February 26, 2024

বাদশাহ নামদার লেখকঃ হুমায়ূন আহমেদ

  • বাদশাহ নামদার
  • লেখকঃ হুমায়ূন আহমেদ
  • প্রকাশনাঃ অন্যপ্রকাশ
  • প্রচ্ছদঃ ধ্রুব এষ
  • রিভিউঃ জারিন আনান
হুমায়ূন ছিলেন এমন এক সম্রাট যিনি মস্তিষ্ক দিয়ে নয়, ভাবতেন হৃদয় দিয়ে। তাই অন্য সব সম্রাটদের বীরগাথার তুলনায় তাঁর বীরগাথা অনেকটাই ভিন্ন, স্বতন্ত্র। সৃষ্টিকর্তা তাঁর জীবনটাকে এতসব বৈচিত্র্য দিয়ে সাজিয়েছেন যে অবিশ্বাস্য বোধ হয়। লেখক ভূমিকাতেই লিখেছেন, ” সম্রাট হুমায়ূন বহু বর্ণের মানুষ। তাঁর চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে আলাদা রঙ ব্যবহার করতে হয়নি। আলাদা গল্পও তৈরি করতে হয়নি। নাটকীয় সব ঘটনায় তাঁর জীবন পূর্ণ।” আসলেই তাই।


১৫৩০ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ ডিসেম্বর নাসিরুদ্দিন মুহম্মদ হুমায়ূন মীর্জা সিংহাসনে বসেন। ১৫৩৯ সালের ২৬ জুন চৌসায় ও পরের বছর কনৌজে শেরশাহের কাছে হেরে সিংহাসন হারান। এরপর বিভিন্ন নাটকীয়তার মধ্যদিয়ে ১৬ টি বছর পলাতক ছিলেন। এমন শোচনীয় পরিস্থিতিতে ১৫৪২ সালে জন্মগ্রহণ করেন আকবর। ইতিহাসের সেই “আকবর দ্য গ্রেট”। ভাগ্যের পরিহাসে আকবরকে রেখেই হুমায়ূন ও তাঁর স্ত্রী হামিদা বানু পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। জন্মের প্রথম তিনবছরে আকবর তাঁর বাবা-মাকে দেখেননি।
হুমায়ূন পুনরায় দিল্লির সিংহাসনে বসেন ১৫৫৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ জুলাই। পুনরায় সিংহাসন দখলে কিছু মানুষের অবদান অনস্বীকার্য। তাদের মধ্যে প্রথমেই বলতে হয় হুমায়ূনের প্রধান সেনাপতি বৈরাম খাঁ এর কথা। যে দূরদর্শিতা আর সাহসিকতার সাথে তিনি সারাজীবন হুমায়ূনের পাশে ছিলেন তার নজির ইতিহাসে খুব বেশি নেই। তাঁর এই বিশ্বস্ততা, এই বিচক্ষণতা না থাকলে মোঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাস এত লম্বা পাতায় লেখা থাকতো কিনা, তা বলা শক্ত।


এছাড়াও বলতে হয় পারস্য সম্রাট শাহ তামাস্পের কথা। বইটি পড়তে গিয়ে উনার ওপর ভীষণ রাগ হচ্ছিল। কিন্তু যখন শাহ্ তামাস্প হুমায়ূনের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “বিদায় বন্ধু ” তখন হুমায়ূনের সাথে সাথে আমিও যেন কিছুটা কৃতজ্ঞ হয়ে উঠলাম। তিনি যদি তখন সহযোগিতা না করে হুমায়ূনকে শত্রুর হাতে তুলে দিতেন, তাহলে হুমায়ূনের রাজ্য ফিরে পাওয়া আর হতো না।


এখানে ব্যক্তিগতভাবে আরো একজনের কথা উল্লেখ করতে চাই, তিনি হলেন হুমায়ূনের আরেক সেনাপতি আবুল কাশেম খাঁ। বৈরাম খাঁ কে বাঁচাতে কি অবলীলায় নিজের প্রাণটা দিয়ে দিলেন! বৈরাম খাঁ তলোয়ার দিয়ে সারাজীবনে যে বীরগাথা রচনা করেছেন, আবুল কাশেম খাঁ সেই বীরত্ব দেখিয়েছেন শুধুমাত্র কয়েক মুহূর্তে, তাঁর পাহাড়সম হৃদয় দিয়ে।


এখানে হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন, ” ইতিহাস কাউকে কাউকে মনে রাখে, আবার কাউকে রাখে না। বৈরাম খাঁ’র বীরত্বগাথা ইতিহাস মনে রেখেছে। কাশেম খাঁ’র বীরত্বগাথা মনে রাখেনি।”
আমি মনে করি বৈরাম খাঁ’য়ের মতো কাশেম খাঁ ও ইতিহাসে বিরল। সেদিন যদি শত্রুর হাতে বৈরাম খাঁ’য়ের প্রাণ যেত, তাহলেও হুমায়ূন হতেন অসহায়।


হুমায়ূন ছিলেন প্রচণ্ড খেয়ালী, সত্যনিষ্ঠ, বিশ্বাসপ্রবণ। আর তাঁর হৃদয় ছিল পৃথিবীসম। তাই অন্যসব সম্রাটদের জীবনীর মতো তাঁর জীবনীতে শুধু যুদ্ধ, তলোয়ারের ঝনঝনানি আর রাজনীতি নেই। আছে লাইব্রেরি, প্রকৃতি, চিত্রকর্ম, হুমায়ূনের রক্তবর্ণ পোশাক, বাহাদুর শাহ’র পোষা তোতাপাখি, আছে সতীদাহ প্রথার শিকার হুমায়ূনের কন্যাতুল্য অম্বা, আছে একদিনের সম্রাট সেই ভিস্তিওয়ালা, আছে লছমি বাই; সৌভাগ্য যার খুব কাছ দিয়ে গিয়েছিল কিন্তু সে তা স্পর্শ করতে পারেনি। হুমায়ূন ছিলেন সেই সম্রাট যিনি রাজ্যহারা, শোচনীয় অবস্থায় ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে শের বানালেন –
“আমরা বাস করি সুন্দরের মধ্যে,
সুন্দরকে ঘিরে থাকে অসুন্দর।
যেমন পুণ্যের চারদিকে থাকে
পাপের শক্ত খোলস।
ভাগ্যবান সেইজন যে অসুন্দরের পর্দা ছিঁড়ে
সুন্দর দেখে। পুণ্যের কাছে যায় পাপের শক্ত খোলস ভেঙে।”


যখন সবাই ভিস্তিওয়ালাকে সিংহাসনে বসানোর বিরোধীতা করলো, তখন তিনি বললেন যুক্তির ওপর অবস্থান করে হৃদয়। আবৃত্তি করলেন,
” হে প্রিয়তমা!
যুক্তি বলছে তোমাকে পাওয়া আকাশের চন্দ্রকে হাতে পাওয়ার মতোই দুঃসাধ্য। মন বলছে তোমাকে পেয়েছি। মনের কথায় সত্য। তুমি আমার। “
এখানে তিনি যে শুধু মস্তিষ্কের ওপর হৃদয়ের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করলেন তাই নয়, বরং বিপদের মুহূর্তে তাঁর দেওয়া সে কথা তিনি রক্ষা করলেন।


হুমায়ূনের এই মস্ত বড় হৃদয় তাঁকে অনেক সময়ই বিপদে ফেলেছে। ভাইদের শত্রুতা সয়েছেন, শের শাহ্ কে বিশ্বাস করে রাজ্য হারিয়েছেন, পথে পথে ঘুরেছেন দীর্ঘ ১৬ টি বছর। তবে তাঁর এই মস্ত বড় হৃদয়ের কাছে তাঁর পাওনা যে একদমই ছিল না তাও নয়। শের শাহ্ এত বড় শত্রু হয়েও কখনোই তাঁর প্রাণ হরণ করতে চাননি, পারস্য সম্রাটের থেকে পেয়েছেন নির্ভেজাল বন্ধুত্ব। সৃষ্টিকর্তার কাছেও তাঁর এই হৃদয় হয়তো ছিল পছন্দের। তাই তাঁর জীবনীতে এতো বৈচিত্র্য, এত বাঁধা সয়ে, এত নাটকীয়তার মধ্যদিয়ে তিনি আবার আরোহণ করেন দিল্লির সিংহাসনে। সত্য হয় হুমায়ূনের সেই উক্তি, “একজনের চরম বিপদে আমি তার পাশে যখন দাঁড়াব, তখন দেখা যাবে আমার চরম বিপদেও কেউ একজন আমার পাশে এসে দাঁড়াবে।”


হুমায়ূনের লেখা এই হুমায়ূননামা আমার ভীষণই ভালো লেগেছে। ইতিহাসটা বরাবরই আমার কাছে কাঠখোট্টা, বিরক্তিকর ব্যাপার। বাংলাদেশ স্টাডিজে রেজাল্ট বরাবরই খারাপ। ইতিহাসের সাল মনে রাখো রে, তারিখ মুখস্থ করো রে, এগুলো অসহ্য ঠেকে বরাবরই। তবে আমার এই অসহ্য লাগাটাকে ভালো লাগায় বদলে দিলেন যে মানুষটা তিনি হলেন হুমায়ূন আহমেদ। হুমায়ূন আহমেদ আমার সবসময়ের প্রিয়। তাই ইতিহাস নির্ভর বই জেনেও বইটা সাহস করে পড়া শুরু করি। পিপাসার্ত মানুষ যেমন গ্লাসভর্তি পানি এক নিশ্বাসে শেষ করে, প্রায় সেভাবেই শেষ করেছি বইটা। পড়ার সময় একবারও বুঝতে পারিনি পাতার পর পাতা যে বইটা পড়ে চলেছি সেটা হলো সেই বিরক্তিকর, কাঠখোট্টা ইতিহাস ; বরং মনে হয়েছে কোনো থ্রিলার পড়ে চলেছি যেখানে “কি হয়, কি হয়” অনুভূতিটা সবসময়ই থাকে।

Sean Publication

View all posts by Sean Publication →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *