February 25, 2024

ভাবনায়_তুমি – Arshi Ayat

ভাবনায়_তুমি
পর্ব০২
লেখিকাঃ Arshi Ayat

সাগরকে বিদায় দিয়ে সাগরের মা তিয়াসাকে বলতে শুরু করেন, “সাগর আগে কতটা খারাপ ছিল তুমি কল্পনা করতে পারবে না। ভাবতে পার মা কেন তার ছেলেকে খারাপ বলবে? কিন্তু এটাই সত্যি। সাগর আগে মাদকাসক্ত ছিল। নিজের গ্যাং ছিল। খারাপ ছেলেদের সাথ মিশতো। বিভিন্ন অপরাধে কয়েকবার থানা পর্যন্ত গিয়েছে। তোমার বাবার ক্ষমতায় হয়তো ওকে বের করে এনেছি কিন্তু ও শুধরায়নি। তখন আমি আর তোমার বাবা সিদ্ধান্ত নেই সাগরের বিয়ে দিয়ে দিব।”

সাগরের মা থামেন। তিয়াসা কৌতুহলী হয়ে শুনছিলো। জিজ্ঞাসা করে, “তারপর? ”

সাগরের মা আবার বলতে থাকেন, “তারপর একটা মেয়ে দেখে সাগরের বিয়ে দেই। স্বাভাবিকভাবেই সাগরের সম্মতি ছিল না। কিন্তু আমরা এক প্রকার জোর করেই সাগরকে রাজি করাই। সাগরের সাথে বিয়ে হয় তাহানার।

আমরা ভেবেছিলাম সাগর বিয়ের পর তাহানার সাথে ঝামেলা করবে। কিন্তু তাহানা মেয়েটার হাতে জাদুই ছিল মনে হয়। কিভাবে সাগরকে ঠিক করে ফেলে বুঝতেই পারিনি। ছয়মাসের মধ্যে আমার বখাটে ছেলে মানুষ হয়ে যায়। ”

তিয়াসা জানতে চায়, “উনার কি হয়েছিল? মানে আপনার ছেলের প্রথম স্ত্রীর? মারা গেলেন কিভাবে?”

-“সে কথা আর জানতে চেয়ো না মা। দূর্ভাগ্য কাকে বলে! সাগর অনেকটা নিজ হাতেই তাকে মেরেছে।”

তিয়াসা অবাক হয়ে যায়, “নিজ হাতে মেরেছে মানে?”

– “সাগর আর তাহানার সংসার খুব ভালো চলছিলো। সাগর খারাপ পথ থেকে ফিরে এলেও তার রাগ ছিল বেশি। একদিন সাগর আর তাহানার কথা কাটাকাটি হয়। কিছু নিয়ে অনেক ঝগড়া হয়। সাগর সে রাতে তাহানার গায়ে হাতও তুলে। তাহানা এতে অনেক কষ্ট পায়। যাই হোক এক পর্যায়ে তাহানা বলে সাগর যতদিন ক্ষমা না চাবে ততদিন সে এই সংসার করবে না। সাগরও বলে সে ক্ষমা চাবে না। এরপর তাহানা বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। ”

সাগরের মা শাড়ির আচলে চোখ মোছেন। তিয়াসা শোনার অপেক্ষায় থাকে।

সাগরের মা বলতে থাকেন, “সে রাতেই তাহানা বেরিয়ে যায়। আমি আটকাতে গিয়েছিলাম কিন্তু সাগর আমায় বাঁধা দেয়। পরদিন সকালে খবর পাই তাহানা রাস্তায় এক্সিডেন্ট করেছে। হাসপাতালে ভর্তি।

সাগর তাহানার সাথে যতই খারাপ ব্যবহার করুক না কেন তাহানাকে সত্যিই ভালোবাসতো। তাই সেই সবার আগে ছুটে যায়। আমরাও যাই। সেখানে শুনতে পাই তাহানার অবস্থা একদমই ভালো না। যেকোনো সময় খারাপ সংবাদ আসতে পারে।

সাগর পুরোপুরি মুষড়ে যায়। সন্ধ্যার দিকে ডাক্তার এসে জানায় তাহানার জ্ঞান ফিরেছে। সাগর তখনই ভিতরে যায়। তাহানার হাত ধরে ক্ষমা চায়। তাহানা কথা বলার অবস্থায় ছিল না। শুধু মুচকি হাসে।

ডাক্তার জানায় বিপদ যা ছিল মোটামুটি কেটে গেছে। যে অপারেশন করা হয়েছে তা সফল। খুব দ্রুতই হয়তো তাহানা সুস্থ হয়ে যাবে।

ডাক্তারের কথায় আমরা আশ্বাস পাই। সাগর তাহানার হাত ধরে একই ভাবে বসে ছিল। রাত আটটার দিকে তাহানা প্রথম কথা বলে। প্রথম কথাটাই ছিল সাগরের উদ্দেশ্য, ” কালকের জন্য স্যরি।”

সাগর বলেছিল, “স্যরি তো আমি। আমার জন্যই এত কিছু হল। ”

-“ভুল কিছু করলে ক্ষমা করে দিও আমায়।”

সাগর একটু রেগে গিয়েই বলে, “কি যা তা বলছো? ডাক্তার বলেছে তুমি সুস্থ হয়ে যাবে।”

– “ডাক্তারের কাজই তো আশ্বাস দেওয়া সাগর। তুমি আমায় ক্ষমা করে দিও।”

– “ভুল তো আমি করেছি তাহানা। ক্ষমা তো আমার চাওয়ার কথা। ”

তাহানা মুচকি হেসে বলেছিল, “তার মানে কিছু মনে করনি তো?”

সাগর জবাব দেয়, “আরে না। দোষ তো আমার।”

তাহানা হাসির পরিধি আরো বাড়িয়ে দেয়। শক্ত করে চেপে ধরে সাগরের হাত। তারপরই হঠাৎ… ”

সাগরের মা থেমে যান। তিয়াসা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলো। বুঝতে পারে মা’র কষ্ট হচ্ছে বলতে। জোর করে না। সাগরের মা একটু থেমে আবার বলেন, “তারপর সাগরের হাত ধরেই তাহানা বমি করে দেয়। রক্তবমি। দ্রুতই ডাক্তার এসে সব চেক করে। সবাইকে বের করে দেয়। কিছুক্ষণ পর এসে জানায় তাহানা আর নেই। সাগরের হাত ধরেই তাহানা চলে যায় ওপারে। ”

তিয়াসারও কষ্ট হতে থাকে। ছোটবেলায় তার দাদির মৃত্যু দেখেছিলো। কি ভয়ংকর সে মৃত্যু। পুরো বাড়িকে কান্নাপুরী বানিয়ে দিয়েছিল দাদির মৃত্যু। ছোট্ট তিয়াসার মনে সেটা ভালোভাবেই আচর কাটে। তখন থেকেই মৃত্যুকে খুব ভয় পায় তিয়াসা। আর মাত্র নিজ কানে স্বামীর প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর কথ শুনলো। কি বেদনাবিধুর! সৃষ্টিকর্তা যদি মৃত্যু না দিতেন? মানুষ জন্মাতো কিন্তু কারো যদি মৃত্যু না হত? অনেক সমস্যাই হয়তো হত কিন্তু কেউ অন্তত এরকম কষ্ট পেত না।

তিয়াসা শ্বাশুড়ির দিকে তাকায়। সাগরের মা বলেন, “এরপর থেকেই সাগর কেমন যেন বদলে গেছে। প্রথম কয়েকদিন কারো সাথেই কথা বলত না। একদম একা একা থাকতো। অফিসে যেত না। কোনো কাজ করতো না। সারাক্ষণ নিজের রুমে বসে থাকতো। কখনো তাহানার ওড়না নিয়ে, কখনো জামা নিয়ে, কখনো বা অন্য কিছু নিয়ে। এরপর আমাদের জোরাজুরিতে একটু স্বাভাবিক হয়। অফিসে যাওয়া শুরু করে। কিন্তু তাহানার স্মৃতি ভুলতে পারেনি কখনোই। এমনকি এখনো না। ”

তিয়াসা অনেকক্ষণ পর কথা বলে, “জানি মা। যে মানুষটা উনাকে স্বাভাবিক করেছে তার স্মৃতি ভোলা এত সহজ না।”

-“হ্যা। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে সাগর আবার আগের মত হয়ে যাচ্ছে। আবার মাদক নেওয়া শুরু করেছে। দেরি করে বাসায় আসে। আমাদের সাথে একদমই কথা বলে না।”

তিয়াসার হঠাৎ করে মায়া হতে থাকে সাগরের জন্য। যে মানুষটার সাথে সারাজীবন কাটাবে বলে গতকাল রাতে আফসোস করেছিলো আজ তার ঘটনা শোনার পর তার জন্যই কষ্ট লাগতে থাকে। তিয়াসা আর কথা বলে না।

রাতে সাগর বাসায় আসে। দেখেই বোঝা যায় নেশা করে এসেছে। তিয়াসা সাগরের মাকে বলে পানি নিয়ে যায়। ভেবেছিলো সাগর এটা নিয়েও বাড়াবাড়ি করবে। কিন্তু সেরকম কিছু করেনি। কথা না বলে বাথরুমে যায় ফ্রেশ হতে।

তিয়াসা সাগরকে খাবার খেতে ডাকে। সাগর এবারও কিছু বলে না। কিছুক্ষণ পর খাবার খেয়ে চুপচাপ নিজের রুমে চলে আসে। সব কিছু গুছিয়ে তিয়াসাও শুতে আসে। তখন প্রথমবারের মত সাগর তিয়াসার সাথে কথা বলে, “কাল মানা করেছিলাম না এখানে শুতে? এরপরও এখানে এসেছো কোন সাহসে?”

তিয়াসা বলে, “কোথায় থাকবো সেটা তো বলে দেননি।”

– “সারাদিন ঘোড়ার ঘাস কেটেছো নাকি যে এখনো জানো না কোথায় থাকবে?”

-“না জানি না। আপনি বলে দিন।”

সাগর হঠাৎ কেন যেন ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। তিয়াসার দিকে এগিয়ে এসে বলে, “মুখে মুখে তর্ক করা আমি একদমই পছন্দ করি না।”

– “আমি তো আপনার সাথে তর্ক করছি না। আপনি একটা কাজ করতে নিষেধ করেছেন তাই জানতে চাইছি কি করব? আপনি অযথাই ভুল বুঝছেন।”

-“আবার?” সাগর হঠাৎ করেই এগিয়ে এসে তিয়াসার গালে সজোরে চড় বসিয়ে দেয়। তিয়াসা এরকম কিছুর জন্য প্রস্তুত ছিল না। কোনোমতে দেয়াল ধরে নিজেকে সামলে ভয়ে ভয়ে সাগরের দিকে তাকায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সাগর তিয়াসার ওড়না ধরে টান দিয়ে ফেলে দেয়। তিয়াসা এবার আর নিজেকে সামলাতে পারে না। মাটিতে পড়ে যায়।

সাগর হঠাৎ কেন এরকম করছে তিয়াসা বুঝতে পারেনা। উঠে দাঁড়ানোর আগেই সাগর তিয়াসার চুলের মুঠি ধরে টেনে আবার গালে চড় মারে। তিয়াসা এবার আর আটকাতে পারে না। গলা দিয়ে আওয়াজ বের হয়ে যায়। সাগরের মা শুনতে পান। দ্রুত ছুটে আসেন সাগরের রুমে। সাথে সাগরের বোনও।

সাগরের মা তিয়াসাকে টেনে সাগরের কাছ থেকে সরানোর চেষ্টা করেন। বলেন, “সাগর তুই কি পাগল হলি নাকি? কিসব করছিস? মেয়েটাকে এভাবে মারছিস কেন?”

সাগর জ্ঞানশূন্য হয়ে গেছে। এক ঝটকায় মাকে সরিয়ে দিয়ে আবার তিয়াসাকে আঘাত করে। এবার সাগরের বোন এসে কোনোমতে তিয়াসাকে সাগরের থেকে ছুটিয়ে বাহিরে নিয়ে আসে।

সাগরের মা সাগরকে বলেন, “এরকম পাগলামি করছিস কেন? ও তোর বউ হয়। এসবের মানে কি হ্যা?”

সাগর চিৎকার দিয়ে বলে, “আবার বউ বউ করছো? বউ হয় মানে কি? তোমরা জোর করে বউ বানিয়ে দিয়েছো। আমি বলেছিলাম আমাকে ওর সাথে বিয়ে দিতে? কোথাকার কোন নষ্টা মেয়েকে আমার বউ বানিয়েছো। তাও আমাকে না বলেই। ”

-“আহা সাগর এভাবে বলছিস কেন? মেয়েটা শুনলে কি ভাববে বল? আর তুই বিয়ে না করলে বাকি জীবন কি করবি? একা একাই আর কত থাকবি আর তাহানার স্মৃতি নিয়েই বা কতকাল পরে থাকবি? নিজের কথা একটু ভাব। তোরও তো একটা জীবন আছে। আর তাছাড়া তুই আমাদের বড় ছেলে। সংসারেরও একটা দায়িত্ব তোকে নিতে হবে। এখন তুই যদি এসব করিস তাহলে কিভাবে হবে বল?”

– “আমাকে জ্ঞান দিতে হবে না। বের হও আমার ঘর থেকে।”

সাগরের মা আর কিছু না বলে বের হয়ে আসেন। তিয়াসা দরজার বাহিরে দাঁড়িয়েই সব শুনছিলো। সাগরের মা বের হতেই কেঁদে দেয়। সাগরের মা তিয়াসাকে জড়িয়ে ধরেন। তিয়াসা বলে, “মা আমি ভিতরে যাই। ওইখানেই থাকি।”

-“মাথা খারাপ নাকি তোমার? স্বর্ণা তোমাকে না বাঁচালে তুমি আজকে হয়তো সাগরের হাতে মরেই যেতে। আর এখন বলছো ওর সাথে থাকবে?”

-“কিছু তো করার নেই। এমন একজনের স্ত্রী হয়েছি এতটুকু সহ্য না করলে কিভাবে হবে? গেলাম আমি।”

সাগরের মাকে আর কিছু বলতে না দিয়ে তিয়াসা দরজা খুলে রুমে ঢুকে আবার দরজা লাগিয়ে দেয়। সাগর দেয়ালে হেলান দিয়ে মাটিতে বসে ছিল। তিয়াসাকে দেখে চমকে যায়। কিছু বলার আগেই তিয়াসা বলে, “রাতে আপনার বিছানায় থাকবো না। সেখানে আপনিই থাকবেন। কিন্তু রাতটা অন্তত এই রুমে থাকতে দিন।”

-“বলেছিলাম না এই রুমে না আসতে? এসেছো কেন আবার?”

-“এটা অনুরোধ। রাখবেন দয়া করে। আমি বাহিরে শুলে মা কষ্ট পাবেন। আপনি আমাকে যা ইচ্ছা করুন। মা’র জন্য হলেও অন্তত এই অনুরোধটা রাখুন।”

সাগর কোনো কথা শুনে না। তিয়াসাকে আবার মারতে শুরু করে। তিয়াসা মুখ বুজে সহ্য করে যাচ্ছে কোনোমতে। একপর্যায়ে সাগর নিজেই ক্লান্ত হয়ে যায়। বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ে। কিছুক্ষণের মাঝেই গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়।

সাগর ঘুমালে তিয়াসা উঠে বাথরুমে যায়। আয়নায় নিজের চেহারা দেখে নিজেই কেঁদে দেয়। ইচ্ছা করছে এই মুখ নিয়ে, এই শরীর নিয়ে বাবার সামনে যেতে। গিয়ে বলতে দেখ আমাকে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিজেদের ইচ্ছায় বিয়ে দেওয়ার ফল। তোমার মেয়ের এই অবস্থা হয়েছে। যে বাবা কোনোদিন মেয়ের গায়ে হাত পর্যন্ত তুলেনি সেই বাবা মেয়ের এই অবস্থা দেখে কি বলবেন? সহ্য করতে পারবেন? নাকি মেয়ের হাত দুটো ধরে বলবেন “আমাকে মাফ করে দে মা”। পরক্ষণেই মনে হয় তার বাবা হয়তো কিছুই বলবে না। জোর করে আবার এখানেই পাঠিয়ে দিবে। তিনি যে আমার থেকে নিস্তার চান!

তিয়াসার চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়েই যাচ্ছে। হাত মুখ ধুয়ে বারান্দায় যায়। হঠাৎ তার মনে হয় এভাবে বাঁচার মানে হয় না। বাঁচতে হলে ভালোভাবে বাঁচবো নয়তো নিজেকে শেষ করে দিব।

চলবে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *