপন্যাসটিকে পুরোটা ইতিহাস আশ্রিত হিসেবেই ধরা যায়। থ্রিল খুব কম ছিল। ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে স্বাচ্ছন্দে পড়ে ফেলা যায়। ফ্যান্টাসির অংশ খুব কমই ছিল বইতে।


সুবর্ণকরণ বিদ্যা, চীনা দর্শনের রহস্যময় প্রাণশক্তি ❛ক্বি❜, অকালবোধন এই ব্যাপারগুলো পড়তে বেশ ভালো লেগেছে। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র কুনাল। কুনাল কোমল হৃদয়ের অধিকারী। অসুর জাতের হলেও শিশুকাল থেকে ব্রাহ্মণের ছায়ায় থাকা, তার দেয়া দীক্ষায় দীক্ষিত হওয়া কুনাল লোভ, পাপ থেকে দূরে থেকেছে। তার এই কোমনীয়তা উপন্যাসে তাকে অনন্য এক স্থান দিয়েছে।


তবে কেন্দ্রীয় চরিত্র কুনাল হলেও উপন্যাসে দাপট দেখিয়েছে চামুণ্ডেশ্বরী। শিশু বয়সে মাথায় সিঁদুর পড়া এক মেয়ে সে। পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্বামীর সেবা করাই ছিল যার প্রথম কাজ। শ্বশুরবাড়িতে ভালোবাসাহীন এক পরিবেশে বেড়ে ওঠা চামুণ্ডেশ্বরী নিজেকে সময়ের সাথে পরিবর্তন করে এক অনন্য ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। কুনালের প্রতি ভালোবাসা, নিজেকে রক্ষার বিচক্ষণতা এবং পরবর্তীতে নিজেকে এক অনন্য পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সবই আমার ভালো লেগেছে। নিজের প্রয়োজনে সে কিছুটা স্বার্থপর হলেও পুরো উপন্যাসে চামুণ্ডেশ্বরীকে আমার সবথেকে ভালো লেগেছে।


বাকি চরিত্র উপন্যাসের কাহিনি অনুযায়ী ঠিকঠাক ছিল। যদিও শুরুতে এবং শেষের দিকের প্রসঙ্গটুক না থাকলেও ভালো হতো। এতে বইয়ের ঘরানার পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হয়নি।
লেখিকার প্রথম উপন্যাস অনুযায়ী তিনি বেশ সার্থক। ভূমিকায় যেহেতু বলে দিয়েছেন এই গল্প তার নিজের কল্পনাপ্রসূত। এখানে নিখাঁদ ইতিহাস খোঁজা ভুল তাই ইতিহাসের সত্যতার বিষয় উহ্য থাকল।


উপন্যাসে লেখিকা তৎকালীন সমাজের কিছু কু-প্রথার অবতারণা করেছেন। বাল্যবিবাহ, সহমরণের মতো নি ষ্ঠু র প্রথা গুলোর চিত্র ফুটে উঠেছে। সে সময় নারীরা ঘরে এবং বাইরে কতটা অবহেলিত ছিল সে বিষয়গুলো উপন্যাসের বর্ণনায় উঠে এসেছে খুব সহজভাবে। প্রতিটি অধ্যায়ের নামকরণ সে অধ্যায়ের কাহিনির জন্যে বেশ মানানসই হয়েছে। অধ্যায়গুলোর নামও বেশ সুন্দর ছিল।


ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস আমার অন্যতম প্রিয় একটি জনরা। যদিও ইতিহাসের বহুল বর্ণনা ছিল না। তবুও সবমিলিয়ে আমার ভালো লেগেছে। সাইজ জিরো ফিগারের এই বইটি পড়ে শেষ করতে খুব একটা বেগ পেতে হবেনা।

প্রচ্ছদ

কথায় আছে ❛আগে দর্শনধারী, পরে গুণবিচারী❜। ঠিক সেরকমই হয়েছে আমার ❝কুনালের চোখ❞ উপন্যাসটি সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে। বইটির নামলিপি দেখার পর বেশ ভালো লাগে। বইটা সংগ্রহে নেয়ার জন্য আগ্রহ বাড়ে। নামলিপিটা প্রথম দেখায় হিন্দি বর্ণের মতো লাগছিল। আর সাথে প্রচ্ছদটাও সুন্দর লেগেছে। বইয়ের প্রোডাকশন আমার ভালো লেগেছে।

বই: কুনালের চোখ
লেখিকা: রোকেয়া আশা
প্রকাশনী: নহলী
মুদ্রিত মূল্য: ৩১০টাকা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *