February 27, 2024

বাকলার জঙ্গলে by দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়

Title বাকলার জঙ্গলে
Author দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়
Publisher দে’জ পাবলিশিং (ভারত)
ISBN 9788129520876
Edition Reprint, 2017
Number of Pages 96
Country ভারত
Language বাংলা

বাকলার জঙ্গলে – নামে শিকারকাহিনী হলেও পড়ার শুরুতে বুঝতে পারিনি শিকার পড়ছি না হরর। লেখার শুরুটা হয় এমনভাবে – শিকারী দেবীপ্রসাদ বন্দোপাধ্যায় গৃহস্থের গরুছাগল খাওয়া এক ধুরন্ধর চিতাকে মারতে উড়িষ্যার বাকলাতে এসেছেন। তো এক ভরাপূর্ণিমার রাতে জঙ্গলে পথ হারান তিনি ও তাঁর গাইড। তারপরই শুরু হয় অদ্ভুতুড়ে সব কান্ড। দলছুট বাইসনের সাথে সাক্ষাৎ থেকে শুরু করে পাগলপ্রায় গাইডকে সামলানো – সবই করতে হয় তাঁকে। পরে অনেক কষ্টে রাস্তা খুঁজে পান।

ভরা জোছনার রাতে জঙ্গলে পথ ভুলিয়ে শিকারীকে মারার চেষ্টা করা এই আরবান প্রেতের নাম হলো মোহিনী। শিকারীকে মোহাবিষ্ট করে মারে সে। অন্তত বাকলাবাসীর তাই ই বিশ্বাস।
লেখা যত সামনে এগোয় তত দেবীপ্রসাদের কলমে ফুটে উঠে জঙ্গলের ভয় ও অন্ধবিশ্বাসের কেচ্ছা। মায়াবী স্বর্ণমৃগের পাল্লায় পড়ে এক পোচারের করুণ মৃত্যু, ভূরুন্ডিবাবু ও চূড়ামনির বউ-ভূত ওরফে কলাগাছ দেখে ভিরমি খাওয়া, সুন্দরী রমণীর মায়ায় পড়ে রাখালের বাঘের পেটে যাওয়া – এরকম টুকরো টুকরো অভিজ্ঞতা শেয়ারের মাধ্যমে বাকলাবাসীর ভেতরে জমে থাকা দীর্ঘদিনের কুসংস্কারকে তুলে এনেছেন লেখক।
ভরা পূর্ণিমার ফকফকে রাত দেখলেই বাকলার লোকজন জঙ্গলের দিকে পা বাড়ায়না। পাছে মোহিনী ধরে! পাছে মোহিনীর বাঁশির সুর শুনে পথ হারিয়ে বেঘোরে মরে!
তবে দেবীপ্রসাদ বন্দোপাধ্যায় নিজেও যে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে ছিলেন তা লেখার মাঝে স্বীকার করেছেন। গাঁয়ের গোভূত থেকে সুন্দরবনে জনশূন্য দ্বীপে মানুষের হাহাকার শোনা – কোনোটারই বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখা তিনি খুঁজে পাননি আজতক। তাই অশরীরী নিয়ে তাঁর নিজের বিশ্বাসও টলটলে।
বইটির মূল ভিলেন কে? আপাতদৃষ্টিতে বাকলাবাসীর ঘুম হারাম করা সেই গেরস্থের গরু চুরি করা হতভাগা চিতা। তার জ্বালায় গ্রামবাসীর ঘুমানোর জো নাই, রাত কাটে চিতা তাড়িয়ে। তাকে মারতে এসে দেবীপ্রসাদও গলদঘর্ম হন। অজস্র বিনিদ্র রজনীর প্রচেষ্টা আর তিন তিনটা হাঁকোয়ার পরও বেঁচে যাওয়া চিতাটা শেষমেশ মারা পড়ে হঠাৎ করেই, কোনো আড়ম্বর ছাড়াই।
তবে চিতার হাত থেকে গ্রামবাসী বাঁচলেও লেখার শেষটা হয় বিয়োগাত্মক।
লেখক যে যুবকের ভুলে চিতাকে মারার সুযোগ হারান ও পরে যে যুবকের টঙে বসে ঐ চিতাটাকে মেরে তাকে লজ্জা থেকে মুক্তি দেন – সেই টুকান নামের তেইশ চব্বিশ বছরের টগবগে গ্রাম্য তরুণের মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে শেষ হয় লেখকের এডভেঞ্চার।
শেষে এসে কাহিনীর মূল ভিলেন গোখেকো চিতার পরিবর্তে হয়ে পড়ে নরঘাতক শঙ্খচূড় সাপ। মহাসর্প শঙ্খচূড়। যার ক হাত উঁচু মারণ ছোবলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে টুকান।
লেখকের বড্ড প্রিয় জায়গা, জলার পাশের সেই কালো চাতাল – সেখানটায় পড়ে থাকে টুকানের কাঠ হয়ে যাওয়া লাশ। টুকান বাঁশি বাজাতে ভালোবাসতো। তার সেই বাঁশির সুর শুনতেই কিনা, শঙ্খচূড় এসেছিলো তার কাছে, আর সারারাত ধরে চলা সুর ভোরবেলা থামতেই তীব্র ক্ষোভে বসিয়ে দিয়েছে মরণ ছোবল!
গ্রামবাসীর দাবি – শঙ্খচূড় নয়, বরং মোহিনীই শঙ্খচূড় এর বেশে এসেছিলো টুকানের বাঁশি শুনতে। আর টুকানও তার মায়ায় পড়ে জীবন দিয়েছে। কাহিনীর শেষে টুকানের অস্বাভাবিক মৃত্যু যেন বাকলাবাসীর মোহিনী-ভীতিতে আরো ভিত জোগায়।
জাঙ্গল হররটির শেষে এসে তাই মূল ভিলেন হয়ে যায় সেই মহাসর্প। হারিয়ে যায় লেখকের চিতা শিকারের রোমাঞ্চ। আসলেই কি সেটি শঙ্খচূড় ছিলো? নাকি মোহিনী লেখকের কাছে নিজের সত্যতা প্রমাণ করতেই সাপরূপে দাঁত বসিয়েছিলো হতভাগা টুকানের কাঁধে?
এর জবাব আর পাওয়া যায়নি। মোহিনীর বাঁশির রহস্যভেদ করতে পারেননি শিকারী দেবীপ্রসাদ বন্দোপাধ্যায়।
বইটি মাত্র ৯৬ পৃষ্ঠার। এক বসায় শেষ করার মত। দেবীপ্রসাদ বন্দোপাধ্যায়ের লেখার হাতও খুব ভালো। তাঁর ‘সুন্দরবনের আতঙ্ক’ বইটি আগে পড়া ছিলো।
কয়েক জায়গায় অবশ্য উপমা আর বর্ণনা বেশি হয়ে গেছে, কিন্তু স্কিপ করলেও কাহিনীর ফ্লো ধরতে অসুবিধা হয়না।
বইটির প্রকাশক দে’জ পাবলিশিং। গায়ের মূল্য ৭০/-। বর্তমানে বাজারে রেয়ার, অন্যান্য শিকারকাহিনীর মতই। প্রচ্ছদটা দুর্দান্ত। সবমিলিয়ে সুখপাঠ্য। ব্যক্তিগত রেটিং ৪/৫।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *