February 26, 2024

হাত বাড়িয়ে দাও – ওরিয়ানা ফাল্লাচি

 

বই:হাত বাড়িয়ে দাও(এটি ‘লেটার টু এ চাইল্ড নেভার বর্ন্’ এর বাংলা অনুবাদ )
লেখক :ওরিয়ানা ফাল্লাচি
অনুবাদ:আনু মুহাম্মদ
মূল্য :৭৫ টাকা
পৃষ্ঠা :৪৭

এক অনাগত সন্তানের উদ্দেশ্যে এক কুমারী মায়ের চিঠি এই বই।ক্ষুদ্র পরিসরে লিখিত এই বইয়ের প্রতিটি পৃষ্ঠার প্রতিটি শব্দে শব্দে আছে জীবন সম্পর্কে এক গভীর মনস্তত্ত্ববোধ।আছে মানবজীবনের ব্যাপক সমালোচনা ।আছে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম ইতিহাস।প্রতিটি মানুষের জীবন যে একেকটি ইতিহাস,একেকটি সংগ্রাম সেই জীবনবোধ ই যেন অনুরণিত হয়েছে ‘ হাত বাড়িয়ে দাও’ বইয়ে-

একজন অবিবাহিত মা যখন তার শরীরে প্রথম একটি নতুন প্রাণের স্পন্দন অনুভব করেন,শিশুর আগমনী বার্তা তার মর্মমূলে প্রবেশ করে তখনই তার মনে এক দ্বিধা জন্ম নেয়-সমাজের হাজারো সমস্যা,নিপীড়ন, অসঙ্গতির মাঝে নতুন শিশুকে কীভাবে স্বাগত জানাবেন এই চিন্তা তাকে ঘিরে ধরে।সজাগ ব্যক্তি হিসেবে তার মাঝে ভয় কাজ করে ক্ষুধা,দারিদ্র্য,লাঞ্ছনা,বঞ্চনা,
অপমান,যুদ্ধতাড়িত,অসুস্থ,কপটতাপূর্ণ এ পৃথিবীতে
“নতুন মানুষের জন্ম দেয়া কী ঠিক?”

যে মা অনেক সাহসী ।যিনি কাউকে পাত্তা দেন না,যিনি ঈশ্বরকেও ভয় করেন না,বিশ্বাস করেন না।তার মনেও ভয় কাজ করে-যদি কোনোদিন তার নবাগত সন্তান তাকে চিৎকার করে প্রশ্ন করে -“কেন তুমি আমাকে এই পৃথিবীতে নিয়ে এলে?কে বলেছিল তোমাকে?”
তখন তিনি উত্তর দিতে পারবেন না ।কারণ জীবন “একটি যুদ্ধ, প্রতিদিনের-প্রতিমুহূর্তের।প্রতি বিন্দু আনন্দের জন্যে এখানে জীবনকে কঠোর মূল্য দিতে হয়।”

এখানে নারী হয়ে জন্মালে তার ধর্ষিতা হবার ভয় থাকে,প্রতি মুহূর্তে বাজেকথা আর অপমানের ভয় থাকে,বুদ্ধিবৃত্তি ঢেকে মসৃণ শরীর বানাতে হয়।
আবার পুরুষ হয়ে জন্মালেও দাসত্ব আর অবিচার থেকে মুক্তি পাবে না,পুরুষের জন্যেও জীবন সহজ নয়,
মাংসপেশী একজন মেয়ের চাইতেও সবল হতে
হবে,অনেক ভারী বোঝা বহন করতে হবে ।পুরুষ কখনো কাঁদতে পারবেনা।তাকে হত্যা করা হবে নয়তো সে নিজে হত্যাকারীর ভূমিকায় নামবে।আর এইজন্য পুরুষ জীবন নিয়েও অনেক সংগ্রাম করতে হবে ।তাই মায়ের উপদেশ “যদি ছেলে হয়ে জন্মাও তাহলে আমি চাইবো তুমি এমন একজন হও যে দুর্বলের প্রতি সংবেদনশীল,উদ্ধতের প্রতি উদ্ধত,যারা ভালোবাসা বুঝে তাদের বন্ধু এবং অধিপতিদের প্রতি কঠোর।”

বাস্তবতার কঠোর নির্মমতা মিশেল এ বইয়ের প্রতিটি লাইনের পরতে পরতে।ধোঁকা, প্রতারণা, কপটতাপূর্ণ স্বার্থপর পৃথিবীতে- ব্যক্তি স্বাধীনতা, নিজস্ব চিন্তা অনুভূতি প্রতি পদে পদে যেখানে অনুশাসিত হয় সেখানে স্বাধীনতা শব্দটি “ভালোবাসা ‘র মতোই বহুল ব্যবহৃত এবং বহুল প্রতারিত একটি শব্দ ” মনে হয়।

নিষ্ঠুরতম,সবলতম,হৃদয়হীন ব্যক্তিরাই সর্বক্ষেত্রে বিজয়ী হয় -আর এদের প্রথম শিকার হতে হয় মেয়েদের ।
এ পৃথিবীতে অবিচার আর বৈষম্যের ছড়াছড়ি।একমাত্র মায়ের গর্ভেই পূর্ণ ‘সাম্য’ বিরাজ করছে।

বইয়ের শেষদিকে লেখক এক চরম বাস্তবতার চিত্র এঁকেছেন -এক কুমারী নারী যে এক পুরুষের সাথে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে একটি নতুন প্রাণের জন্ম দিতে চাচ্ছে কিন্তু তার সহকর্মী পুরুষটি সেটির দায়ভার নিতে চাচ্ছে না এবং বারবার তাগিদ দিচ্ছে অনাগত শিশুটিকে পৃথিবীতে না আনার।সেই নারী তখন আত্ম অনুশোচনায় ভুগে-“একজন পুরুষকে আলিঙ্গনের পাপ কেন করেছিলাম-যার জন্যে একটা জীবনের জন্ম দিতে হচ্ছে? ”

আর এরপর থেকেই শুরু হয় শিশুটিকে পৃথিবীতে না আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা।অতিমাত্রায় সিগারেট আর অ্যালকোহল পান।যার ফল স্বরূপ গর্ভপাতে বেরিয়ে আসে গোলাপি অ্যালকোহলে ভাসমান ডিম্বাণু (শিশুর প্রথম স্পন্দন।)

নিষ্ঠুর পৃথিবীর কাছে পরাজিত কুমারী মা পারেনি তার শিশুটিকে হাত বাড়িয়ে দিতে,শিশুটিও পারেনি মাকে হাত বাড়িয়ে ছুঁতে।এই সমাজ পারেনি হাত বাড়িয়ে শিশুটিকে পৃথিবীর আলো দেখাতে।কিন্তু তারপরও কিছু এসে যায় না ।জীবন ধারাবাহিক ।জীবনের কখনো মৃত্যু নেই।জীবন আপন নিয়মে চলবে।কোনোকিছুর জন্য বা কারো জন্য জীবন কখনো থেমে থাকবেনা।জীবন শুধু প্রতিনিয়ত আহ্বান করছে ‘হাত বাড়িয়ে দাও’ …

(দ্র:এটি আমার প্রথম বুকরিভিউ।রিভিও লিখার তেমন ধারণা নেই।তাই ভুল-ক্রটি হলে ধরিয়ে দেয়ার অনুরোধ রইলো😊)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *