February 21, 2024

সে ই স ম য় – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় – একটা বইয়ের মাঝে কতজন কিংবদন্তি চরিত্র রাখা যায়?

সেই সময় একটি বাংলা ঐতিহাসিক উপন্যাস যার উপজীব্য ঊনবিংশ শতাব্দীর ব্রিটিশ শাসনামলের বিকাশমান কলকাতা নগরীর সমাজ এবং মানুষ। বিখ্যাত ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এ উপন্যাসের রচয়িতা। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাঙালির নবজাগরণ উপন্যাসটির অন্যতম মূল বিষয়বস্তু।

সেই সময় | সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
প্রকাশনা: আনন্দ পাবলিশার্স
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৫২৩
মূল্য: ৫০/-

উনবিংশ শতাব্দীর হালচালের দিকে ফিরে যাওয়া এক কালজয়ী উপন্যাস ‘সেই সময়’। লেখকের ভাষ্যমতে ১৮৪০ থেকে ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দের পটভূমিতে রচিত এ উপন্যাস। যেখানে কাহিনির মূল নায়ক হচ্ছে ‘সময়’। আর এ সময়ের প্রতীক হচ্ছে কাহিনির মূল চরিত্র জোড়াসাঁকোর সিংহ বাড়ির কনিষ্ঠপুত্র নবীনকুমার সিংহ। মূলত তার জন্মকাহিনী থেকে তার জীবনের নানা ঘটনার দিকগুলো, শেষদিকে এক অচেনা যুবতীর মধ্যে নিজের মাতৃরুপ দর্শন, তার অদ্ভুত ধরনের মৃত্যু সবই সেই প্রতীকের ধারাবাহিকতা।

নবীনকুমারের চরিত্রে এক অকাল মৃত অসাধারণ ঐতিহাসিক যুবকের কিছুটা আদল রয়েছে। তবে তা কিয়দাংশ মাত্র। বইয়ের প্রতি পাতায় দেখা যায় রথী মহারথীরা ছুটে চলেছেন এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। এমনকি ঠাকুরবাড়ির দেবেন্দ্রনাথ বাবুর সনাতন ধর্ন থেকে ব্রাহ্মধর্মে প্রতিষ্ঠিত হওয়া থেকে রয়েছে কিভাবে তা ধীরে ধীরে অন্যদের আক্রোশে পরিণত হয়!

এছাড়াও আরো দেখা যায় হেয়ার সাহেব ভারতের শিক্ষা প্রসার ঘটাচ্ছেন। বিদ্যাসাগর মশাই ব্যস্ত বিধবাবিবাহের আইন পাস ও তার কার্যকর করা নিয়ে। রয়েছে বিখ্যাত লেখক মধুসূদন দত্তের পতন-উত্থান-পুনরায় পতনের গল্প। সেই সাথে নিজেকে সামান্য লেখক বলে দাবি করা গন্ধর্বনারায়ণ ওরফে দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ উপন্যাস কিভাবে উপরমহলের সাহেবদের মনেও ভয় ধরিয়ে দেয় তার বিবরণ।

বইটি পড়ার সময় সিপাহী বিদ্রোহের পুরো বিষয়টি আমার চোখের সামনে এসেছে। এত নিপুণ বর্ণনা! এছাড়া মনশ্চক্ষুতে ভেসেছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তার আর বাঙালী বাবুদের নারী-সুরা-বেলাল্লাপানার চূড়ান্ত নিদর্শন! শেষে একটা জিনিস মনে দাগ কেটেছে সেটি হচ্ছে এই উপন্যাসের গল্পের একপর্যায়ে জন্মগ্রহণ করেন দেবেন্দ্রনাথ বাবুর ত্রয়োদশ সন্তান শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর! লোমহর্ষক না?

অহংকার, মদত, ঘাত, প্রতিঘাত, প্রেম, অভিমান, ব্যভিচার, কুসংস্কার, সমাজসংস্কারের মতো বিষয় গুলো সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এত দীর্ঘ উপন্যাস পড়তে গিয়েও খেই হারিয়ে ফেলিনি বা বিরক্তি বোধ আসেনি। বহমান নদীর মতো পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠায় বুঁদ হয়ে থাকার মতোন ভালো ব্যাপার বুঝি আর হয় না!

★ইউরোপের রেনেসাঁসের মতো আমাদের এই বাংলাতে ঘটেছিলো রেনেসাঁস। বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ,সতীদাহ প্রভৃতি প্রথার বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি হচ্ছিল। অন্তঃসত্ত্বা মেয়ে মাতুর তীব্র আর্তনাদ,
“আমাকে একটু বাইরে নিয়ে যাও, আমি নাকে হাওয়া পাচ্ছিন…ওগো…। কেউ নিয়ে যায়নি বাইরে। এক সময় শব্দ থেমে যায় “
★মধু চরিত্রে মধুসূদন বলে বলেছিলেন “শেক্সপীয়ার ইচ্ছে করলে নিউটন হতে পারতেন কিন্তু নিউটনের সাধ্য ছিল না শেক্সপীয়ার হওয়ার “
★একদিকে হেয়ার সাহেবের ভারত শিক্ষা প্রসার তো অন্যদিকে বিদ্যাসাগরের সংস্কৃতি সংস্করণ।
কলেরা হেয়ার সাহেব কে নিয়ে গেলো শুধু রেখে গেলো তার বাক্যবুলি ঃ
নারায়ণের প্রতি কথন ” বিদ্যাশিক্ষা করিতেছ, যদি পারো তো দেশবাসীকে বুঝাইয়ো। মাতৃজাতির দুঃখ দূর করিবার জন্য কিছু যত্ন করিয়ো! ও কাজ আমি পারিব না। তোমাদিগেরই কাহাকেও উদ্যোগ লইতে হবে।
★(১৮৪০-১৮৭০) সালের সম্পুর্ন ইতিহাস সুনিল বাবুর বইটিতে মিলে। নীলমনি থেকে রবিন্দ্রনাথ অন্যদিকে রামমোহন রায় আছেন আপন ভূবনে।
★বীটন সাহেব মধুসূদন এর ইংরেজি সাহিত্যের বই ক্ষানিকটা পাঠ করে তিনার বন্ধু গৌরদাস কে বলেন ” যে ভাষায় বহু সংখ্যক লেখক অনেক উত্তম গ্রন্থ রচনা করিয়াছেন, সে ভাষায় খ্যাতি অর্জন করা সুকঠিন। কিন্ত যে ভূমি আজও অকর্ষিত, সেখানে তো অতি সহজেই সোনার ফসল ফলানো যাইতে পারে। “
ইতিহাসের ধূলোকলি সকল বিষয় নিয়ে মনোমুগ্ধকর
লিখনি বিস্ময়কর!
বাংলার উত্থান পতন, সাহিত্য সংস্কৃতি, সভ্যতার উপর দাড়িয়ে আছে ‘সেই সময়’। সময়ের চাকায় অবগাহন করতে চাইলে চলুন ঘুরে আসি সুনিলের সেই সময়ের পাতায়।
রেটিং:৫/৫

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *