March 1, 2024

সাহিত্যের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত দশ বিষয়বস্তু

🌸 বিষয় : সাহিত্যের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত দশ বিষয়বস্তু ।

🍂 একটা বইয়ের মূল বিষয়বস্তু বলতে ভেতরকার সার্বজনীন সুরকেই বোঝানো হয়। যে চিন্তা কিংবা সংবাদকে আশ্রয় করে নির্মিত হয় আখ্যানের পটভূমি, তা-ই বিষয়বস্তু। হুমায়ূন আহমেদের ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ উপন্যাসের পটভূমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ; আহমদ ছফার ‘গাভী বিত্তান্ত’র বিষয়বস্তু উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোতে চলমান অনিয়ম এবং অসভ্যতা। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের ‘চোখের বালি’ উপন্যাসের প্লট পুরোপুরি মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন। বস্তুত প্রতিটা বই-ই জন্ম নেয় কোনো না কোনো বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করে। তাই কিছু সাধারণ বিষয়বস্তু দেখা যায় অনেক বইয়ের মধ্যেই। অনেকগুলো বিষয়বস্তু নিয়ে একটা বই রচিত; এমন নজিরও বিরল নয়।

🍂 যেভাবে বুঝতে হয় বিষয়বস্তু

ছেলেবেলায় ঈশপের গল্প কে না পড়েছে? কচ্ছপ কিংবা খড়গোশের প্রতিযোগিতার সেই গল্পের অনেক কথার ভাঁজে শেষমেশ একটা কথাই মুখ্য হয়ে ওঠে—অধ্যবসায়ীরাই সত্যিকার অর্থে বিজয়ী হয়। অনুরূপ উপন্যাসের ক্ষেত্রেও। অনেকের কাছে অবশ্য উপন্যাস কিংবা গল্পের মূল বিষয়বস্তু বের করাটা রীতিমতো অসম্ভব। এরকম কোনো নিয়মও নেই যে, সাহিত্যিক একটা মাত্র লাইনে লেখার বিষয়বস্তু বলে নিয়ে লেখা শুরু করবেন। বস্তুত বিষয়বস্তু কখনো প্রকাশ্য আবার কখনো রূপকের মাধ্যমে গোটা গল্পকে জড়িয়ে রাখে।

যে কোনো লেখার বিষয়বস্তু বের করার জন্য একটা কাজ করা যেতে পারে। এমন একটি শব্দ সনাক্ত করা যেতে পারে, যার মাধ্যমে উঠে আসে গোটা গল্পের উদ্দেশ্য। তবে শব্দটা যেন জীবনের সাথে সম্পর্কিত হয়। একটু এদিক সেদিক হলে অবশ্য দোষ নেই। যদিও লেখক একটা প্রসঙ্গে বন্দি হয়ে থাকেন না; থাকতে পারেন না। বিষয়বস্তু জিনিসটা অনুসন্ধানী পাঠকের জন্যই তাৎপর্যপূর্ণ।

1️⃣ বিচার

খুব সম্ভবত বিশ্বসাহিত্যে জনপ্রিয় একটি বিষয়বস্তু বিচার। এই ধরনের বইয়ে কোনো ব্যক্তিকে তার কাজের জন্য বিচারের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। কাজটা সত্যিকার অর্থেই মন্দ হোক কিংবা উপন্যাসের পটভূমিতে অন্যদের চোখে মন্দ—বিচারের ঘটনাটাই নাটকীয়তা তৈরি করে। ক্লাসিক উপন্যাসগুলোর মধ্যে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে প্রায়ই। ‘দ্য স্কারলেট লেটার’, ‘টু কিল এ মকিংবার্ড’, ‘দ্য হাঞ্চব্যাক অব নটরডেম’ কিংবা ফ্রানৎস কাফকার ‘দ্য ট্রায়াল’-এর কথা সবার আগে উল্লেখযোগ্য। অবশ্য বিচারগুলো সবসময় ন্যায়বিচার হয়ে উঠতে পারে না।

2️⃣ টিকে থাকা

শ্বাসরুদ্ধকর কিছু টিকে থাকার গল্প আছে; যেখানে কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলো শুধুমাত্র টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করে রাতদিন। সামান্য জীবনের জন্য কিংবা প্রত্যাশা পূরণের জন্য পাড়ি দিতে থাকে এক স্তর থেকে আরেক স্তর। জ্যাক লন্ডনের যে কোনো বইকে এই ক্যাটাগরিতে ফেলা যায়। চরিত্রগুলো যেন প্রায়ই বেঁচে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত। ‘লর্ড অব দ্য ফ্লাইস’ সেক্ষেত্রে সফল উদাহরণ। মাইকেল ক্রিচটনের ‘কংগো’ কিংবা ‘জোরাসিক পার্ক’-এর পেছনেও একই প্রভাবক।

3️⃣ যুদ্ধ ও শান্তি

শান্তি আর যুদ্ধের পরিস্থিতি নিয়ে গড়ে উঠেছে অজস্র উপন্যাস। বিশেষ করে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে কেন্দ্র করে। পরবর্তীকালে স্নায়ুযুদ্ধকালীন পরিস্থিতিও ভালো প্রভাবিত করেছে সাহিত্যিক মহলকে। বেশিরভাগ সময়েই রাজনৈতিক সংঘর্ষ কিংবা টানাপোড়েনে এইসব রচনার চরিত্রগুলো খাবি খায়। ‘গন উইদ দ্য উইন্ড’, ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’, ‘দ্য বয় ইন দ্য স্ট্রাইপড্ পাজামা’ এবং ‘দ্য রোড ব্যাক’ ঠিক এই ধরনের লেখা। যুদ্ধের পূর্বের জীবন এবং যুদ্ধময় পরিস্থিতিতে ভীতিকর অগোছালো জীবন চিত্রিত হয়েছে সূক্ষ্মতার সাথে।

4️⃣ প্রেম

বিশ্বসাহিত্যে প্রেম যতটা সফলতার সাথে লেখকের মস্তিষ্ক দখল করে রেখেছে; অতোটা আর কিছুই পারেনি। এমনকি যুদ্ধ কিংবা অন্যান্য বিষয়বস্তুর ভেতরেও রোমান্টিকতাকে তুলে আনা হয় প্রায়শ। বাংলা সাহিত্যে শরৎচন্দ্র কিংবা রবীন্দ্রনাথের জীবনের বিশাল কর্ম গড়ে উঠেছে একে কেন্দ্র করে। বিশ্বসাহিত্যে জেন অস্টিনের ‘প্রাইড এন্ড প্রেজুডিস’, টলস্টয়ের ‘আন্না কারেনিনা’, স্টিফেন মেয়ারের ‘টুইলাইট’-এর মতো উপন্যাসগুলো উদাহরণ হতে পারে।

5️⃣ বীরত্ব

মিথ্যে থাক কিংবা সত্য, বীরত্ব উপন্যাস রচনার অন্যতম মৌলিক বিষয়বস্তু হিসাবে প্রতীয়মান হয়েছে। সাধারণ কোনো চরিত্রের দুর্দান্ত অভিযাত্রা ও সাফল্যকে ফ্রেমে বন্দি করা হয় এখানে। হোমারের ‘ওডিসি’ থেকে শুরু করে ‘রামায়ণ’, ‘থ্রি মাসকেটিয়ার্স’, ‘হবিট’—এই শ্রেণির রচনার কাতারে পড়ে। প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্যের নিদর্শনে বীরত্বই মুখ্য ভূমিকা পালন করে। যেহেতু তৎকালীন রাজতান্ত্রিক সভ্যতায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক ধ্যান-ধারণা গড়ে উঠেছিল। এইজন্য ‘গিলগামেশ’ কিংবা ‘বেউলফ্’ থেকে পরবর্তী কালের ‘লর্ড অব দ্য রিংস’ তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ হিসাবে পরিগণিত।

6️⃣ শুভ এবং অশুভ

শুভ ও অশুভের পাশাপাশি অবস্থান মিথোলজি গড়ে ওঠার প্রধান উপজীব্য। প্রাচীন জরাথুস্ত্রবাদে ভালো আর মন্দের দেবতার মধ্যকার সংঘর্ষের মধ্য দিয়েই সৃষ্টিপ্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যুদ্ধ কিংবা বিচারের মতো বিষয়গুলোতেও ভালো-মন্দের দ্বন্দ্ব প্রতীকায়িত হয়ে ওঠে। জে কে রাউলিং এর ‘হ্যারি পটার’ কিংবা জে আর টোলকিনের ‘লর্ড অব দ্য রিং’-এর মূল কেন্দ্রবিন্দু শুভ ও অশুভের দ্বন্দ্ব। ‘স্টার ওয়ার্স’ কিংবা ‘দ্য উইচ এন্ড দ্য ওয়ারড্রব’-এর পেছনেও একই কথা প্রযোজ্য।

7️⃣ জীবনচক্র

জন্ম দিয়ে জীবনের শুরু আর মৃত্যু দিয়ে শেষ; লেখকেরা এই সত্যকে নাকচ করতে পারেননি। তাই অবচেতনে হলেও জীবন নিয়ে তুলে ধরেছেন নিজস্ব চিন্তা। ‘দ্য পিকচার অব ডোরিয়ান গ্রে’, ‘দ্য কিউরিয়াস কেইস অব বেনজামিন বাটন’ রচনাগুলো অনুরূপ উদাহরণ হতে পারে। বস্তুত বিষয়বস্তু হিসাবে জীবন ও মৃত্যু লেখকে আত্ম-অনুসন্ধানের দিকে ধাবিত করে। নিজেকে আবিষ্কারের পথ দেখায় নতুন করে। এজন্য ভারি কথা ও ভারি ভাব উঠে আসে।

8️⃣ ভোগান্তি পর্ব

শারীরিক হোক কিংবা মানসিক; মানুষের ভোগান্তি এক বৃহত্তম পরিসর ঘিরে আছে সাহিত্যের। জার্মান সাহিত্যিক ফ্রানৎস কাফকার গোটা রচনাতেই জীবনের জটিলতা ও ভোগান্তি উঠে এসেছে। দস্তয়ভস্কির ‘ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট’ দুঃখ আর ভোগান্তিতে পরিপূর্ণ। চার্লস ডিকেন্সের ‘অলিভার টুইস্ট’-এ অবশ্য শারীরিক যন্ত্রণাই মুখ্য হয়ে উঠেছে। তারপরেও এই শ্রেণিতে উদাহরণ কম নেই।

9️⃣ প্রতারণা

প্রতারণার আবার প্রকারভেদ আছে। সামাজিকভাবে হতে পারে কিংবা ব্যক্তি বিশেষের সাথেও। মার্ক টোয়েনের ‘দ্য এডভেঞ্চার অব হাকলবেরি ফিন’ কিংবা শেক্সপিয়ারের অনেক নাটকের কেন্দ্রবিন্দুতে প্রতারণা একটা বড় স্থান নিয়ে আছে। যে কোনো রহস্য কিংবা রোমঞ্চধর্মী রচনার পেছনেও একই কথা প্রযোজ্য।

🔟 নতুন সময়

কিছু বইতে আবার উপর্যুক্ত বিষয়কে ছাপিয়ে পরিণত মনস্তত্ত্ব প্রকাশ পেয়েছে। আধুনিক সময়গুলোতে সাহিত্য অস্তিত্ববাদ, প্রথাবিরোধিতা, পরাবাস্তবতা কিংবা অন্যান্য আদর্শিক ধারাকে সামনে রেখে এগিয়ে গেছে। জীবনের খুটিনাটি বিষয়গুলো পরিণত ব্যক্তিদের মাধ্যমে তুলে আনা হয় যত্নের সাথে। আলবেয়ার ক্যামুর ‘দ্য আউটসাইডার’, এবং স্যালিঙ্গারের ‘দ্য কেচার ইন দ্য রাই’ উপন্যাস এক্ষেত্রে অগ্রগণ্য। মার্কেজের ‘হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিটিউড’, চিনুয়া আচেবের ‘থিংস ফল এপার্ট’ও এর আওতাভুক্ত।

🍂 উল্লিখিত বিষয়বস্তুর বাইরেও

অনেকগুলো ধারা সাম্প্রতিক সময়ে জনপ্রিয়। সায়েন্স ফিকশন, ইতিহাস, স্যাটায়ার কিংবা পুরানকথা দিনে দিনে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে নতুন করে। অনেক বিষয়বস্তু জন্ম নিচ্ছে নতুন পৃথিবীকে কথা বলানোর জন্য। আগামীর কথাসাহিত্যে এদের আবেদন কতটা টিকে থাকে তা সময়ই বলে দেবে।

Credit : Mansib Zunaid Chowdhury

#টিম_গীতাঞ্জলি_০৭

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *